শার্লি এবদোর সন্ত্রাসী হামলা ও বর্তমান মুসলিম মানস

নূরে আলম

নূরে আলম: ফরাসি ম্যাগাজিন শার্লি এবদোয় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। ফেইসবুক, টুইটারসহ ইন্টারনেটে নানাভাবে নানান মতের মানুষ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। প্যারিসে একটি মিছিলে অংশ নিয়ে বেশকিছু বিশ্বনেতাও তাদের নৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। এক সপ্তাহ যাবত এগুলো পর্যবেক্ষণ করছি, এবং এখন কিছু লেখা যেতে পারে বলে মনে করছি।

শুরুতেই বলে নিই যে, প্রথমতঃ এই সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাটি আসলেই কোনো সংক্ষুব্ধ মুসলিম গ্রুপের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে কিনা, তার প্রমাণ নেই। বরং ৯/১১ এর টুইন টাওয়ার হামলার ঘটনার মতই এর পেছনে আমরা অন্য কোনো মোটিভ দেখতে পাই। দ্বিতীয়তঃ যদি মুহাম্মদকে (সা.) ব্যঙ্গ করার কারণে সংক্ষুব্ধ কোনো মুসলিম গ্রুপ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েও থাকে, তবুও সেটাকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। কারণ, ব্লাসফেমি আইনে মৃত্যুদণ্ড কেবলমাত্র একজন ‘যোগ্য দ্বীনি নেতৃত্বই’ দিতে পারেন, আর এক্ষেত্রে সেরকম কোনো ব্যাপার ঘটেনি। অতএব এটি সুস্পষ্ট সন্ত্রাসবাদ এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনার কোনোই বৈধতা নেই। তাই মুসলিম হিসেবে আমরা এই ঘটনার সমর্থন করতে পারি না এবং সেই সন্ত্রাসীদেরকেও সমর্থন দিতে পারি না, এমনকি যদি তারা মুসলিম গ্রুপ হয়েও থাকে। তবে আমাদের প্রতিক্রিয়া কেবলমাত্র এই সন্ত্রাসবাদের নিন্দা জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, বরং সেইসাথে আরো তীব্রভাবে নিন্দা জানানো উচিত ওই ম্যাগাজিনের কর্মকাণ্ডকে, যা এজাতীয় সন্ত্রাসবাদকে উসকে দেয়। কিংবা যাকে কেন্দ্র করে ইসলামবিরোধী শক্তি এজাতীয় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে মুসলমানদের উপর দায় চাপানোর সুযোগ পায়।

যেসব বিশ্ব নেতা প্যারিসের মিছিলে অংশ নিয়েছেন এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানে কিছু মুসলিম দেশের নেতাও রয়েছেন, তারা কার্যতঃ শার্লি এবদোর প্রতি সহানুভুতি প্রকাশ করেছেন। আমি শুরুতেই বলেছি, এই সন্ত্রাসী হামলার যতটা না নিন্দা জানানো উচিত, তার চেয়ে অনেক বেশি নিন্দা জানানো ও বিরোধিতা করা উচিত শার্লি এবদোর ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের। সেই বিবেচনায় প্যারিসের মিছিলে অংশ নেয়া মুসলিম নেতাদের উচিত ছিল শার্লি এবদোর নোংরা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আরো বড় মিছিলে অংশ নেয়া, কিন্তু তারা সেটা করেননি। এর মাধ্যমে তারা মুসলিম জনগণের নেতৃত্বের নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। এদিক থেকে ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। গত বুধবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারজিয়েহ আফখাম এক প্রেস ব্রিফিং এ বলেছেন, “ফ্রান্সে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তার নিন্দা জানিয়েছে তেহরান; একইসঙ্গে ম্যাগাজিনটির বার বার উস্কানিমূলক কাজও বন্ধ করতে হবে বলে আমরা মনে করি।” তিনি আরও বলেন, “ফ্রান্সের ব্যঙ্গ ম্যাগাজিন শার্লি এবদো সন্ত্রাসবাদের সমর্থনে কাজ করছে এবং তাদের তৎপরতা নিতান্তই সন্ত্রাসবাদ উস্কে দিচ্ছে।”

আমাদের করণীয় কী?

