দেশ ও জাতির কী ক্ষতি করছে ওরা জানে না

এবারের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিন আমার বিবিসির চাকরি নিয়ে লন্ডন আসার ৫৫ বছর পুরো হলো। এর আগের সাত বছর আমি ঢাকায় ব্রিটিশ ইনফরমেশন সার্ভিসের সম্পাদক ছিলাম। বিলেতের নজিরবিহীন পুলিশ বাহিনীÑ যারা কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে না এবং সাধারণ মানুষকে সবিনয়ে ‘স্যার, স্যার’ বলে সম্বোধন করেÑ তাদের সম্পর্কে জানলেও চোখে দেখে কৌতূহল নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছি। তা ছাড়া সংবাদ নিয়ে নিয়মিত কাজ-কারবারের অংশ হিসেবে রাজনীতির ব্যাপারে গভীর খোঁজখবর রাখতে হয়েছে। আরো একটা ব্যাপার গোড়া থেকেই করেছিলাম। ফিট স্ট্রিট বলতে গেলে বুশ হাউজের লাগোয়া। ব্রিটিশ সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ গোড়া থেকেই করে রেখেছিলাম।

প্রকৃতই তখন পুলিশ কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র বহন করত না। জরুরি অবস্থায় ব্যবহারের জন্য শুধু কাঠের ছোট একটি ব্যাটন (লাঠি) রাখত ট্রাউজারের পকেটে। এর পর থেকে অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক আর ওয়াশিংটনে এবং বিশেষ করে ২০০৫ সালে লন্ডনেও আলকায়েদা সন্ত্রাসীদের হামলার পর থেকে লন্ডনের কোনো কোনো সড়কে প্রায়ই আগ্নেয়াস্ত্রধারী পুলিশ চোখে পড়বে। মাত্র সে দিন কেউ একজন রেডিওতে বলছিলেন, ব্রিটিশ পুলিশের তিন শতাংশ এখন কোনো-না-কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে। অবশ্যি তা সত্ত্বেও পুলিশ এখনো সবিনয়ে এবং ‘স্যার স্যার’ বলে সম্বোধন করে সাধারণ নাগরিকদের।

পুলিশের মধ্যে পরিবর্তনগুলো চোখে পড়তে শুরু করে বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষার্ধ থেকে। সে সময় হঠাৎ এ দেশে ঢলের মতো অভিবাসী বহিরাগত আসতে শুরু করে। বহু সীমিত শিক্ষিত আফ্রিকান ও আফ্রো-ক্যারিবীয়রাও হুড়মুড় করে এসেছিল। এ দেশের অর্থনীতিতে তাদের জন্য যথেষ্ট কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ছিল না। এসব কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের বেকার কিশোর-তরুণেরা ছুরিকাঘাতসহ বহু অসামাজিক দুষ্কর্মে জড়িয়ে পড়ে। পুলিশকে তখন সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের রাস্তায় থামিয়ে তল্লাশি করার ক্ষমতা দিয়ে আইন পাস হয়। খুব সম্ভবত পুলিশ বহু ক্ষেত্রে এ ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করেছে। ফলে কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের সাথে পুলিশের সম্পর্কে গুরুতর অবনতি হয়। পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সরকারকে একাধিক তদন্ত কমিশনও গঠন করতে হয়েছিল তখন। কৃষ্ণাঙ্গ সমাজে এখন শিক্ষার ব্যাপক প্রসার হয়েছে। পেশাদারি কাজে এখন হয়তো পাকিস্তানি কিংবা বাংলাদেশীদের অনুপাতেও বেশি কৃষ্ণাঙ্গ দেখা যাবে। বর্তমানে ব্রিটেনসহ গোটা ইউরোপেই পুলিশের বেশি মাথাব্যথা আলকায়েদা আর তথাকথিত ইসলামিক স্টেট প্রভৃতি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে নিয়ে। প্যারিস আর বেলজিয়ামে গত কয়েক দিনের সহিংস ঘটনাগুলো থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে।

তবে ৫৫ বছরের পর্যবেক্ষণ শেষে এ কথা বলতে পারব না যে, ব্রিটিশ পুলিশ বরাবরই ফেরেশতাদের বাহিনী ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে পুলিশের বিরুদ্ধে কিছু কিছু বর্ণবাদের এবং দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। তদন্ত শেষে প্রত্যেক ক্ষেত্রেই কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মাত্র দিনকয়েক আগে পুলিশের একজন আঞ্চলিক কমান্ডারকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি দু’বছর আগে তদন্তাধীন একটি মামলার বিবরণ বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিকের কাছে ফাঁস করেছিলেন। চার-পাঁচ বছর আগে একজন ইরানি বংশোদ্ভূত পুলিশ কমান্ডারও বরখাস্ত হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, তিনি স্বদেশী বংশোদ্ভূতদের একটি গোষ্ঠীবিবাদে জড়িত হয়ে কিছু অন্যায় কাজ করেছিলেন।

