গণতন্ত্রের স্পৃহা মুছে ফেলা যাবে না

রাজা কৃষ্ণচন্দ্র গোপাল ভাঁড়কে বলেছিলেন, সে যদি শীতের সারা রাত প্রাসাদের অদূরের দীঘিতে গলাপানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, তাহলে তিনি তাকে পুরস্কৃত করবেন। গোপাল সারা রাতই গলাপানিতে দাঁড়িয়ে ছিল। সকালে পুরস্কার চাইতে গেলে রাজা জিজ্ঞেস করলেন, সারা রাত কী করেছে সে। গোপাল বলল, সে একদৃষ্টিতে প্রাসাদের একটি বাতির দিকে তাকিয়ে ছিল। রাজা হেসে বললেন, তাহলে তো পুরস্কার সে পাবে না, কেননা প্রাসাদের বাতির আলো তাকে তাপ দিয়েছিল। গোপাল ভাঁড় স্থির করে যে, সে প্রতিশোধ নেবে। রাজাকে সে বনভোজনের নিমন্ত্রণ জানায়।

বনের মধ্যে সুউচ্চ একটা গাছের ডালে ভাতের হাঁড়ি ঝুলিয়ে মাটিতে সে ছোট একটা অগ্নিকুণ্ড রেখেছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, কিন্তু ভাত আর আসে না। শেষে বিরক্ত রাজা গোপাল ভাঁড়কে বললেন, মাটিতে রাখা আগুনের তাপ কী করে এত উঁচুতে ভাতের হাঁড়িতে লাগবে? গোপাল জবাব দিয়েছিল, যেভাবে প্রাসাদের বাতির আলো এত দূরের দীঘিতে তাকে উত্তাপ দিয়েছিল। রাজা বুঝলেন, বুদ্ধির খেলায় তিনি হেরে গেছেন। গোপালকে পুরস্কৃত করতে এরপর তিনি আর আপত্তি করেননি।

গোপাল ভাঁড়ের দিনের মতো রসবোধ আর সুবিচার আজকের বাংলাদেশে নেই। কিন্তু একতরফা রিমোট কন্ট্রোলের খেলা আজকের বাংলাদেশের মসনদে আসীনরাও খেলছেন। অভিযোগ এসেছে, বখশিবাজারে আলিয়া মাদরাসা এলাকায় খালেদা জিয়াকে হত্যার জন্য হামলা চালাল ছাত্রলীগ আর আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা। মিডিয়ায় অস্ত্রধারীদের স্পষ্ট ছবি দেখেছি। এদের শনাক্ত করতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বিএনপির নেতা গয়েশ্বর রায় আর যুবদলের সভাপতি আলাল গ্রেফতার হলেন, তারা যেখানে যেখানে ছিলেন সেখানে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির বেশির ভাগ শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এয়ারপোর্ট রোডে কিংবা বাংলা মোটরে কারো গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। কিন্তু গ্রেফতার হয়েছেন তারা এবং বিএনপির অন্য যেসব নেতার বিরুদ্ধে সরকারের ক্ষোভ যদিও ঘটনার সময় তারা বহু দূরে নিজ বাড়ি, অফিস কিংবা অন্যত্র ছিলেন। পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, কোথাও কোনো দুর্বৃত্ত (হয়তো সরকারি দলীয়) আগুন লাগিয়েছে কিংবা অন্য কোনো অপকর্ম করেছে; কালবিলম্ব না করে রিমোট কন্ট্রোলের নির্দেশে কুড়িতে কুড়িতে, শ’য়ে শ’য়ে বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে দেয়া হচ্ছে।

