অবরুদ্ধ খালেদা জিয়া এবং নায়ার তত্ত্ব

আহমদ আশিকুল হামিদ : বাংলাদেশে আবারও বিদেশী কূটনীতিকরা জোর তৎপরতা শুরু করেছেন। এবারের কারণ সৃষ্টি হয়েছে বিএনপির চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ডাকে চলমান অবরোধের পরিপ্রেক্ষিতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও এরই মধ্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যখন প্রথম থেকে ঘাড় বাঁকিয়ে রাখা ক্ষমতাসীনরাও এসব দেশ ও সংস্থার দূত ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে বাধ্য হয়েছেন। এটা গত ৫ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। ধারণা করা হচ্ছে, দু’চারদিনের মধ্যে সরকারের প্রতিক্রিয়া ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানা যাবে। দেশপ্রেমিক পর্যবেক্ষকরা অবশ্য তেমন আশাবাদী হতে পারছেন না। কারণ, আওয়ামী লীগ সরকারের একমাত্র পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র ভারতের বিজেপি সরকারও কংগ্রেস সরকারের সুরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি পূর্ণ আস্থা ও সমর্থন ঘোষণা করেছে। অথচ ধারণা করা হয়েছিল, লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী দল কংগ্রেসের আশীর্বাদ পেয়ে এসেছেন বলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদি হয়তো শেখ হাসিনার পশ্নে অন্য রকম অবস্থান নেবেন। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলে কথা! বাংলাদেশকে শোষণ করার এবং বাংলাদেশের কাছ থেকে ইচ্ছাপূরণের ব্যাপারে সব ভারতীয় নেতাই যে অভিন্ন মনোভাব পোষণ করেন বর্তমান পর্যায়েও তারই প্রমাণ পাওয়া গেলো। রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও সংশয় বাড়ছে একই কারণে।

এ পর্যন্ত এসে পাঠকরা ভাবতে পারেন, কূটনীতিকদের তৎপরতা সম্পর্কে আলোচনা করার জন্যই আজকের নিবন্ধটি পরিকল্পিত হয়েছে। অন্যদিকে উদ্দেশ্য এখানে ভারতীয় এক বিশিষ্টজনের মন্তব্য ও বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানানো। তার আগে বলা দরকার, দেশ ও জাতির জন্য লজ্জাজনক হলেও বাংলাদেশে এমন কিছু সংবাদপত্র রয়েছে যেগুলো বিশেষ করে ভারতীয়দের লেখা নিবন্ধ ছাপাতে পারলে ধন্য ও কৃতার্থ হয়ে যায়। এই সুযোগে ভারতীয়রাও নিবন্ধের আড়ালে নিজেদের অভিমত এবং পরামর্শের ট্যাবলেট গেলানোর চেষ্টা করে থাকেন। ‘প্রবীণ সাংবাদিক ও ঝানু কূটনীতিক’ হিসেবে পরিচিত কুলদিপ নায়ারও তেমন একজন, যার সম্পর্কে সচেতন পাঠকদের আগে থেকেই জানা থাকার কথা। কারণ, উপলক্ষ পেলে তো বটেই, সুচিন্তিতভাবে উপলক্ষ সৃষ্টি করে হলেও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে দেখা গেছে তাকে। সে কুলদিপ নায়ারই সম্প্রতি আবারও দৃশ্যপটে এসেছেন। প্রধান জাতীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ডাকে চলমান সফল অবরোধে মাথা একেবারে খারাপ হয়ে গেছে বলেই ‘তর’ সয়নি মিস্টার নায়ারের। বিলম্ব  না করে লাফিয়ে দৃশ্যপটে এসেছেন তিনি। গত ১৯ জানুয়ারি ঢাকার একটি দৈনিকে ‘নিজেকেই দায়ী করতে পারেন খালেদা’ শিরোনামে লেখা এক নাতিদীর্ঘ নিবন্ধে যথারীতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন তিনি। শুধু সাফাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও নিবন্ধটিকে হয়তো বিষয়বস্তু বানাতে হতো না। কিন্তু নানা কথার মারপ্যাঁচে এবং চমৎকার কৌশলে এমন কিছু বক্তব্যও মিস্টার নায়ার হাজির করেছেন, যেগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অস্তিত্বের সম্পর্ক রয়েছে। যেমন তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশ নাকি ‘হাজার হাজার মানুষের রক্তের বিনিময়ে’ স্বাধীনতা অর্জন করেছে! খুবই তাৎপর্যপূণ বিষয় হলো, সরকারি হিসাবে যেখানে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন বলা হয় সেখানে মিস্টার নায়ার আবিষ্কার করেছেন ‘হাজার হাজার’! কুলদিপ নায়ারের অন্য তিনটি মন্তব্যও উল্লেখ করা দরকার- এক. ‘প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ এখনো স্বাধীন হয়নি’; দুই. বাংলাদেশীরা নাকি ‘কর্কশ ও যুক্তিহীনভাবে’ নিজেদের শাসন করতে ভালোবাসে এবং তিন. স্বাধীনতাযুদ্ধে সহযোগিতা করেছিল বলে বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা ও সরকারের ব্যাপারে নয়াদিল্লি ‘একটা ভূমিকা রাখতে পারে’।