পঞ্চান্ন বছর আগে ব্রিটেনে রাজনৈতিক দল ছিল তিনটিÑ টোরি, লেবার আর লিবারেল। পরবর্তীকালে লিবারেলরা বিবর্তিত হয়ে লিবডেম পার্টি হয়েছে। আরো কিছু ভুঁইফোড় দলের আবির্ভাব ও অন্তর্ধান ঘটেছে। গ্রিন পার্টি এবং ইউকিপের যথাক্রমে একজন ও দু’জন এমপি আছেন পার্লামেন্টে। আগামী ৭ মে সাধারণ নির্বাচনে এ দু’টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। কিন্তু হলফ করে বলতে পারি এই ৫৫ বছরে কোনো রাজনৈতিক দলের দিক থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বৈষম্য কিংবা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ শুনিনি। বরং আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রাসঙ্গিক হতে পারে। একাত্তরের এপ্রিল মাসে আমরা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত গঠনের লক্ষ্যে ট্রাফালগার স্কোয়ারে সর্বপ্রথম যে জনসভা করি, তার দু’দিন আগে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের একজন ইনস্পেক্টর বুশ হাউজে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন আমাদের সভায় আনুমানিক কত লোক হতে পারে, তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী কোনো মহল আছে কি না এবং কোনো পাকিস্তানি গোষ্ঠীর আমাদের সভা কিংবা মিছিলে হামলা করার সম্ভাবনা আছে কি না। সভার দিনে ট্রাফালগার স্কোয়ারে এবং পরে মিছিলে শান্তি রক্ষার জন্য উপযুক্তসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।

রাজনৈতিক আন্দোলন এবং পুলিশ

বাংলাদেশে যে প্রসঙ্গটা বর্তমানে আমার সবচেয়ে বেশি দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্যপূর্ণ ও আশঙ্কাপূর্ণ মনে হয়, সেটা বিরোধী ২০ দলের গণতন্ত্রের আন্দোলন সম্পর্কে তথাকথিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোর প্রধানদের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি। আমার পুরাতন পাঠকদের মনে থাকা স্বাভাবিক যে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গদি পাওয়ার সময় থেকে একটি ব্যাপারে আমি জাতিকে বারবার হুশিয়ার করে দিয়েছিলাম। আমি পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলাম যে, নতুন সরকার প্রশাসনে এবং পুলিশে জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতা ডিঙ্গিয়ে আওয়ামী লীগপন্থী অফিসারদের বসিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডবল ও ট্রিপল প্রোমোশন দিয়েও উচ্চপদে স্থাপন করছে। পরবর্তীকালে পুলিশের আনুষঙ্গিক ও গোয়েন্দা বিভাগগুলোতে এবং আধা সরকারি বিভাগেও একই পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। দলীয় লোকদের নিয়োগ দিয়ে বিচার বিভাগকে ভারাক্রান্ত করে ফেলা হয়েছে। পুলিশের ক্ষেত্রে পরবর্তীকালেও কোনো কোনো অফিসারকে আরো পদোন্নতি দিয়ে অভাবনীয় উচ্চতায় উঠানো হয়েছে। দুর্ভাগ্য তখন দেশজুড়ে কোনো প্রতিবাদ ওঠেনি। সে দিন যেসব বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল, তার কুফল এখন আমরা হাড়ে হাড়ে অনুভব করছি।

প্রশাসন, পুলিশ প্রভৃতি বিভাগের সর্বোচ্চ স্তরে নিয়োগকে বলা হয় ‘স্ট্যাটুটরি’ বা সংবিধিবদ্ধ। ব্রিটিশ আমলের আইসিএস, পাকিস্তানি আমলের সিএসপি-পিএসপি এবং বাংলাদেশের বিসিএস পদগুলো এর অন্তর্ভুক্ত। খুবই গুরুতর অভিযোগ এবং যথোপযুক্ত তদন্ত ছাড়া এদের চাকরি থেকে সরানো যাবে না, যদিও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মাঝে মাঝেই সরকার পরিবর্তন হবে বলে আশা করা হয়। অর্থাৎ সরকার বদলাবে কিন্তু সংবিধানবদ্ধ পদে নিযুক্ত কর্মকর্তাদের চাকরি নিরাপদ থাকবে। কিন্তু তার বিনিময়ে এসব পদে নিয়োগের বিশেষ কিছু শর্ত আছে। যেমনÑ তাদের কোনো রাজনৈতিক আনুগত্য থাকবে না, এমনকি তারা কোনো দলের প্রার্থীকে ভোট দিলেন, সেটাও গোপন রাখার জন্য তাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। রাজনৈতিক সরকার যে দলেরই হোক, সমান দক্ষতার সাথে সে সরকারের সেবা এসব কর্মকর্তাকে করতে হবে। তবে রাজনৈতিক সরকার কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিলে এসব কর্মকর্তার কর্তব্য হবে তাদের ভুল সংশোধনের পরামর্শ দেয়া।

রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা এখন প্রশ্নবিদ্ধ

গত কয়েক দিনে বাংলাদেশে স্ট্যাটুটরি পদে নিযুক্ত কর্মকর্তাদের চাকরির ভবিষ্যৎ গুরুতর প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির মহাপরিচালকদের কিছু অত্যন্ত বিতর্কিত উক্তিতে। দেশে এখন গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার জন্য আন্দোলন চলছে। যত দূর দেখা যাচ্ছে, দেশবাসীর বিপুল গরিষ্ঠ অংশই এ আন্দোলন সমর্থন করছেন। বস্তুত একাত্তরের পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর মতো বিশাল কনভয় ছাড়া পুলিশ এখন রাজধানীর বাইরে যেতে সাহস পায় না। সেই সাথে কিছু সহিংসতা, প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষতিও হচ্ছে এবং এটাও স্পষ্ট যে, সরকারের বিরোধীদের সভা-সমাবেশ ও প্রতিবাদ করতে না দেয়ার কারণেই সহিংসতাগুলো ঘটছে।

পুলিশের মহাপরিচালক জনসভা করে বিরোধী ২০ দলীয় আন্দোলনের নেত্রী এবং তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সম্পর্কে অপ্রীতিকর কটাক্ষ করেছেন। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তার মন্তব্যগুলোর সাথে কোনো কোনো মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতার গালাগালির আশ্চর্য মিল লক্ষ করা যায়। সরকারের মন্ত্রীদের মতো তিনিও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতারের ব্যাপারে ‘হুকুমের আসামির’ যুক্তি উত্থাপন করতে চান বলে মনে হয়। আমার মনে পড়ছে, ১৯৯১-৯৬ আর ২০০১-০৬ সময়ের মধ্যে আওয়ামী লীগ মোট ৩৬২ দিন হরতাল করেছে, তার মধ্যে অবরোধ ছিল অনেক, নাশকতা আর হত্যাও হয়েছিল কয়েক ডজন। তখন কিন্তু কোনো পুলিশ কর্মকর্তার মুখে ‘হুকুমের আসামি’ কিংবা অনুরূপ কোনো কথা শুনিনি। গত ছয় বছরে যে কয়েক শ’ মানুষকে গুম, খুন ও ক্রসফায়ার প্রভৃতি বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাদের বাবদও তো ‘হুকুমের আসামির‘ কথা শোনা যাচ্ছে না! পুলিশ মহাপরিচালক আরো বলেছেন, বিএনপি ও বিরোধী জোট অশান্তি ঘটাবে বলেই পুলিশ তাদের সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছে না।

খালেদা জিয়া বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা। সারা বিশ্ব এখন স্বীকার করছে যে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তিনিই হবেন প্রধানমন্ত্রী। বস্তুত বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ-ও স্বীকার করছে, সে ভয়েই অনির্বাচিত, অবৈধ সরকার সুষ্ঠু নির্বাচনকে এত ভয় পাচ্ছে। তার সম্পর্কে এমন বিদ্বিষ্ট, পক্ষপাতদুষ্ট ও অমার্জিত মন্তব্য করার আগে পুলিশ-প্রধানের অজস্রবার চিন্তা করা উচিত ছিল। সবাই জানে আওয়ামী লীগপন্থী বলেই বর্তমান সরকারের আমলে তিনি পুলিশের মহাপরিচালক হতে পেরেছেন। কিন্তু তার রাজনৈতিক আনুগত্যকে এমন নগ্নভাবে প্রকাশ করা খুবই অনুচিত হয়েছে। কোনো সুশাসিত ও আইন অনুসারী দেশে হলে আলোচ্য পুলিশপ্রধানকে তাৎক্ষণিকভাবে সাসপেন্ড করা হতো। তা ছাড়া তার বক্তব্য পুরোপুরি ভ্রান্ত ও বাস্তববর্জিত ছিল। অতীতে বিএনপি সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে কয়েকটি বিশাল সভা ও সমাবেশ করেছে। খুব সম্ভবত রাজনৈতিক সরকারের নির্দেশে বিরোধী দলকে তাদের সভা-সমাবেশের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেই পুলিশ পরিস্থিতি ঘোলাটে করে ফেলেছে।

