দেশ জটিল অবস্থায়, এ অবস্থা চলতে থাকলে রাষ্ট্র অস্তিত্ব সংকটে পড়বে

দেশে কি হতে যাচ্ছে তা সরাসরি বলা খুব মুশকিল। কারণ দেশের পরিস্থিতি খুবই জটিল। দেশের ক্ষমতাসীন এবং আন্দোলরত উভয় পক্ষই অনড় অবস্থানে। আর অনড় অবস্থানে থেকে রাজনীতি করা যায় না বলে মন্তব্য করলেন নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক এবং বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহমুদুর রহমান মান্না।

তিনি বলেন, বর্তমান সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য জাতীয়ভাবে সংলাপে বসা উচিত তবে সেরকম কোনো লক্ষণ এই মুহূর্তেও দেখা যাচ্ছে না। আর জাতীয় সংলাপ না হলে এবং এ অবস্থা চলতে থাকলে রাষ্ট্র অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

রেডিও তেহরানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে মান্না বলেন, বর্তমানে সন্ত্রাস নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। সরকার সন্ত্রাস দমন নিয়ে খুব বেশি কথা বলছে। তবে একপক্ষ সন্ত্রাস করে আর কেউ করে না বিষয়টি এরকম না। তবে সন্ত্রাস মোকাবেলা করাটা আমাদের জাতীয় ইস্যু।

বেগম খালেদা জিয়াকে সহসা গ্রেফতার করা হবে এমনটি আমি ভাবছি না। আর যদি সেটা করা হয় তাহলে তা হবে ধ্বংসাত্মক একটা পদক্ষেপ। তবে এমনটি হবে বলে আমি মনে করছি না। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন গাজী আবদুর রশীদ। পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো।

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশের চলমান আন্দোলন সফল করতে ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া খুবই আত্মপ্রত্যয়ী বলে জানা যাচ্ছে। অন্যদিকে, সরকার আন্দোলন দমনে প্রয়োজনে আরো কঠোর হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। কি হতে যাচ্ছে দেশে? আপনি কি মনে করেন দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে?

মাহমুদুর রহমান মান্না:  দেখুন আসলে দেশে কি হতে যাচ্ছে এর জবাব সরাসরি দেয়াটা বেশ মুশকিল। কারণ দেশের পরিস্থিতি সত্যিই খুব জটিল। আপনি প্রশ্নের মধ্যে যেভাবে বললেন এবং বাস্তবতা যা তাতে দেখা যাচ্ছে উভয় পক্ষ্যই নিজ নিজ অবস্থানে অনড়-অটল।  তবে অনড় অবস্থানে থেকে রাজনীতি করা যায় না। কাউকে কিছু না কিছু ছাড় দিতে হয়, সমন্বয় করতে হয়। তবে সেই ছাড় দেয়ার ব্যাপারে বা সমন্বয়ের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে না। বেগম খালেদা জিয়া ৭ দফা দেয়ার পর বলেছেন তিনি আলোচনায় বসতে চান। তবে আমি মনে করি আলোচনায় বসার ব্যাপারটি শুধু আওয়ামী লীগ বিএনপির ব্যাপার নয়, ডায়ালগটা হওয়া উচিত সবার মধ্যে। কারণ এ ধরনের সংকট কেবলমাত্র এই মুহুর্তে সৃষ্টি হয়েছে এমন নয়, প্রতি পাঁচ বছর পর পর এমন সংকট তৈরি হচ্ছে। অতএব এ সংকটের একটা স্থায়ী সমাধানের জন্য জাতীয়ভাবে সংলাপে বসা উচিত। তবে এখন পর্যন্ত এরকম কিছু দেখা যাচ্ছে না।

তারপরও আমি বলতে চাই, সাধারণত আমাদের দেশে এমনটি হয়ে থাকে কোনো একটি সংকটের নিষ্পত্তির আগে সবাই খুব জেদ দেখায়; গো ধরে বলে যে মানি না- শুনব না ইত্যাদি। তবে পরে সবাই সমঝোতার দিকে আসতে থাকেন। আামাদের সেভাবেই এগুতে হবে। এরকম আশা করা ছাড়া আমাদের কাছে বিকল্প আর কোনো কিছু নেই।

