ঘৃণা নিরসনে এখনই নাগরিক উদ্যোগ চাই

নাশকতার ভয় আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছেএক-এগারোর বার্ষিকীতে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ একটি ভালো চিন্তার খোরাক জুগিয়েছেন। ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পরে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ সম্ভবত এই প্রথম স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট করে বললেন যে, ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে রেখেও একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হতে পারে। আমরা ধরে নিতে পারি যে তিনি এটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে বলেছেন। বিএনপির এটা মনের কথা হলেও তারা এটা এখন প্রকাশ করবে না। সুতরাং, লিখিতভাবে তাদের কাছ থেকে কোনো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা পাওয়া যাবে না। তেমনি সরকারি দলও বলবে না যে নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির অবস্থান কী দাঁড়াবে। যদি ধরে নিই, নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে ঐকমত ঘটে গেছে, তাহলেও সংকট ঘুচবে না।

যাঁরা বলেন সংকট কেবলই নির্বাচনকেন্দ্রিক, সেটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। আমাদের দেখতে হবে অনেকগুলো অবাধ নির্বাচন করার পরও আমরা কেন জিরোসাম গেমের বৃত্তেই আটকে গেলাম। আমরা এত দিন ভেবেছি এবং এখনো অনেকেই মনে করেন যে, দুই নেত্রী সরে দাঁড়ালেই সমস্যা মুছে যাবে। আসলে তা যাবে না। কারণ, দুই দলের মধ্যে অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধা নিরসনে এখন পর্যন্ত আমরা কোনো ফর্মুলা বের করতে সচেষ্ট হইনি। এমাজউদ্দীন আহমদ যা বলেছেন, সেটা মেনে নিতে আওয়ামী লীগের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তার পরও অচলাবস্থা কেটে যাবে না। বিএনপিকে নরম মনে হতে পারে। কিন্তু তা অচলাবস্থা নিরসনে তেমন কাজে দেবে না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত

আগেই বলেছেন, খালেদা জিয়া অসময়ে ভালো কথা বলেছেন। তাঁকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সুতরাং মনে হচ্ছে, এখন মূল বিরোধ হলো নির্বাচন কখন হবে। এই নির্বাচনের তারিখ ঠিক করার কাজটি বিএনপি অব্যাহত অবরোধ করে আদায় করতে পারবে কি না, সেটা পরিষ্কার নয়।

এমাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর মতো অসহযোগ আন্দোলনের ইঙ্গিত করেছেন। কিন্তু সেটা ছিল ছয় দফানির্ভর। আর সেখানে অর্থনৈতিক ও শাসনগত মুক্তির ব্যাপারে মানুষের মধ্যে পরিষ্কার ধারণা ছিল। কিন্তু বিএনপির কর্মসূচিতে কেবল নির্বাচন অনুষ্ঠান ছাড়া আর কিছু নেই। সুতরাং, অসহযোগ আন্দোলন দিয়ে সরকারকে নির্বাচন দিতে বাধ্য করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এমনকি ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিএনপি অপেক্ষা করতে রাজি হলেও সংকট ঘুচে যাবে না। কারণ, আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যে বলেছে, তারা ওই নির্বাচনেও জিতবে। শেখ হাসিনা হ্যাটট্রিক করবেন। সুতরাং, ধরে নিতে পারি, আমরা একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকটে নিপতিত রয়েছি। আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় টিকে যাওয়া, বিএনপির তা প্রতিহত করতে অব্যাহতভাবে ব্যর্থ কিংবা সফল হওয়া সমাজে শান্তি আনবে না।

