তোমরা জেগে উঠো

শওকত মাহমুদ

এখনো দেশের সেরা ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। নেতৃত্ব নিয়ে মতানৈক্য থাকুক, অন্তর্কলহে রক্ত ঝরুক বা রাজপথ কাঁপানো আন্দোলন না করতে পারুক, ছাত্রদল ছাত্রদলই। শহীদ জিয়া, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং আগামীর দেশনায়ক তারেক রহমানের সব চেয়ে প্রিয় অঙ্গসংগঠন। অলওয়েজ চয়েস ফর নিউ জেনারেশন।

স্বৈরাচার থ্যাঁৎলানো আশি দশকে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রধান শক্তিই ছিল ছাত্রদল। ‘চয়েস ফর নিউ জেনারেশন’ এই স্লোগানে অগুনতি ছাত্র তখন এই সংগঠনে সরাসরি যোগ দিয়েছেন, নতুবা নীরব সহযাত্রী হয়েছেন। এক অসামান্য সাহসী পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষক চিরায়ত মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জিয়াউর রহমান ছাত্রদলের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার শুভাগমন প্রতিকূল অভ্যর্থনায় শুরু হলেও তা ছিল সাময়িক। এর পর তিনি লাইব্রেরি চত্বরের দিকে একাই এগিয়ে যান এবং ক্ষুব্ধ ছাত্রদের সাথে কথা বলেন। প্রতিকূলতার ছবিটি উবে যায়। সাধারণ ছাত্ররা এক অদ্ভুত আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে। আমাদের চোখের সামনেই ঘটে একজন সরকারপ্রধানের সেই অবিশ্বাস্য সখ্য গড়ার ঘটনাটি এবং ডাকসু নির্বাচনগুলোতে অন্য যেকোনো সংগঠনের চেয়ে ছাত্রদলের ধারাবাহিক ও আশাতীত বিজয়ের গল্প গড়ে দিয়েছেন এই ছাত্ররাই। জন্মলগ্ন থেকে ছাত্রদল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর নয়; বরং আদর্শভিত্তিক ইতিবাচক কর্মকাণ্ডকেন্দ্রিক ছিল।

বর্তমান অবস্থার দিকে তাকালে মনে হতে পারে ছাত্রদল বুঝি আর নেই। আওয়ামী হিংস্রতায় আর অভ্যন্তরীণ নিষ্ক্রিয়তায় যেন সংগঠনটি কুঁকড়ে গেছে। গত কয়েক বছরে অসংখ্য নেতাকর্মীকে গুম বা খুন করা হয়েছে। হাজার হাজার মিথ্যা মামলায় জেলে অথবা আদালতের বারান্দায় বারান্দায়। ঘরে ঘুমাতে পারেন না। পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলোতে ঢুকতে বা দাঁড়াতে পারছেন না। পুলিশের অসভ্যতায় রাস্তায় পর্যন্ত পা ফেলতে পারছেন না। দলবাজ ভিসি, আওয়ামী পুলিশ ও হানাদার সশস্ত্র ছাত্রলীগাররা ছাত্রদলের কারো ছায়া দেখলেই নেকড়ের মতো ছুটে আসে। ছাত্রদলের দুই সাবেক সভাপতি শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও সালাউদ্দিন টুকুর মাথা ফাটিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে বিচার বিভাগ গ্রেফতারকৃত ভিন্ন মতের ছাত্রদের প্রতি যেন অনুদার। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নামে এইচ টি ইমামের এক নতুন বাহিনীর উপদ্রব চলছে। আর মিডিয়ার বেশির ভাগে চলছে অব্যাহত মতলবি অপপ্রচার। ছাত্ররা মিছিল করলে বলে নাশকতা, পুলিশ গুলি করলে মিডিয়ার প্রশংসা পায়, মারা গেলে আপন ভাইয়ের চেয়েও বেশি কাঁদে। আবার পুলিশি বর্বরতার জন্য রাস্তায় না নামতে পারলে চেঁচিয়ে বলতে থাকে, ওরা আন্দোলন করতে পারে না। ছাত্রদলের নিজেদের মারামারিকে বড় করে দেখায়, এতে গোয়েন্দা সংস্থার ইঞ্জিনিয়ারিং বা পুলিশের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। হিটলার, মুসোলিনি, স্টালিনের ফ্যাসিবাদকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে হিংস্র্র নেকড়ের মতো লেলিয়ে দিয়েছেন আর একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া তার রক্তপানে উন্মত্ত হয়ে গেছে।