ঈশপের গল্পের নেকড়ে বাঘ আর ছাগলছানার গল্পের মতো সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো, তারা নাকি ‘রিমোট কন্ট্রোলে’ ঘটনাগুলো ঘটিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের সব মানুষ জানে এ দেশের প্রশাসন, এ দেশের আইনসহ এ দেশের অনেক কিছুই এখন চলে রিমোট কন্ট্রোলে। বিতর্কিত ধরপাকড়, সাজানো মামলাসহ সাজানো সবকিছু নির্দেশ যে রিমোট কন্ট্রোলে আসছে, সে কথা বলার সাহস কয়জন রাখেন? বুদ্ধির খেলায় গোপাল ভাঁড়ের কাছে হেরে গিয়েও রাজা তাকে পুরস্কৃত করেছিলেন। কিন্তু এখন পুরস্কার দূরে থাক্, গণতন্ত্রের মতো ন্যায় ও সুবিচারকেও নির্বাসিত করা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে। আগের দিনে শুধু ছিল ‘জোর যার মুল্লুক তার।’ এখন হয়েছে ‘জোর যার আইন তার, সরকারও তার।’ আহা মরি বাংলাদেশ!

অথচ এ কথা স্বীকার করার সাহস শাসকদের নেই যে, তারা আসলে গণতন্ত্র চান না, তারা গণতন্ত্রবিরোধী। সুদূর অতীতে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশরাও বুঝেছিল, ভারত সাম্রাজ্যে এমন কয়েকটা প্রদেশ আছে, যেখানে জনগণ আত্মনিয়ন্ত্রণেরই বেশি উপযোগী। সে প্রদেশগুলোর শীর্ষে ছিল আজকের বাংলাদেশ। ১৯৩৫ সালে এখানে অন্তত তৃণমূল স্তরে প্রত্যক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি চালু হয়েছিল। তারপর প্রাদেশিক স্তরেও নির্বাচন পদ্ধতি চালু হয়। ১৯৪৬ সালে ভারতবর্ষব্যাপী নির্বাচন হয়েছিল। কেন্দ্রীয় গণপরিষদ ও প্রাদেশিক আইনসভায় প্রতিনিধি পাঠানো লক্ষ্য হলেও প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলমানেরা আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তান চায় কি না সে সম্বন্ধে গণভোট নেয়া। পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছিল। বেলুচিস্তান সমর্থন দিয়েছিল মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের মানুষ একবাক্যে পাকিস্তানের পক্ষেই ভোট দিয়েছিল।

বিচার করবে ফেরারিরা?

ভাগ্যের কী পরিহাস! গণভোটে যারা বিরোধিতা করেছিল, সে পাঞ্জাবিরাই পাকিস্তানে ক্ষমতার মালিক-মোখতার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্রপ্রীতিকে তারা গোড়া থেকেই ভয়ের চোখে দেখেছে। তারা জানত, বাংলাদেশের মানুষকে গণতন্ত্র দেয়া হলে ক্ষমতা পাঞ্জাবিদের হাতছাড়া হয়ে যাবে। সে ভয়ে সংখ্যাগুরুর ভাষার দাবিরও তারা সর্বপ্রথমে বিরোধিতা করেছিল। অনেক মনীষী ইঙ্গিত দিয়েছেন, বাংলাদেশের পলিমাটি নরম, কিন্তু এ মাটির মানুষ তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ আর গণতন্ত্রের দাবিতে প্রয়োজনে লৌহদৃঢ় হতে পারে। পাঞ্জাবিরা অবশেষে অন্য কৌশল নিয়েছিল। তারা মুখে ভাষার দাবি মেনে নিয়েছিল, ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনও দিয়েছিল। কিন্তু তারা বেঈমানি করেছিল পরে। তার শাস্তিও তাদের জন্য জমা হতে হতে স্তূপাকার হয়ে উঠছিল।