মুহাম্মদকে (সা.) ব্যঙ্গ করে কার্টুন আঁকা, ইসলাম, কুরআন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) অবমাননা করা ইত্যাদি জঘন্য কর্মকাণ্ডের জবাবে আমাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত? এই প্রশ্ন এখন মুসলিম সমাজকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। অথচ এজাতীয় ব্লাসফেমির ঘটনা ঘটামাত্রই মুসলিম নেতৃত্বের পক্ষ থেকে দিকনির্দেশনা আসার কথা ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা পাওয়া যাচ্ছে না, আর তাই অসহায় দিকভ্রান্ত মুসলমানের ইন্টারনেটসহ নানান জায়গায় সমাধান খুঁজে বেড়াচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে তারা সঠিক উত্তর পাচ্ছে না বরং নানাভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে।

প্রথমতঃ ব্লাসফেমির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কিনা, এ নিয়ে আলেমসমাজের মাঝে মতভিন্নতা আছে। এটি যেহেতু ইসলামের সূক্ষ্ম বিষয় এবং যেহেতু এটা নির্ধারণের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের ইসলামী জ্ঞানের অধিকারী হওয়া দরকার, সেহেতু এবিষয়ে আলেসমাজের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া উপায় নেই। কোনো দ্বীনি নেতৃত্ব যদি বলেন যে ব্লাসফেমির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নয়, তবে তাঁর অনুসারীগণের সেটাই মেনে নেয়া উচিত। আর কোনো দ্বীনি নেতৃত্ব যদি মনে করেন যে ব্লাসফেমির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং যদি তিনি কোনো ব্লাসফেমির ঘটনায় কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেন, তবে তাঁর অনুসারীদের সেটাই মান্য করা উচিত। কিন্তু কখনোই আলেমসমাজের উচিত হবে না তাঁদের মতের পক্ষে-বিপক্ষের বিভিন্ন যুক্তি সাধারণ মুসলমানদের হাতে তুলে দেয়া। এতে সাধারণ মুসলমানেরা পূর্ণ যোগ্যতা ছাড়াই কিছু অপূর্ণ ধর্মীয় রেফারেন্স নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্কে লিপ্ত হবে এবং ভিন্নমতের আলেমগণকে উপেক্ষা বা হেয় করতে প্রবৃত্ত হবে। এতে মুহাম্মদকে (সা.) অপমানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উল্টা মুসলমানেরাই নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়বে। নষ্ট হবে বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য। সুতরাং এই মতভিন্নতাসহ অধিকাংশ ধর্মীয় মতভিন্নতার যুক্তি ও কারণসমূহ আলেমসমাজের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত, এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কেবলমাত্র সংশ্লিষ্ট রায় ও করণীয় বলার মধ্যেই বিষয়টাকে সীমিত রাখা উচিত। কখনোই উচিত হবে না এর পক্ষে-বিপক্ষের নানান রেফারেন্স সাধারণ মুসলমানদের হাতে তুলে দেয়া।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ইসলামের এই মতভিন্নতার বিষয়ে ইন্টারনেটে বিভিন্ন স্তরের সুপরিচিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের ভিডিও লেকচার ও লেখা ভেসে বেড়াচ্ছে, যেখানে ব্লাসফেমি বিষয়ে একটি মতের পক্ষের বিভিন্ন রেফারেন্স সাধারণ মুসলমনাদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে এবং ভিন্নমতের ব্যক্তি ও আলেমগণকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হচ্ছে। এটা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

ব্লাসফেমির জবাব কী হওয়া উচিত, এ প্রসঙ্গে দু ধরণের প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করতে চাই। প্রথমেই স্মরণ করতে চাই স্যাটানিক ভার্সেস এর রচয়িতা কুখ্যাত সালমান রুশদিকে মৃত্যুদণ্ড জারি করে ইমাম খোমেনীর (রহ.) দেয়া সেই বিখ্যাত ফতোয়া :

