একটি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু নিয়ে এ কেমন নিষ্ঠুর তামাশা!

গত ২৭ ডিসেম্বর বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির মাঠে খেলতে গিয়ে ওয়াসার পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের ১৭ ইঞ্চি ব্যাসের খোলা পাইপের ভেতর প্রায় ৩০০ ফুট নিচে পড়ে যায় চার বছরের শিশু জিহাদ। দরিদ্র পিতা-মাতার সন্তান সে। তার খেলার সাথীরা টের পায়, সে পড়ে গেছে নলকূপের পাইপে। তারা কাছে গিয়ে জিহাদকে ডাক দিলে সে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জবাব দেয় আর বাঁচার আকুতি জানাতে থাকে। ছোট শিশুরা তখন কলোনির বাসিন্দা দশম শ্রেণীর ছাত্রী মোছাম্মৎ ফাতেমাকে (১৪) ডেকে আনে। ফতেমাও কথা বলে জিহাদের সঙ্গে। তাছাড়াও কথা বলে আরও তিন শিশুর সঙ্গে। তারা হলো- মোহাম্মদ নাহিদ (৫), মো. তৌশিদ (৪) জাহিদা ইয়াসমিন পুষ্পিতা (৮)।

কলোনির লোকজন জিহাদকে উদ্ধারের জন্য ফায়ার ব্রিগেডে খবর দিলে তারা বেশ দ্রুতই ঘটনাস্থলে এসে হাজির হয়। তারপর শুরু হয় জিহাদ উদ্ধার অভিযান। প্রথমে চেষ্টা করা হয় জিহাদ কোথায় কতো নিচে আছে, তার সে অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা। ফায়ার ব্রিগেডের ওইদিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা দড়ি নামিয়ে দিয়েছিল, যেন শিশু জিহাদ সে দড়ি ধরে থাকতে পারে এবং ফায়ার ব্রিগেডের কর্মীরা তাকে টেনে তুলতে পারেন। তারা প্রাথমিকভাবে জানান, জিহাদ তাদের দড়ি ধরেও ছিল, কিন্তু দড়ি ধরে সে থাকতে পারেনি। পড়ে যায়। এরপর তারা নিচে একটি চটের ব্যাগ পাঠায়। তারা ধারণা করেছিলেন, শিশু জিহাদ ওই চটের ব্যাগের ভেতরে ঢুকে যাবে আর তখন তারা তাকে টেনে ওপরে তুলে আনবেন।

তাদের এই দ্বিতীয় অপশনটিও ব্যর্থ হয়। তখন তারা তৃতীয় অপশনে যান। সেটি হলো- এই পাইপের মাঝ বরাবর ছিলো আরও একটি সরু পাইপ। ফায়ার ব্রিগেড সিদ্ধান্ত নিলো, ওই পাইপটি টেনে বের করতে হবে। জিহাদ উদ্ধারে প্রতিটি মুহূর্ত ছিলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাইপ উদ্ধারের নামে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণমূলক কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলো ফায়ার ব্রিগেড। তাদের কারও ভাষ্য অনুযায়ী ওই পাইপের গভীরতা ৬০০ ফুট। কোনো কোনো পন্ডিত বললেন, ৪০০ ফুট, কেউ বললেন, ৩০০ ফুট। যাই হোক, পাইপ তোলা, পাইপ কাটা, পাইপ ঠান্ডা করা- এই নিয়ে দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায়। পাইপের নিচে অসহায়ভাবে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে শিশু জিহাদ।

পাইপ উদ্ধার কাজ শেষ হলে সরকারি ফায়ার ব্রিগেডের চতুর্থ অপশন শুরু হয়। সেটি হলো- ১০০ কোটি টাকা মূল্যের (?) ক্যামেরার মাধ্যমে ফের জিহাদের অবস্থান নির্ণয়ের চেষ্টা। এ ক্যামেরা চালু করতেই লেগে যায় ফায়ার ব্রিগেডের প্রায় ৯ ঘণ্টা। অথচ তখন জিহাদের জন্য ৯ সেকেন্ড সময়ও গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। সে চেষ্টা চললো। তারপর কোনো একসময় ক্যামেরা ওপেন হলো। ক্যামেরা নাকি ২৮০ ফুট নিচে পাঠানো হলো। কিন্তু নিচে কিছুই দেখা গেলো না। শুধু দেখা গেলো আরশোলা টিকটিকি এইসব।

