ইতিহাসের পাঠ কেউ নেয় না

হায়দার আকবর খান রনো

শাসক দল আওয়ামী লীগ ৫ জানুয়ারি গণতন্ত্র বিজয় দিবস হিসেবে পালন করবে। ২০১৪ সালের ওই দিন এক প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও তার জোট দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসে। এমন নির্বাচন আমাদের ইতিহাসে আর কখনো হয়নি। এমনকি এরশাদ আমলেও নয়। নির্বাচনের আগেই ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতাসীনরা নির্বাচিত হয়েছিলেন। ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনে পাঁচ কি দশ শতাংশের বেশি ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাননি। তবু শাসক দলের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন বলল, ৪০ শতাংশ ভোটার নাকি ভোট দিয়েছেন। আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন শাসক দলের পক্ষ হয়ে এরশাদকে নিয়ে যে খেলা খেলেছিল, তাতে আর যাই হোক, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা বলে কিছুই ছিল না। এরশাদ ও তার দলের লোকেরা প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করলেও নির্বাচন কমিশন তা মানল না। সে এক হাসির নাটক হয়েছিল এরশাদকে নিয়ে। কিন্তু হাসব না আমরা। বরং নির্বাচন কমিশন যতই জোকারের ভূমিকা পালন করুক না কেন, নির্বাচন ও গণতন্ত্রের সর্বনাশ হয়ে গিয়েছিল তখনই। তাই দেখি, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. শামসুল হুদা বর্তমানের নির্বাচন কমিশনারের যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উত্থাপন করছেন। তিনি আরও বলেছেন, দেশে বর্তমানে নির্বাচিত অটোক্রেসি চলছে।

পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে বিরোধী দল থাকতে হয়। এখনো আছে, তবে এক অদ্ভুত ধরনের বিরোধী দল। এরশাদ ও জাতীয় পার্টি। তারা সরকারেও আছেন, আবার বিরোধী দলের নাম ব্যবহার করছেন। বিরোধী দল হলেও তারা মন্ত্রীও হন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতও হন। এমন আজব কাণ্ড পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে নেই। বস্তুত বাংলাদেশে গণতন্ত্র আগেও খুব একটা ছিল না। আর এখন তো বিশেষ করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর গণতন্ত্রের সামান্য যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও নির্বাসিত। যখন শাসক দল আওয়ামী লীগ ৫ জানুয়ারিকে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস ঘোষণা করছে, তখন বিশিষ্ট সাংবাদিক একটি অনলাইন পত্রিকার (আমাদের বুধবার) সম্পাদক আমীর খসরু যথার্থই প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, ‘তাহলে গণতন্ত্রের বিদায় দিবস কোনটি’ তার লেখা থেকে কয়টা বাক্য উদ্ধৃত করা যাক। তিনি বলেছেন ‘… আওয়ামী লীগ ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন এবং অপ-নজির সৃষ্টিকারী ওই নির্বাচনের দিনকে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস হিসেবে পালন করবে বলে কর্মসূচি দিয়েছে। মানবাধিকার, নানাবিধ জনআকাঙ্ক্ষা এবং সর্বোপরি গণতন্ত্র আজ নির্বাসনে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে সামান্য সুযোগটুকু দেশবাসীর ছিল তাকেও যে দিনটিতে বিদায় জানানো হয়েছে সেদিনই পালিত হবে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস। তাহলে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক- গণতন্ত্রের বিদায় দিবস কোনটি?’

নির্বাচনের প্রহসন করে যে সরকার ক্ষমতায় বসেছে, তারা এক বছরেও গণতান্ত্রিক আচরণ করতে পারেনি। আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি এক বছর কোনো কার্যকর আন্দোলন করতে পারেনি। ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, নেতা, উপনেতারা বেশ মজা করে বলছেন, ওদের মুরোদ নেই আন্দোলন করার। হয়তো তাই। কারণ আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিও কোনো গণতান্ত্রিক শক্তি নয়। জনগণের আস্থা-ভরসা তাদের ওপরও নেই। কারণ তাদের রাজত্বকালও জনগণ দেখে এসেছে। আওয়ামী লীগের মতো তারাও ধনিক শ্রেণির দল।

