বছরজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার মানুষের মৃত্যু

২০১৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত  হয়েছে ৭ হাজার মানুষ। বছরের শেষ দিনও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন সড়ক মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছে। বছরজুড়ে ছিল সড়ক দুর্ঘটনার করুণ চিত্র নিয়ে সরব ছিল সংবাদ মাধ্যম। পরিসংখ্যান অসুযায়ী ২০১৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হরিয়েছে প্রায় ৭ হাজার মানুষ। আহত হয়েছে কয়েক হাজার। অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করে জীবনযুদ্ধে লড়ছেন। আবার কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়েছেন।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) তাদের জরিপে বলেছে ২০১৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৬৫৮২ জন। তবে সংগঠনটির জরিপ প্রকাশের দিন ৩১ ডিসেম্বর ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় পুলিশের এক কনস্টেবলসহ তিনজন নিহত হয়েছে। নিহত কনস্টেবলের নাম আবদুল বাসেদ (৪৩)। নিহত অন্য দুজন বাস ও পিকআপ ভ্যানের চালক। একই দিন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ট্রাকের চাপায় নিহত হয়েছেন পান বিক্রেতা মিজান (৫০)।

এছাড়া প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে মানুষ। গত ২৯ নবেম্বর রাজধানীতে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান সিনিয়র সাংবাদিক জগলুল আহমেদ চৌধুরী। ঘটনা তদন্তে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। চিকিৎসায় অবহেলার দরুন পান্থপথে অবস্থিত মোহনা হাসপাতালের কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করা হয়। তার একদিন পরেই বাসচাপায় মারা যান কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র। যার জের ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

নিসচার পরিসংখ্যান বলছে ২০১৪ সালে জানুয়ারিতে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৬৪টি, মারা গেছেন ৪২৫ জন। আহত হয়েছেন ৬৪৬ জন। ফেব্রুয়ারিতে দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৯১টি, মারা গেছেন ৪৪৭ জন। আহত হয়েছেন ৯১৫ জন। মার্চে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২১৪টি, মারা গেছেন ৪৯৭ জন। আহত হয়েছেন ৯৮৪ জন। এপ্রিলে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০৬টি, মারা গেছেন ৩৬৫ জন। আহত হয়েছেন ৭৯৩ জন। মে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৬১টি, মারা গেছেন ৪৫৭ জন। আহত হয়েছেন ১০৬২ জন। জুনে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৪৭টি, মারা গেছেন ৩১৬ জন। আহত হয়েছেন ৯৬৯ জন। জুলাইয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০৭টি, মারা গেছেন ৪৩৫ জন। আহত হয়েছেন ১২৪০ জন। আগস্টে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৫৬টি, মারা গেছেন ৩৮৪ জন। আহত হয়েছেন ১১০৮ জন। সেপ্টেম্বরে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৪৩টি, মারা গেছেন ২৭৮ জন। আহত হয়েছেন ৫৯৯ জন। অক্টোবরে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২২৪টি, মারা গেছেন ৩৯৮ জন। আহত হয়েছেন ১০২৪ জন। নবেম্বরে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০৪টি, মারা গেছেন ২৫৩ জন। আহত হয়েছেন ৫৭১ জন। ডিসেম্বরে দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৯৬টি, মারা গেছেন ২৮১ জন। আহত হয়েছেন ৮৫৯ জন। দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালে নেয়ার পর মারা গেছেন ১০৭৭ জন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর মারা গেছেন ৯৬৯ জন।

এভাবে প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে মারা যাচ্ছে হতভাগা যাত্রী বা পথচারী। তারপরও সরকারের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। বরং সরকারের মন্ত্রীরা দুর্ঘটনার পক্ষেই কথা বলেন।

সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি বলেছেন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। অপরদিকে সড়ক দুর্ঘটনা রোধের পক্ষে আন্দোলন করে যাচ্ছেন নিরাপদ সড়ক চাই-এর চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, সরকার সড়ক দুর্ঘটনাকে জাতীয় ইস্যু মনে করছে না। যদি এটাকে জাতীয় ইস্যু মনে করা হতো তাহলে সড়কপথে মৃত্যুর হার অনেক কমে আসতো। অকালে মায়ের কোল এভাবে খালি হতো না। পিতা-মাতা হারাতো না তাদের আদরের সন্তানকে। তিনি বলেন, প্রত্যেকটা সরকার সড়ক দুর্ঘটনা রোধে উদাসীন ছিল।

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের বিচার বা যথাযথ শাস্তি না হওয়া দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। তারা মনে করেন, রাষ্ট্র যদি এ ধরনের অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে পারতো, তাহলে মানুষের মনে এ ব্যাপারে আস্থা তৈরি হতো।

সূত্র জানায়, দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো হয়ে উঠেছে যেন মৃত্যুফাঁদ। দুর্ঘটনার কারণগুলো বিভিন্ন গবেষণায় চিহ্নিত হয়েছে, সভা-সেমিনারে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু সেসব দূর করার জন্য নেয়া হচ্ছে না পর্যাপ্ত উদ্যোগ। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না, বরং জনসংখ্যা ও যানবাহন বৃৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধের বিষয়টি সরকারের কাছে আরও বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। এজন্য দরকার ব্যাপক পরিকল্পনা।

সূত্র মতে, যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং পথচারীদের চাপা দেয়ার ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে সবচেয়ে বেশি। জানা যায়, চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য দুর্ঘটনা ঘটে শতকরা ৯১ ভাগ। নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৪টি তাজা প্রাণ ঝরে গেল। রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায় লাশের মিছিল। একই পরিবারের ৬ সহোদরের মৃত্যুর ঘটনা বিরল।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে গাড়ির অতিরিক্ত গতি ৫৩.২৮ ভাগ। মোটরযান আইনে গতিসীমা নির্ধারণ করে দেয়া থাকলেও অধিকাংশ চালকই এ নিয়ম মানেন না। মহাসড়ক, শহর ও লোকালয়ের জন্য আলাদা আলাদা গতিসীমা রয়েছে। মহাসড়কে বাস, কোচ ও পিকআপের সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৫৫ কিলোমিটার। ভারী ট্রাক, লরির গতিবেগ ৫০ কিলোমিটার। ট্রাক্টর ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৩০ কিলোমিটার। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর কারণ দেখানো হয়েছে ৩৭.৩৮ শতাংশ। পথচারীদের ভুলের কারণে মৃত্যু হয় ৩.৫৬ শতাংশ এবং অন্যান্য কারণে ৫.৭৮ শতাংশ।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক শামসুল হকের এক সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, পুলিশের রেকর্ডে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত-আহতের আসল চিত্র আসে না। তিনি জানান, ২০১০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার। কিন্তু পুলিশের হিসাবে আসে ১ হাজার ৯০০। বিশ্বব্যাংকের জরিপে নিহতের সংখ্যা বছরে প্রায় ১২ হাজার। কিন্তু বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে এ সংখ্যা ১৮ হাজার।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় অর্থনৈতিক ক্ষতি জিডিপির ১ থেকে ২ শতাংশ। দেড় শতাংশ ধরলেও প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। পরিবার তথা দেশের অর্থনীতিতে এই যে বিরাট ক্ষতি, তা থেকে রক্ষাকল্পে আমাদের তেমন কোনো উদ্যোগ কর্মপরিকল্পনা, আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা এর বাস্তবায়ন লক্ষণীয় নয়। একটা দুর্ঘটনা ঘটার পর গতানুগতিক রীতিতে তাৎক্ষণিকভাবে একটা কমিটি গঠন করে দেয়া হয় তার পর সে বিপোট আদৌ প্রকাশ হয় কিনা জানা যায় না।