এর অর্থ কী, আমাদের কিছু করার নেই? ছাত্রদল বসে থাকবে? বাংলাদেশের ইতিহাসের কুৎসিৎতম এই বিভীষিকা কি আমরা নীরবে মেনে নেব? আমি মনে করি, একে উৎখাত করে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ আন্দোলনের অতুলনীয় বিজয় অর্জনের এই পরম সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। অনেককে বলতে শুনি, এ দেশে ছাত্র আন্দোলনের যে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি আমরা কেন ঘটাতে পারছি না। কিন্তু ওই বলিয়েরা বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারছেন না। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের চরিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায় অভিন্ন প্রতিপক্ষ অর্থাৎ বিদেশী শাসক বা সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যখন আন্দোলন হয়েছে, তখন সব ছাত্রসংগঠন কমন এনিমির বিরুদ্ধে একই গাঁটবন্ধনে আন্দোলন করেছেন। সরকার সমর্থকদের ঝেঁটিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়া করেছেন। মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের দুঃশাসনে ক্যাম্পাসে সেনাসদস্যদের পর্যন্ত ধাওয়া করেছেন।

কিন্তু নব্বইয়ের গণ-অভ্যত্থানের পর যখন নির্বাচিত সরকারগুলো আসতে শুরু করল, তখন ছাত্ররাজনীতির প্রকৃতিতে পরিবর্তন দেখা দিলো। অবশ্য বিশ্বজুড়েই ছাত্র আন্দোলনের হলকা বিশেষভাবে সীমিত হয়ে পড়ছিল, যা আমরা ষাট বা সত্তর দশকেও দেখেছি। আর কমন এনিমি ক্ষমতায় বসে না, আন্দোলনেও বিভক্তি। বেগম জিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বে ডাকসু সচল ছিল। নির্বাচিত ছাত্র সংসদগুলো ছাত্র কল্যাণমুখী হয়ে উঠল।

বেগম জিয়ার তৃতীয় আমলেও হলগুলেতে ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, শিবির এক রুম ভাগাভাগি করে থাকত। জহরুল হক হল ছাত্রলীগের ঘাঁটি এ সত্য মেনে নিয়েই সানন্দে রাজনীতি করেছে ছাত্রদল। নব্বইয়ের পর ছাত্ররাজনীতির যে পরিবর্তনকে শুভ পথে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল, অন্তত ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগে সংসদীয় পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তনের প্রক্রিয়া বিবেচনা করে হলেও, তা কিন্তু ঘটল না। আওয়ামী লীগের সর্বনাশা, দেশবিনাশী রাজনীতি তা হতে দিলো না। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের হাতে দেশের বড় শক্তি সৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মৃত্যু তথা নৈতিকতা বিকিয়ে টাকার জন্য হন্যে হয়ে ওঠার বিষম প্রতিযোগিতা এবং ছাত্রদের রাজনীতি, ঐতিহ্য এবং মাটি-মানুষ বর্জিত একধরনের নিরেট ক্যারিয়ারমুখী করে তোলার প্রক্রিয়া সমাজকেই অসুস্থ করে তুলেছে।

আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ভিন্ন মতের ছাত্র থাকতে পারেন না। শিক্ষকেরা চলেন-ফেরেন তাল মিলিয়ে নতুবা নীরব আত্মসমর্পণে। ছাত্রভর্তি, শিক্ষক নিয়োগসহ সর্বত্র বেশরম দলীয়করণ। ছাত্রলীগের জোরে ভিসিরা অসম্ভব ক্ষমতাবান। সে দিন বেশি দূরে নয়, সত্য জানান দেবে কত ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট অথবা উচ্চতম মেধাবীদের ভার্সিটিতে চাকরি দেয়া হয়নি অথবা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় অযোগ্য করা হয়েছে। তারা ছাত্রলীগ করেনিন, এটাই তাদের অযোগ্যতা।