কিন্তু বিএনপি ব্যর্থ হচ্ছে বলেই যে আওয়ামী লীগ জিতে গেল এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। বেশ, মানলাম বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে আন্দোলন গড়ে তুলতে। কিন্তু বিএনপিকে জনসভা করতে দেওয়া হয় না কেন? এমনকি ঘরের মধ্যেও সভা করতে দেওয়া হয় না। তাহলে কী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও কর্তাব্যক্তিরা বিএনপিকে উসকাচ্ছেন আইনভঙ্গ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে? সেটাকেই কী তারা আন্দোলনের একমাত্র পথ বলে মনে করেন? শান্তিপূর্ণ আইনসিদ্ধ আন্দোলনের পথ তো শাসক দলই রুদ্ধ করে রেখেছে। তারপর আবার বলছে, আন্দোলনের মুরোদ নেই। সাম্প্রতিক দুটি ঘটনার কথাই ধরা যাক। বিএনপি গাজীপুরে জনসভা করবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল। অমনি ছাত্রলীগও সেখানে প্রতিহত করার কর্মসূচি দিয়ে বসল। প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করল। এর নামই কী গণতন্ত্র? বিএনপি যদি বলত, আমরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করব, তাহলে হয়তো সংঘর্ষ ও রক্তক্ষরণ হতো। তবে লীগ সরকারের মন্ত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী সেটাই বোধহয় আন্দোলন হতো।

ঠিক প্রায় একই সময় ঢাকায় বকশীবাজারে আরেকটি ঘটনা ঘটে গেল। এক মামলায় খালেদা জিয়া বিশেষ আদালতে যাচ্ছেন। খুবই স্বাভাবিক, নেত্রীর সঙ্গে যাবেন তাদের দলের লোকজন। কিন্তু ছাত্রলীগ সেখানে কেন? শুধু কি তাই? ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা যে অস্ত্র ব্যবহার করেছে তাও পত্রিকার পাতায় ছবিসহ ছাপা হয়েছে। এরপরও কি বলব দেশে গণতন্ত্র আছে?

ছাত্রলীগের যে ছেলের হাতে পিস্তলসহ অ্যাকশনের ছবি ছাপা হয়েছে সেই ছেলের নাম ও পরিচয় বিভিন্ন কাগজে দেওয়া হয়েছে। তবু পুলিশ তাদের পক্ষেই ছিল। আর মামলা হয়েছে আক্রমণের শিকার বিএনপির লোকদের বিরুদ্ধে। ২৪ ডিসেম্বর বুধবার যে সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটেছিল তার ওপর ২৬ ডিসেম্বর কালের কণ্ঠে যে প্রতিবেদনটি শেষ পাতায় … ছাপা হয় (যার শিরোনাম ছিল ‘ওরা সবাই ছাত্রলীগ’।) সেখান থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করা যাক।

‘… প্রকাশ্য রাস্তায় দিনদুপুরে শত শত মানুষের সামনে প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী সশস্ত্র মহড়ায় অংশ নেওয়া যুবকরা বকশীবাজার, পলাশীসহ আশপাশের এলাকার মানুষের কাছে পরিচিত মুখ। আর পুলিশের অনেক কর্মকর্তার সঙ্গেও রয়েছে তাদের সদ্ভাব। … বুধবারের ঘটনায় অস্ত্র হাতে যে যুবকের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তিনি ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগ নেতা। তার আশপাশে অবস্থান নেওয়া যুবকরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সক্রিয় নেতা-কর্মী। এর বাইরেও যেসব অস্ত্রধারী ক্যামেরার লেখ এড়িয়ে থাকতে পেরেছে অথচ তাদের সদম্ভ উপস্থিতি নজর কেড়েছে অনেকের, তাদের বেশির ভাগই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজের পদধারী ছাত্রলীগ নেতা। আর লাঠি হাতে বেদম পেটানো ও রাস্তায় প্রতিপক্ষকে ফেলে পা দিয়ে মাড়ানোর কাজে নেতৃত্বদানকারীরাও ছাত্রলীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মী। অথচ সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয়েছে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের। সেখানে যুবলীগ, ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট কারও নাম নেই। আর প্রকাশিত ছবি কাদের তা পুলিশ কর্মকর্তারাও জানেন না বলে দাবি করেছেন।