“বিসমিল্লাহ।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন।

বিশ্বের তেজোদীপ্ত মুসলমানদের অবগত করছি যে, ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ বইটি, যা ইসলাম, নবী করীম (সা.) ও পবিত্র কুরআনের বিরুদ্ধে রচনা, ছাপা ও প্রকাশ করা হয়েছে, এর রচয়িতা এবং একইভাবে বইটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবগত প্রকাশকগণও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হচ্ছে। তেজোদীপ্ত মুসলমানদের নিকট প্রত্যাশা করছি যে, তারা এদেরকে পৃথিবীর যে স্থানেই পাবে অতিদ্রুত হত্যা করবে। যাতে করে কোনো ব্যক্তিই যেন মুসলমানদের পবিত্র নিদর্শনাবলীকে হেয় প্রতিপন্ন করতে না পারে।

যদি কোনো ব্যক্তি ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ এর রচয়িতাকে নাগালের মধ্যে পেলেও তাকে হত্যা করার সামর্থ্য না রাখে, তাহলে সে যেন তাকে জনগণের নিকট পরিচয় করিয়ে দেয়, যাতে করে স্যাটানিক ভার্সেস এর রচয়িতা তার কৃতকর্মের সাজা পেয়ে যায়।

ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

রুহুল্লাহ আল মুসাভি আল খোমেনী।

তাং : ১৪-০২-১৯৮৯”

ইমাম খোমেনী (রহ.) যখন এই ফতোয়া জারি করেন, তখন তিনি ইসলামী ইরানের রাহবার অর্থাৎ সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। শুরুতেই আমি বলেছিলাম যে,  ব্লাসফেমি আইনে মৃত্যুদণ্ড কেবলমাত্র একজন ‘যোগ্য দ্বীনি নেতৃত্বই’ দিতে পারেন। ইমাম খোমেনী (রহ.) নিশ্চিতভাবেই ছিলেন তেমনই একজন যোগ্য দ্বীনি নেতৃত্ব। তৎকালে তাঁর জারি করা এই ফতোয়া গোটা মুসলিম বিশ্ব সমর্থনও করেছিল। বর্তমান ঘটনাটিও অনুরূপ ‘যোগ্য দ্বীনি নেতৃত্বের’ বিবেচ্য বিষয়। সুতরাং শার্লি এবদোর কার্টুনিস্ট-প্রকাশকদের মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে কিনা, সেটা বিচারের ভার আমাদের আস্থাপূর্ণ যোগ্য দ্বীনি নেতৃত্বের হাতেই ছেড়ে দিলাম। আমাদের সাধারণ মুসলমানদের কখনোই উচিত হবে না এ বিষয়ে রায় দেয়া, কারণ এতে miscarriage of justice এর আশঙ্কা আছে। তবে ইমাম খোমেনীর (রহ.) সেই ফতোয়া থেকে এক্ষেত্রে আমরা অন্ততঃ এতটুকু গ্রহণ করতে পারি যে, মৃত্যুদণ্ড দেয়া হোক বা না হোক, ইসলাম, কুরআন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) অবমাননাকারী ঘৃণ্য এই ব্যক্তিদেরকে সর্বতোভাবে বর্জন করা উচিত এবং জনগণের সামনে তাদেরকে নিকৃষ্ট জীব হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া উচিত।

এবার দ্বিতীয় মতের প্রসঙ্গে আসি, আর তা হলো : ব্লাসফেমির জবাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া বৈধ নয়। যারা মনে করেন যে ব্লাসফেমির জবাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া বৈধ নয়, তারাও আর্টিকেলের দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফের সাথে একমত হবেন যে, শার্লি এবদোর কার্টুনিস্টদের উপর সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলাটি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ নয়। এটা নিন্দাযোগ্য অপরাধ এবং আমাদের উচিত এর নিন্দা জানানো, সেইসাথে আরো বেশি নিন্দা জানানো উচিত শার্লি এবদোর অপকর্মকে। এখন, এই দ্বিতীয় মতাবলম্বী ব্যক্তিরা প্রতিক্রিয়া হিসেবে বেশকিছু কথা বলছেন এবং কর্মসূচী সাজেস্ট করছেন। সে ব্যাপারে সংক্ষেপে কিছু মতামত দেয়া যেতে পারে।

একটি প্রতিক্রিয়া এমন : “আমরা মুসলমানেরা এটা নিয়ে বেশি মাতামাতি করার মাধ্যমে ওদের উদ্দেশ্যকেই সার্ভ করছি, ওদের প্রচার বাড়াচ্ছি।”

