খালেদা জিয়ার ৭ দফা : বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা

বিএনপির চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দ্রুত নতুন একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিসহ সাত দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন। ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, এই সরকার এমন হতে হবে যাতে সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারে এবং সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সুযোগের সমতা নিশ্চিত হয়। অন্য এক প্রস্তাবে তিনি বলেছেন, নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রিসভা ও সংসদ বিলুপ্ত হবে এবং দায়িত্ব নেবে সব দলের সম্মতিক্রমে গঠিত নির্দলীয় সরকার। প্রতিদ্বন্দ্বী সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ, দক্ষ, যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনেরও দাবি জানিয়েছেন খালেদা জিয়া। বলেছেন, কমিশনের সচিবালয় ও মাঠ পর্যায় থেকে পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করতে হবে। তিনি আরো বলেছেন, নির্বাচনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে তারিখ ঘোষণার পরপরই বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তার জন্য ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সারা দেশে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করতে হবে। ভোটার তালিকার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করা, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির পাশাপাশি বর্তমান সরকারের আমলে নিষিদ্ধ করা সকল সংবাদপত্র ও টেলিভিশন খুলে দেয়ার দাবিও জানিয়েছেন খালেদা জিয়া। তার ভাষায় সম্পূর্ণ ‘অবৈধ ও দখলদার’ সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, সমঝোতা ও আলোচনার পথে তার উপস্থাপিত সাত দফা মেনে না নিলে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে। তাকে ‘মাইনাস’ করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে জানিয়ে খালেদা জিয়া বলিষ্ঠতার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন, শুধু দেশবাসীই তাকে রাজনীতি থেকে ‘মাইনাস’ করতে পারেÑ স্বার্থান্বেষী কোনো গোষ্ঠীরই তেমন সাধ্য নেই। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্য সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে খালেদা জিয়া বলেছেন, প্রতিটি তথ্যই প্রকাশিত বই-পুস্তক ও মুদ্রিত দলিলপত্রে রয়েছে। এসবের তালিকাও তারেক দিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীকে জোটে রাখা প্রসঙ্গে বিএনপি নেত্রীর জবাব ছিল, আওয়ামী লীগও অতীতে দলটিকে সঙ্গে রেখেছে। তাছাড়া ২০ দলীয় জোট গঠিত হয়েছে অবৈধ এই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য। জোটে জামায়াতের মতো আরো অনেক দলও রয়েছে। সুতরাং কেবলই জামায়াতের ব্যাপারে আপত্তি জানানোর সুযোগ নেই।

সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে অন্য কিছু বিষয়ও রয়েছে, কিন্তু প্রাধান্যে এসেছে সাত দফাÑ যার মধ্যে মন্ত্রিসভা ও সংসদের বিলুপ্তি ঘটানোর পাশাপাশি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি তুলে ধরেছেন খালেদা জিয়া। বলার অপেক্ষা রাখে না, খালেদা জিয়ার উপস্থাপিত নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও সরকারের এই প্রস্তাব সবদিক থেকেই বাস্তবসম্মত এবং দেশের সকল মহলেই এটা ব্যাপকভাবে সমর্থিত হবে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যই তিনি দাবি জানিয়ে এসেছেন, আন্দোলনও করেছেন। জনগণের আশা ও ধারণা ছিল, ক্ষমতাসীনরা এই দাবি মেনে নেবেন এবং সে অনুযায়ী সংবিধানে সংশোধনী আনবেন। অন্যদিকে সরকার এগিয়েছে নিজেদের ছক অনুযায়ী, যার প্রকাশ ঘটেছে গত বছরের ৫ জানুয়ারি আয়োজিত ভোটারবিহীন সংসদ নির্বাচনে। সে নির্বাচনও এমন এক ‘সর্বদলীয়’ সরকারের অধীনে হয়েছে যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে পরিষ্কার হয়ে গেছে, প্রধানমন্ত্রীর পদটি তিনি আঁকড়ে থাকবেনই। ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তখন বলা হয়েছিল এবং একথা প্রমাণিতও হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী আদৌ চাননি, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ওই নির্বাচনে অংশ নিক। অমন এক পরিস্থিতিতেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে ছাড় দিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। বলেছিলেন, যে কোনো নামেই গঠন করা হোক না কেন, নির্বাচনকালীন সরকারকে নির্দলীয় হতে হবে এবং প্রধানমন্ত্রীর পদে শেখ হাসিনা থাকতে পারবেন না। কিন্তু বিএনপি নেত্রীর সে দাবিও নাকচ করা হয়েছিল। সেই থেকে সংকট ক্রমাগত আরো ঘনীভূত হয়ে চলেছে বলেই সমাধানের পন্থা হিসেবে নতুন পর্যায়ে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের প্রস্তাব পেশ করেছেন খালেদা জিয়া। অন্যদিকে অতীতের মতো এবারও সমঝোতামুখী অবস্থান নেননি ক্ষমতাসীনরা। সংবাদ সম্মেলন শেষ হতে না হতেই তারা নিজেদের ইচ্ছামতো সংশোধিত সংবিধানের দোহাই দিয়ে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ঘোষণা দিয়েছেন, ২০১৯ সালের আগে কোনো নির্বাচনই হবে না। আমরা মনে করি, সরকার যে নীতি-কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে এবং যে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে দমন-নির্যাতন চালাচ্ছে তার ফলে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব হয়ে উঠবে। রাজনৈতিক সংকট তো ঘনীভূত হবেই, সারা দেশে সহিংসতাও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি অবশ্যই আশংকাজনক এবং জনগণের আকাঙক্ষার পরিপন্থী। এজন্যই সরকারের উচিত সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নীতি-অবস্থান পরিবর্তন করা। বলা বাহুল্য, এজন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি বিষয়ে দিকনির্দেশনা রয়েছে খালেদা জিয়ার সাত দফায়। দরকার শুধু সরকারের পক্ষ থেকে সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটানো।

You Might Also Like