গণতন্ত্রের কফিনের ওপর এ কেমন উদ্দাম নৃত্য

চলমান আন্দোলন ও রাজনীতির ধরন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকতেই পারে। কিন্তু এর যে একটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতি আছে, তাতে কারো কোনো ভিন্নমত থাকার কথা নয়। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। সমাধানও হয়তো হঠাৎ করে হয়ে যাবে না। তবে এর সমাধান হতেই হবে। এবং তা হতে হবে জনগণের গণতান্ত্রিক আকাক্সার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েই। এক-এগারো সরকার রাজনীতিবিদদের অসম্মান করেছিল বলেই আমরা ফুঁসে উঠেছিলাম। গ্রেফতার রাজনীতিবিদদের জন্য ডালভাত। কিন্তু এভাবে ভিন্নমতের সব রাজনীতিবিদের প্রতি অসম্মান এ জাতি কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। আইয়ুব-ইয়াহিয়ারা হার মেনে যাচ্ছেন এ সময়ের শাসকদের কাছে। তাই বলছিÑ গণতন্ত্রের কফিনের ওপর এমন উদ্দাম নৃত্য বেশি দিন চলা সম্ভব নয়। তাতে দেশ শুধু ক্ষতিগ্রস্তই হবে না, এমন কোনো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে; তাতে সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট নো রিটার্ন পয়েন্টে পৌঁছে গেছে। বলা যায়, পৌঁছে যেতে উসকানির পর উসকানি দেয়া হয়েছে। এখন তাদের পিঠ দেয়ালে। সামনে রাষ্ট্রীয় শক্তি অপব্যবহারের বিভীষিকাময় ও অনভিপ্রেত চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক শক্তি সাধারণত পরাভব মেনে নেয় না। ফলে সঙ্ঘাত আরো বাড়বে। এক সময় অস্তিত্ববিনাশী পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে তাদের মরণ কামড় হানতে হবে। সেটা হবে রক্তাক্ত পরিণতি, হয়তো বা গণতন্ত্রের অকস্মাৎ মৃত্যু কিংবা সংবিধানের আত্মাহুতির মতো কিছু।

সরকার অনেকটা দুরভিসন্ধির আশ্রয় নিয়ে সর্বজন গ্রহণযোগ্য তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা উপড়ে ফেলে এই অগ্নিগর্ভা পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। এই ভয়াবহ সঙ্কট তারাই ডেকে এনেছে। এখন সরকার শুধু মই সরিয়ে অসঙ্গত আস্ফালন দেখাচ্ছে নাÑ নিজেদের অজান্তে আত্মহননের পথও প্রশস্ত করে চলেছে। সমঝোতা, সংলাপ ও আলোচনার শেষ সুযোগ নষ্ট হয়ে গেলে সরকারি দলকেও নো রিটার্নের পথে হেঁটে গিয়ে অনিশ্চয়তার পথ প্রস্তুত করে দিতে হবে। সেটা হবে আরেক অনাকাক্সিত পরিণতি।

রাজনীতির ক্ষেত্রে সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়ের চেয়েও খেসারতের পাল্লা ভারী করে দেয়। সরকারি দলের নৈতিক অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। নিজস্ব শক্তি অত্যন্ত ভঙ্গুর। রাষ্ট্রশক্তির পাটাতন সরে গেলে তাদের পরিণতি সম্পর্কেও কোনো আশাবাদ জেগে থাকবে না। তখন কী হবে, সেটা আন্দাজ করাও কঠিন। বেগম খালেদা জিয়া ক’দিন আগে সংবাদ সম্মেলন করে তার আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করতে চেয়েছেন। নিরপেক্ষ সাজার ভান করে বেগম খালেদা জিয়ারও দশটা ভুল চিহ্নিত করে কথা বলা সহজ। কিন্তু তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব ভিত্তিহীন এবং নৈতিক বিবেচনায় তার রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনের সিদ্ধান্ত শতভাগ ভুল, তা বলা সহজ নয়।

শেখ হাসিনা ৫ জানুয়ারির ভাষণে সত্যনিষ্ঠ থাকার ও গণতান্ত্রিক ভেদ-বুদ্ধিজাত নেত্রী হওয়ার সুযোগ নিতে পারতেন। নিজের অবস্থানের বস্তুনিষ্ঠতা তুলে ধরতে পারতেন। একটি নিরাপদ অবতরণের সিঁড়ি বানাতে পারতেন। তিনি কিছুই করেননি, বরং রক্তমঞ্চে দাঁড়িয়ে ফুলের হাসি দিয়ে জাতির সামনে অনাকাক্সিতভাবে উপস্থাপিত হলেন। খালেদা জিয়াকে নছিহত করা কিংবা পরামর্শ দেয়ার আগে তিনি চার পাশে তাকাতে পারতেন। উন্নয়নের মহাসড়কের অলীক ও স্বপ্নিল বক্তব্য উপস্থাপন না করে সোজাসাপটা গণতন্ত্রের মহাসড়ক দেখিয়ে দিতে পারতেন। তাতে ফের অবরুদ্ধ জাতি ভরসা পেত, স্বস্তি পেত। সমাধানের একটা কাক্সিত পথ বেরোত।

