কখন আসবে অপেক্ষার ট্রেন?

ফারুক ওয়াসিফ :

‘এ আর কী কষ্ট, এর থেকে বেশি কষ্ট কইরছি!’ মিষ্টি চেহারার ছোট্ট মেয়েটির মুখে এমন ভরসার কথা শুনে চট করে দুই নেত্রীর মুখ মনে এল। ক্ষমতা ধরে রাখা কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই করতে করতে তাঁরাও নিশ্চয়ই কষ্টে আছেন। কিন্তু খুলনার প্রান্তিক গ্রাম কয়রার তরুণী সুইটির মতো সবুর তাঁরা যদি করতে পারতেন! যদি ভাবতেন, ‘আমাদের আর কী কষ্ট, এর চেয়ে বেশি কষ্ট করে আমার দেশের মানুষ।’ তাহলে বুকটা ভরে যেত। কিন্তু আমরা ভাবি এক আর হয় আরেক। আমাদের আশার গুড়ে শুধুই বালি! জনগণের জন্য এখন ফকির লালন সাঁইয়ের এই গানটিই মানানসই:

একবার সবুরেরও দেশে, বয় দেখি দম কষে।

উঠিস না রে ভেসে পেয়ে যন্ত্রণা!

এক. ১০ জানুয়ারি রাত ১০টা। রাতের ভৈরব আর রূপসা নদীর হিমবাতাসে জবুথবু মান্ধাতা আমলের খুলনা রেলস্টেশন। মাইকে অমুক ট্রেন অত ঘণ্টা লেট, তমুক ট্রেন তত ঘণ্টা লেট—শুনতে শুনতে যাত্রীরা বেদম বিরক্ত। যে যেভাবে পারে বসে-দাঁড়িয়ে-হেঁটে কনকনে শীতে গা গরম রাখার কসরত করছে। অনেকেই কম্বলে গা মুড়িয়ে আসন পেতে বসেছে স্টেশনের চওড়া পাটাতনে।

দেয়াল ঘেঁষে এভাবেই বসা দেখি তাদের। বলে না দিলে মেয়েটিকে কিশোরীই মনে হবে। মাথা মোড়ানো মাফলারে, কোমর অবধি ঢাকা কম্বলে। মধ্যবয়সী বাবাও একইভাবে শীত তাড়াচ্ছেন। আর মশা তাড়াতে পাশেই জ্বলছে কয়েল। ঢাউস একটা বই পড়ছে তো পড়ছেই বাপের মেয়েটি। বাবা চোখ বুজে আছেন।

তাঁদের পাশেই লুঙ্গি পরা দুটি যুবক টিনের থালায় ছাতু মাখাচ্ছে। একজনের নাম রহমান, অন্যজন খলিল। ইমারত নির্মাণকাজের শ্রমিক হতে ওরাও যাবে ঢাকায়। এটাই ওদের রাতের খাবার! যাত্রাপথে খরচ বাঁচাতে গরিব মানুষ ছাতুর সঙ্গে গুড় মাখিয়ে খিদা মেটায় বাংলাদেশে। তবে এবার তাদের ছাতু বেশি লাগছে। কারণ, ট্রেন অস্বাভাবিক লেট। দেশজোড়া অবরোধ, জায়গায় জায়গায় লাইন ওপড়ানো, স্লিপার ওঠানো। তাই প্রতিবার ট্রেন যাওয়ার পর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার লাইনে পাইলট ট্র্যাকিংয়ের সময় যাচ্ছে। এরপর ট্রেন চলছে, তাও সাবধানতার জন্য অল্প গতিতে। রেললাইন যেন জাতীয় অবস্থারই প্রতীক, সাবধানে ধীরগতিতে ২০১৫ সাল পাড়ি দেওয়া শুরু করেছে দেশ।

কিন্তু এতক্ষণ ধরে কী বই পড়ছে মেয়েটি? কৌতূহল নিয়ে পাশে বসে জিজ্ঞাসা করি, ‘কী পড়ো তুমি?’ প্রচ্ছদ মেলে দেখাল সে, শার্লক হোমস অমনিবাস। অবরোধ, উত্তেজনা আর রাজনৈতিক রহস্যের রাতে স্টেশনের পাটাতনে বসে অগাথা ক্রিস্টির গোয়েন্দাকাহিনি পড়ছে পাড়াগাঁর এক মেয়ে! বেশ তো!

এতক্ষণে বাবা চোখ মেলেছেন। নাম জানালেন শচীন্দ্রনাথ সরকার। মেয়ে সুইটি সরকার এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে ভর্তি হয়েছে। সিট বরাদ্দ পেয়েছে শামসুন্নাহার হলে; ১১ তারিখ ছিল হলের খাতায় নাম লেখানোর দিন। তাই অবরোধের মধ্যে রওনা হয়েছে বাপ-বেটি। গ্রাম-মফস্বলের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কী দারুণ সার্থকতার ক্ষণ! অথচ রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য কী বেমক্কা ভোগান্তি!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন। কোথায় আনন্দ-আদরে স্মরণীয় মুহূর্তটি উদ্যাপন করবে, তার বদলে শীতে-মশায় আর বিপদের ভয় মাথায় নিয়ে তারা অপেক্ষা করছে ঢাকা যাওয়ার দুর্লভ ট্রেনের। পোড়ার দেশের পোড়ার কপাল। বললাম, তোমার কি রাগ লাগছে, মনটা তিতা লাগছে? অবলীলায় উত্তর করে মেয়ে:

এ আর কী কষ্ট, এর থেকে বেশি কষ্ট কইরছি! এ মাসের ৫ তারিখে ছিল ভর্তির তারিখ। সেই দিনও গন্ডগোল ছিল। বাস চলে না। ট্রেনের টিকিট পাই না। ভাবলাম, কোনো বগিতে উঠতে পারলে হয়, দাঁড়ায় দাঁড়ায় যাব। তা-ই গিয়েচি। ইন্টার পরীক্ষার সময়ও হরতাল ছিল। কী করব বলেন, আমাদের তো চলতি হবেই। তবে, এখন আমি নিশ্চিত, ভর্তি তো হয়েই গিয়েচি।’ বলে মেয়েটি হাসে।

অনিশ্চয়তা আর ঝুঁকির মধ্যে জীবন চালাতে শিখছে বাংলাদেশের মানুষ। খুলনা স্টেশনেই ১০ তারিখ সকাল নয়টায় পেলাম ময়মনসিংহের মো. ওমর ফারুক খন্দকারকে। তিনি ময়মনসিংহের তারাকান্দি থেকে ঢাকা হয়ে এসেছেন মেয়েকে নিয়ে। আগের দিনই ছিল মেয়ের খুলনা মেডিকেল কলেজে ভর্তির তারিখ। নিরুপায় হয়ে অবরোধ ভেঙে তাঁরা পথে নেমেছেন। এখন মেয়েকে হলে তুলে দিয়ে ফেরার ট্রেনের অপেক্ষায়।

সাধারণ মানুষের থেমে থাকার উপায় নেই। তাদের কাছে জীবনের নাম মহাশয়, যা সওয়াও তা-ই সয়।

দুই. স্টেশনমাস্টারের কক্ষে তখন ভিড়। শহরের সরকারি-বেসরকারি প্রভাবশালী ব্যক্তিরা লোক পাঠাচ্ছেন আগাম টিকিটের জন্য। অনেকে আবার বিশ্ব ইজতেমায় যাবেন। বাইরে সাধারণ যাত্রীরা সার বেঁধে টিকিটের জন্য দাঁড়িয়ে; কারও ভাগ্যে সবুরের মেওয়া মহার্ঘ টিকিট মিলছে, কেউ বা নিরাশ বদন। কিন্তু বিভাগীয় শহরের প্রধান স্টেশনের স্টেশনমাস্টারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অনুরোধ ফেলার জো নেই। তিনি অনুরোধে সাড়া দিয়ে কিছু কিছু টিকিট দিচ্ছেন আর টাকা নিচ্ছেন। স্লিপ লিখে দিলে কাউন্টারে দেখালে কাজও হচ্ছে। কিন্তু গরিব ও প্রান্তিক মানুষের কিছুই করার থাকে না, লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া।

রাজনৈতিক বা প্রাকৃতিক—যেকোনো দুর্যোগের হাত সবার আগে ধরে দুর্বল ও ক্ষমতাবঞ্চিত মানুষকে।

টানা ছয় দিন স্টেশনেই থাকছেন বলে দাবি করলেন স্টেশনমাস্টার কাজী আমীরুল ইসলাম। রাজনৈতিক অচলাবস্থার পুরো চাপ এভাবে সরাসরি পড়ছে গিয়ে প্রশাসনের লোকজনের ওপর। সম্ভবত পুলিশ ও রেলের কর্মীদের ওপরই চাপ বেশি। সরকারি নিয়ন্ত্রণ জারি রাখায় পুলিশের ভূমিকাই প্রাথমিক। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়া মানে সরকার দেশ চালাতে ব্যর্থ হচ্ছে। সেটা যাতে প্রতীয়মান না হয়, সে জন্যই এই অতিরিক্ত চাপ বইছে দুস্থ বাংলাদেশ রেলওয়ে।

তিন. ঢাকা থেকে বাসে মাওয়া। সেখান থেকে কাওড়াকান্দি এসেছি স্পিডবোটে। তারপর মাইক্রোবাসে যাত্রীবোঝাই হয়ে খুলনার রূপসা ঘাটে। পদ্মার এ পারে শিবচর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাটের মধ্য দিয়ে তবে খুলনা। বাস তেমন না চললেও আওয়ামী লীগের ঘাঁটি বলে পরিচিত গোপালগঞ্জের এপার-ওপার অপেক্ষাকৃত শান্ত। কিন্তু যাত্রী যাঁরা, বাংলাদেশের আমজনতা যাঁরা, তাঁরা শান্ত নন। সড়কে বা নদীতে, সহযাত্রীরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছেন। কাউকেই দেখলাম না সরকার বা বিরোধী দলের হয়ে সরাসরি কথা বলতে।

বরং তাঁরা অপেক্ষা করছেন। তাঁরা অপেক্ষা করছেন, কখন ক্ষমতার লীলাখেলা শেষে বাংলাদেশ আবার স্বাভাবিক গতিতে চলতে শুরু করবে। অপেক্ষার প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশও রহমান ও খলিলের মতো ছাতু মাখাচ্ছে; কখন আসবে আমাদের মুক্তির ট্রেন, ও বাংলাদেশের স্টেশনমাস্টার? জীবনের পথে আমাদের তো অনেক লেট হয়ে যাচ্ছে!

ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।

bagharu@gmail.com

You Might Also Like