এ ধরণের প্রতিক্রিয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম, কুরআন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) এর মর্যাদা আমাদের জীবনের চেয়েও অধিক। তাঁদের অপমানের জবাবে চুপ করে থাকাটা নির্লিপ্ততা, উদাসীনতা ও ভালোবাসাহীনতা। আমাদের অবশ্যই প্রতিক্রিয়া থাকতে হবে। কেউ বলছেন প্রতিক্রিয়া হিসেবে যোগ্য দ্বীনি নেতৃত্ব কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড জারি হতে হবে ও কার্যকর হতে হবে, ফলস্বরূপ তারা ভয় পেয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে আর ইসলামের পবিত্র বিষয়াবলীকে অবমাননা করার সাহস পাবে না। কেউ বলছেন এক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড প্রযোজ্য নয়, প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমাদের উচিত হবে মুহাম্মদ (সা.) এর উপর বিভিন্ন ডিবেইট-ডিসকাশানের আয়োজন করা, মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর প্রচারিত দ্বীন ইসলামের মহত্ব তুলে ধরা। অর্থাৎ, প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকতে পারে, কিন্তু ব্লাসফেমির জবাবে নির্লিপ্ত ও উদাসীন থাকাটা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আবার কেউ কেউ বলছেন, আমাদের উচিত এ বিষয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আদালতের কাছে যাওয়া। কেউবা আবার জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত ও ঘোষিত বিভিন্ন ‘অধিকারের’ কথা বলছেন। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা উচিত, আমরা কোন বিষয়ে কথা বলছি। আমরা ইসলাম নিয়ে কথা বলছি! আমরা কুরআন নিয়ে কথা বলছি! আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে (সা.) নিয়ে কথা বলছি! আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলাম ও তাঁর রাসূলের মাধ্যমে প্রেরিত কুরআনের আইন – এগুলি হলো দুনিয়ার বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও একমাত্র নির্ভেজাল, খাঁটি আইন। অতএব, স্বয়ং আল্লাহ, তাঁর প্রেরিত দ্বীন ও তাঁর রাসূল (সা.) যখন প্রশ্নের সম্মুখীন, তখন কিভাবে আমরা বিচারের জন্য মানুষের আদালতের শরণাপন্ন হতে পারি? এটা কিভাবে সম্ভব যে এ বিষয়ে আমরা মানুষের তৈরি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রদত্ত অধিকারের নিচে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারি? এটা কিভাবে সম্ভব যে সার্বভৌম আইন দাতা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে (সা.) অপমান করা হলে আমরা তাঁর আদালত ছাড়া অন্য কোনো আদালতের শরণাপন্ন হতে পারি, যেখানে কুরআনের আইন মানা হয় না? কিভাবে আমরা তাগুতের কোর্টের শরণাপন্ন হতে পারি?! অতএব, “ইসলাম অবমাননার দায়ে” কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার নৈতিক অধিকার মুসলমান হিসেবে আমরা রাখি না (যেহেতু আন্তর্জাতিক আদালতগুলো ইসলামী আদালত নয়)। এ বিষয়ে যদি কোনো আদালতের শরণাপন্ন হতেই হয়, তবে সেটা হবে ইসলামী আদালত, কুরআনের আদালত এবং কেবল একজন যোগ্য দ্বীনি নেতৃত্বই এ সংক্রান্ত রায় প্রদান করবেন। দুনিয়ার বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও একমাত্র খাঁটি নির্ভেজাল আইন মুসলমানদেরই আছে। সেটাকে ত্যাগ করে সেক্যুলার পশ্চিমা বিশ্বের আইন-আদালত-অধিকারের দোহাই দেয়া কিংবা শরণাপন্ন হওয়া – উভয়ই আমাদের মানসিক দৈন্য ও পশ্চিমের প্রতি এক প্রকার মানসিক দাসত্বের পরিচায়ক। আমাদের মুসলিম চেতনা জেগে উঠুক! মুসলিম জাতি বিচারপ্রার্থী নয়, বরং দুনিয়ার বুকে তারাই শ্রেষ্ঠ বিচারক।