এরকম ঘটনা নতুন কিছু নয়। যে ছাত্রলীগ এখন টেন্ডারবাজি করে বেড়াচ্ছে এবং বখরার ভাগ নিয়ে নিজেদের মধ্যে অহরহই খুনাখুনি চলছে, সেই ছাত্রলীগ আর পুলিশ র‌্যাব হয়ে উঠেছে ‘গণতান্ত্রিক’ প্রশাসনের মূল ভিত্তি।’ জনসমর্থন না থাকলে এটাই হয়। নির্বাচনকে করা হয়েছে প্রহসন। শুধু কি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন? এরপরের উপজেলা নির্বাচনে কী দেখলাম। পাঁচ পর্বে উপজেলা নির্বাচন হয়েছিল। প্রথম দুই পর্বের ফলাফলে দেখা গেল, শাসক আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হয়েছে। তখনই বোঝা গেল, লীগ সরকারের জনপ্রিয়তা আর নেই। তাই উপজেলা নির্বাচনের তৃতীয় পর্ব থেকে শাসক দল যা করল তা হলো- নির্বাচনী কেন্দ্র দখল করে নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে ব্যালট পেপারে খুশি মতো সিল মারা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের রাতেই সিল মারার কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন সেটাকেই অনুমোদন করেছিল। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার যথার্থই বর্তমান নির্বাচন কমিশনের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অবশ্য শাসক দলের প্রতি আনুগত্যই যদি যোগ্যতার মাপকাঠি হয়, তবে অন্য কথা।

নির্বাচন হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রধানতম প্রতিষ্ঠানের অন্যতম। এ ছাড়াও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যা ছিল তাও চরম দলীয়করণের দ্বারা কলুষিত করা হয়েছে। প্রশাসন ও পুলিশ ব্যবস্থা যে আর নিরপেক্ষ নেই, তার প্রমাণ তো ভূরি ভূরি রয়েছে। ২৪ ডিসেম্বরের ঘটনা তো একটা মাত্র উদাহরণ। বিশ্বজিৎকে যখন ছাত্রলীগের কর্মীরা খুন করেছিল তখন কাছেই ছিল পুলিশ বাহিনী। তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেখানে যে পুলিশ কর্মকর্তা অবস্থান করছিলেন, তাকে পরে সরকার বিশেষ পদকে ভূষিত করেছিল। একই পুলিশ অফিসার বিএনপির নেতা ও তদানীন্তন সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদিন ফারুককে প্রকাশ্য রাস্তায় বর্বরের মতো পিটিয়েছিলেন। তদানীন্তন লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছেন, এই বর্বরোচিতভাবে বিএনপি নেতাকে প্রহার করার জন্যই পুলিশ অফিসারকে পদক দেওয়া হয়েছিল। বস্তুত দেশটি এখন পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। পুলিশ-র‌্যাবের যা ইচ্ছে তাই করার স্বাধীনতা রয়েছে। অথচ কথা বলার স্বাধীনতা নেই জনসাধারণের। দুই মাস বেতন না পাওয়া গার্মেন্ট শ্রমিকরা যখন তাদের পাওনা বেতনের দাবিতে অনশন ধর্মঘট করেন তখন সরকারের পেটোয়া বাহিনী তাদের ওপর চড়াও হয়, পুলিশ অনশনরত শ্রমিক ও শ্রমিক নেত্রীদের ওপর বিষাক্ত গ্যাস নিক্ষেপ করে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের লাশ ভেসে না উঠলে র‌্যাবের সদস্যরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকত। গুম, খুন, সন্ত্রাস এখন সরকারের টিকে থাকার অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগেও যে গণতন্ত্র খুব একটা ছিল এমন দাবি করছি না। বিএনপি আমলও আমাদের দেখা আছে। সেই আমলেও ক্লিনহার্ট অপারেশনের নামে নিরীহ মানুষের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। অনেকে পঙ্গু হয়েছেন। নিহতও হয়েছেন অনেকে। অথচ নির্যাতনকারী হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল পার্লামেন্টে আইন করে। সে জন্যই তো বিএনপি যখন গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন করতে চায়, তখন তেমন সমর্থন আসে না। সে জন্যই লীগ সরকারের মন্ত্রীরাও বলার সুযোগ পাচ্ছেন, আন্দোলনের মুরোদ তাদের নেই।

কিন্তু প্রশ্ন সেটা নয়। র‌্যাব, পুলিশ ও ছাত্রলীগ বাহিনী দ্বারা মত প্রকাশের এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সব পথ রুদ্ধ করে শুধু কি বিএনপিকে ঠেকানো হচ্ছে? গণতন্ত্রকেই তো নির্বাসনে পাঠানো হচ্ছে। এতে বিএনপিকেই প্রতিহত করা হচ্ছে না, শাসক দল নিজেদেরও ভবিষ্যৎকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলছে। যে বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ঐতিহ্য অনেক পুরনো, সেই জনগণকে কিছু দিন ভয়ভীতি, সন্ত্রাস দ্বারা দমিয়ে রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘদিন তা চলবে না। দুর্ভাগ্য! ইতিহাসের পাঠ কেউ নেয় না। বিশেষ করে ক্ষমতার দম্ভে যখন অন্ধ হয়ে থাকেন।

লেখক : রাজনীতিক

You Might Also Like