‘বাংলাদেশে দুই রানির লড়াইয়ে মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে’

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তি ৫ জানুয়ারি ঘিরে বাংলাদেশে ফিরে এসেছে সংঘাত ও নৈরাজ্য। আর এর মাধ্যমে দেশটিতে শুরু হয়েছে দুই রানির (শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া) লড়াই । আর এই লড়াইয়ে মূল্য দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ জনগণকে।
১০ জানুয়ারি ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাময়িকী দি ইকোনমিস্টে ‘ড্রামা কুইনস’ বা রানিদের নাটক শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে। এখানে তা হুবুহু তুলে ধরা হলো-
বাংলাদেশে যে সহিংসতা চলছে, তা বছরজুড়ে রাজনীতিতে অব্যাহত থাকবে বলে মনে হচ্ছে। ৫ জানুয়ারি ফের ঢাকার রাজপথে দেখা মিলেছে বালুভর্তি বর্ণিল ট্রাক। এ দিনটি ছিল মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তি। ওই নির্বাচন দেশটির প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বয়কট করায় ফের বিজয়ী হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এক বছর আগে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়াকে ঢাকায় তার বাসভবনে ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। এবারও পুলিশি সহায়তায় ট্রাক দিয়ে তাকে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে বেশ কয়েক দিন ধরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এটা করা হচ্ছে তার নিরাপত্তার জন্য।
এ ছাড়া দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বিএনপির অন্য নেতাদের বেশির ভাগই আত্মগোপনে রয়েছেন। দলটির প্রধান কার্যালয় তালাবদ্ধ করতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। লন্ডনে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে থাকা খালেদা জিয়ার ছেলে ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য প্রকাশের পর পর্নোগ্রাফির অভিযোগে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের মালিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বিএনপি বা খালেদা জিয়ার অনুগত নন, এমন একজন সিনিয়র সাংবাদিক ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম বিরোধীদের ওপর নির্মম দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বিরোধীদের ওপর এমন দমন-পীড়ন কর্মকাণ্ড চালানোর পর বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দাবি করা উপহাসমাত্র বলে মনে করেন তিনি।
নিজের দলের নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করতে ও দেশের অন্য এলাকাতে অস্তিত্ব জানান দিতে নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’হিসেবে পালনের পরিকল্পনা নিয়েছিল দুর্বল বিএনপি।
আওয়ামী লীগ ও এর নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়েছিলেন অন্য পরিকল্পনা। তারা আগেভাগেই দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ করেছিল, সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছিল এবং একই সঙ্গে তারা ওই দিনটিকে ‘সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা দিবস’হিসেবে পালন করে। যদিও ওই নির্বাচন ছিল প্রহসনমূলক, এটা শুধু বিএনপি বর্জন করেছিল বলেই নয়। নির্বাচনের দিন অতিক্রম না হওয়া পর্যন্ত দেশটির প্রাক্তন স্বৈরশাসক ও তৃতীয় বৃহত্তম দলের নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে আটকে রাখা হয়েছিল একটি সেনা হাসপাতালে এবং চতুর্থ বৃহত্তম দলটিকে তাদের ইসলামি গঠনতন্ত্রের জন্য নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।
সব সময়ের মতো, ঢাকার ড্রামাপ্রবণ সংঘাতের রাজনীতির মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে গ্রামীণ জনগণকে। নাটোরে বিএনপির দুই কর্মীকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা গুলি করে হত্যার পর বিএনপি অনির্দিষ্টকালের পরিবহণ ধর্মঘট আহ্বান করে। এ পর্যন্ত এবার দেশজুড়ে সহিংসতায় নিহত হয়েছেন সাতজন এবং আহত হয়েছেন কয়েক শ মানুষ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফেরেন। কিন্তু জনগণের সেই ম্যান্ডেট তিনি ব্যবহার করেছেন বিরোধীদের প্রতিহত করতে। নিজের সুবিধা হয় এমনভাবে সংবিধান সংশোধন করেছেন এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছেন- ঠিক তার আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ক্ষমতায় থাকতে যেমনটা করেছিলেন খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগ অর্থনৈতিক যে দক্ষতার দাবি করে, তা অপ্রাসঙ্গিক হতে শুরু করেছে। খালেদা জিয়ার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া ও তাকে খেয়াল-খুশি মতো অবমাননার কারণে দেশটির নিরপেক্ষ ভোটাররা তার দিকেই ঝুঁকছেন। এরশাদের জাতীয় পার্টি, যারা সংসদে বিরোধী দল, তারা মন্ত্রিপরিষদ থেকে দলের সদস্যদের সরিয়ে আনার কথা বলেছে।
২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিকে ধ্বংস করে দিতে দৃশ্যত প্রধানমন্ত্রী বদ্ধপরিকর। তার সরকার আদালত, নিরাপত্তা বিভাগ ও মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আগামী চারটি বছর যাতে ক্ষমতায় থাকতে পারে, সে জন্য তারা কোনো সমঝোতায় আগ্রহী নয়। তাই এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য বিএনপি একমাত্র সেনাবাহিনীর দিকে তাকিয়ে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সেনাবাহিনী রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে লোভনীয় সুযোগ পেয়ে ও ব্যবসা করে বেশ সন্তুষ্ট।
গত সপ্তাহে আরেকটি সহিংসতার সূচনা হলো। শোনা যাচ্ছে, খালেদা জিয়াকে সম্ভবত রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। তিনি ইতিমধ্যে দুর্নীতির অভিযোগে বিচারের সম্মুখীন। যদি এতে তিনি অভিযুক্ত হন তাহলে তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের পক্ষাবলম্বন করে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিএনপি-জমায়াতের বেশ কয়েকজন নেতাকে শাস্তি হিসেবে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে দেশটির স্থিতিশীলতা আরো হুমকিতে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অন্য কোনো দেশ প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। বিএনপির ওপর দমন-পীড়ন বেড়ে যাওয়ায় অনানুষ্ঠানিকভাবে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে চীন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের ওপর প্রকাশ্যে চাপ সৃষ্টি করা বন্ধ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় ক্রেতা জার্মানি। এই মুহূর্তে ঢাকায় তাদের রাষ্ট্রদূতও নেই। ভারতের নতুন সরকার এখনো শেখ হাসিনার ওপর থেকে তাদের সমর্থন হ্রাস করেছে বলে মনে হয়নি। তাই তিনি সমঝোতার জন্য কমই চাপে আছেন। তাই এ সপ্তাহের সহিংসতা আগামী দিনে আরো বেশি প্রভাব ফেলবে। বালুর ট্রাক ও তালাওয়ালারা হয়তো আরো ব্যস্ত হয়ে উঠবে।

You Might Also Like