একইসাথে খেয়াল রাখা দরকার যে, কোনো অধিকারকে আমরা যেন এই দৃষ্টিকোণ থেকে অধিকার মনে না করি যে, জাতিসংঘ সেটাকে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে! কিংবা কোনো মানবাধিকার সংস্থা সেটাকে অধিকার বলেছে। বরং আমাদের অধিকার ও কর্তব্যসমূহের বিধানদাতা হলেন আল্লাহ তা’আলা। অতএব একই অধিকার যদি ইসলামে স্বীকৃত থাকে এবং জাতিসংঘ কিংবা কোনো মানবাধিকার সংস্থা কর্তৃকও স্বীকৃত থাকে, আমরা সেটাকে কেবল এই বিচারেই গ্রহণ করতে পারি যে, সেটা ইসলামের স্বীকৃত অধিকার-কর্তব্য। কখনোই যেনো জাতিসংঘ কিংবা কোনো মানবাধিকার সংস্থা আমাদের অবচেতন মনে অধিকারদাতা অথবা কর্তব্য নির্ধারণকারী হিসেবে জায়গা করে না নেয়।

কেউ কেউ বলছেন শান্তিপূর্ণ মিছিল, বিক্ষোভ সমাবেশ ইত্যাদির কথা। এর পেছনে আমাদের মুসলিম মানসে কী মনস্তত্ত্ব কাজ করছে, তা ভেবে দেখা দরকার। শয়তানের বারংবার ঔদ্ধত্য ও ব্লাসফেমির জবাবে তারা যদি আমাদের সর্বোচ্চ প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখে ‘শান্তিপূর্ণ’ মিছিল, তবে এতে ব্লাসফেমি বন্ধ হবে না। আর আমাদের মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ দেখে সেক্যুলার রাষ্ট্রগুলোও কোনোদিন আইন জারি করে ইসলাম অবমাননা নিষিদ্ধ করবে না। এ জাতীয় ‘শান্তিপূর্ণ মিছিল’ আসলে কোনো ফলাফলই বয়ে আনবে না।

ইসলামের পবিত্র বিষয়াবলীকে অবমাননা করার মত জঘন্য কাজের জবাবে যখন আমরা স্বাভাবিকভাবে জেগে ওঠা উত্তেজিত মুসলিম রক্তকে শান্ত করার চেষ্টা করি ‘শান্তিপূর্ণ মিছিলের’ কথা বলে, তখন সেটাকে পশ্চিমা সেক্যুলার পেশিশক্তির ভয় হতে উৎসরিত বলেই মনে হয়। আমাদের মুসলমানদের লক্ষ্য রাখা উচিত যে, আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীই করি কী সহিংস যুদ্ধই করি, কোনোটিই যেন সেক্যুলার পশ্চিমাদের ভয়ে অথবা ওদের সামনে নিজেদেরকে জাহির করার জন্য না হয়। আমাদের প্রতিক্রিয়া যদি কখনো শান্তিপূর্ণ হয়, তবে সেটা যেনো এই মনস্তত্ত্ব থেকে না হয় যে, পাছে ওরা আমাদের জঙ্গি ট্যাগ লাগিয়ে হামলা করে বসে! আর আমরা কখনো সহিংস সশস্ত্র যুদ্ধ করলেও সেটা যেন কখনো এই মানসিকতা থেকে না হয় যে, সেক্যুলার শক্তিকে আমরা দেখিয়ে দিলাম, আমরাও পারি! বরং মুসলিম জাতির প্রতিটা কর্মকাণ্ড ও প্রতিক্রিয়াই হওয়া উচিত আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য, আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী ও আল্লাহকে খুশী করার জন্য। এটা ভিন্ন অন্য কোনো দুনিয়াবি লাভ-ক্ষতি বা ভয়-ভীতির অনুভুতি যেন আমাদের অবচেতন মনকে পেয়ে না বসে।

পণ্য বর্জনের কথা কেউ কেউ বলছেন। কিন্তু এ ধরণের প্রতিক্রিয়া ইসলামের পবিত্র বিষয়াবলীর মর্যাদার অবমাননার জবাবে খুবই দুর্বল প্রতিক্রিয়া। আর কখনো যদি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এমন হয় যে, আমাদের পণ্য বর্জনের খুব একটা সুযোগ নেই কিংবা আমাদের পণ্য বর্জন তাদের উপর কোনো প্রভাব ফেলবে না, তাদের অপকর্ম বন্ধ হবে না? সেক্ষেত্রে এমন একটি প্রতিক্রিয়া অন্ততঃ থাকা দরকার, যেটা স্থান-কাল নির্বিশেষে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।