বর্তমান পর্যায়ে যে অবরোধ, হরতাল প্রভৃতি ঘটছে, তার কারণ গত ৫ জানুয়ারি বিরোধী দলগুলোকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অথবা রাজধানীর অন্য কোথাও সমাবেশ করার অনুমতি না দেয়া। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও এখন স্বীকার করছেন যে, সে তারিখে সমাবেশ করতে না দেয়া মারাত্মক ভুল হয়েছিল। আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ গত রোববার বলেছেন, বিএনপি আবার সমাবেশের আবেদন করলে তাদের সে অনুমতি দেয়া হবে। এখানে ৫ জানুয়ারি সমাবেশে বাধাদানের জন্য একটি অনুশোচনা লক্ষণীয় নয় কি? সমাবেশের অনুমতির আবেদন উপলক্ষে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেভাবে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের প্রতি অসৌজন্য আচরণ করেছেন বা করছেন, সেটা আরেক কেলেঙ্কারি।

দলীয় আনুগত্যের পরিণতি শুভ হবে না

পুলিশপ্রধানের মতো রাজনৈতিক অবিবেচনা দেখিয়েছেন র‌্যাব ও বিজিবির মহাপরিচালকদ্বয়ও। র‌্যাবের মহাপরিচালক গত বছরের ৫ জানুয়ারির বিশ্বধিকৃত প্রহসনের সাফাই গেয়েছেন এবং বলেছেন, ২০১৯ সালের আগে নির্বাচন হবে না। বিজিবির মহাপরিচালক প্রকাশ্যে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর হুমকি দিয়ে খুবই ভুল করেছেন। ঊর্ধ্বতন স্তরের ভুলগুলো শান্তিরক্ষার দায়িত্বে নিযুক্তদের সব স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে বলেই মনে হয়। যেমনÑ প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার এম এ হাফিজ বলেছেন, ‘পুলিশ অবশ্যই গুলি করবে।’ লক্ষণীয় যে, তারা কোনো কোনো মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতার হুমকিরই পুনরাবৃত্তি করছেন। যেমনÑ খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম হুমকি দিয়েছেন, ‘অস্ত্র দিয়েই’ রাজনৈতিক আন্দোলন প্রতিহত করা হবে।

র‌্যাব ও বিজিবি বাহিনীতে বহু সেনাকর্মকর্তা নিযুক্ত আছেন। সময় হলে এরা আবার সামরিক বাহিনীতে ফিরে যান। বিশ্বসমাজের সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লেষ আছে। এ বাহিনী থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জওয়ান ও অফিসার জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে নিযুক্ত হন। এ সূত্র থেকে তাদের অনেকে লাখ লাখ মার্কিন ডলার উপার্জন করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো জাতিসঙ্ঘও গত বছরের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য (অতএব প্রকারান্তরে বর্তমান সরকারকে অবৈধ) বলে রায় দিয়েছে। গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর সরকারি নির্যাতনেরও নিন্দা করেছে জাতিসঙ্ঘ। র‌্যাব ও বিজিবি প্রধানদের আলোচ্য উক্তিগুলোর পর জাতিসঙ্ঘের কোনো প্রভাবশালী সদস্য দেশ যদি শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশী সেনাবাহিনীর জওয়ান ও অফিসারদের নিয়োগে আপত্তি করে তাহলে বিস্ময়ের কারণ ঘটবে কি?

পথভ্রষ্ট সরকারি কর্মচারীর বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের অত্যধিক অনুগত হওয়ার দৃষ্টান্ত ভূরি ভূরি। সব ক্ষেত্রেই তার পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। সবচেয়ে জঘন্য ঘটনাগুলো ঘটেছিল নাৎসি জার্মানিতে। কিন্তু নাৎসিরা কোথায় এখন? হিটলারের নির্দেশে যেসব রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা বহু অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছিলেন, ন্যুরেমবার্গের বিচারে তাদের অনেকেরই খুবই গুরুদণ্ড হয়েছিল, তাদের বংশধরেরা দুই প্রজন্ম ধরে ঘৃণা আর গ্লানি সহ্য করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের ডামাডোলে কিছুসংখ্যক নাৎসি কর্মকর্তা পালিয়ে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেভাবে তারা নিষ্কৃতি পাননি। বিভিন্ন সময়ে তাদের অনেকেই বিভিন্ন দেশে ধরা পড়েছেন এবং শাস্তি ভোগ করেছেন। একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছেন অ্যাডলফ আইখম্যান। হিটলারের ইহুদি নিধনযজ্ঞের একজন বড় হোতা ছিলেন তিনি। ১৯৪৫ সালে নাৎসিদের পতনের পর তিনি পালিয়ে আর্জেন্টিনা চলে যান। সেখানে নাম ও পরিচয় পরিবর্তন করে তিনি সফল জীবনযাত্রা গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু ১৯৬০ সালে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ তাকে ধরে আনে। তার বিচার সারা বিশ্বে আগ্রহ সৃষ্টি করেছিল। ১৯৬২ সালে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাকে ফাঁসি দেয়া হয়।

