গণতান্ত্রিক শ্রীলঙ্কার পরীক্ষা

কুলদীপ নায়ার : মাহিন্দ্রা রাজাপক্ষে দ্বিতীয় মেয়াদে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত যে হলেন তার কারণ ব্যাখ্যা করার দায় আছে নয়াদিল্লির। তাকে ক্ষুদ্র অস্ত্র সরবরাহ করেছিল ভারত। তিনি সেসব অস্ত্রের ঢালাও ব্যবহার করেন তামিলদের হত্যার কাজে। শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলে তামিল জঙ্গি সংগঠন লিবারেশন অব তামিল টাইগার্সের (এলটিটিই) যোদ্ধারা আত্মসম্পর্ণের পরও তাদের হত্যা করা হয়েছিল। ৪০ হাজার তামিল হত্যার দায়ে রাজাপক্ষের বিচার হওয়া উচিত।

নির্বাচনে এবার হেরে যাওয়ার পরও ক্ষমতায় থাকার জন্য তিনি সামরিক বাহিনী ও পুলিশকে হাত করার চেষ্টা করেছেন। এতে বোঝা যায় কী কুশলী চালে তিনি গণতান্ত্রিক ভারতকে বিভ্রান্তির পথে নিয়েছিলেন। কেমন করে কীভাবে তিনি গায়ের জোরে দেশ শাসন করতেন, নয়াদিল্লির তা জানা দরকার। তার এক ভাই ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী।

রাজাপক্ষের ভূমিকা আমি তো কখনোই ভুলতে পারি না। কারণ রাতের বেলায় আমায় হয়রানি করেছিল পুলিশ। আমার একমাত্র অপরাধ, আমি বলেছিলাম, ‘তামিল টাইগার্সদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে রাজনৈতিকভাবে, সামরিকভাবে নয়।’ সে রাতে আমার দরজার কড়া নাড়ল। আমার পাসপোর্ট দেখতে চাইল পুলিশ। ব্যস আর কিছু না। বার্তাটি পরিষ্কার। পরদিনই ওই দেশ ছাড়লাম আমি। আর কখনোই কলম্বোয় ফিরলাম না।

দেশটি স্বৈরতন্ত্রকে উৎখাত করেছে। এখন তার উচিত জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গৃহীত প্রস্তাবটি বস্তবায়ন করা। প্রস্তাবে আছে- যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন আর অবর্ণনীয় যে নিষ্ঠুরতা চালানোর অভিযোগ উঠেছে, শ্রীলঙ্কা সরকারকে সে বিষয়ে ‘নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য’ তদন্ত করতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত, ওই সময়টায় রাজাপক্ষের উপকারের জন্য নয়াদিল্লি যথাসাধ্য চেষ্টা করে। কিন্তু ৪৭ দেশের ওই সংস্থা, ভারতের আপত্তিগুলোকে পাত্তাই দিল না। শুধু তাই নয়, প্রস্তাবের ভাষা নমনীয় করার অনুরোধও উপেক্ষা করল। দিল্লির সেই আচরণের প্রতিবাদে দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) ওই সময় তাদের (সরকারের প্রতি) সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। শ্রীলঙ্কায় যেসব অন্যায় অপরাধ হয়েছে তা খতিয়ে দেখার জন্য সে সময় ভারত ‘লেসন লার্নট্ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের কথা বলেছিল। সেরকম একটি কমিশন এখন করা হলে ‘খুব দেরিতে করা হয়েছে’ বলা যাবে না। এ ধরনের একটি চেষ্টা বরবাদ হয়ে গেছে। কারণ তদন্তটা করেছিল শ্রীলঙ্কা সরকার। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই তদন্তকারী! উল্লেখযোগ্য কিছু বের হয়ে এলো না। ওটা ছিল তদন্তের নামে ধাপ্পাবাজি।

গণতন্ত্রের বাতাবরণে ফিরে আসছে শ্রীলঙ্কা, এটা উল্লসিত হওয়ার মতোই একটা দৃশ্য। পাকিস্তানে কিন্তু তা নয়। প্রকৃত গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার জন্য সে দেশের মানুষ উচ্চকণ্ঠে দাবি তুলছে না। পাকিস্তানে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের বিচারে দুই বছরের জন্য সামরিক আদালত গঠনের বিধান করতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। রাজনীতিকরা কোনো মন্তব্য করছেন না। দুঃখের বিষয়, মন্তব্য করেছেন শুধু একজন। তিনি হলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল রাহীল শরীফ। তিনি বলেন, ‘বিশেষ আদালত সেনাবাহিনীর কাঙ্ক্ষিত কোনো ব্যাপার নয়। বিশেষ সময়ের জন্যই এই আদালত প্রয়োজন।’ সলজ্জ রাজনীতিকরা নীরবতা অবলম্বনের মধ্য দিয়ে তাদের সহমত প্রকাশ করলেন।

শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান আমাদের পড়শি। ওই দুই দেশে যা ঘটে তার অভিঘাত ভারতকে স্পর্শ করতে পারে। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের শিকড় এতটাই গভীরে প্রোথিত যে ওসব প্রতিহতকরণ কঠিন কিছু নয়। তা সত্ত্বেও পাশের দেশে স্বৈরতন্ত্র অস্বস্তিকর ব্যাপার। ভারত গণতন্ত্র রপ্তানি করতে পারে না। তবে আশপাশে জনগণের ইচ্ছায় সব চলছে কিনা তা তো দেখতে পারে। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ছাড়াই তা করা যায়।

গণতন্ত্রের স্খলন ঘটলে স্বৈরতন্ত্র প্রেরণা পায়। এই বিরাট পাপ ভারত করেছিল কয়েক বছর আগে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে ভোটদানে বিরত থাকার মধ্য দিয়ে। তামিল টাইগার্সদের বিরুদ্ধে অভিযানকালে শ্রীলঙ্কা খুব ঠাণ্ডা মাথায় ৪০ হাজার সেনা ও অন্যদের হত্যা করেছিল কিনা, এমনকি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করার পরও ওদের হত্যা করা হয়েছিল কিনা তা অনুসন্ধানে একটি আন্তর্জাতিক স্বচ্ছ তদন্ত অনুষ্ঠানের প্রস্তাব পাস করতে চাওয়া হয়েছিল।

পরিষদের যে বৈঠকে প্রস্তাবটি পাস করতে চাওয়া হয়েছিল তাতে ভোটদানে ভারতের বিরত থাকায় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর একটি কথা মনে পড়ল। তিনি বলেছেন, ‘আগ্রাসন ঘটলে কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে আমরা নিরপেক্ষ থাকতে পারি না। নিরপেক্ষ থাকব না।’ অথচ মনমোহন সিং সরকারকে দেখা গেল রাজাপক্ষের নেতৃত্বাধীন স্বৈরতন্ত্রী সরকারকে তোষণ করছে। এতে তামিলদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ক্ষতি কতটা হলো, সেই পরোয়া করল না নয়াদিল্লি।

আমার ধারণা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমলারা তাদের উদ্ভট চিন্তা থেকে ‘দেশের স্বার্থে’ ভোটাভুটিতে অনুপস্থিত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর তদানীন্তন দুর্ভাগা পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ ওদের যুক্তি মেনে নিয়েছিলেন। তিনি হয়তো শ্রীলঙ্কার দাবি মতে তাদের জলসীমায় ‘ছোটাছুটি করার সময়’ আটক ভারতীয় ১০০ জেলের মুক্তির জন্যই অমন করেছেন।

ভারতের ভূমিকা দেখে রাজাপক্ষে সরকার তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেছে- ‘ধন্যবাদ’। এই সংবাদ পড়ে আমি বিস্মিত হইনি। আমেরিকার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বিশ্বের চাপে ছিল নয়াদিল্লি, এতে সন্দেহ নেই। আর চীন ও পাকিস্তানে তো গণতন্ত্র একটা আপেক্ষিক বিষয়। তারাও সমর্থন করেছে কলম্বোকে। তামিল টাইগার্স বা এলটিটিই ছিল সন্ত্রাসবাদী সংগঠন। ওরা নিশ্চিহ্ন হওয়ায় আমার দুঃখ নেই। কিন্তু মানবতাবাদী হিসেবে, আত্মসমর্পণের পরও তাদের ও তাদের সমর্থকদের খুন করার ঘটনায় আমি বেদনাবোধ করি। এ জন্য শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর কোনো অনুতাপ নেই; তারা তো প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে ও তার ভাই প্রতিরক্ষামন্ত্রী গোটাভায়া রাজাপক্ষের আশীর্বাদপুষ্ট হয়েই রক্তস্নান করেছে। এলটিটিই সেনাদেরই শুধু নয়, নিরীহ তামিলদেরও খুন করা হয়েছে, নির্যাতন চালানো হয়েছে। এরপরও ‘বিবিসি চ্যানেল ফোর’ প্রামাণ্যচিত্র না দেখালে বিশ্ববাসী বিষয়টি জানতেই পেত না। কলম্বো নিজে যে তদন্ত চালিয়েছিল তা ছিল লোক দেখানো। ওই তদন্ত সেনাবাহিনীকে দায়মুক্তি দেয়, সব দোষ চাপায় তামিলদের ওপর। এই তামিলরা শ্রীলঙ্কা রাষ্ট্রব্যবস্থায় সমানাধিকার চেয়েছিল। নতুন সরকারের জমানায় তারা সেই অধিকার পাবে কিনা শ্রীলঙ্কার গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের জন্য সেটাই একটা পরীক্ষা।

লেখক : প্রবীণ ভারতীয় সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

You Might Also Like