সব পথ বন্ধ করবেন না

আলী রীয়াজ

দুই দিন ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে ঢাকায় যে ঘটনাবলি ঘটেছে এবং ঘটছে, তা একেবারে অভূতপূর্ব, এমন বলা যাবে না। নৈতিক বিবেচনায় অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত বলে মন্তব্য করা গেলেও একে অভাবনীয় বলার কোনো সুযোগ নেই। যাঁরা এমন হবে না বলে ভাবছিলেন, তাঁদের পৃথিবী বাস্তবের বাংলাদেশ থেকে দূরে বলেই মনে করতে হবে। এর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল গত ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত তিনটি সংবাদ সম্মেলনেই। বিএনপির নেতা খালেদা জিয়ার সাত দফা প্রস্তাব উপস্থাপনার পরপরই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে চটজলদি তা প্রত্যাখ্যান করা থেকেই এটা বোধগম্য ছিল, বিএনপি যা-ই বলুক না কেন, তাদের কোনো রকম সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না।

এর পাশাপাশি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সংবাদ সম্মেলনে ২০১৪ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতির যে চিত্র আমরা দেখতে পাই, তা কমবেশি সবার জানা থাকলেও পুরো চিত্র একত্রে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, দেশে বিরাজমান ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা’র মূল্য কে দিয়েছেন, কীভাবে দিয়েছেন। এক অর্থে এ ছিল ২০১৫ সালে কী ঘটতে পারে, তার রেখাচিত্র। সেখানে অবশ্যই সরকারবিরোধীদের অধিকার রক্ষা ও প্রয়োগের কোনো নিশ্চয়তা নেই, থাকার কথাও নয়। থাকার কথাও নয় এ কারণে যে এই অবস্থার সূত্রপাত গত কয়েক দিনে হয়নি; এক বছর আগে একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। নির্বাচনের পরপরই প্রথম সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা’র নির্বাচন মানে অচিরেই আবার নির্বাচন নয়। ফলে এখন যা ঘটছে তাকে ‘স্বাভাবিক’ বলেই ধরে নিতে হবে, যদিও তার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি স্বীকার করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

গত এক বছরে এ কথা বহুবার বলা হয়েছে যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের ফলে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাদের এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমতের অবকাশ নেই যে গত এক বছরে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এই ক্ষতির সূচনা হয়েছিল দলটি ক্ষমতায় থাকার সময়েই, কিন্তু তা দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে পরের বছরগুলোতে। আন্দোলনের সহযোগী নির্ধারণ কিংবা কৌশল নির্বাচন—কোনো বিষয়েই বিএনপি এবং তার নেত্রী খালেদা জিয়া প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন বলে কেউ দাবি করতে পারবেন না। বিএনপি গত কয়েক বছরে জনগণের সামনে এমন কোনো কর্মসূচি উপস্থিত করেনি, যাতে করে দল হিসেবে জনসম্পৃক্ততা বাড়বে। খালেদা জিয়ার ঘোষিত সাত দফা প্রস্তাবেও তার কোনো ইঙ্গিত নেই। উপরন্তু, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লন্ডনপ্রবাসী তারেক রহমানের ক্ষেত্রবিশেষে অসময়োচিত, ক্ষেত্রবিশেষে অজ্ঞতাপ্রসূত, কিন্তু সামগ্রিকভাবে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অশোভন কিছু বক্তব্য। শেখ মুজিব প্রসঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যসমূহ এই ধারার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এগুলো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে দলের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে—এই দাবি করতে পারেন কারা, সেটা পাঠকেরা জানেন। এ বিষয়ে বাক্য ব্যয়ের দরকার নেই। এ কথা বলা বাহুল্য, অনুপস্থিত শেখ মুজিবকে নেতৃত্বের আসনে রেখেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল।

Ali reazগত এক বছরে দল হিসেবে বিএনপি তার ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারেনি। সরকারি দলের নেতা-নেত্রীরা বারবার তা মনেও করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু গত দুই দিনে তাঁরা নিজেদের বক্তব্যকেই অসার প্রমাণ করলেন কি না, সেটা ভেবে দেখতে পারেন। যাকে তাঁরা এত দিন ধরে ‘সাংগঠনিকভাবে দুর্বল’ এবং ‘দিগ্‌ভ্রান্ত’ একটি ‘ক্ষুদ্র’ দল বলে বর্ণনা করেছেন, তাকে মোকাবিলা করতে ক্ষমতাসীন দলকে এইভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করতে হলো কেন, সেটা নিশ্চয় ভেবে দেখবেন। নৈতিক শক্তির অভাব সব সময়ই ক্ষমতাসীনদের বল প্রয়োগের ওপরে নির্ভরশীল করে তোলে। একতরফা নির্বাচনের পর থেকে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি জোরদার না হলেও ক্ষমতাসীনেরা বারবারই শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নিয়ে তাঁদের দুর্বল অবস্থানেরই জানান দিচ্ছেন। তাঁদের আচরণের ফলে সাধারণ নাগরিকদের মনে এই ধারণা আরও জোরদার হবে যে, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার ব্যর্থতার কারণেই সরকার ও ক্ষমতাসীন দলকে বড় আকারের ট্রাকের মতো জিনিসের আশ্রয় নিতে হয়েছে।