জিরোসাম গেম থেকে বেরোতে হলে ঘৃণার রাজনীতির বলয় থেকে দুই দলকে বের করে আনতে হবে। দুই বড় দলের মুক্তবুদ্ধি ও বিবেকবানদের উচিত হবে এটা স্বীকার করে নেওয়া যে, ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দেওয়ার ফলেই কেবল এত বড় সংকট তৈরি হয়নি। এর উল্টোটা আমরা যারা বলি, তাদের ভাবা উচিত, এর ফলে আমরা খুব বেশি সরলীকরণ করছি কি না। আমাদের এটা খতিয়ে দেখতে হবে যে, কোনো রাজনৈতিক সংকট যাতে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক পরিণতি লাভ না করতে পারে, সে ব্যাপারে সব বিবদমান পক্ষ পলায়নপর ও সন্ধিগ্ধ থাকে কেন? বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সংকটের অবসান আলাপ-আলোচনা করে হয়নি, তাহলে এবারে আমরা সংলাপ সংলাপ করছি কেন? আগের যে পরিবেশের কারণে এটা হয়নি, সেই পরিবেশ তো পাল্টে যায়নি। বরং ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পরে শেখ হাসিনার তরফে বিএনপি নির্মূল করে দেওয়ার রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে বলেও মনে করা হয়। ২১ আগস্ট প্রশ্নে বিএনপি এখন পর্যন্ত যেমন তার অবস্থান স্পষ্ট করেনি; তেমনি আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করি যে, এই মামলার বিচার-প্রক্রিয়া যথেষ্ট মন্থর হয়ে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ হলে আমরা আশা করেছিলাম যে, ঘৃণার রাজনীতি অনেকটাই কমে যাবে। কারণ, জিয়া অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। তাঁর স্ত্রী ও পুত্র অতীতের সন্দেহ-সংশয়ের দায় নিতে পারেন না। কিন্তু এখন অামরা মানব যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের পরে অবিশ্বাস আরও গভীরতর হয়েছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার বিচার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে সরকারি দলের উদ্যোগ না দেখতে পাওয়া একেবারে রাজনীতি বিযুক্ত মনে করা কঠিন।

সুতরাং সব বিচারে দুই বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে যাতে সম্প্রীতি ও আলাপ-আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি হয়, সেটাই সব থেকে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। এই অবিশ্বাস বজায় থাকবে, অথচ কেবল বিএনপির অবরোধের মুখে আওয়ামী লীগ আগাম নির্বাচনে রাজি হবে, কেন জানি তাতে মন সায় দেয় না। অবশ্য অনমনীয় থাকা হবে কঠিন ও নির্দয় রাজনীতির বিষয়। যদিও গণতন্ত্রে নির্দয়তার জায়গা নেই। সেই রাজনীতিতে গণতন্ত্র কতটা, আর গায়ের জোর কতটা, সেটা মাপাও সহজ নয়।

চলতি অবরোধ অকার্যকর হতে পারে। সেটা সরকারি দলের জন্য স্বস্তির হতে পারে। কিন্তু এটা বেশ পরিষ্কার যে, তাতে সমাজে শান্তি আসবে না। একটা উত্তেজনা, অস্থিরতা, নাশকতার ভয় আমাদের কুরে কুরে খাবে। আমি, যেটা বিশেষ করে বলতে চাই, নির্বাচন আমাদের মুক্তি দেবে না। নির্দলীয় বা দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আমাদের শান্তি দেবে না। সাময়িকভাবে একটা স্থিতি দিতে পারে। মোটকথা, আমরা ঘৃণার রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে রয়েছি। অবরোধ সফল হোক বা না হোক, এ থেকে আমাদের কোনো পরিত্রাণ নেই।

এই সরকার যেমন, তেমনি আগামীর ‘নির্বাচিত’ সরকারও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর অব্যাহতভাবে এবং বেশি বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এর ফলে আমাদের বাক্স্বাধীনতা, বিশেষ করে গণমাধ্যম এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা দুর্বল থেকে দুর্বলতর হওয়ার ঝুঁকি বজায় থাকবে।

আমরা বিএনপির সমাবেশের স্বাধীনতা চাই। কারণ, আমরা আমাদের বাক্স্বাধীনতার অধিকার চাই। বিএনপির কণ্ঠ রুদ্ধ করা সম্ভব হলে কিংবা সেটাকে কার্যকর করতে গিয়ে সরকার আমাদের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা করবে। কিংবা অন্য কথায়, সরকার সেটা না চাইলেও আপনাআপনি ঘটে যাবে। কারণ, পানির ধর্মই হলো ওপর থেকে গড়িয়ে নিচে ছড়িয়ে পড়া। মিডিয়ার বাক্স্বাধীনতা বা মিত্র মিডিয়ার বাক্স্বাধীনতা আর বিরোধী দলের বাক্স্বাধীনতার প্রতি দুই রকম আচরণ দেখানো বাস্তবে সম্ভব নয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্য বিএনপি ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির কর্মী পেলে বেশি পেটাবে, আর একই সময়ে সেই তারাই অন্যান্য নাগরিকদের প্রতি আইনানুগ সদাচরণ করবে, সেটা আশা করা যায় না।

