আমরা যাচ্ছি কোথায়?

আগুনে পুড়ছে রিয়াজ রহমানের গাড়িবাংলাদেশ আবারও রাজনীতির নাশকতা চক্রে আটকা পড়ছে। এক-এগারোর আগে যে ধরনের নাশকতা সৃষ্টি হয়েছিল, এবার মনে হচ্ছে তার চেয়েও গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। রিয়াজ রহমানকে যারা টার্গেট করেছে, তারা ক্ষতি করেছে আওয়ামী লীগের, বেশি ক্ষতি করেছে রাষ্ট্রের। আওয়ামী লীগ আমাদের আশ্বস্ত করেছিল যে তারা বাংলাদেশের জঙ্গি ও সন্ত্রাসকবলিত একটা ভাবর্মূতি, যেটা আমরা বিগত বিএনপি-জামায়াত আমলে দেখে হতচকিত হয়েছিলাম, তা থেকে মুক্তি দেবে। সেটা দিয়েছিল। সে জন্য আমরা আওয়ামী লীগের প্রতি সব সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির একটা রূপান্তরকাল চলছে। সেটা হলো ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের সহিংসতা থেকে বন্দুকধারীদের দ্বারা বড় ধরনের সন্ত্রাসকবলিত হওয়া, গুপ্তহত্যা বৃদ্ধি পাওয়া।

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন, ইলিয়াস আলীর হারিয়ে যাওয়া, রিজওয়ানা হাসানের স্বামীর অপহরণ থেকে বিএনপির চেয়ারপারসনের নিভৃতচারী উপদেষ্টা রিয়াজ রহমানকে প্রকাশ্যে গুলি করে, পুড়িয়ে হত্যার মতো চেষ্টাগুলো ওই রূপান্তকরণ নির্দেশ করছে। ধর্মীয় জঙ্গিরাষ্ট্র নাকি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব–সন্ত্রাসে দীর্ণ রাষ্ট্র—কোনটি বেশি ক্ষতিকর, সেই কূটতর্ক বৃথা। অবরোধ কিংবা প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার অন্তরীণ থাকার নয় দিন কেটে গেছে। ইতিমধ্যে ১৯ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং রেলের ফিশপ্লেট উপড়ানোসহ নানা নাশকতায় বিপুল পরিমাণ সরকারি ও বেসরকারি সম্পদের হানি ঘটেছে। এক হিসাবে কেবল পরিবহন খাতে প্রতিদিনের ক্ষতি ৪৮ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। বিজিএমইএ বলেছে, পোশাক রপ্তানি খাতের ক্ষতি এ পর্যন্ত সাড়ে চার শ কোটি টাকা। এখন প্রায় প্রতিদিনই রাজনৈতিক সহিংসতার খবর মিলছে। তবে পুলিশ–বিরোধী কর্মীর সংঘাত, গাড়ি ভাঙচুর করে পালিয়ে যাওয়া কিংবা বিএনপির নেতাদের পাইকারি গ্রেপ্তার, তাঁদের রিমান্ডে নেওয়ার মতো ঘটনার চেয়ে পরিস্থিতি মারাত্মক দিকে মোড় নিচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়।

যেটা বেশি উদ্বেগজনক, সেটা হলো খালেদা জিয়া অবরোধ প্রত্যাহার না করার সংকল্পে অটল আছেন। আবার সরকারি দলও তাঁকে অন্তরীণ অবস্থা থেকে মুক্তিদানের কোনো মনোভাব দেখাচ্ছে না। তবে সরকারের জন্য যেটা বেশি অস্বস্তিকর, সেটা হলো মাঠে তেমন কোনো পিকেটিং ছাড়াই অবরোধের কারণে দেশের কোথাও না কোথাও একটা অস্বাভাবিক অবস্থা জিইয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে। ধরে নেওয়া যায়, খালেদা জিয়ার স্রেফ মুখের কথায় যেহেতু অবরোধ চলমান রয়েছে, তাই তাঁর ওপর সব রকমের চাপ সৃষ্টি করে যাবে সরকার। অনেকেই মনে করতে পারেন, রিয়াজ রহমানের প্রাণনাশের চেষ্টা তাঁর ওপর মানসিক প্রভাব ফেলবে। তবে সে উদ্দেশ্যেই এটা করা হয়েছে কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ বিষয়। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই, যারাই এর সঙ্গে জড়িত থাকুক, এ ঘটনা যে খুনোখুনির রাজনীতিকে আরও ছড়িয়ে দিতে পারে, সেই আশঙ্কা সৃষ্টি করবে। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, বিএনপি রাজপথে সভা-সমাবেশ ও পিকেটিং করা ছাড়াই যদি নয় দিন অবরোধ চালাতে পারে, তাহলে তাকে নিবৃত্ত করতে সরকার আর কীভাবে কঠোর হতে পারে। আবার বিএনপির দাবির সপক্ষে সাধারণ মানুষ রাজপথে শামিল হয়ে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করবে তেমন একটা অবস্থা আশা করাও দুরূহ। বিএনপির নেত্রীর জন্য উভয় সংকট হলো তিনি কী বলে এখন অবরোধ তুলবেন, আবার অনির্দিষ্টকাল ধরে অবরোধ চালিয়ে যেতে পারবেন কি না।