আস্থাহীনতা আইনশৃঙ্খলার অন্তরায়

বাংলাদেশে যাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিরপেক্ষভাবে নিয়োজিত থাকার কথা, আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রতি তাদের অন্ধ আনুগত্য গুরুতর সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। বিএনপির সমাবেশ বন্ধ করার জন্য তারা ১৪৪ ধারা জারি করেন, কিন্তু ছাত্রলীগ আর যুবলীগ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে শ’য়ে শ’য়ে পথে নেমে এলে তারা বাধা দেন না। বরঞ্চ দেখা গেছে, আগ্নেয়াস্ত্রধারী শাসকদলের ক্যাডারেরা যেন পুলিশের পরিপূরক হিসেবে পুলিশের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সড়কে মোড়লি করছে। আওয়ামী লীগ যখন সমাবেশ করার বাসনা প্রকাশ করেছে, পুলিশ তখন চটজলদি তাদের ১৪৪ ধারা তুলে নিয়েছে।

দেশজুড়েই এই একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ গোড়ায় বিভ্রান্ত বোধ করেছে। কিন্তু এখন তাদের বিভ্রান্তি কেটে গেছে। তারা বুঝে গেছে র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবি ইউনিফর্ম পরিধান করলেও শাসকদলের ক্যাডারদের সাথে তাদের কোনো তফাত নেই। কার্যত তারা একই লক্ষ্যে, অর্থাৎ একটি নানা বিতর্কে বিতর্কিত সরকারকে গদিতে বহাল রাখার কাজে লিপ্ত আছে। ইউনিফর্মের আর কোনো কর্তৃত্ব কিংবা মূল্য রইল না সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে। তারা এখন র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবিকে শত্রুপক্ষ হিসেবেই দেখতে শুরু করেছেÑ যেমন তারা ইউনিফর্মধারী পাকিস্তানি সেনাদের দেখেছিল একাত্তর সালে।

একাত্তরের সাথে আরো কিছু অশুভ মিল যেন দেখতে পাচ্ছি। পাকিস্তানিরা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে অর্থের ও অন্যান্য প্ররোচনা দিয়েছিল। বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানও ঘোষণা করেছেন যে, গণতন্ত্রের দাবিতে অবরোধে জড়িতদের যারা ধরিয়ে দেবে, তাদের পুরস্কৃত করা হবে। দখলদার পাকিস্তানিরা দেশপ্রেমীদের ধরার উদ্দেশ্যে রাজাকার, আলবদর বাহিনী ও শান্তি কমিটি গঠন করেছিল। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বর্তমান সরকারও ঢাকায় শান্তি কমিটি গঠনের কথা চিন্তা করছে। দেশে কিংবা বিদেশে এই সরকার কোনো সুস্থ ধারণা সৃষ্টি করছে না।

আইন ও পুলিশ কার্যকর হতে পারে এ জন্য যে, সাধারণ মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়, পুলিশকে এরা নিরপেক্ষ মনে করে স্বেচ্ছায় পুলিশের কর্তৃত্ব মেনে নেয়। কিন্তু পুলিশকে যখন সাধারণ মানুষ নিরপেক্ষ কিংবা ন্যায়ানুগ মনে করতে পারে না, তখন স্বভাবতই পুলিশকে মানতে তাদের মন চাইবে না। এরা বিদ্রোহ করবে। আর মানুষ যখন একবার বিদ্রোহ করতে শেখে, তখন আইনশৃঙ্খলাকে দীর্ঘকালের জন্য বনবাসে পাঠালেও তারতম্য হবে না। তিন মহাপরিচালক মিলে বর্তমানে বাংলাদেশে এ পরিস্থিতিই সৃষ্টি করেছেন।(লন্ডন, ২০.০১.১৫)

serajurrahman34@gmail.com

You Might Also Like