মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার আদায়ের চলমান আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান সাদেক হোসেন খোকার

বাংলাদেশের চলমান আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে পরিচালিত লড়াই বলে আখ্যায়িত করেছের  বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা। ৮ ফেব্রুয়ারী রোববার নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে পাল্কি সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। দেশের গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার ফিরে না আসা পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। নিজ নিজ অবস্থান থেকে  এ আন্দোলনে শামিল হবার জন্য প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুল লতিফ সম্্রাট, সাবেক সেক্রেটারি জিল্লুর রহমান ও সিনিয়র সহ-সভাপতি গিয়াস আহম্মেদসহ বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী।

জনাকীর্ণ এই সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শুরুতে উপস্থিত সাংবাদিকদের কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন। জানিয়ে বলেন আমরা জানি যে, প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের মতো আপনারাও বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন এবং বিচলিত। মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের জীবন, অগণিত মা-বোনের ইজ্জত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত প্রিয় বাংলাদেশ আজ এক ভয়ংকর বিপদের মুখে। গত বছরের ৫ জানুয়ারী ইতিহাসের নজিরবিহীন এক প্রতারণামূলক ভোট-নাটকের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখলকারী বর্তমান অবৈধ সরকার তাদের দানবীয় ক্ষমতা-ক্ষুধা মেটানোর জন্য দেশবাসীকে এই বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বিস্তারিত:

নিউ ইয়ের্কে চিকিৎসাধিন জনাব সাদেক হোসেন খোকা সংবাদ সম্মেলনে তাঁর লিখিত বক্তব্যে বলেন, আপনারা জানেন যে, শেখ হাসিনার অবৈধ সরকার অবৈধ ক্ষমতার দাপটে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় গত দেড়মাস যাবত তালাবদ্ধ করে রেখেছে। একইভাবে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তার কার্যালয়ে অবরূদ্ধ করে রাখা হয়েছে। সেখানে এমনকি সাংবাদিকদেরও ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ওই দফতরের বিদ্যুৎ, টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ এমনকি মোবাইল নেটওয়ার্কও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। বিএনপি’র নেতাদেরকে দেখামাত্রই গ্রেফতার অথবা গুলি করা হচ্ছে। সাধারণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন দূরের কথা, এমনকি সাংবাদিকদের ব্রিফিং করার সুযোগও পাচ্ছেন না নেতারা। শুধুমাত্র প্রেস ব্রিফিং এবং প্রেস বিজ্ঞপ্তি ইস্যু করার অপরাধে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে সংহতি জানাতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন সাবেক দুই সংসদ সদস্য আশরাফউদ্দিন নিজান ও নাজিমউদ্দিন আহমদ। চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁর উপদেষ্টা, বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও টিভি চ্যানেল মালিক সমিতির প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেক আলী ফালূকে। আরেক উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু ও ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মুবিন চৌধুরীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে নিজ নিজ বাড়ি থেকে। তাদের প্রত্যেককেই দফায় দফায় রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে। আরেক উপদেষ্টা রিয়াজ রহমানকে চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর পরই গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর এমাজউদ্দিনের মতো নিরীহ মানুষকে গাড়ি পোড়ানোর মামলার আসামী বানিয়ে তাঁর বাড়িতে গুলি করা হয়েছে। নির্বিচারে গুলি, ক্রসফায়ার, পেট্টোল বোমার সন্ত্রাস ও গণগ্রেফতারের মাধ্যমে দেশজুড়ে এক বিভিষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে সরকার। সে কারণেই আজ এই দূরদেশে বসে আপনাদের মাধ্যমে দেশ নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ

আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, অবৈধ ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার অপচেষ্টা বাস্তবায়ন করার জন্য বর্তমান অস্ত্রবাজ সরকার এমন কোনো অপকর্ম নেই যা করছে না। চলমান আন্দোলন-লড়াইয়ের মুখে তারা গণদাবী মেনে ক্ষমতা ছাড়ার পরিবর্তে বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করার এক ভয়াবহ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে উদ্যত হয়েছে। এ জন্য তারা প্রয়োজনে দেশকে সিরিয়া বা ইরাক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়ার হুমকিও প্রকাশ্যেই দিয়ে চলেছে। বিরোধী দলের নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সরকার একদিকে দলীয় ক্যাডার ও দলবাজ গোয়েন্দা এজেন্টদের দিয়ে পেট্টোল বোমা মেরে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে, অন্যদিকে বিরোধী দলের নিরীহ নেতা-কর্মীদেরকে প্রকাশ্যে ধরে নিয়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের নামে সরাসরি গুলি চালিয়ে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করছে।

