রাজনীতিকেই গ্রেফতার

গত বছর ৫ জানুয়ারির দেশ-বিদেশে চরম বিতর্কিত ও আলোচিত এক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসা বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দেশের রাজনীতিকে গৃহবন্দী করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার মরণপণ করে বসেছে। এবার ৫ জানুয়ারিকে তারা গণতন্ত্রের বিজয়ের দিন হিসেবে আখ্যায়িত করে পুলিশি পাহারায় আনন্দ-উল্লাস করে এ দিনটি উদযাপন করেছে। অথচ দলান্ধদের বাদ দিলে দেশী-বিদেশী মহল ও বিবেকী মানুষের কাছে গত বছর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল কার্যত গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার মতো এক কলঙ্কজনক প্রয়াস। কারণ, এ নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না। ১৫৩টি আসনেই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। বাকি আসনগুলো ছিল সরকারের মিত্র দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে ভাগাভাগি করে নেয়ার। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও এ ধরনের প্রতিফলন ছিল। নির্বাচন কমিশনের ভুতুড়ে হিসাবে সে নির্বাচনে ৪০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির কথা বলা হলেও কোনো নিরপেক্ষ সূত্রই বলেনি যে, ১০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। বিদেশীরা এ নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য বলেননি। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। এ নির্বাচনের পর সব দলের সাথে সমঝোতা করে সবার অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন দেয়া হবে। কিন্তু সরকার নির্বাচনের পরপরই সে অবস্থান থেকে সরে দাঁড়িয়ে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার দৃঢ়প্রত্যয় ঘোষণা করে। এর আগে কোনো সংলাপ নয়, নির্বাচনও নয়। বেগম জিয়া নির্বাচনী ট্রেন ফেল করেছেন। অতএব, তাকে পাঁচ বছর পর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নেতারা ও অন্যান্য বামপন্থী নেতারা একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের উপায় অবলম্বনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে সরকারবিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়ার উপায় অবলম্বন করে।

এমনই প্রেক্ষাপটে আসে এ বছরের ৫ জানুয়ারি। সরকারবিরোধী ২০ দলীয় জোট এ দিনটিকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করে ঢাকায় সমাবেশের অনুমতি প্রার্থনা করে। সরকার অনুমোদন না দিয়ে বেগম জিয়াকে এর আগের দিন থেকেই তার গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। ৪ জানুয়ারি থেকেই ঢাকার সাথে সব ধরনের যোগাযোগ পরিবহন বন্ধ করে দেয়া হয়। সাথে চলে সারা দেশে ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার। একই সাথে চলে মামলা-হামলা। ৫ জানুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম জাতীয় প্রেস কাবে পেশাজীবীদের এক অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে গেলে প্রেস কাবের চার পাশে পুলিশ মোতায়েন করে কার্যত তাকে ঘিরে রাখা হয়। পরদিন এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার পর মির্জা ফখরুল প্রেস কাব থেকে বেরিয়ে এলে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হানিফ বলেন, তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় গ্রেফতার করা হয়েছে।

আসলে মির্জা ফখরুলসহ অন্য নেতাকর্মীদের এভাবে এলোপাতাড়ি গ্রেফতার ও যখন-তখন মামলা দায়ের কার্যত রাজনীতিকেই যেন গ্রেফতার করার প্রয়াস। এ ধরনের প্রয়াস গণতন্ত্রের সাথে সমান্তরালভাবে চলতে পারে না। আমরা মনে করি, এ ধরনের সরকারি মনোভাব দেশে একটি কঠিন ও জটিল রাজনৈতিক সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো, সরকার জেনে-বুঝেই তা করছে। সরকার সমর্থকেরা এখন মানুষকে বার্তা দিতে চাচ্ছেÑ গণতন্ত্র না-ই থাকল, উন্নয়ন হলেই জনগণ সরকারের পক্ষে চলে আসবে। এ যে কত ভয়ানক বিভ্রান্তি, তা বোঝা কারো জন্য অসুবিধা নয়। তাই অবিলম্বে সরকার বর্তমান মনোভাব পরিহার করে সমঝোতার মনোভাব নিয়ে সব দলের সাথে সংলাপের পথে হাঁটবে বলে আমরা আশা করি। আর এর মধ্যেই সব মহলের কল্যাণ নিহিত।

You Might Also Like