সারা পাকিস্তানে, অর্থাৎ পার্লামেন্ট নির্বাচন দিতে তারা অনবরত গড়িমসি করেছে। শেষে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন  জারি করে স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল হয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশী জনগণের গণতন্ত্রের দাবি তিনিও সরাসরি অস্বীকার করার সাহস পাননিÑ ‘বেসিক ডেমোক্র্যাসি’ বা বুনিয়াদি গণতন্ত্রের নামে তিনিও প্রতারণা করেছিলেন। একাত্তরে সব প্রতারণার শাস্তি ভোগ করেছে প্রতারকেরা। পাকিস্তানের দেহ থেকে প্রাণবারি বেরিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে। পাকিস্তানের পরিত্যক্ত অবশিষ্টাংশের মন্দভাগ্য এখন সারা বিশ্বের করুণার উদ্রেক করে। ভাগ্যের পরিহাস তার পরও আমাদের পরিত্যাগ করেনি। শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়ে একটা অপ্রয়োজনীয়, বেহুদা নির্বাচনও করেছিলেন ১৯৭৩ সালে। দু:খের বিষয়, তিনিও গোড়া থেকেই স্বেচ্ছাচারিতার পথ অনুসরণ করেছিলেন। শেষে জনপ্রিয়তা তাকে ছেড়ে গেলে ক্ষমতা স্থায়ী করার জন্য তিনি বাকশালী শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। তার পরিণতি এখনো তুমুল বিতর্কের বিষয়।

একাত্তরে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেননি, এমনকি যারা প্রাণের ভয়ে পাশের দেশে পালিয়ে বেঁচেছিলেন, তারা পর্যন্ত স্বাধীনতার মালিক হয়ে বসলেন। অদৃষ্টের এটা আরেক পরিহাস। আর পালানোর যাদের পথ ছিল না, বেপরোয়া হয়ে যারা ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনার বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছে, তাদের আজ ‘দেশদ্রোহী’ বলছে পলাতকেরা, তাদের বিচারের অধিকার দাবি করছে। মুক্তিযোদ্ধারা যেন রবীন্দ্রনাথের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে চাইছেÑ ‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে!’

বাস্তবতা হলো, গণতন্ত্রের সপক্ষে সর্বপ্রথম সচেতন অবস্থান নিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের চার মাসের মাথায় তিনি আমাকে বলেছিলেন, গণতন্ত্র বাংলাদেশের মানুষের মজ্জাগত; অতএব তাদের গণতন্ত্র দিতেই হবে।’ জানালেন, কিভাবে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা যায় সে সম্বন্ধে তিনি বিশেষজ্ঞদের সাথে ইতোমধ্যেই আলোচনা শুরু করে দিয়েছেন। সেসব আলোচনার ফলাফল আমরা দেখেছি ১৯৭৮ সালে। বাকশাল চালুর সময় শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)সহ বিদ্যমান সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন এবং সব বেসরকারি পত্রপত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান অবাধে পত্রপত্রিকা প্রকাশের অনুমতি দেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে আবার বৈধ ঘোষণা করেন এবং সক্রিয় প্রচেষ্টায় ভারত থেকে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু মন্দভাগ্য যেন বাংলাদেশকে ছেড়ে যেতে চায় না। রাহু যেমন ঘুরেফিরে এবং বারে বারে চন্দ্রে গ্রহণ ঘটায়, স্বৈরতন্ত্র তেমনি বাঙালির গণতান্ত্রিক স্পৃহাকে গিলে খেতে ওঁৎ পেতে থাকে।

হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও দেশের ভাগ্য

ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় থেকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ১৩ দিনের মাথায় এক আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হন। পরে লে. জে. এরশাদের সামরিক স্বৈরতন্ত্রে সুকৌশলে সাহায্য ও সমর্থন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। অন্যথায় এ শাসন ৯ বছর স্থায়ী হতে পারত না। লক্ষণীয় যে, গণতন্ত্রকে সরাসরি ‘না’ বলার সাহস এরশাদেরও হয়নি। ১৯৮৬ সালের মে মাসে তিনি ভাঁওতার সংসদ নির্বাচন ডাকেন। ১৯ এপ্রিল অন্য সব রাজনৈতিক দলের সাথে আওয়ামী লীগও নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল। কিন্তু মাত্র দু’দিন পরেই শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন যে, আওয়ামী লীগ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে। একটি ভোটারবিহীন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছিলেন এরশাদ ১৯৮৮ সালের অক্টোবরে। বিদেশীদের প্রতারিত করার আশায় তিনি শেখ মুজিব হত্যার হোতা কর্নেল ফারুককে ফ্রিডম পার্টি নামে একটি দল গঠন এবং রাষ্ট্রপতি পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দিয়েছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার আপসবিমুখ, তবে অব্যাহত আন্দোলনের ফলে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এক গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের জনগণ এরশাদকে গদিচ্যুত করে এবং ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নিরপেক্ষ নির্বাচনে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনে।