gulshan-officeওপরে উল্লেখিত মন্তব্য তিনটির ব্যাখ্যা করলে দেখা যাবে, মিস্টার নায়ার বাংলাদেশকে এখনো ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ মনে করেন না। শুধু তা-ই নয়, সরকার গঠন এবং ক্ষমতার পালাবদলের মতো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করার জন্যও ভারতকে উস্কানি দিয়েছেন এই ‘ঝানু’ কূটনীতিক। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের সামনে নাকি একটি পথই খোলা রয়েছে- তার ভাষায়, ‘দেশ (জনগণ) পরিষ্কার দুই ভাগে বিভক্ত হবে এবং রাজনৈতিক শত্রুতায় জড়িয়ে পড়বে।’ অমন অবস্থার পরিণত পর্যায়েই ভারতকে ‘একটা ভূমিকা’ পালন করার তাগিদ দিয়েছেন মিস্টার নায়ার। দ্বিতীয় একটি কারণেরও উল্লেখ করেছেন তিনি। সেটা পাকিস্তানের কল্পিত ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা’ সম্পর্কে। পাকিস্তান নাকি জামায়াতে ইসলামীর মাধ্যমে বাংলাদেশে ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে’ এবং বিএনপি নাকি সব জেনেই জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে! মিস্টার নায়ার লিখেছেন, ‘খালেদা জিয়া পণ করেছেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ভবিষ্যতেও জোট বাঁধবেন।’ এভাবেই একের পর এক প্রসঙ্গ ধরে ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়েছেন মিস্টার কুলদিপ নায়ার। বিএনপির মতো জনপ্রিয় প্রধান একটি দল কার সঙ্গে জোট বাঁধবে এবং কোন কৌশলে রাজনীতি করবে সেসব বিষয়ে কোনো ভিনদেশীর নিশ্চয়ই মন্তব্য করার বা মতামত দেয়ার সুযোগ বা অধিকার থাকতে পারে না। কিন্তু ভারতীয় কূটনীতিক বলে কথা! নিজের উদ্দেশ্যের প্রকাশ ঘটাতেও দ্বিধা করেননি মিস্টার নায়ার। সে উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা। তিনি জানেন, বিএনপি যদি জামায়াতে ইসলামীর ‘সঙ্গ’ ত্যাগ না করে এবং দল দুটি যদি জোটবদ্ধ থাকে তাহলে তার প্রিয় দল ও নেত্রীর সমুহ বিপদের, এমনকি পতনেরও সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্যই তিনি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই কথা বলেছেন, রাজনৈতিক অর্থে যাকে ‘প্যাঁচাল’ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। এরই ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন তিনি বর্তমান সরকারের বৈধতা এবং বেগম খালেদা জিয়ার কথিত সহযোগিতা সম্পর্কে। গত বছরের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের উল্লেখ করে মূল কথায় মিস্টার নায়ার লিখেছেন, ওই নির্বাচন নাকি ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ হয়েছিল এবং এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাকি ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ পেয়েছিলেন! এ পর্যন্ত এসেও থেমে পড়েননি এই ভারতীয় কূটনীতিক। লিখেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার দাবি ও যুক্তি নাকি ‘হালে পানি পায়নি’ এবং নির্বাচন বয়কট করার মধ্য দিয়ে বিএনপির নেত্রীই নাকি শেখ হাসিনার শক্তিশালী রূপকল্পকে ‘বৈধতা’ দিয়েছেন! আরো কিছু মন্তব্য ও অভিমতও প্রকাশ করেছেন মিস্টার নায়ার। এসবের মধ্যে একটি মন্তব্য উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি লিখেছেন, ‘শেখ হাসিনা যে রাজনীতিতে পটু তা নতুন নয় (!)।’ আর ‘পটু’ বলেই তিনি বিএনপির নেত্রীকে অবরুদ্ধ করেছেন যাতে তার পক্ষে এমন কোনো বিশেষ জায়গায় যাওয়া সম্ভব না হয় যেখানে গিয়ে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ডাক দিতে পারতেন।

এভাবেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়েছেন ভারতের ‘ঝানু কূটনীতিক’ কুলদিপ নায়ার। বলা দরকার, এবারই প্রথম নয়, অতীতের বিভিন্ন সময়েও তিনি নাক তো গলিয়েছেনই, উপদেশও দিয়েছেন গাঁয়ে না মানা মোড়লের স্টাইলে। মিস্টার নায়ারকে বেশি তৎপর দেখা গেছে সেনাবাহিনীর ব্যাপারে। যেমন ২০১২ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ১৯৭৫ সালে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নাকি রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎখাত চেষ্টার ব্যাপারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জানিয়েছিল। কিন্তু সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয়রা নিজেরাই ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকায় শেখ মুজিবকে প্রাণ হারাতে হয়েছিল। এ ধরনের লেখালেখির ধারাবাহিকতায় পিলখানা হত্যাকা-কেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহেও কম লেখেননি মিস্টার নায়ার। কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, ‘ঝানু কূটনীতিক’ হলেও এমন কিছু তথ্যও তিনি নিজের অজান্তে ফাঁস করে দিয়েছিলেন, যেগুলো পিলখানা হত্যাকা-ে ভারতের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল। ২০১২ সালে বাংলাদেশের একটি প্রশ্নসাপেক্ষ প্রচেষ্টাকেও বিষয়বস্তু বানিয়েছিলেন কুলদিপ নায়ার। বলেছিলেন, কথিত ওই ব্যর্থ প্রচেষ্টা নাকি দিল্লির জন্য একটি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে এসেছিল। এর মধ্যে মিস্টার নায়ার দেখেছিলেন নতুন পর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার সুযোগ। তার পরামর্শ ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপারে জনগণের মোহভঙ্গ ঘটলেও দিল্লির উচিত তাদের জানিয়ে দেয়া, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রক্ষার জন্য ভারত ‘যে কোনো সীমা পর্যন্ত’ পদক্ষেপ নেবে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সবকিছু করবে। একই নিবন্ধে চমকপ্রদ কিছু তথ্যও জানিয়েছিলেন ‘ঝানু’ এই কূটনীতিক। মিস্টার নায়ার লিখেছিলেন, তার কাছে ‘খবর’ আছে, আসামের ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট বা উলফা, নাগা বিদ্রোহী ও মনিপুরের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামীরা নাকি বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ভূমিকা পালন করছে। বিস্ময় প্রকাশ করে মিস্টার নায়ার বলেছিলেন, শেখ হাসিনার সরকারের বদৌলতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা যেখানে অতীতের মতো বাংলাদেশের ভূখ- ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে না ভারত সেখানে বাংলাদেশের ব্যাপারে উদাসীন ও নিষ্ক্রিয় রয়েছে। আর সে সুযোগই নিচ্ছে ভারতের বিদ্রোহীরা।