আমরা জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের লক্ষ্যে চলমান আন্দোলন-লড়াইয়ে র‌্যাব-পুলিশের গুলিতে ও পেট্টোল বোমায় নিহত মানুষদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং তাদের শোক-সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। এছাড়া গুলি ও বোমায় আহত যেসব মানুষ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে দু:সহ যন্ত্রনালয় ছটফট করছেন, তাদের প্রতিও আমাদের গভীর সহানুভূতি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, বর্বরোচিত এসব হত্যাকান্ড ও হামলার প্রকৃত হোতাদের অচিরেই গ্রেফতারের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং প্রত্যেক অপরাধীই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে। এছাড়া জুলুমবাজ অবৈধ সরকারের বিদায়ের পর জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিবর্গ ও পরিবারসমূহকে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।

প্রিয় বন্ধুগণ,

এ কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে যে অশান্তির আগুন জ্বলছে, তার জন্য দায়ী আজকের অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তে স্বেচ্ছাচারি কায়দায় সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা তুলে দিয়ে এই আগুন জ্বেলেছেন। দেশের সকল রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, বিশিষ্টজনেরা এমনকি শেখ হাসিনার নিজের দল আওয়ামী লীগও এই পদ্ধতি বহাল রাখার পক্ষে অভিমত দিয়েছিল। কিন্তু সবার মত উপেক্ষা করে তিনি একক সিদ্ধান্তে একটি মিমাংসিত ব্যবস্থা ধ্বংস করার মাধ্যমে দেশকে দীর্ঘস্থায়ী বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। সুতরাং আজকের পেট্টোল বোমা ও কথিত ক্রসফায়ারে সকল হত্যাকান্ডের দায় তাকেই নিতে হবে।

এরপর তিনি সম্পূর্ণ একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েমের নীলনকশা অনুযায়ী গত বছরের ৫ জানুয়ারী দেশে এমন একটি ভোট-প্রতারণার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন, সভ্য দুনিয়ায় যার দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত নেই। আওয়ামী জোটের বাইরের সকল রাজনৈতিক দল, এমনকি কমিউনিস্ট পার্টি, এলডিপি গণফোরাম, বিকল্পধারা, বাংলাদেশ, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, আ স ম আব্দুর রবের জাসদসহ প্রায় সকল রাজনৈতিক দল এই সাজানো নির্বাচন বর্জন করে। জনগণের সর্বাত্মক প্রত্যাখানের মুখে আওয়ামী জোট ১৫৩ আসনে তাদের প্রার্থীদেরকে নির্বাচন ছাড়াই নির্বাচিত ঘোষণা করে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার ঘোরতর আপত্তি উপেক্ষা করে তথাকথিত ওই নির্বাচনী নাটকের মধ্য দিয়ে বর্তমান অবৈধ সরকার কার্যতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশকেই ডাকাতি করে নেয়। দেশজুড়ে বিরোধী দলের অসংখ্য নেতা-কর্মীকে খুন করার পাশাপাশি হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারের পর কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এমন অব্যাহত জুলুম-নিপীড়ন সত্ত্বেও একটি শান্তিপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপি তার জোটভূক্ত দলগুলোকে সাথে নিয়ে গত এক বছর বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে না গিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি বার বার আহবান জানিয়েছে। কিন্তু এই শান্তিপূর্ণ আহবানকে আমল না দিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও পাতি নেতারা বিরোধী দলের আন্দোলন-সক্ষমতা নিয়ে প্রায় নিয়মিতভাবে ঠাট্টা-মশকরা করে বক্তব্য দিয়েছে। সেই সঙ্গে দমন-পীড়নের স্টিম রোলার চালিয়ে বিরোধী মতকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার দানবীয় উন্মাদনায় লিপ্ত থেকেছে।

