‘পয়েন্ট অব নো রিটার্নে’

মিনার রশীদ :

সব আলামত দেখে মনে হচ্ছে যে, সরকার চরম বেকায়দায় পড়ে গেছে। বিএনপি এবং জামায়াত এ দু’টি দলকেই ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্নে’ ঠেলে দেয়া হয়েছে ও সরকার যেসব অপকৌশল প্রয়োগ করে এত দিন বিরোধী দলগুলোকে দমিয়ে রেখেছিল, একে একে তার সবগুলোই ভোঁতা বা অকেজো হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনোটি সরকারের জন্য বুমেরাং হয়ে পড়েছে।

আন্দোলনে এমন একটা পদ্ধতি বেরিয়ে এসেছে যে মধ্যসারির নেতাদের ওপর নির্ভরতা ছাড়াই টপ নেতৃত্ব আন্দোলন পরিচালনা করতে সক্ষম হচ্ছেন। এ বিষয়টি আন্দোলনের চেহারা ও মেজাজ আমূল বদলে দিয়েছে। শোনা যাচ্ছে, কিছু সুযোগসন্ধানী নেতাকে নিয়ে বিকল্প বিএনপি তৈরির সরকারের পরিকল্পনাটিও মাঠে মারা গেছে।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোলবোমা মেরে সাতজন মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। পুলিশ পাশ থেকে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখেছে, কিন্তু আগুন নেভাতে এগিয়ে যায়নি বলে অভিযোগ এসেছে। এ বিষয়ে জনগণের সন্দেহের তীরটি সরকারের দিকেই বেশি করে আপতিত হয়েছে ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এমবেডেড মিডিয়ার ওপর থেকে জনগণের বিশ্বাস এমনিতেই উঠে গেছে।

সরকার ও পদলেহী মিডিয়ার দুর্বোধ্য বীজগণিত মানুষ বুঝতে পারে না। তার পরিবর্তে সহজ পাটীগণিতের হিসাব কষে হত্যাকারীদের মোটিভ ও চেহারা ধরে ফেলেছে। ভবিষ্যতে অন্য কেউ নিজের ফাঁসি চেয়ে কিছু জানিয়ে দিলে মানুষ মূল রহস্যটি জানতে পারবে। অন্যথায় রোজ কেয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

সাধারণ মানুষের বিশ্লেষণী শক্তি এখন আগের চেয়ে অনেকগুণ বেড়ে গেছে। কাজেই বিরোধী দলের আন্দোলনের প্রতি জনগণকে বিক্ষুব্ধ বানাতে সরকারের এই পরিকল্পনাটিও বুমেরাং হয়ে পড়েছে। কারণ, মূল ধারার মিডিয়াকে নিজেদের হাতে নিয়ে ফেললেও বিকল্প সামাজিক মিডিয়ার শক্তি ও কর্মকৌশল সম্পর্কে সরকার সম্যক ধারণা করতে পারেনি।

অন্য দিকে বহির্বিশ্বে সরকারের একমাত্র আশা ও ভরসার জায়গাটিও নড়ে গেছে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষেই তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। আমাদের দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তারা এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। খবরটি বাড়াবাড়িকারীদের পায়ের নিচের মাটি অনেকটাই সরিয়ে দিয়েছে।

হিন্দুত্ববাদীদের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তারা যে একটা পর্যায়ের নিচে নামতে পারবেন না তা স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ অবৈধ কাউকে টিকিয়ে রাখতে যতটুকু নিচে নামা দরকার কংগ্রেস সরকার ততটুকুই নিচে নামত। কিন্তু বিজেপি সরকার হুবহু ততটুকু যে নামবে না, এটা বোঝা যাচ্ছে। অনৈতিক ক্ষমতা চর্চাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলতে এতটুকুই যথেষ্ট।

তা ছাড়া একটা অস্থিতিশীল বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ। ইন্ডিয়া নিজের স্বার্থেই এ দেশে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেবে না। ইন্ডিয়ার নেতৃত্ব আমাদের মতো মগজহীন নয়। এ দেশে গৃহযুদ্ধ বাধলে ইন্ডিয়ার কথিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে, এটা তারা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি চায়নার জন্য বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করবে, যা ইন্ডিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের স্বার্থের সম্পূর্ণ বিপরীতে চলে যাবে। কাজেই তারা কেউ নিজের নাক কেটে আমাদের গণতন্ত্রের যাত্রাটি বন্ধ করবেন না। নিজের গরজেই তাদেরকে আমাদের গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করতে হবে। এখানেও সরকার একটা পর্যায়ে এসে আটকে যেতে বাধ্য।

যে পুলিশ ও র‌্যাবের ওপর নির্ভর করে এ সরকার টিকে আছে, তারাও ভেতর-বাহির থেকে প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীতে আমাদের অংশগ্রহণ প্রশ্নের মুখে পড়েছে। জাতিসঙ্ঘের এক মুখপাত্র ইতোমধ্যেই একটি প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রেখেছেন। মতলববাজ মিডিয়া এ সংবাদটিকে ফিল্টারড করে ফেললেও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে দেশের ভেতরে প্রায় সবার কাছে পৌঁছে গেছে।

এখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভাবনা বা হিসাবটিও স্ট্রেট ফরোয়ার্ড। নিজের দেশে যারা অশান্তি সৃষ্টি করে তারা অন্য দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। নিজের দেশে যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, অন্য জায়গায় তারা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।

ডিজিটাল এই যুগে একটি ঘটনা মুহূর্তের মধ্যেই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পুলিশ ও র‌্যাবের অফিসাররাও নতুন হিসাব-নিকাশে পড়ে গেছেন। সরাসরি গুলির নির্দেশ তাদের নিয়ন্ত্রণহীনতা ও সার্বিক অসহায়ত্বকেই তুলে ধরেছে।

যেসব অতি উৎসাহী অফিসার এসব কাজ করছেন, তারা দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর মনিটরিংয়ে পড়ে গেছেন। তাদের কয়েকজনের নামে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোর্টে মামলা হয়েছে। মামলার এ ধারাটি অব্যাহত থাকবে। এ ধরনের অমানবিক কাজে জড়িতদের কেউ রেহাই পাবেন না।

গত ৫ জানুয়ারিতে সরকার যে ভুলটি করেছে এখন পর্যন্ত তার পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পেরেছে বিএনপি এবং জামায়াত জোট। মাঝখানে কোকোর মৃত্যু সরকারকে দারুণভাবে উৎফুল্ল করে তুলেছিল। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ় মনোবল এবং কোকোর জানাজায় স্মরণকালের বৃহত্তম জনসমাবেশ পুরো আন্দোলনকে নতুন জীবনীশক্তি দান করেছে। এই শোক এখন মহাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

সব দিক বিবেচনায় এই সরকারের জন্য সার্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতির অনিবার্যতা শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

You Might Also Like