ঢাকায় একটিমাত্র সমাবেশ করার স্বাধীনতা অর্জন করার মতো বিষয় হয়তো তাঁর হাতের নাগালে। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়াবে, একটি সমাবেশ আদায়ের জন্য যদি তিনি লাগাতার অবরোধকে পুঁজি হিসেবে খরচ করেন, তাহলে আগাম নির্বাচনে বাধ্য করতে তাঁকে কী ধরনের কর্মসূচি পালন করতে হবে? সেটা কত দিনের বিরতিতে, আর সেই সময়ে তাঁর ভূমিকা কী হবে? তাঁকে এমন একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে যেতে হবে, যেটিকে গ্রহণযোগ্যতা দিতে হলে আওয়ামী লীগকেও অংশ নিতে হবে। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে তিনি যে কৌশলগত ভুল করেছিলেন, সেই ভুল শেখ হাসিনা না-ও করতে পারেন। ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে আওয়ামী লীগের বয়কট ঘোষণার পরও বিএনপি ২২ জানুয়ারির নির্বাচন ও নতুন মন্ত্রিসভা তৈরিতে ব্যস্ত ছিল। অথচ খালেদা জিয়াকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল যে তিনিও ওই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিন। সেটা তিনি করেননি। অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগকে এখন আগাম নির্বাচনে বাধ্য করা হলে তাতে তারা অংশ নেবেই, সেটা শতভাগ নিশ্চিত বলা যায় না। সুতরাং অবস্থা যেটা দাঁড়াচ্ছে, সেটা গভীর শঙ্কামূলক। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বৈধতার প্রশ্ন এখন আরও বেশি মাপা হবে জানমালের নিরাপত্তার পাল্লায়, সংবিধানের নিক্তিতে নয়।

বড় বেশি আক্ষেপ করি, কারণ আগের মতোই এই বিপজ্জনক ধারা চলমান রয়েছে যে রাজনীতিতে দুই প্রধান খেলোয়াড়কে কেন্দ্র করে যা কিছুই ঘটুক না কেন, সপক্ষত্যাগী বা ভিন্নমতাবলম্বীদের সংখ্যাধিক্যের কোনো লক্ষণ নেই, দেখা যাবে না। ক্ষমতাসীন দলের কয়েক শরিক ক্ষীণকণ্ঠে যেটুকু ভিন্নমত দেখাচ্ছে, সেখানে আলোর একটি ক্ষীণরেখা অবশ্য আছে। উভয় দলের নেত্রী যে যতই ভুল করুন, যে যতই হারিকিরি সিদ্ধান্ত নিন, তাতে তাঁদের মুখচেনা প্রভাবশালী মিত্ররা এতটুকু বিচলিত হন না, এটা আমাদের জাতি গঠনের মুখ্য অন্তরায়। ব্যক্তি যে যেখানে আছেন, সেখানেই তাঁরা স্থির থাকেন। হিংসা ও রক্তগঙ্গা যতই বইয়ে যাক, এঁরা কেউ ‘আদর্শ’ বদলাবেন না। দেশে এ ধরনের ‘আদর্শবাদের’ মহামারি চলছে। এর প্রতিষেধক হিসেবে কেউ ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের দরকার মনে করেন না। তাঁরা মনে করেন, তাঁদের পছন্দের কোনো ব্যক্তি বা দল এমন কোনো অচিন্তনীয় বর্বরোচিত কাজ করতে পারে না, যাতে তাঁদের সমর্থন প্রত্যাহার করার কথা ভাবতে হতে পারে।