তিনি নিজেও জানেন, জনগণের আন্দোলন মিথ্যার বেসাতি করে সাময়িক বাঁক ঘুরানো যায়, একেবারে কক্ষচ্যুত করা যায় না। অসত্য তথ্য দিয়ে নিজের তুষ্টি মেলে, জনগণের বিশ্বাস মেলে না। রাজপথকে দুমড়ে-মুচড়ে হোঁচট খাইয়ে দেয়া যায়, লক্ষ্যচ্যুত করা যায় না। এখন তার শান্তির ললিত বাণী জলকামান, মরিচের গুঁড়া, বালুর ট্রাক, পুলিশি অত্যাচার, হামলা-মামলার ভেতর বসে পিশাচের হাসি হাসছে। তালা ঝুলছে বিবেকের দরজায়। গণতন্ত্রের আর্তনাদ এখন পুলিশি বন্দুকের বাঁট ও ব্যারেলের ডগায়। গুলিতে ও বিষাক্ত ছোবলে ঝাঁজরা হয়ে যাচ্ছে আবহমান বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ভোটের অধিকার।

কেউ কেউ মনে করেন, সব অধিকার কেড়ে নেয়ার পর সরকারের হাতে আছে শেষ অস্ত্র, দেশকে জরুরি অবস্থার দিকে ঠেলে দেয়া। ভুলে গেলে চলবে না, কুইনিন জ্বর সারাবে কিন্তু কুইনিন সারানোর কেউ থাকবে না। জরুরি অবস্থা বলবৎ করার জন্য যাদের ডাকতে হবে তাদের আম্পায়ার বানিয়ে মরণ খেলা সাঙ্গ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। কারণ, শান্তির পথে যারা আহ্বান জানায় তারা কোনো দিন খুনরাঙা পথ রচনা করতে চায় না। এক দিকে জুলুম, নিপীড়ন ও নির্যাতনের নির্দেশ দেয়া হবেÑ আবার শান্তির পথ রচনা না করে সে পথে আহ্বান বড়মাপের কপটতা।

জনগণ যা দেখে তা থেকেই উপসংহার টানে। নিজেদের করণীয় নির্ধারণ করে। কারো ভাষণ শুনে জনগণ সিদ্ধান্ত নেয় না। শাসকেরা যতটা ভাবে জনগণ ততটা বোকা নয়। শাসকেরা ক্ষমতার মসনদ থেকে কিংবা মগডালে বসে জনগণকে পোকামাকড়ের মতো দেখতে পারেন। আসলে জনগণই শক্তি। তারা রোজ সকালে একবার করে শক্তি প্রদর্শন করে না। গণতন্ত্রের পথে পাঁচ বছরে একবার শক্তি প্রদর্শন করে। সেই পথ আগলে দাঁড়ালে প্রথম সুযোগেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়। গেল বছর ৫ জানুয়ারি জনগণ ভোট দেয়নি। ভোট দিতে না পারার দুঃখবোধ এখন ক্ষোভের আগুনে রূপান্তরিত হচ্ছে। জনগণের ক্ষোভের আগুন নেভাতে পারে শুধুই ভোটের অধিকার ফেরত দেয়ার মাধ্যমে। দেশের তাবৎ বুদ্ধিজীবী, সুশীলসমাজ ও বিশিষ্ট নাগরিকেরা কোনো উদ্যোগী ভূমিকায় না এলে আগামী দিনের পরিস্থিতি কারা নিয়ন্ত্রণ করবেÑ সেটা আলেমুল গায়েব ছাড়া কেউ জানেন না। যদিও একটি চেনাপথের অভিজ্ঞতা জনগণের সামনে রয়েছে। সবাই আশঙ্কা করছেন, আন্দোলন সেই ঘাটে নোঙর করবে।

সরকার প্রতিপক্ষের জন্য কোনো জায়গা বা স্পেস রাখেনি। তাই জায়গা করে নেয়ার তাড়না একটি গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিত সৃষ্টি করতে যাচ্ছে কি নাÑ সবাইকে সেটা ভেবে দেখতে হবে। এখন পর্যন্ত সবার জন্য সম্মানজনক ও নিরাপদ সমাধান রাজনৈতিক সমঝোতা। সংলাপের পথ ধরে সেটা অর্জন করা এখনো সবার আয়ত্তের মধ্যেই রয়েছে।

You Might Also Like