ফায়ার ব্রিগেডের লোকজনের মধ্যে উৎসাহ কমে আসতে থাকলো। কমপক্ষে দুটি টিভি চ্যানেলে এই উদ্ধার অভিযান সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছিল। টিভি চ্যানেলে উদ্ধার অভিযানের খবর দেখে নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘটনাস্থলে এসে হাজির হলেন পাঁচ-সাতজন উদ্যমী তরুণ। তারা তাদের নিজস্ব দেশীয় সাধারণ যন্ত্রে উদ্ধার অভিযানের অনুমতি চেয়েছিল ফায়ার ব্রিগেডের কাছে। কিন্তু ফায়ার ব্রিগেডের কর্মকর্তারা তাদের পাত্তা দেননি।

রাত পৌনে ৩টায় জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) যুগ্ম-পরিচালক আবু সাঈদ রায়হান জিহাদের পাইপের ভেতর পড়ে যাওয়ার ঘটনাকে নিছকই গুজব বলে অভিহিত করেন। এতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তার পরিচয় জানতে চায়। এক পর্যায়ে তিনি তার পরিচয় দেন। ততোক্ষণে ঘটনাস্থলে এসে হাজির হন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনিও জানান, প্রমাণাদি যা পাওয়া যাচ্ছে, তাতে পরিষ্কার যে, পাইপের ভেতরে শিশুটির কোনো অস্তিত্ব নেই।

পাইপের ভেতরে যদি শিশুটির অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে শিশুটি গেল কোথায়? এবার শুরু হলো পুলিশী অভিযান। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ আটক করলো জিহাদের উদ্বিগ্ন উৎকণ্ঠিত বাবা নাসির উদ্দিন ফকিরকে। আর আটক করে নিয়ে যায় সেই চার শিশুকে যারা দাবি করেছিল, তারা কথা বলেছে শিশু জিহাদের সঙ্গে। শিশুদের দোষ, যে ছেলের অস্তিত্বই নেই, তারা তার সঙ্গে কথা বললো কি করে? শিশুদের পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে চার ঘণ্টা ধরে। মধ্যরাতে তুলে নিয়ে গিয়ে চার ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও পুলিশ ও শিশুদের কোনো খাবার খেতে দেয়নি। পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়েছিলো বটে, কিন্তু শিশুদের সঙ্গে তাদের নেয়া হয়নি।

এরপর শুরু হয় জিহাদের পিতা নাসির উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদ। নাসির উদ্দিনকে পুলিশ বলে যে, হয় তার ছেলেকে কেউ অপহরণ করেছে, নয়তো নাসির নিজেই তার ছেলেকে কোথায়ও লুকিয়ে রেখেছে। এই ধারায়ই প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারপর হুমকি দেয়া হয় যে, নাসির যদি সত্য কথা না বলে, তখন তাকে র‌্যাবের হাতে তুলে দেয়া হবে। তখন নিশ্চয় নাসির সত্য কথা প্রকাশ করবে। এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদকালে নাসিরকেও পুলিশ কোনো কিছু খেতে দেয়নি। নাসিরের খবর নিতে থানায় গিয়েছিলো তার শ্যালক। তাকেও আটক করে থানা পুলিশ নানাভাবে হয়রানি করে।