এর মূল কারণও রক্তারক্তি ও হিংসাশ্রয়ী রাজনীতির মধ্যে নিহিত। আমরা অনেকেই লক্ষ করছি না, যে সময়টায় আমরা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে আঘাত হানলাম বলে দাবি করলাম, সেই সময়টায় জঙ্গিবাদ থেকে সামাজিক খুনোখুনির রূপান্তকরণ ঘটে গেল। রাষ্ট্রীয় বাহিনীও এ থেকে মুক্ত নয়। তাই খুনপিয়াসী রাজনীতি তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়ারই কথা। কারণ বিচারহীনতা এখানে প্রায় নিরঙ্কুশ। নব্বইয়ের পরের রাজনৈতিক সরকারের ২১ বছরে রাজনৈতিক হিংসায় ২ হাজার ৮৫৫টি খুন হয়। ২০০৭-০৮ সালের অরাজনৈতিক সরকারের দুই বছরে সেই খুন মাত্র ১১টিতে নেমে এসেছিল। গত ছয় বছরে আওয়ামী লীগারের হাতে আওয়ামী লীগার খুন ১৭২, এ সময় আরও ২৪৬ আওয়ামী লীগারের জীবন আওয়ামী লীগ বাঁচাতে পারেনি। এ সময় শুধু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সহিংসতায় নিহত হয় ১৫১। ক্ষমতার হালুয়া-রুটি কামড়াকামড়ি করতে না পারা বিএনপিও এ সময়ে নিজেরা খুনোখুনি করে ৩৪ জন মরেছে। সর্বোচ্চ ১ হাজার ২১৯টি রাজনৈতিক খুন হয় তার গত আমলে। প্রায় কোনো রাজনৈতিক খুন বা সন্ত্রাসেরই বিচার হয় না। কেউ চায়ও না! গতকাল রংপুরে বাসেই পুড়ে কয়লা হলো শিশুসহ চারজন। বিএনপি আমলে শেরাটনের পাশে দোতলা বাসে পুড়িয়ে ১১ যাত্রী হত্যারও বিচার হয়নি। এই পটভূমি মনে রেখে আমরা কিন্তু রিয়াজ রহমানের প্রাণনাশের চেষ্টার বিচারের সম্ভাব্যতা অনুমান করতে পারি। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রতিশ্রুত তদন্তের তল মাপতে পারি।

বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ নির্বাচনকালীন সরকার এবং দুই বড় দলের মধ্যে তথাকথিত সংলাপ, জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে যত চিন্তাভাবনা খরচ, কাগজ-কলম ও বাকশক্তি নষ্ট করেছে, তার সিকিভাগও তারা দুই দলের হিংসার মূল কারণগুলো অপনোদনে খরচ করার চেষ্টাও করেনি। রিয়াজ রহমানের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাই নাশকতার শেষ উদাহরণ ধরে নিতে পারলে স্বস্তি মিলত। তবে যেটা বলা দরকার, সেটা হলো এত বড় একটি সন্ত্রাসী ঘটনার পরও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বিস্ময়কর নীরবতা দেখিয়েছে। হোটেলটি কূটনৈতিক জোনে অবস্থিত থাকার কারণে ওই সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার প্রভাব নিতান্ত অভ্যন্তরীণ থাকার কথা নয়। হামলাটি পরিকল্পিত মনে হয়। বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরতদের নিরাপত্তা উদ্বেগ বৃদ্ধি। সে কারণে আরও বেশি গুরুত্ব ও দ্রুততার সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তরফে একটি ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত ছিল। সেটা ঘটেনি। বরং রিয়াজ রহমানের ওপর হামলা বিএনপির ‘নীলনকশা’র অংশ বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। কেউ বলবেন ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার জন্য বিএনপি যদি আওয়ামী লীগকে দুষতে পারে, তাহলে এই দোষারোপে দোষ কতটুকু?

ড. আকবর আলি খান তাঁর অন্ধকারের উৎস হতে বইয়ে বাংলার রাজনীতিতে হিংসা ও হানাহানির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখিয়েছেন। বাংলাদেশ যেন সুপ্রাচীনকাল থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি অস্থিতিশীল ভূখণ্ডের অন্তর্গত। মোগল ঐতিহাসিক আবুল ফজল বাংলাদেশকে ‘বুলঘকখানা’ বা অশান্ত আবাসের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। জীবনানন্দ দাশকে স্মরণ করেই আজ শেষ করি: ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,/ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা,/যাদের হৃদয়ে কোন প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই/পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।’

মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷

mrkhanbd@gmail.com

You Might Also Like