কেউ কেউ ডিবেইট-ডিসকাশান আয়োজনের কথা বলছেন। এটি ভালো পন্থা। ইসলাম অবমাননার প্রতিক্রিয়ায় ইসলামের প্রচার-প্রসার বৃদ্ধি করা, মুহাম্মদের (সা.) জীবনী তুলে ধরা, ইত্যাদি ভালো উপায় হতে পারে। ডিবেইটের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য রাখা উচিত যে, ইসলাম-ভিন্ন অন্য কোনো মানদণ্ডকে যেন আমরা ডিবেইটে ব্যবহার না করি। যেমন, কথাপ্রসঙ্গে “জাতিসংঘে এই অধিকার স্বীকৃত” এ জাতীয় অধিকারের দোহাই দেয়া।

যারা ব্লাসফেমির জবাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়াকে উন্মাদনা বলছেন, জঙ্গি চেতনাপ্রসূত বলছেন কিংবা সহিংসতা বলছেন, তাদের জবাবে লেখার শেষটায় এসে ইমাম খোমেনীর (রহ.) কথা স্মরণ হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বে সফল ইসলামী বিপ্লবের এই আধ্যাত্মিক নেতাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা হতভম্ব হয়ে যায় যে, সালমান রুশদিকে হত্যার ফতোয়া দেয়া এমন একজন ‘চরমপন্থী’ আলেম কিভাবে আবার বলেন যে, কিছু কিছু মিউজিক হারাম নয়! আমি সেইসাথে যোগ করতে চাই যে, তারা আরো বিস্মিত হবেন যদি জানতে পারেন যে, ১৯৭৮ সালে নির্বাসিত অবস্থায় ফ্রান্সে থাকাকালীন ইমাম খোমেনী ক্রিসমাসের দিন প্রতিবেশী খ্রিস্টানদেরকে উপহার পাঠিয়েছিলেন। সালমান রুশদি ও তার বইয়ের প্রকাশকদেরকে হত্যার ফতোয়া জারি করা এই মানুষটির লেখা আধ্যাত্মিক কবিতাগুলো পড়লে কেউ হয়তো মোটেও

মিলাতে পারবে না, যেখানে লেখা :

Open the door of the tavern before me night and day,

for I have become weary of the mosque and seminary.

(The Wine of Love – Imam Khomeini)

ইমাম খোমেনীর (রহ.) আধ্যাত্মিক কবিতা বিশ্লেষণের সুযোগ এখানে নেই। কিন্তু পরিশেষে এটুকু বলা প্রয়োজন যে, ইসলামকে না শান্তিপূর্ণ ধর্ম বলার প্রয়োজন আছে আর না সহিংস ধর্ম বলার প্রয়োজন আছে। ইসলাম তো ইসলামই।  ইসলামের সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) যুদ্ধের ময়দানে নেমে নিজহাতে কাফিরদের হত্যা করেছেন, আবার তিনিই গভীর রাতে নামাজে কাফিরদের জন্য অশ্রুপাত করতেন এই কষ্ট থেকে যে, কেন তারা এমন হলো! ইসলাম, কুরআন কিংবা নবীজির (সা.) কেবলমাত্র একটি দিকের উপর আলোকপাত করলে তাই ন্যায়বিচার করা হয় না। ইসলামের সহিংস সশস্ত্র যুদ্ধের কথা বললে সেইসাথে এর ভালোবাসার দিকগুলির কথা না বললে যেন ন্যায়বিচার হয় না। ইসলামের বাহ্যিক শরীয়তি বিষয়গুলোর আলোচনা যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায় এর আধ্যাত্মিক দিকগুলির আলোচনা ছাড়া। পরিপূর্ণ উপলব্ধিতে ইসলামকে সার্বিকভাবে আত্মস্থ করা তাই শুধু এখন সময়ের দাবিই নয়, এটি চিরন্তন আত্মার দাবিও বটে।

লেখক: কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

You Might Also Like