সুতরাং, বিএনপির সঙ্গে সরকারের একটা ন্যূনতম বোঝাপড়ার সম্পর্কের সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি বিকশিত হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। রাজনৈতিক আবহাওয়া গোলযোগপূর্ণ হওয়ার প্রায় প্রতিটি পর্বে মিডিয়ার ওপর খড়্গ নেমে এসেছে। কিন্তু মিডিয়া সংঘবদ্ধভাবে তা প্রতিহত করতে পারেনি। কারণ, মিডিয়ার স্বাধীনতা ও সাহসিকতা আমার কাছে চূড়ান্ত বিচারে একটি রাষ্ট্রের প্রধান

বিরোধী দলের নৈতিক সাহসের বর্ধিত অংশমাত্র। গুণগত মানসম্পন্ন রাজনীতি না থাকলে সেখানে গুণগত মানসম্পন্ন সাংবাদিকতা কিংবা মুক্তবুদ্ধি ও সংস্কৃতির চর্চা দুরূহ হতে বাধ্য। মধ্য আয়ের টেকসই দেশ হতে হলে মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞানের চাষ থাকতে হবে। আর সেটা অশান্তির মধ্যে হওয়া কঠিন।

তাই এমাজউদ্দীন আহমদ শেখ হাসিনাকে রেখে বিএনপিকে নির্বাচনে যাওয়ার যে পরামর্শ দিয়েছেন, সে বিষয়টিকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দিতে চাই। কারণ, যেকোনো ধরনের নির্বাচন আমাদের জাতি গঠনে টেকসই সমাধান দেবে না। যেসব উন্নয়নশীল দেশে নিয়মিত অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়, সেসব দেশের ঘৃণার রাজনীতি ঢের কম। সেখানে নূ্যনতম শাসন আইনের শাসনের সংস্কৃতি ক্রিয়াশীল। সেই কারণে সেখানে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়; সংবিধানে লেখা থাকে বলেই হয় না। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তারেকের কটূক্তি বিচ্ছিন্ন ও শেষ ঘটনা নয়। এ বিষয়ে অধ্যাপক আহমেদকে প্রশ্ন করলে তিনি আমাকে বলেন, ‘যখন তাঁর বাবা সম্পর্কে বলা হলো যে তিনি পাকিস্তানের চর বা ঘটনাচক্রে মুক্তিযোদ্ধা বা রাজাকার—এমন একটি প্রেক্ষাপটেই তিনি আসলে বলেছেন। জাতীয় নেতৃবৃন্দকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখার সূচনা হওয়া উচিত। এখানেও একটি সমঝোতা সৃষ্টিতে জ্যেষ্ঠ নাগরিকেরা সক্রিয় হতে পারেন। তখন জাতীয় রাজনীতির স্বার্থে তারেক ওই অবস্থান থেকে সরে আসতে পারেন।’

এই বিষয়ে দুই দলের মধ্যে কোনো আশু উদ্যোগ আকাশকুসুম কল্পনা। নাগরিক উদ্যোগ গ্রহণও কম কঠিন নয়। তবে সম্ভব। তার চেয়েও বড় কথা এটা অবিলম্বে স্বীকার করা ভালো যে, সুশাসন, আইনের শাসন, গণতন্ত্র, অবাধ নির্বাচন ইত্যাদির জগতে আমাদের প্রবেশের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আর সে জন্য ঘৃণার রাজনীতি মুছতে হবে। ১৯৭৫ ও ২০০৪—দুটি আগস্টের গভীর ক্ষত নিরসনে সংলাপ হতে হবে। এটা কীভাবে, কারা কখন শুরু করবে, তা জানি না। শুধু জানি, জাতি গঠনে ও বিশ্বদরবারে শির উঁচু করে দাঁড়াতে হলে, অন্যের কাছে মর্যাদা চাইলে এ রকম একটি গন্তব্যে পৌঁছানোর কোনো বিকল্প নেই।

মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷

mrkhanbd@gmail.com

You Might Also Like