আগেই বলেছি, মাথা বাংলাদেশের হলেও ব্যথায় মরে যান ভারতের এই প্রবীণ সাংবাদিক-ক’টনীতিক। অনেক উপলক্ষেই কুলদিপ নায়ারকে দৃশ্যপটে আসতে দেখা গেছে। তার প্রতিটি কথাও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন ২০১০ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের উপস্থিতিতে ঢাকায় এক স্মারক বক্তৃতায় এবং পরদিন একটি দৈনিকে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশকে নিয়ে নিজের মাথাব্যথার কথা জানিয়েছিলেন কুলদিপ নায়ার। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘একই’ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কারণে দু’ দেশের মধ্যকার সম্পর্ক ‘ঐতিহাসিক’। এ সম্পর্ক ‘আরো গভীর’ হয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। স্বাধীনতার পর দু’ দেশের সরকার ‘যৌথ অংশিদারিত্বে’ বিভিন্ন পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। তখনও প্রশ্ন উঠেছিল, ঠিক কোন ধরনের ‘ঐতিহাসিক’ তথ্যের ভিত্তিতে ‘একই’ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কথা বলেছেন কুলদিপ নায়ার? প্রশ্নের কারণ, দিল্লির শাসকদের ভাষা হিন্দি, যার সঙ্গে হিন্দুদের কিছুটা থাকলেও মুসলমানদের দূরতম সম্পর্ক নেই। কখনো ছিলও না। তাছাড়া প্রায় ৯১ শতাংশ মুসলমানের এই দেশ ‘পূর্ব পাকিস্তান’ থাকাকালেও বাংলা ভাষার জন্য উর্দুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা বানিয়ে ছেড়েছে। মুসলমান হয়েও এদেশের মানুষ ভারতীয় ও পাকিস্তানী মুসলমানদের ভাষা হিসেবে আদৃত উর্দুকে যেখানে প্রত্যাখ্যান করেছেন সেখানে কুলদিপ নায়ারদের হিন্দুয়ানী ভাষা হিন্দির সঙ্গে একাত্মতা বোধ করতে পারেন কিভাবে? ইতিহাসের কোন অংশে কথাটা পেয়েছেন তিনি? মিস্টার নায়ার সম্ভবত ভারতের রাজ্য পশ্চিম বঙ্গকে মাথায় রেখে ‘একই’ ভাষার কথা বলেছিলেন, হিন্দুদের সঙ্গে বাঙালী মুসলমানদের মিলিয়ে ফেলেছিলেন। এ ক্ষেত্রেও ইতিহাস কিন্তু কুলদিপ নায়ারকে সমর্থন করে না। কারণ, এক সময় ‘একই’ ভারতের অংশ থাকলেও বাংলাদেশ ভারত থেকে বেরিয়ে এসেছিল। ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই বাংলাদেশ দিল্লির আধিপত্য মেনে নেয়নি। ‘একই’ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও তাই প্রশ্ন ওঠে না। কুলদিপ নায়ার নিশ্চয়ই জানেন, ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ‘বঙ্গ’ নামক প্রদেশের অংশ বাংলাদেশের ভারত ভেঙে বেরিয়ে আসার প্রধান কারণটিও ‘ঐতিহাসিক’। ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে মূল ভারতের সঙ্গে সব সময়ই মুসলিম প্রধান এ অঞ্চলের দ্বন্দ্ব ছিল। আর এ দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ ছিল হিন্দুদের শোষণ-পীড়ন। শিক্ষা, ব্যবসা ও চাকরিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলমানরা ছিলেন নির্যাতিত, উপেক্ষিত ও পশ্চাদপদ অবস্থায়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ছিল সে অবস্থারই পরিণতি। পরবর্তীকালে ‘পশ্চিম পাকিস্তান’কেন্দ্রিক শাসক-শোষক ও জেনারেলদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করেও বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরই পরিচয় দিয়েছেন। নিজেরা মুসলমান হলেও ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ পাকিস্তানের সঙ্গে ‘একই’ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে বিলীন হয়ে যাননি।

অর্থাৎ ‘ঐতিহাসিক’ কারণেই নিরংকুশভাবে মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতের ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। এখানে কুলদিপ নায়ারের জন্য ‘একই’ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে পাড়া মাতানোর কোনো সুযোগ নেই। এ অবস্থায় পরিবর্তন ঘটতে পারতো স্বাধীনতার পর। কারণ ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্য করেছিল। কিন্তু আস্থা তৈরির দুর্লভ সে সুযোগটিকেও ভারতই হাতছাড়া করেছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বিপুল ঘাটতির মধ্যে রাখা, অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে নিষ্ঠুরভাবে বঞ্চিত করা, ভূমি ও সমুদ্রের সীমানা নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি ও তা জিইয়ে রাখা এবং সীমান্তে হত্যা পর্যন্ত এমন কোনো বিষয়ের উল্লেখ করা যাবে না, যেখানে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে শত্রুতাপূর্ণ ব্যবহার না করে চলেছে। এজন্যই ভারতের প্রতি বাংলাদেশী জনগণের মনোভাবও বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু কুলদিপ নায়ারের চোখে এসবের কিছুই ধরা পড়েনি। তিনি শুধু ‘একই’ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে ভাষণ দিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করার অশুভ চেষ্টা চালিয়েছেন। বলেছেন, শেখ মুজিবের পর যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারা নাকি ‘স্বভাবতই’ ভারতের বিপক্ষে ছিলেন! তাদের মধ্যে ‘পাকিস্তানপন্থী’ মানসিকতার লোকজনও নাকি বেশি ছিলেন- যারা ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক পছন্দ করতেন না! এ এক বিচিত্র ‘আবিষ্কার’ই বটে! মিস্টার নায়ার আরো বলেছিলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর এখন নাকি ‘সময় বদলেছে’! শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর ‘সময়’ কেন বদলায়নি, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন মিস্টার নায়ার। বলেছেন, শেখ হাসিনা সেবার বহুদিন স্থবির হয়ে থাকা সম্পর্কে ‘গতি’ আনলেও ‘ভারতবিরোধী প্রচারণা’ ও দু’ দেশের মধ্যে ‘দেয়ালের’ কারণে ‘দূরত্ব’ থেকেই গিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, বেগম খালেদা জিয়ার সময় দু’ দেশের সম্পর্কে নাকি আবারও ‘ছেদ’ পড়েছিল। কিন্তু এখন দু’ দেশের সম্পর্ক আবারও ‘ভালো’ হয়েছে এবং এতে মিস্টার নায়ার ‘খুবই খুশি’। নিজের ‘স্বপ্নের’ কথাও শুনিয়েছিলেন কুলদিপ নায়ার। বলেছিলেন, তিনি ‘স্বপ্ন’ দেখেন, ভারত ও বাংলাদেশের মানুষ অদূর ভবিষ্যতে ‘একই’ মুদ্রা ব্যবহার করবে, ‘একই’ বাজার থেকে ‘একই’ পণ্য কিনবে! এ লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য দু’ দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব বাড়ানোর জন্যও নসিহত করেছিলেন তিনি।