Accident_1জানা গেছে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ক্রুটিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থা, ওভারলোডিং, ওভারটেকিং, ওভার স্পিড, গাড়িচালকদের অদক্ষতা, ভুয়া লাইসেন্স, বেপরোয়া ও নেশাগ্রস্ত হয়ে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন মেনে গাড়ি না চালানো, গাড়ির গতিসীমা অনুসরণ না করা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা, আইন প্রয়োগে শিথিলতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন না করা এসব কারণেই প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। মোটর ভেহিকেল অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩ অনুযায়ী একজন চালককে লাইসেন্স দেয়ার আগে মহাসড়কে তার ৩৫ মিনিটের গাড়ি চালানোর পরীক্ষা ও তাত্ত্বিক পরীক্ষা নেয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে তা পালন হয় না।

রাস্তায় বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, গাড়ি আছে ২১ লাখ কিন্তু চালকের সংখ্যা ১৩ লাখ। আন্তঃজেলায় যেসব বড় বড় বাস চলে সে সব বাসের চালককে দেখা গেছে সারা রাত জেগে গাড়ি চালিয়ে এসে পরের ট্রিপ ধরতে। এটার কারণ হচ্ছে, একদিকে চালকের স্বল্পতা অন্যদিকে বাণিজ্যিক মনোভাব অর্থাৎ অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় মানুষের জীবনকে বাজি রেখে মালিকপক্ষ এ ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করার ফলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। মানুষের জীবন নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়ায় দুর্ঘটনা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে।

জানা যায়, সারা দেশে ৩ লাখ ১৩ হাজার ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলছে। এর মধ্যে খোদ রাজধানীতেই ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা ৯৩ হাজার ৬০৪। শতকরা হিসাবে ৩৩ ভাগ যানবাহনের ফিটনেস নেই। এসব ফিটনেসবিহীন গাড়ির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

সূত্র জানায় সড়ক পথে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ মহাসড়কে হাটবাজার ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ। ঢাকা-মহাসড়কের বরিশাল অংশের প্রায় ৭৭ কিলোমিটার জুড়ে মহাসড়ক লাগোয়া অন্তত ১০ স্থানে বাজার বা পাকা স্থাপনা রয়েছে। মহাসড়কের দুপাশ থেকে ৩০ ফুট দূরত্বে স্থাপনা নির্মাণ করার নিয়ম উপেক্ষা করার বিষয়টি খতিয়ে দেখে এ ব্যাপারে অইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া উচিত। মহাসড়কের ওপর বিভিন্ন স্থাপনা ও সাপ্তাহিক হাটবাজার বসার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। এ চিত্র কেবল বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কেই সীমাবদ্ধ নয়, সারাদেশে একই চিত্র বিরাজ করছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর মধ্যে অন্তত ৪১ ভাগের অবস্থা খুবই খারাপ। ১২ ভাগ সড়ক-মহাসড়ক খানাখন্দে ভরা। ঢাকার সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী ছয়টি মহাসড়কের অন্তত ২০০ কিলোমিটার বেহাল বলে জানা গেছে।

সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আমি চাই সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নেমে আসুক, সহনীয় পর্যায়ে আসুক। সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। আমার যে দায়িত্ব, কর্তৃত্ব না থাকলেও তা পালন করব। মন্ত্রী বলেন, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বাঁক স্পটগুলো আগেই চিহ্নিত করেছি। অনেক ‘যুদ্ধ’ করে বাকি ১৪৪টি স্পটের জন্য ১৬৫ কোটি টাকা একনেকে অনুমোদন করানো হয়েছে। এগুলো সারাতে জানুয়ারি থেকে টেন্ডার আহ্বান করা হবে। এই সড়কে মাত্র ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১টি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা ঠিক করা হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধের দায়িত্ব কার?

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’র চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন প্রশ্ন রেখে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধের দায়িত্ব কার? এর উত্তর হল এর দায় একক কোনো সংগঠনের নয়। সড়ক দুর্ঘটনা একক কারণে নয়, তেমনি দুর্ঘটনা রোধ করার দায়িত্বও একক কোনো কর্তৃপক্ষের নয়। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় সড়কের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকগুলো মন্ত্রণালয় রয়েছে। এসব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কিন্তু সেতুমন্ত্রীর একার নয়। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সাধারণ মানুষ, সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, সংগঠন, সবারই দায়িত্ব রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব সরকারের।

You Might Also Like