সরকার-সমর্থকেরা বলবেন যে বিএনপিকে সমাবেশ করতে দিলে অরাজকতা ও নাশকতা হবে—এ বিষয়ে সরকার নিশ্চিত ছিল। সেটা যদি সত্য বলেই ধরে নিই, তাহলে কি এটাই মেনে নিতে হবে যে জনগণকে এই বিষয়ে তাঁরা গত এক বছরেও বোঝাতে পারেননি? জনগণকে সম্পৃক্ত করে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে, এই সত্য আর কারও চেয়ে ক্ষমতাসীনদেরই বোঝার কথা আগে। সেই সত্য জানা-বোঝার পরও ক্ষমতাসীনেরা কেন জনসাধারণকে বোঝাতে পারছেন না যে বিএনপি তাদের জন্য কতটা ক্ষতিকর? বিপরীতক্রমে সরকারি দলের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির বদলে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরে নির্ভর করেই দেশ পরিচালনা করতে হচ্ছে কেন?

প্রাসঙ্গিকভাবে অনেকেই জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির সখ্যের কথা এবং জামায়াতের ভূমিকার কথা বলবেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী বিএনপিকে সমাবেশ করতে দেওয়ার অর্থ জামায়তের কর্মীদের মাঠে নামার সুযোগ তৈরি করা। এ কথার অর্থ এই দাঁড়ায় কি যে বিএনপি ছাড়া জামায়াত তার কার্যক্রম চালাতে পারছে না? যদিও জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি,

কিন্তু তাদের কার্যক্রম পরিচালনা নিষিদ্ধ দলের আকার নিয়েছে। এবং এটাও বলা যেতে পারে যে, জামায়াত বিএনপিকে বাদ দিয়েই তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু জামায়াতের ডাকে যে মানুষ সাড়া দেয় না, সেটা গত কয়েক দফা ব্যর্থ হরতাল থেকেই প্রমাণিত হয়েছে।

সাধারণ মানুষ নিশ্চয় এটা বুঝতে পারেন যে কাদের, কখন প্রত্যাখ্যান করতে হবে। জামায়াতের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামে বিজয়ী হওয়ার পথ দেখানোর কাজ নেতৃত্বের, কিন্তু শেষ বিচারে তা করবেন জনসাধারণ। বিএনপি যদি সেটা না বুঝতে পারে, তবে তার জন্য দল হিসেবে বিএনপিকে মাশুল গুনতে হবে, জনগণকে সেই সুযোগ দিলে তাঁরা যে এই রকম সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করেন না, ইতিহাস সেই সাক্ষ্যই দেয়। একাত্তরের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের যে বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটি সম্ভব হয়েছে জনগণের আকাঙ্ক্ষার কারণেই। জনগণের দেওয়া নির্বাচনী রায়ের কারণেই এর সূচনা সম্ভব হয়েছে; এর পেছনে অনেক দিনের প্রক্রিয়া কাজ করেছে। কোনো দল চাইলেই তা বন্ধ হয়ে যাবে বলার অর্থ হচ্ছে এমন মনে করা যে জনগণের মধ্যে সেই শক্তি গড়ে ওঠেনি, যা দিয়ে একই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা যাবে। কিন্তু জনগণের ওপরে সেই আস্থা রাখার কোনো লক্ষণ নেই, ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের আগে থেকেই তা শুরু হয়েছে, গত এক বছরে তা আরও জোরদার হয়েছে।

আগামী দিনগুলোতে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে। ফলে ২০১৫ সালে আমরা এই ধরনের পরিস্থিতি আরও দেখতে পাব বলেই অনুমান করতে পারি। ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষ যে অবস্থান নিয়েছে, তা দেখে যাঁরা এটা মনে করেন যে এই দফায় এক পক্ষ অন্য পক্ষকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করতে পারবে, আমি তাঁদের সঙ্গে একমত হওয়ার কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। তবে এটা ঠিক যে এই বছরে এই চেষ্টা আরও শক্তিশালী আকার ধারণ করবে। এই বৃত্তচক্র থেকে বেরোনোর যে পথ নেই তা নয়, কিন্তু সে পথে অগ্রসর হতে হলে ক্ষমতাসীনদেরই আগে পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণটা সহজ, তাঁরা এখন ক্ষমতাসীন, তা যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হোক না কেন। সব পথ বন্ধ করে দিলে বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি তৈরি হবে ইংরেজিতে যেটাকে বলে ‘টিন্ডারবক্স’। দেশ সে পথে অগ্রসর হোক, তা নিশ্চয় কারও কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক

সূত্র প্রথম আলো

You Might Also Like