আপনারা জানেন যে, এমন পটভূমিতেই গত ৫ জানুয়ারী বিরোধী জোট রাজধানী ঢাকায় গণতন্ত্র হত্যা দিবস উপলক্ষে সমাবেশের কর্মসূচি দেয়। কিন্তু গণঅভ্যূত্থানের ভয়ে সদা তটস্থ এই অবৈধ সরকার জনগণের মুখোমুখি হওয়ার সাহস দেখাতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। দুনিয়ার তাবত ঘৃনিত স্বৈরশাসকদের পদাঙ্ক অনুসরনের মাধ্যমে তারা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের পথ রূদ্ধ করার পাশাপাশি বিরোধী দলের ওপর নজিরবিহীন জুলুম-নির্যাতন শুরু করে। সরকারই বস্তুত বিরোধী জোটকে টানা আন্দোলন-লড়াইয়ের পথে ঠেলে দেয়। এরপর গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সরকারের সীমাহীন দমন-পীড়ন ও বর্বরোচিত হত্যা-নির্যাতন উপেক্ষা করে দেশবাসী এই জুলমবাজ অবৈধ সরকারের বিরূদ্ধে সর্বাত্মক সফল গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এ অবস্থায় সরকার এখনও পর্যন্ত ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার সুযোগ পেয়েছে কেবলমাত্র বিভিন্ন বাহিনীর কতিপয় উগ্র দলবাজ কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ সহায়তায়, যারা পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সদস্যদেরকে সরাসরি মানুষ হত্যার নির্দেশ দিচ্ছে। স্বয়ং অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার জোটের নেতারা প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের বুকে গুলি চালানোর উষ্কানী দিচ্ছেন। তাদের নির্দেশে প্রতিদিনই নিরপরাধ তরুন ও যুবকদেরকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে । নৃশংস কায়দায় গুলি চালিয়ে ঝাঁজরা করে দেওয়া হচ্ছে তাদের বুক। এরপর সেই ছবি আবার গণমাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে। যৌথবাহিনীর অভিযানের নামে বিরোধী দল সমর্থকদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে, কোথাওবা বুলডোজার চালিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। এমনকি মহিলাদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো পেশাচিক ঘটনাও সংঘটিত হচ্ছে। এসব ঘটনা কেবলমাত্র মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে আমাদের প্রশ্ন, আপনারা কার বুকে গুলি চালাচ্ছেন ? গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়াটাই তাদের অপরাধ ? এভাবে নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে আপনাদের কি লাভ ? আপনারা তো কোনো দখলদার বাহিনীর সদস্য নন। দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসলে আপনাদের ভবিষ্যত বংশধরেরাই উপকৃত হবে। সুতরাং এসব নৃশংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে নিবৃত্ত হওয়ার জন্য আমরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি সদস্যদের প্রতি আহবান জানাই।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, দেশে জনগণের চলমান আন্দোলন-লড়াইকে জঙ্গি তৎপরতা হিসাবে প্রতিপন্ন করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে নিরীহ জনসাধারণের ওপর চালানো হচ্ছে বর্বরোচিত পেট্টোল বোমা হামলা। ইতিমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে অসংখ্য খবর বের হয়েছে যে, র‌্যাব-পুলিশের প্রহরায় মূলত আওয়ামী লীগের ক্যাডাররাই এসব হামলা চালাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ হাতেনাতে ধরাও পড়েছে। দেশে আন্দোলনের নামে নিরীহ জনগণের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানোর সংস্কৃতির জন্মদাতা আওয়ামী লীগ এবং ক্ষমতায় বসেও তারা এই সংস্কৃতি লালন করছে। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে ১৯৯৬ সালে আন্দোলনের নামে আওয়ামী লীগ কিভাবে ঢাকার শনির আখড়ায় বাসে পেট্টোল বোমা হামলা চালিয়ে ১৭ জন নিরীহ যাত্রীকে পুড়িয়ে মেরেছিল। এরপর ২০০৪ সালে শেরাটন হোটেলের পাশে বিআরটিসির বাসে গান পাউডার হামলা চালিয়ে ১১ জনকে হত্যা করা হয়। সে সময় তারা আন্দোলনের নামে বোমা-সন্ত্রাস চালিয়ে অসংখ্য মানুষকে হতাহত করেছিল।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

এ কথা আজ দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে, বর্তমান অবৈধ সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে প্রকৃতপক্ষে প্রতিমুহুর্তে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস এবং মুক্তিযুদ্ধের সকল অর্জনকেই পদদলিত করে চলেছে। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানী স্বৈরশাসকদের নিগড়মুক্ত হয়ে একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু তারা গণতন্ত্র হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নাম ভাঙ্গিয়ে বাস্তবে কি চায়, তা আজ দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার। সুতরাং এই খুনি ও প্রতারক সরকারের দ্রুত প্রস্থানই এখন দেশবাসীর প্রধান আকাঙ্খা। জনগণের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই কঠিন সময়ে নিজের স্বাভাবিক জীবন বিসর্জনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। কার্যালয়ের ছোট্ট একটি কক্ষে কার্যত তিনি বন্দি জীবন যাপন করছেন, যেখানে খাওয়া কিংবা ঘুমানোর কোনো স্বাভাবিক বন্দোবস্ত নেই। এ অবস্থায়ও দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের দায়েরকৃত মামলায় তাকে আসামী করা হচ্ছে। অতীতে স্বৈরাচার এরশাদকে হটিয়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও তিনি ছিলেন আপোষহীন প্রধান কান্ডারি এবং তাঁর নেতৃত্বেই সেদিন গণতন্ত্রে উত্তরনের পথ খুঁজে পেয়েছিল বাংলাদেশ। এ কারণে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে।