বাংলাদেশের মানুষের অদম্য গণতান্ত্রিক স্পৃহায় আরো দু’বার আঘাত এসেছে এবং সে জন্যও মূলত আওয়ামী লীগ দায়ী। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার নিজের মতে, ‘আন্দোলনের ফসল’ বর্ণচোরা সেনাশাসন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে উপড়ে ফেলে ক্ষমতা দখল করে। তাদের পরিকল্পিত নির্বাচনে শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হন। ছ’বছর ধরে ‘স্লো পয়জনিংয়ের’ মতো করে গণতন্ত্রকে হত্যা করার প্রচেষ্টা চলছে। বিজয়ী হয়ে সংসদে গরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে বারবার সংবিধানকে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী ঢেলে সাজানো হয়েছে। কোনো জেলা পরিষদের সংবিধানও এত ঘন ঘন এবং এত সহজে বদলানো যায় বলে শুনিনি। বস্তুত সংবিধান এখন যেন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করার অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। গত ২৭ ডিসেম্বর গাজীপুরে যেভাবে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সহায়তায় বিএনপিকে জনসভা করা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, সেটাকে রাজনৈতিক ইতরামি ছাড়া আর কী বলা যায়?

প্রকৃত সন্ত্রাসীরা, কোন্ দলে

মন্ত্রীরা আগে থেকেই ঘোষণা করেছিলেন, বিএনপিকে তারা শুধু গাজীপুরেই নয়, কোথাও সভা-সমাবেশ করতে দেবেন না। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সঙ্ঘাত চাই না, শান্তি চাই।’ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, ‘সমাবেশে বাধা দেয়ার অভিপ্রায় আওয়ামী লীগের নেই।’ কিন্তু খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আপনারা রাজপথে নামতে পারবেন না।’ দলের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ তার একটি দৈনিক ফতোয়ায় বিএনপি নেতাকর্মীদের গণধোলাই দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দলের ক্যাডারদের। আর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম তার ক্যাডারদের ‘বেয়াদবের ভূমিকায় অবতীর্ণ’ হওয়ার এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের ‘নেড়িকুত্তার মতো পেটানোর’ নির্দেশ দিয়ে থাইল্যান্ড থেকে ছুটে এলেন।

শেখ হাসিনা বিদেশীদের প্রায়ই বলে থাকেন, তিনি ‘জঙ্গি ও সন্ত্রাসী দমন’ করছেন। প্রকৃতপক্ষে সন্ত্রাসী রয়েছে ক্ষমতাসীন দলে এবং সরকারে। বিগত কিছু দিনে আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রীদের মুখ থেকে যেসব হিংস্র হুঙ্কার শোনা গেছে, তার মাত্র দু-তিনটি দৃষ্টান্ত এখানে দেয়া হলো। এগুলো যদি সন্ত্রাস না হয়, তাহলে কি ‘শান্তির ললিত বাণী’ বলব? দেশে যখন গণতন্ত্র ফিরে আসবে, মানবতাবিরোধী অপরাধে এই সন্ত্রাসীদের বিচার হবে, এসব উক্তি তখন অবশ্যই প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। মনে রাখতে হবে, হিটলার, আইয়ুব খান, এরশাদের মতো স্বৈরতন্ত্রী নির্যাতকের পতন হয়েছে; ভবিষ্যতেও এর পুনরাবৃত্তি হবে সর্বত্র।

