ইসরাইলে হামলার ক্ষেত্রে অতীত রীতি আর মানবে না হিজবুল্লাহ

লেবাননের জনপ্রিয় ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ বলেছেন, সিরিয়ার গোলান সীমান্ত সংলগ্ন কুনিত্রায় ইসরাইলি হামলার পর থেকে হিজবুল্লাহ ইসরাইলের বিরুদ্ধে আগামী যে কোনো যুদ্ধে বা অভিযানে ‘যুদ্ধের প্রচলিত নিয়ম বা অতীত রীতি’ মেনে চলবে না, বরং ইসরাইলের যে কোনো হামলার জবাব হিজবুল্লাহ যে কোনো স্থানে ও যে কোনো সময়ে নিজের ইচ্ছেমত দেবে। অর্থাৎ এখন থেকে সিরিয়া ও লেবাননসহ যে কোনো স্থানে ইসরাইলি হামলার জবাব দেবে হিজবুল্লাহ।
বৈরুতে [গতকাল(শুক্রবার)] কুনিত্রার বীর শহীদদের স্মরণে আয়োজিত এক জনসভায় ভাষণ দেয়ার সময় হিজবুল্লাহর এই নতুন নীতি বা কৌশলের কথা ঘোষণা করেন তিনি।
জনাব নাসরুল্লাহ বলেছেন, লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। কুনিত্রার শহীদরা বিশ্বের কাছে প্রমাণ করেছেন যে হিজবুল্লাহর মুজাহিদরা এখনও সীমান্তে সক্রিয় রয়েছেন এবং তারা যুদ্ধক্ষেত্রের প্রথম সারিতেই থাকবেন; কারণ বিশ্বের কেউই তাদের ও তাদের পছন্দের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।
তিনি ইহুদিবাদী ইসরাইলকে একটি ক্যান্সারময় কোষ, সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ও দুর্নীতির জীবাণু হিসেবে অভিহিত করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য অন্তত ১৯৪৮ সাল থেকেই এই ক্যান্সারের কারণে কষ্ট পাচ্ছে। ইসরাইল সব সময়ই এমনই ছিল, তবে গত কয়েক বছরে ইসরাইল তার পুরনো কৌশলে ফিরে গেছে এবং এর সঙ্গে যোগ করেছে দুর্নীতি ও দম্ভ। আর এরই প্রকাশ হিসেবে ইসরাইল হুমকী দিচ্ছে, দখলদারিত্ব, ধ্বংসযজ্ঞ ও গুপ্তহত্যায় জড়িত হচ্ছে এবং তেলআবিব ভাবছে যে সে যা খুশি তা-ই করতে সক্ষম ও তার এইসব কাজ থামানোর ক্ষমতা কারো নেই।
হিজবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ তার ভাষায় ‘তথাকথিত আরব-লিগের’ অনুপস্থিতির নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এই সংস্থাটি কখনও কোনো ভালো কাজ করতে পারেনি।
তিনি কুনিত্রায় ইসরাইলের সন্ত্রাসী হামলা প্রসঙ্গে বলেছেন, গত রোববার ইসরাইলি হেলিকপ্টারগুলো আমাদের সাত মুজাহিদ ভাই বহনকারী দু’টি গাড়ির ওপর হামলা চালিয়ে তাদের শহীদ করে। ওই ভাইয়েরা সে সময় এ অঞ্চল পরিদর্শন করছিল। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ স্টাফ পর্যায়ে ওই হামলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল ও তাদের সংসদের বিরোধী নেতাও তা জানতেন। অর্থাৎ ওই হামলা ছিল ইসরাইলের সুপরিকল্পিত হামলা ঠিক যে ধরনের সুপরিকল্পিত ইসরাইলি হামলায় শহীদ হয়েছিলেন হিজবুল্লাহর সাবেক মহাসচিব সাইয়্যেদ আব্বাস মুসাভি, তার স্ত্রী ও সন্তান।
হিজবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ আরো বলেছেন, ইসরাইল রোববারের ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে অনেক দেরিতে। কারণ, তেলআবিব ভেবেছিল হিজবুল্লাহ এ ব্যাপারে নীরব থাকবে ও ইসরাইলকে কেবলই অভিযুক্ত করবে। হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে গেছে- এই ধারণার কারণেই তারা ওই হামলার দায় স্বীকার করতে দেরি করেছিল। কিন্তু ইসরাইল বিস্মিত হয় যখন আমরা হামলার ওই ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তা ঘোষণা করি এবং এমনকি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের শহীদদের নামের তালিকাও ঘোষণা করি।
হিজবুল্লাহর মহাসচিব ইসরাইলের এই দাবি নাকচ করে দেন যে (ইরানি এক জেনারেলসহ) তাদের যোদ্ধারা ইসরাইলের ওপর হামলা চালাতে অথবা হামলার প্রস্তুতি নিতে কুনিত্রায় উপস্থিত হয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন করেন: ” আন-নুসরা ফ্রন্টের হাজার হাজার যোদ্ধা অস্ত্রসহ গোলান ও কুনিত্রা অঞ্চলে উপস্থিত রয়েছে। তাদের কাছে ট্যাংক, কামান ও বিমান-বিধ্বংসী অস্ত্রসহ সব ধরনের ভারী অস্ত্র ও সাঁজোয়া যানও রয়েছে। আর আন-নুসরা গোষ্ঠীর পরিচয় কী? এটা হচ্ছে আলকায়দার সিরিয় সংস্করণ এবং সারা বিশ্ব এই সংস্থাটিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করছে এবং গোলানে তাদের বিপুল সংখ্যক সদস্য উপস্থিত রয়েছে; কিন্তু তা সত্ত্বেও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কেনো চিন্তিত নন? ইসরাইলের সেনাপ্রধান ইয়ালুনও কেনো তাদের ব্যাপারে শঙ্কিত নন? বরং তারা এদেরকে রক্ষা করছেন, তাদের জন্য সেখানে হাসপাতাল খুলেছেন ও আননুসরার আহত সন্ত্রাসীদেরকে হাসপাতালে পরিদর্শন করছেন! ইসরাইল তার সীমান্তে এইসব সন্ত্রাসীর উপস্থিতিতে মোটেই উদ্বিগ্ন ছিল না, অথচ তারা যখন জানতে পারে যে এ অঞ্চলে দু’টি মটর কারে রয়েছে সাতজন এমন ব্যক্তি যে তাদের কাছে রয়েছে কেবল ব্যক্তিগত অস্ত্র মাত্র তখন তেলআবিব উদ্বিগ্ন হয়ে (তাদেরকে হত্যা করার) ওই বিপজ্জনক সিদ্ধান্তটি নেয়।
হিজবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ আবারও এটা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, হিজবুল্লাহ কখনও ফিলিস্তিনে ইসরাইল নামক একটি দখলদার শক্তির অস্তিত্বকে কখনও ভুলে যাবে না ও ফিলিস্তিনি জনগণকেও কখনও ভুলে যাবে না যদিও অনেকে চায় যা হিজবুল্লাহ এইসব বিষয় ভুলে যাক। শুধু হিজবুল্লাহ নয় হিজবুল্লাহর সন্তান ও তাদের নাতি-নাতনিরাও এইসব বিষয় কখনও ভুলে যাবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
হিজবুল্লাহর মহাসচিব শাহাদতের ঘটনাগুলোকে খোদায়ী রহমত বা আশীর্বাদ হিসেবে তুলে ধরে বলেছেন, শহীদদের নেতা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)’র বোনা সাইয়্যেদা জাইনাবকে (সালামুল্লাহি আলাইহা) যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল (ইয়াজিদ বা তার সহযোগী ইবনে জিয়াদের পক্ষ থেকে) তার ভাইয়ের শাহাদতের ব্যাপারে মন্তব্য করতে তখন তিনি বলেছিলেন: আমি (খোদাপ্রেমের জন্য আত্মত্যাগের) সৌন্দর্য ছাড়া আর কিছুই দেখিনি।