খুব ভরসা দিয়ে বলতে পারি, এ অবস্থার অবসান হবেই এবং ছাত্রদল এই দুঃশাসন বিদায় করার সফল অগ্রসৈনিক হবেই। কিভাবে? ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব এখন ডাবল ডোজে উদ্দীপ্ত। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যাচাই-বাছাই করেই ছাত্রদের নিয়ে নতুন কমিটি করেছেন এবং প্রকাশ্য বিদ্রোহ, যাতে সরকারের চুলকানি স্পষ্ট সত্ত্বেও তিনি নতুন কমিটিকে বাদ দেননি। এ জন্য নতুন নেতৃত্বের দায়িত্ব অনেক। তাদের বড় প্রাপ্তি হলো, তাদের প্রতি দেশনেত্রী বেগম জিয়া এবং ভবিষ্যতের দেশনায়ক তারেক রহমানের সরাসরি আশীর্বাদ রয়েছে। আর শহীদ জিয়ার সেই জিয়নমন্ত্র ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ হচ্ছে এক সার্বক্ষণিক প্রেরণা। ছাত্রদল এ মুহূর্তে কয়েকটি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে এগোতে পারে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোতে যুদ্ধ করে ঢুকে কয়েকটি মিছিল করলে সরকারের পতন হবে না; বরং তারা বন্দী হয়ে পড়বে পুলিশ ও ছাত্রলীগের হাতে। বরং সরকারকে পতনের খাদে নিয়ে যেতে যেসব সংবেদনশীল ক্ষেত্রকে নাড়া দেয়া প্রয়োজন এবং যেসবে ত্বরিত ফল পাওয়া যাবে, সেগুলো নিয়েই ভাবা উচিত।

আজ বহু ছাত্র এই সংগঠনে আসতে চান। ছাত্রদলে পদ পাওয়ার প্রতিযোগিতা যেন ভালো সরকারি চাকরি প্রাপ্তির লড়াইয়ের চেয়েও তীব্রতম। নতুন সদস্য বাড়াতে হবে এবং সোস্যাল মিডিয়াকে ব্যাপকভাবে কাজ করতে হবে। বহু মেধাবী ছাত্র আছেন, যারা পদ চান না, অথচ দেশসেবা করতে চান, তাদের নিয়ে একটা উদ্যোগ জরুরি। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ-স্বপ্ন’ সে তাদেরই স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আমাদের সবার বাংলাদেশ হবে এ কথাটি বোঝাতে হবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যতœবান নজর দিতে হবে। সরকারের অত্যাচার, পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস বিকৃতি, ভিসিদের দুর্নীতি-অনিয়ম অনুসন্ধান করে প্রকাশনায় যেতে হবে। ডকুমেন্টেশন খুবই জরুরি। মিডিয়ার অপপ্রচারে কান দেয়ার প্রয়োজন নেই। বরং গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি, তাদেরকে তথ্য প্রদানের জন্য সার্বক্ষণিক উদ্যোগের ব্যবস্থা করা জরুরি। এক, দুই, তিন করে আমি পরামর্শের তালিকা দিতে পারব না, সমীচীনও হবে না। এটুকু বলতে পারি সর্বোপরি প্রয়োজন বুকভরা সাহস। সাহস দেখাতে পারলেই স্বৈরাচারের প্রথম পরাজয় ঘটে যাবে। হাসিনা সরকার মুখে যত সবল, ভেতরে ভেতরে ভীষণ অস্থির, দুর্বল,আতঙ্কগ্রস্ত। একটি স্ফুলিঙ্গ বা স্পার্ক হলেই সরকার ভেস্তে যাবে।

শহীদি চেতনায় রাজপথ কাঁপাতে পারলে কাজ হয়ে যাবে। মিছিলের সামনে দেশনেত্রী থাকবেন বলে তো ঘোষণাই দিয়েছেন। এখনই দেশকে বাঁচাতে দলে দলে অকুতোভয়ে রাজপথে নেমে আসতে হবে। একটি জাতির চূড়ান্ত মুক্তির জন্য রক্ত তো লাগতেই পারে। গুমে মরার চেয়ে শহীদি মৃত্যু সর্বকালেই বিজয় সুনিশ্চিত করেছে।

You Might Also Like