আশংকার কারণ হলো, নানা কথার মারপ্যাঁচের মধ্য দিয়ে মিস্টার নায়ার সেবার একটি মেসেজও দিয়েছিলেন। সে মেসেজের মূল কথা হলো, ভারত বিরোধিতার অবসান না ঘটলে বাংলাদেশের জনগণকে ‘চরম মূল্য’ দিতে হবে। কথাটার মধ্য দিয়ে তিনি আসলে সরাসরি হুমকি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপারে জনগণের মোহভঙ্গ ঘটলেও শেখ হাসিনাকে রক্ষার জন্য দিল্লি ‘যে কোনো সীমা পর্যন্ত’ পদক্ষেপ নেবে। তিনি শুধু এটুকু বলতেই বাকি রখেছেন যে, ভারতের কথামতো কাজ না করলে দেশটি তার সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেবে। বিশ্ব জানবে, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ‘মহান উদ্দেশ্য’ নিয়ে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশকে ‘সাহায্য’ করার জন্য ঢুকে পড়তে ‘বাধ্য’ হয়েছে! এভাবেই বাংলাদেশের ব্যাপারে নিজের ‘মাথাব্যথার’ প্রকাশ করেছিলেন কুলদিপ নায়ার। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে অবনতি ঘটানোর পেছনে ভারতেরই যে প্রধান ভূমিকা রয়েছে সে ব্যাপারে সামান্য উল্লেখ পর্যন্ত করেননি তিনি। তার ‘মাথাব্যথা’ শুধু বাংলাদেশের ভারত বিরোধীদের কারণে। কিন্তু তিনি জানাননি, কেন ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশীদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাবের বিকাশ ঘটেছে। তিনি শুধু ‘একই’ ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মধুর সংগীত শুনিয়েছেন। নিজের ‘স্বপ্নের’ আড়ালে ‘একই’ মুদ্রা, বাজার ও পণ্য ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

কুলদিপ নায়ারের এ নিবন্ধ থেকে কিছু বিষয় কিন্তু পরিষ্কার হয়েছে। প্রথমত, বিশেষ কোনো সদর দফতর সম্পর্কিত তথ্য না জানালেও মিস্টার নায়ার জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খুবই তৎপর রয়েছে। দ্বিতীয়ত, জনগণের মোহভঙ্গ ঘটলেও শেখ হাসিনাকে রক্ষার জন্য দিল্লি ‘যে কোনো সীমা পর্যন্ত’ পদক্ষেপ নেবে। এবং তৃতীয়ত, উলফা এবং নাগা ও মনিপুরের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বাংলাদেশে তৎপর রয়েছে। অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে তৃতীয় তথ্যটি প্রসঙ্গে বলা দরকার, এখানে শিক্ষণীয় রয়েছে আসলে ভারতের জন্য। কারণ বাংলাদেশে সত্যি তৎপরতা চালানোর সুযোগ পেয়ে থাকলে ভারতের কথিত স্বাধীনতা সংগ্রামীরা তাদের মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের অভ্যন্তরে অর্থাৎ দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে দেবেন, পুরো ভারতকেই অস্থির করে তুলবেন। তেমন অবস্থায় ভারতের সংহতি রক্ষা করা সম্ভব হবে না, ভারত বরং কয়েকটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়বে। বিষয়টি নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকদের মাথায় থাকা দরকার, রাষ্ট্রক্ষমতায় দলের বদল ঘটলেও যারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সরকারকে মাথায় তুলে নৃত্য করে চলেছেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলালেও মিস্টার নায়ার কিন্তু সম্ভাবনার এই দিকটি প্রসঙ্গে কিছুই বলেননি। তিনি শুধু ‘দোষ’ খুঁজেছেন প্রধান জাতীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার!

You Might Also Like