বাঙালি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে

দেশপ্রেম জিনিসটি মালকোঁচা মেরে প্রকাশের বিষয় নয়। আস্তিন গুটিয়ে বা কোমরে কাপড় পেঁচিয়ে দেশপ্রেম প্রকাশের প্রয়োজন হয় না। বল্লমের মতো হাত আকাশের দিকে তুলে বা মঞ্চে সজোরে পদাঘাত করে দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো যায় না। দেশপ্রেম এমন এক নির্মল ও পবিত্র আবেগ, যার প্রকাশ ঘটে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং তা যে কেউ বুঝতে পারে এবং তাতে মাথা নত করে সবাই। বিকট চিৎকার দিয়ে দেশপ্রেম প্রকাশ করে কেউ যদি মানুষকে বলে, ‘এই ব্যাটারা দেখ্ আমি দেশপ্রেম দেখাচ্ছি, তোরা আমাকে শ্রদ্ধা কর’; তাতে কাজ হয় না। গলায় গামছা দিয়ে কারও থেকে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা আদায় করা যায় না, দাস-দাসী থেকে করা গেলেও, জনগণ থেকে তো করা যায়ই না।

বাঙালি এক অদ্ভুত জনগোষ্ঠী। অতি অনিশ্চিত তার স্বভাব। তার এক প্রজন্মের সঙ্গে আরেক প্রজন্মের স্বভাব-চরিত্রে মিলের চেয়ে গরমিল বেশি। এক প্রজন্ম যদি স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করে তো আরেক প্রজন্ম তা খোয়াতে কিছুমাত্র দ্বিধা করে না। বাঙালির এক প্রজন্ম যদি সাহিত্য-বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে তো আরেক প্রজন্ম ২৮ দিনে ৫ হাজার ৬০০ বই প্রকাশকেই মনে করে বিরাট বাহাদুরি। এক প্রজন্মের কাছে মান বড় তো আরেক প্রজন্মের কাছে পরিমাণ। এক প্রজন্মের এক বিজ্ঞানী যদি বলেন, গাছের প্রাণ আছে, খবরদার নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া গাছের গোড়ায় করাত বা কুড়াল চালিয়ো না, ডালপালাও কেটো না। গাছের অনুভূতি আছে, ওরা ব্যথা পায়। আরেক প্রজন্ম কথায় কথায় গাছ কেটে সাবাড় করে। বাঙালির এক প্রজন্ম যদি বাংলা ভাষার জন্য রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করে, স্লোগান দেয় ‘উর্দু না বাংলা বাংলা’; আরেক প্রজন্মের কাছে ইংলিশ ও হিন্দির কদর বেশি। এক প্রজন্ম যদি ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে তো আরেক প্রজন্ম ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় মৌলবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এক প্রজন্ম যদি বাক্স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের জন্য লড়াই করে তো আরেক প্রজন্ম বাক্স্বাধীনতা ও মানবাধিকার হরণ করে আনন্দ পায়। বাঙালির এক প্রজন্ম যদি গণতন্ত্রের জন্য অকাতরে জীবন দেয় তো আরেক প্রজন্ম গণতন্ত্র হত্যা করে সুখ পায়। বাঙালির কোন প্রজন্ম কী আচরণ করবে, তা বিধাতার পক্ষেও অনুমান করা অসম্ভব। সুতরাং বিধাতা বাঙালিকে যেমন খুশি তেমন চলার জন্য ‘চাবি মাইরা দিছে ছাইড়া’। তাকে কে রুধিবে দিয়ে বালির বাঁধ?

চিরস্থায়ী একটি দেশ এক জিনিস, রাষ্ট্র আর এক জিনিস এবং গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র আর এক জিনিস। বনে-জঙ্গলেও বহুকাল মানুষ বসবাস করেছে। সেখানে বসবাসকারী মানুষেরা কেউ নাগরিক নয়। সুস্পষ্ট বিধিবিধান দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রের অধিবাসীরাই নাগরিক। নাগরিকেরাই ভোগ করে রাষ্ট্র প্রদত্ত বা সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার এবং তাদের রয়েছে রাষ্ট্রের প্রতি অবশ্যপালনীয় কিছু দায়িত্ব। রাষ্ট্র যেমন নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণ করতে পারে না, তেমনি সে তার নাগরিক দায়িত্বও এড়াতে পারে না। মৌলিক অধিকার ও দায়দায়িত্ব সবার ক্ষেত্রে সমান প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষটি এবং পথের সহায়-সম্বলহীন নিঃস্ব ভিখেরি উভয়েরই মৌলিক মানবাধিকার সমান। যদি কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাউকে তার সেই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তাহলে তাকে আর ডেমোক্রেটিক রিপাবলিকান বা গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র বলে আখ্যায়িত করা যায় না। তাকে যদি কেউ জংলি দেশ বলে, তার প্রতিবাদ করা যাবে না।