প্রিয় সংবাদকর্মীগণ

এই নিপিড়ক শাসক চক্রের বিরূদ্ধে চলমান আন্দোলন-লড়াই মোটেই বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোটের ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে পরিচালিত এই লড়াই মুক্তিযুদ্ধেরই একটি সম্প্রসারিত অংশ, যা জনগণের কাছে দেশের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই করা হচ্ছে। আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। কিন্তু বর্তমান অবৈধ সরকার অস্ত্রের জোরে সেই মালিকানা হাইজ্যাক করে নিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে জনগণের সকল গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার। এ পরিস্থিতিতে চুড়ান্ত লড়াইয়ের মাধ্যমে গণধিকৃত এই অবৈধ শাসক চক্রকে বিদায়ের মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ পুন:প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া জনগণের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। এই ভূখন্ডের জনগণ কখনও এ ধরণের জুলুমবাজির স্বৈরশাসন মেনে নেয়নি। সে কারণে কেবলমাত্র ২০ দলীয় জোট নয়, আওয়ামী জোটের বাইরের সকল রাজনৈতিক শক্তি আজ চলমান আন্দোলন-লড়াইয়ে একাত্ম। সরকারের নির্বিচার গুলি, কথিত ক্রসফায়ার ও পেট্টোল বোমা সন্ত্রাসের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে সমস্ত নেতা-কর্মী এই আন্দোলনকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন, তাদের ভূমিকা জাতি চিরদিন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে। দেশের এই দুর্দিনে প্রবাসীদের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহবান, তাঁরাও যেন নিজ নিজ অবস্থান থেকে যার যেভাবে সম্ভব, সেভাবেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে শামিল হন।

এ পরিস্থিতিতে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, সররকার যে কোনোমূল্যে অবৈধ ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর উগ্র দলবাজ সদস্যদেরকে শান্তিপ্রিয় জনগণের বিরূদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। জনগণের টাকায় জীবিকা নির্বাহকারী এসব দলান্ধ কর্মকর্তা পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার সকল রীতি-নীতি ভুলে গিয়ে প্রকাশ্য সমাবেশে আন্দোলনকারীদের গুলি করে হত্যা, এমনকি বংশ নির্মূল করার ঘোষণা দিচ্ছে। আমরা জানিয়ে রাখতে চাই যে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পোষাক পরিহিত এসব খুনি-সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় তথ্য জনগণ সংগ্রহ করে রাখছে এবং সময়মতো সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্রের পেশাদার ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি আমাদের আহবান, ভবিষ্যত প্রজন্মের মঙ্গলের কথা ভেবে দেশাত্মবোধে উজ্জীবিত হয়ে আপনারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই এসব আওয়ামী সেবাদাসদের বিরূদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

পরিশেষে গণমাধ্যমের বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই যে, বর্তমান অবৈধ শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য দেশের সব রকম গণমাধ্যমকে কিভাবে অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি করেছে, তা আপনারা আমাদের চেয়ে ভাল জানেন। আমরা বিশ্বাস করি মুক্ত গণমাধ্যমে, মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতায়, যা ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা। কিন্তু অবৈধ শাসনের যাঁতাকলে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনাও আজ নিদারুনভাবে পদদলিত। সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা, টেলিভিশন ও বেতারের কার্যক্রমের ওপর আরোপ করা হয়েছে নানামুখী নিয়ন্ত্রণ। কেবলমাত্র এক তরফাভাবে সরকারের প্রশংসা প্রচার এবং চলমান আন্দোলন-লড়াইয়ের বিরূদ্ধে বিষোদগার করতে বাধ্য করা হচ্ছে প্রতিটি মিডিয়াকে। অবৈধ সরকারের এমন নিয়ন্ত্রণমূলক কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে জনগণের আন্দোলন সম্পর্কে সত্য ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের জন্য আমরা সকল গণমাধ্যম উদ্যোক্তা ও গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি উদাত্ত আহবান জানাই।

 

You Might Also Like