আর যদি সমঝোতা বা সংলাপ না হয় তাহলে পরিস্থিতিটা চরম দুঃখজনক, বিয়োগান্তক, মর্মান্তিক,সংবিধান বিরোধী এবং রাজনীতি বিরোধী একটি ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া নিষ্পত্তির আর কোনো উপায় নেই। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের অর্থনীতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্র যন্ত্রটা বড় রকমের অসুস্থতার মধ্যে পড়ে যাবে। তখন রাষ্ট্র অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। আর সেকারণে আমি মনে করি শেষ পর্যন্ত সবার মধ্যে শুভ বুদ্ধির  উদয় হবে এবং একটা সমাধান হবে।

রেডিও তেহরান:  আন্দোলনে সহিংসতা চলছে এবং তা নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য রয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানের ওপর গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। রাজনীতিতে রিয়াজ রহমান নিতান্তই ভদ্রজন বলে পরিচিত। কিভাবে দেখছেন এ ঘটনাটিকে?

মাহমুদুর রহমান মান্না: দেখুন রিয়াজ রহমানের ওপর হামলার ব্যাপারটি আমার কাছে বিস্ময়কর। উনি একজন সৎজন। খুব সক্রিয় রাজনীতিবিদও নন তিনি। তারপরও তার ওপর হামলার বিষয়টি আমি মেনে নিতে পারি না। আর এটা বিএনপি করেছে বা তাদের ভেতরের কেউ করেছে এই বক্তব্যও আমি কোনোভাবে মানতে পারিনা। আবার সামগ্রিক ঘটনায় সরকার অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি। সেক্ষেত্রে এই হামলার কাজটি সরকারপক্ষ করেছে সেটাও কি করে মেনে নেয়া যায়। কারণ এতখানি মূর্খতা এবং নির্বুদ্ধিতার পরিচয় কেন দেবে সরকার?

রিয়াজ রহমানের ওপর হামলার বিষয়টি যদি আপনি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করেন তাহলে দেখবেন তাকে মেরে ফেলার জন্য এটেম্পট করা হয়নি। মেরে ফেলতে চাইলে তারা সেটা করতে পারত। সেক্ষেত্রে এরকম একটা ঘটনা কি কোনো ম্যাসেজ বা বার্তা কিনা সেটা বোঝা বেশ মুশকিল। তবে আমি ওই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।

 

দেখুন বর্তমানে সন্ত্রাস নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। সরকার সন্ত্রাস দমন নিয়ে খুব বেশি কথা বলছে। তবে একপক্ষ সন্ত্রাস করে আর কেউ করে না বিষয়টি এরকম না। সন্ত্রাস মোকাবেলা করাটা আমাদের জাতীয় ইস্যু।

 

বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের মধ্যে যে পিপার স্প্রে করা হলো। অথচ আদালত পিপার স্প্রের করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তারপর পুলিশ সেই কাজটি কিভাবে করে! স্বাভাবিকভাবে যে পুলিশ কর্মকর্তার নির্দেশে এটি করা হয়েছে এবং যেসব পুলিশ এটি করেছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তি হওয়ার কথা ছিল। অথচ তাদের কারো বিরুদ্ধে কোনো শাস্তি হয়নি। আর সেকারণে আমার মত হচ্ছে- এসব করে কারো কোনো লাভ হবে না। সহিংসতা- সহিংসতার জন্ম দেবে। আর আইন বন্ধ করে দিলে এরকম ঘটনাই ঘটতে থাকবে। এই অবস্থা থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর সেজন্য আমি মনে করি সংলাপের দরকার। আর সেটা জাতির সব মানুষকে যুক্ত করে করতে হবে। তানাহলে হবে না। আর আমি যে আশার কথা বললাম সেটাকে ইংরেজিতে এবাবে বলা যাবে hope against hope. দেখা যাচ্ছে না, তারপরও দেখতে হবে আমাদেরকে। বিকল্প কিছু নেই।

 

রেডিও তেহরান: সরকারের বিভিন্ন ইঙ্গিত থেকে অনেকে আশংকা করছেন যে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হতে পারে। আপনার কি মনে হয়?