AbulMaksud-Cartoonএকটি দেশকে প্রজাতন্ত্রে পরিণত করে সে দেশের নাগরিকেরা, কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ নয়, কোনো সরকারও নয়; তবে কাজটি কোনো একটি সরকারের হাত দিয়েই হয়। একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলো একটি প্রবাল দ্বীপের মতো। প্রবাল দ্বীপ যেমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মৃত প্রবাল কীটের খোলক দিয়ে গড়ে ওঠে, একটি প্রজাতন্ত্রও সব নাগরিকের সমন্বয়ে গঠিত। সেই নাগরিকদের মধ্যে রয়েছে কৃষিজীবী, কারিগর, জেলে, কামার, কুমার, গৃহিণী, শিক্ষার্থী, সরকারি ও আধা সরকারি কর্মকর্তা ও অন্য সব পেশাজীবী। নাগরিকদের মধ্যে চোর, ছ্যাঁচড়, পকেটমারদের বাদ দেওয়ার উপায় নেই। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় একটি সংবিধানে। অদৃশ্যভাবে রাষ্ট্র চালায় নাগরিকেরা, শুধু হালটা ধরে থাকে সরকার। রাষ্ট্র যেহেতু লাখেরাজ সম্পত্তি নয়, মোতোয়ালি সম্পত্তি নয়, কোনো সরকারের পৈতৃক সম্পত্তিও নয়—প্রতিটি নাগরিকের যৌথ সম্পত্তি, যেহেতু প্রতিটি নাগরিকের শান্তিপূর্ণভাবে চলাফেরার বিধান করা সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। নাগরিকদের সভা-সমাবেশ করে মত প্রকাশের সুযোগ করে দিতে রাষ্ট্র বাধ্য। রাষ্ট্রে সরকার নয়, নাগরিকেরাই সার্বভৌম।

কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে এবং তার একটি শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়ে গেলেই নাগরিকদের সব কাজ শেষ হয়ে গেল, তা নয়। জনগণের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিক অধিকারকে সুরক্ষা দিতে গেলে রাষ্ট্রকে অব্যাহত সংস্কারের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। যেমন ঘরবাড়িকে মানুষ প্রতিনিয়ম ধোয়া-মোছা ও সংস্কার করে থাকে। রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সংস্কারের ব্যাপারে সংঘবদ্ধ ও সচেতন নাগরিক সমাজের দায়িত্ব বিরাট। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা, সামাজিক সংগঠনের নেতা, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের নেতা এবং নির্দলীয় বিভিন্ন ব্যক্তির সম্মিলিত ভূমিকা ছাড়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থার সংস্কার সম্ভব নয়। সে জন্য সবার মতামত প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ থাকতে হবে। গণতন্ত্রের দর্শনটাই হলো এই যে তা অন্যের মতামত বোঝার সুযোগ করে দেয়। বিভিন্ন পরস্পর বিপরীত ভাবনার মধ্যে আদান-প্রদানের সুযোগ থাকে, সমন্বয়ের সুযোগ থাকে এবং সবশেষে যা থাকে তা হলো সব প্রশ্নে নয়, কোনো কোনো ব্যাপারে আপসরফা। আপসরফা আর আত্মসমর্পণ করে পরাজয় বরণ এক কথা নয়। আপস-মীমাংসার মধ্যে কোনো রকম গ্লানি নেই, বরং মানুষের কল্যাণের স্বার্থে বেশি ছাড় দেওয়াতে গৌরবই আছে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ও কখনো কখনো ছন্দপতন ঘটে। সেই রকমই একটি ছন্দপতনের ঘটনা ২০১৪-র ৫ জানুয়ারি ঘটেছে। সেই গণতান্ত্রিক ছন্দপতনের জন্য কারা কারা দায়ী, তা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে সমস্যার সমাধান হবে না। আর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি রয়েছে। ওই দাবি তোলার অর্থ এই নয় যে সেই নির্বাচনটি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে হতে হবে। মোদ্দা কথা হলো, ওই রকম একটি নির্বাচন হতেই হবে, সে নির্বাচন এক-দেড় বছরের মধ্যে হতে পারে, ২০১৯-এ হতে পারে অথবা ১৫ বছর পরেও হতে পারে, যদিও তখন বর্তমানের রাজনৈতিক কুশীলবদের অনেকেই ভবধামে নাও থাকতে পারেন।

সরকারবিরোধী বড় বড় সভা-সমাবেশ বিশ্বব্যাপী হচ্ছে। পশ্চিমের পাকা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও হচ্ছে। কমবেশি বিক্ষোভ-ভাঙচুরও হয়। বিশাল সভা-সমাবেশ করে, ভাঙচুর করে, কোনো সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব নয়। বরং সভা-সমাবেশে মত প্রকাশের অধিকার হরণ করলেই সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয়। সরকার জনরোষে পড়ে। বিএনপির নেত্রী কালো পতাকা উড়িয়ে ৫ জানুয়ারি একটি জনসভা করতে চেয়েছিলেন। কালো পতাকা উড়িয়ে হোক বা নীল পতাকা উড়িয়ে হোক বা ফিরোজা রঙের পতাকা উড়িয়ে হোক, ওই রকম ১০-১৫টি সমাবেশ করলে সরকারের কোনো ক্ষতিই তিনি করতে পারতেন না। তাঁকে তাঁর অফিসে অবরুদ্ধ করে রাখতে সরকারের বুদ্ধিদাতাতে যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন, তাঁরা সরকারের একটুও উপকার করেননি। বিএনপির নেত্রীর লাভ-ক্ষতি যা-ই হোক, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলো।

বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের ডাকে এক আধখ্যাচড়া ধরনের অবরোধ চলছে। যারা দিন এনে দিন খায়, তাদের অনেকেই লিখতে-পড়তে জানে না, অঙ্ক কষতেও জানে না। অঙ্কে পাকা বড় বড় ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এফবিসিসিআই। তার নেতা ও পরিবহনমালিকেরা অঙ্ক কষে দেখিয়ে দিয়েছেন অবরোধে প্রতিদিন কত হাজার কোটি টাকা লোকসান। তাঁদের ‘পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে’ বলে তাঁরা হরতাল-অবরোধ বন্ধে ‘আইনি ব্যবস্থা’ নেওয়ার জন্য তাঁদের সভাপতিকে ‘ম্যান্ডেট’ দিয়েছেন। মনে হচ্ছে, তাঁরা অতীতে কোনো দিন এ দেশে হরতাল দেখেননি।

কিছু কিছু রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান কোর্ট-কাছারিতে ঘুরে হয় না। অন্তত এ পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো দেশে কোনো কালে হয়নি। আমি ব্যবসায়ী নেতা হলে গুলশানে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের বলতাম, বালু-সিমেন্ট-ইটের ট্রাক সরান এবং বাড়ির ফটকের তালাটা খুলুন। যিনি অবরোধের ডাক দিয়েছেন, তাঁকে গিয়ে আমরা বলব, আপনি অবরোধ তুলে নিন। সব শ্রেণির মানুষ যদি আত্মস্বার্থে পলিটিকসে জড়িয়ে পড়েন, তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়।

বঙ্গীয় রাজনীতিতে নাটকীয়তা বহুদিন থেকেই আছে। পঞ্চাশের দশকে পশ্চিমে স্যামুয়েল বেকেট, জাঁ জেনে, আয়োনেস্কো প্রমুখ সূচনা করেন অ্যাবসার্ড থিয়েটারের। আমাদের রাজনীতিতে অ্যাবসার্ড থিয়েটারের সূচনা নব্বইয়ের দশকে। ২০১৩-র ডিসেম্বরে বিএনপির নেত্রীর ওপর বালুভর্তি ট্রাকতত্ত্বের সার্থক প্রয়োগ হয়। ওদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের ওপর হাসপাতালতত্ত্ব। ওসব থেরাপি ভালো কাজ করেছে। এবার বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব জাপা চেয়ারম্যানের মতোই অলৌকিকভাবে হাসপাতালে নীত হন। উধাওও হন অলৌকিক উপায়ে। সেটা নাকি তাঁর ‘কৌশলগত’ ব্যাপার।

আমাদের প্রচলিত ধারার রাজনীতিতে নেতা-নেত্রী ও তাদের ব্যক্তিগত সচিবদের চেতনার রঙে শুধু পান্নাকে সবুজ বা চুনীকে লাল দেখায় না: তারা পান্নাকে নীলা বা পদ্মরাগমণী বলে প্রচার করেন। চার দলীয় জোটের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে ঢাকায় রয়টার্সের সংবাদদাতার ভুয়া ফোনালাপ নিয়ে কেলেঙ্কারি হয়েছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এবং জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর হয় এক কথা, কর্মকর্তারা প্রচার করেন তাঁদের মনের কথা। পরে তাঁদের অফিস থেকে বক্তব্যের প্রতিবাদ করা হয়। এসব অ্যাবসার্ড নাটকীয়তা আমাদের নষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতির উপাদান।

শুধু পেপার স্প্রে নয়, এবার ট্রাকের সঙ্গে যোগ হয়েছে টেলিফোন। বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশের ক্ষমতাসীন দলের নেতা টেলিফোন করতেই পারেন (তাঁর গলা নকল করে অন্য কেউও ফোন করতে পারেন), গুলশান থেকে অবরুদ্ধ নেত্রীও ফোন করতে পারেন। কথাবার্তা চোখের মরিচের গুঁড়ো নিয়ে হতে পারে। পরিচালক রাজকুমার হিরানির মুন্নাভাই এমবিবিএস, থ্রি ইডিয়টস বা চলতি ছবি পিকে নিয়েও হতে পারে। তাতে দোষের কী? কিন্তু টেলিফোনও বাংলাদেশের রাজনীতির ঠেলায় ভিলেনে পরিণত হয়েছে। অ্যাবসার্ড নাটকে অ্যাবসার্ড টেলিফোন, যার কোনো সম্পর্ক নেই বাস্তবের সঙ্গে।

চলমান নষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতির যদি সঠিক চিকিৎসা না হয়, তাহলে অব্যবহিত পূর্ববর্তী প্রজন্মের মতো আগামী বহু প্রজন্ম রক্তার্জিত স্বাধীনতা থেকে কিছুই পাবে না।  কার্টুন: তুলি

সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

You Might Also Like