এ কলাম লিখছি ইংরেজি নতুন বছরের শেষ দিনে। ফেলে আসা বছরটা সার্বিকভাবে বিশ্বের জন্যও ভালো যায়নি। বাংলাদেশের জন্য ছিল আরো খারাপ। শুধু বাস্তবটাই যে অশুভ ছিল তা নয়, ভবিষ্যতেরও সর্বনাশের চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল ক্ষমতার অবৈধ দখলদারেরা। বছরের গোড়ার দিক পর্যন্ত তারা অন্তত গণতন্ত্রের ভণ্ডামি করেছে। সংসদ নির্বাচনের তারিখের এক সপ্তাহ আগে তারা নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদীয় দল বলে ঘোষণা করেছিল। নির্ধারিত তারিখে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ছিল কুকুর আর আওয়ামী ক্যাডারদের অবাধ বিচরণ। প্রশাসনিক ঘোষণা দিয়ে তারা অবশিষ্ট আসনগুলোতেও নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করেছে। কিন্তু প্রহসনমূলক সে নির্বাচনকে বিশ্বসম্প্রদায় প্রত্যাখ্যান করেছে। বছরের শেষ মাথায় এসে ক্ষমতাদর্পীরা গণতন্ত্রের ভড়ংও ছেড়ে দিয়েছে। তারা এখন গায়ে জোরে গদিতে থাকতে চায়। ‘গণতন্ত্র-গণতন্ত্রের’ পরিবর্তে তারা এখন ‘উন্নয়ন-উন্নয়ন’ স্লোগান ধরেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ অতীতে কখনো গণতন্ত্রের স্পৃহা বর্জন করেনি। ভবিষ্যতেও করবে না।

কী করবেন বেগম জিয়া

খালেদা জিয়াকে রাজধানীতে সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। গাজীপুরে ক্ষমতাসীনদের ন্যক্কারজনক আচরণকে এ দেশের মানুষ বরাবরই ছি ছি করবে। কিন্তু গোটা বাংলাদেশ যে গণতন্ত্রের এবং খালেদা জিয়ার সাথে আছে, দেশের মানুষ তার প্রমাণ দিয়েছে; প্রমাণ দিয়েছে ২৯ ডিসেম্বরেও। বিএনপিতে মন্ত্রিত্ব ও বিবৃতিসর্বস্ব, জেলভীতু এবং অনির্ভরযোগ্য কিছু নেতা হয়তো আছেন। অতীতেও সে কথা আমরা বারবার বলেছি।

কিন্তু বেগম জিয়াকে এ কথা মনে রাখতে হবে, গান্ধীজীর স্বাধীনতা সংগ্রামেও অনেক বিশ্বাসঘাতক ছিল এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ লাখো নেতাকর্মীকে বন্দী করে জেলে পুরেছিল। শেষে যেন তিল ধারণের স্থানও ছিল না কোনো কারাগারে। তবু লাখে লাখে, কোটি কোটি মানুষ এগিয়ে এসেছে গ্রেফতার হতে, কারাবরণ করতে। ইংরেজের হাতে ধরা দিয়েই তারা ইংরেজকে পরাজিত করেছে। জয় হয়েছিল গান্ধীজীরই। ‘বাপুজী’ ‘বাপুজী’ বলে গান্ধীর চরণের ধুলো নিতে তখন ঠেলাঠেলি করেছিল বিশ্বাসঘাতকেরাও।

আমরা প্রার্থনা করব, খালেদা জিয়া চূড়ান্ত গণ-আন্দোলনের ডাক দেবেন ১৯৯০ সালের মতো এবং গান্ধীজীর মতো। জনগণই তাদের প্রাণের দাবি গণতন্ত্র ছিনিয়ে আনবে অশুভ শক্তির হাত থেকে। ২০১৫ সাল বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের বছর হবে, এ যেন সবার প্রার্থনা হয়। এ বছর বিজয়ের বছর, আনন্দের বছর আর শান্তির বছর হোক সবার জন্য।

২ জানুয়ারি ২০১৫, শুক্রবার, ৯:১৭

You Might Also Like