 

মাহমুদুর রহমান মান্না: মন্ত্রীরা কতরকম কথা বলে, তাদেরকে আমি কোনোভাবে গুরুত্ব দিতে চাই না।বেশ কিছুদিন আগে আমি একটা সভায় বলেছিলাম এরকম একটা পরিস্থিতি হতে পারে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকার যদি বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের মতো পদক্ষেপ নেন তাহলে ধরে নিতে হবে সেটি তাদের চূড়ান্ত অবস্থান। এরকমও হতে পারে। বিশ্বের কোনো কোনো দেশে একদল ক্ষমতায় গিয়ে আরেক দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার চেষ্টা করেছে। তবে এমনটি করতে গিয়ে কোনো কোনো দেশে কিছুটা সফল হয়েছে আবার অনেক জায়গায় ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ওই ধরণের একটি লড়াই ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। যে কারণে বেগম খালেদা জিয়াকে সহসা গ্রেফতার করা হবে এমনটি আমি ভাবছি না। আর যদি সেটা করা হয় তাহলে তা ধ্বংসাত্মক একটা পদক্ষেপ। তবে এমনটি হবে বলে আমি মনে করছি না।

 

রেডিও তেহরান:  বিএনপিকে নির্মূল করতে না পারলে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। কেন এই বক্তব্য? এর কি অর্থ থাকতে পারে?

 

মাহমুদুর রহমান মান্না: খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের বক্তব্যের কোনো অর্থ নেই। এসব বক্তব্য স্পষ্ট মূর্খতা। আওয়ামী লীগের ফাদার ফিগার, বাংলাদেশের জাতির জনক এভাবে আমরা বলে থাকি সেই বঙ্গবন্ধুকে তার পরিবারসহ হত্যা করা হয়েছে। তাই বলে কি আওয়ামী লীগ নির্মূল হয়ে গেছে। তখন এরকম বলা হয়েছিল আওয়ামী লীগ আর দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু তাই কি হয়েছে। এভাবে কথা বললে হবে না। যারা ইতিহাস পড়েন না বা জানেন না তারাই এধরণের কথা বলেন। তারা পেছনে ফিরে দেখার চেষ্টা করেন না। আর মন্ত্রীর এ ধরনের কথা আলোচনার যোগ্য বলে আমি মনে করি না। একটা দল রাজনৈতিক বিভ্রান্তি বা ভুলের  কারণে নিঃশেষ হতে পারে কিন্তু মেরে কোনো দলকে নিঃশেষ করা যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।

 

রেডিও তেহরান:  আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান আন্দোলনের কি প্রভাব পড়েছে বা পড়তে পারে বলে মনে হয় আপনার?

 

মাহমুদুর রহমান মান্না: দেখুন অন্যান্য প্রভাবের কথা আমি বলতে পারবো না কিন্তু মিডিয়ার খবরে যেটা দেখলাম যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট, ইউরোপিয় ইউনিয়ন বিবৃতি দিয়েছেন। তারা চাচ্ছে যে সবাইকে স্বাধীনভাবে নিজেদের মতো করে চলতে দেয়া হোক, কথা বলতে দেয়া হোক। একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশে সবকিছু হোক।

 

তারমানে বোঝা যাচ্ছে রিয়াজ রহমানের ওপর হামলার ঘটনা বিশ্বের বেশ কিছু দেশকে প্রভাবিত করেছে। ফলশ্রুতিতে তারা এরকম বিবৃতি দিয়েছে। এছাড়া সাধারণভাবে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীমহল বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। বর্তমান আন্দোলন বাবসা বাণিজ্যে নেতিবাচক ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।এরমধ্যে বিজিএমইএ যারা মূলত রপ্তানী নির্ভর তারা খুবই উদ্বিগ্ন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে এভাবে চলতে থাকলে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব পড়ছে এই অর্থে যে তারা একটা অর্ডার নিয়ে তা সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে বলা চলে অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতা খুবই ক্ষতির কারণ।

 

এছাড়া সামগ্রিক প্রভাব বলতে স্পষ্টভাবে কেউ তেমন কিছু বলছে না। তারা মুখে যেরকম বলছে কার্যত সেরকম হচ্ছে না। সবাই চাইবে বাংলাদেশে একটা শান্তি ও সুষ্ঠু পরিস্থিতি থাকুক। তারা তাদের নিজেদের স্বার্থে এমনটি চাইবে। প্রতিবেশিরাও এমনটি চাইবে। বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিকসহ নানাবিধ যে সম্পর্ক রয়েছে তাদের সবাই এমনটি  চাইবে। ফলে বিষয়টি অবশ্যই প্রভাব ফেলবে।

You Might Also Like