 

হিজবুল্লাহর মহাসচিব কারো কারো এই বিশ্লেষণ বা ধারণাও উড়িয়ে দেন যে ‘ইরান ও সিরিয়া ইসরাইলি হামলার জবাব দেয়া থেকে হিজবুল্লাহকে বিরত রাখার চেষ্টা করবে তাদের স্বার্থেই’। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, আমাদের কোনো বন্ধুই এটা মেনে নেবে না যে আমাদের অপমান করা হবে অথবা হত্যা করা হবে, আর তারা তা নীরবে চেয়ে চেয়ে দেখবে। না, ইসরাইলের অবশ্যই জেনে রাখা উচিত যে সে আমাদের জনগণকে হত্যা করে কখনও শান্তিতে ঘুমাতে পারবে না।

 

হিজবুল্লাহর মহাসচিব আরো জানান, ইসরাইলের সাম্প্রতিক ওই হামলার পরপরই হিজবুল্লাহ প্রতিশোধ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং এ সিদ্ধান্ত নিতে এক সেকেন্ডও দেরি করেনি। কারণ, ইসরাইলকে শাস্তি পেতেই হবে এবং এ জন্য আত্মত্যাগ করতে হলেও তার দরকার রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, কুনিত্রার শাহাদতের ঘটনার প্রথম সাফল্য ছিল এটা যে গত রোববার থেকেই ইসরাইল ভয় ও টেনশনে ছিল এবং সতর্ক ছিল হিজবুল্লাহর সম্ভাব্য জবাবের আশঙ্কায়। আর ইসরাইলের চূড়ান্ত প্রস্তুতির মধ্যেই আমরা মহান আল্লাহর দয়ায় প্রতিশোধ অভিযান চালাতে সক্ষম হই। কিন্তু ইসরাইল কি ঘটতে যাচ্ছে তার কিছুই আঁচ করতে পারে নি এবং ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও বুঝতে পারেনি যে কিভাবে কী ঘটে গেলো; আর শত্রু ও মিত্র সবার জন্যই এটা একটি বার্তা।
হিজবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ আরো বলেছেন: ” মোট কথা, ওরা আমাদের ভাইদের হত্যা করেছিল ঠিক দুপুর ১১টা ত্রিশ মিনিটে, জবাবে আমরা ওদের হত্যা করেছি ঠিক দুপুর ১১টা ২৫ মিনিটে, ওরা আমাদের দুটি গাড়ি ধ্বংস করেছিল-জবাবে আমরা ধ্বংস করেছি ওদের দু’টি সাঁজোয়া যানসহ আরো কিছু গাড়ি এবং আমাদের শহীদদের রক্তের বদলা নিতে আমরা ওদের বেশ কয়েকজনকে হতাহত করেছি। ওদের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের জবাবে আমরাও ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছি। তবে ইসরাইল ও আমাদের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হলো তারা হলো কাপুরুষ ও ভীরু। কারণ, তারা দেয়াল বা বেষ্টনীর পেছনে থেকে হামলা চালায় ও পেছন থেকে আক্রমণ করে; আর আমাদের প্রতিরোধ যোদ্ধারা মুখোমুখি লড়াই করে। এ ছাড়াও ইসরাইল তার হামলাটির দায় স্বীকার করতে সাহস করেনি, কিন্তু প্রতিরোধ যোদ্ধারা অভিযান চালানোর পরপরই তার দায়-দায়িত্বের কথা ঘোষণা করেছে।”

 

হিজবুল্লাহর মহাসচিব প্রতিরোধ যোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানিয়ে আরো বলেছেন, ইসরাইল এ পর্যন্ত কেবল ব্যর্থতা ও হতাশাই অর্জন করেছে, অথচ প্রতিরোধ আন্দোলন (হিজবুল্লাহ) বিজয় অর্জন করেছে এবং ইসরাইল ময়দানে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মোকাবেলা করতে যে অক্ষম তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে।
হিজবুল্লাহর মহাসচিব ওয়াহাবি-তাকফিরি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে, বিশেষ করে গোলানে অবস্থানরত তাকফিরিদেরকে ইসরাইলের মিত্র হিসেবে অভিহিত করে বলেন, দক্ষিণ লেবানন থেকে বিলুপ্ত হওয়া এন্টন লাহাদের নেতৃত্বাধীন খ্রিস্টান ফ্যালাঞ্জিস্ট বাহিনীর মতোই এই তাকফিরিরাও ইসরাইলের বন্ধু।
হিজবুল্লাহ এখন থেকে ইসরাইলি আগ্রাসন ও হত্যাকাণ্ডের জবাব দেয়ার ক্ষেত্রে স্থান ও সময়ের কোনো সীমারেখা এবং পদ্ধতির কোনো রীতি মেনে চলবে না বলেও তিনি দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
হিজবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ আরো বলেন, আমরা সচেতন যে ইসরাইল যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাত এড়াতে চাইছে এবং আমাদের সাম্প্রতিক পাল্টা হামলায় জড়িতদেরই কেবল চিহ্নিত করতে চাইছে। তাই আমরা জানিয়ে দিচ্ছি যে আমরা অতীতে গুপ্ত হত্যা ও সামরিক হামলার মধ্যে পার্থক্য করতাম, কিন্তু এখন থেকে আমাদের কোনো যোদ্ধা ইসরাইলি হামলায় নিহত হলে তার জবাব দেয়ার ক্ষেত্রে সময়, স্থান ও পদ্ধতির কোনো রীতি আমরা আর মেনে চলবো না।

You Might Also Like