Ziad-1জিহাদ উদ্ধার অভিযান তখন সরকারি পর্যায়ে অপহরণ বা লুকিয়ে রাখা রহস্য উদঘাটনে পর্যবসিত হয়। এ সময় সেই উদ্যোগী তরুণরা কিন্তু বসে ছিলো না। তারা এসেছিলো বিভিন্ন স্থান থেকে মানবিক তাড়নায়। এই অভিযানের আগে তারা কেউ কাউকে চিনতেনও না। এরা হলেন- বেসরকারি পলিটেকনিকের ছাত্র শাহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল নুন, আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মুরাদ ও আনোয়ার। ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দোকানি আব্দুল মজিদ। বসুন্ধরা এলাকার গাড়ি ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন। পিরপুরের বাসিন্দা এআইইউএবির ছাত্র সুজন দাস রাহুল। আরও যারা নিজেই এই উদ্ধার অভিযানে শরিক হয়েছিলেন রহমতুল্লাহ, আশরাফউদ্দিন মুকুল ও মনির হোসেন। রাত ৩টায় পুলিশের দৃষ্টি যখন ভিন্ন দিকে, তখন এরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়ার সুযোগ পান। সরকারিভাবে উদ্ধার অভিযান কার্যত পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু সেখানে উৎকণ্ঠিত মানুষের ভিড় কমছিলো না। এলাকার সাধারণ মানুষ কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলো না যে, জিহাদ এই গর্তে নেই। ওই তরুণদের প্রথম প্রচেষ্টা রাতে ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় প্রচেষ্টা হিসেবে তারা একটি ‘কামড়ি’ তৈরি করে। এটা তিনটি রডের সমন্বয়ে একটি খাঁচা।

সকাল থেকেই কার্যত সরকারি উদ্ধার অভিযান পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। ফয়ার ব্রিগেড ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিতে শুরু করে। ওই তরুণদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। বেলা গড়িয়ে যেতে থাকে। জিহাদকে জীবিত উদ্ধারের আশা কমে আসতে থাকে। শনিবার দুপুর পৌনে ৩টায় ফায়ার সার্ভিসের ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান উদ্ধার অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। তার আগেই পুনরায় তৎপর হয়ে উঠে উদ্ধারকারী তরুণরা। তারা তাদের পুনরায় ডিজাইন করা ‘কামড়ি’ পাইপটির ভেতর ঢুকিয়ে অনুসন্ধান কাজ শুরু করেন। ওই খাঁচার সঙ্গে লাগানো ছিলো একটি সিসি ক্যামেরা। আর একটি টর্চ লাইট। একটি টেলিভিশন ছিলো তাদের মনিটর। খাঁচাটি তারা তৈরি করেছেন স্থানীয় একটি ওয়েল্ডিং কারখানায়। খুব সাবধানে তারা খাঁচাটি নিচে ফেলে তিন টুকরো রডের এই খাঁচা এমনভাবে তৈরি হয়েছিলো যা পাইপের ভেতরে নির্বিঘেœ ঢুকবে। কিন্তু টেনে তোলার সময় ওই পাইপের ভেতরে কোনো কিছু পড়ে থাকলে সেটি আংটার মতো আটকে যাবে। সেই পদ্ধতিতেই তারা কামড়িটি নামিয়ে দেয় এবং ফয়ারা ব্রিগেডের মহাপরিচালক উদ্ধার অভিযান পরিত্যক্তের ১৫ মিনিটের মধ্যে বের করে আনে শিশু জিহাদের মৃতদেহ।

পুনরায় শুরু হয় সরকারের নিষ্ঠুর নাটকের পালা। জিহাদের লাশ যখন উদ্ধার হয়, তখন থানা থেকে তার বাবাকে মেডিকেল কলেজের কাছে নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। জিহাদের লাশ তখন সেখানেই ছিলো। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রায় সাথে সাথেই বললেন যে, স্থানীয়দের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিসই জিহাদকে উদ্ধার করেছে। সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করলেন, তবে যে আপনি বলেছিলেন পাইপের ভেতরে কোনো শিশুর অস্তিত্ব নেই? তিনি সঙ্গে সঙ্গে তার আগের বক্তব্য অস্বীকার করে বললেন, আমি ওরকম বলিনি। আপনারা ভুল শুনেছেন। কিন্তু টেলিভিশনে সরাসরি প্রচারিত অনুষ্ঠানে দেশের কোটি মানুষ দেখেছে, তারা কে কী বলেছেন, কে কী করেছেন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও আইজিপি একযোগে বলেছেন, জিহাদের পিতাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো সৎ উদ্দেশ্যে তার নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু জিহাদের পিতার নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার মতো কোনো কিছুই সেখানে ঘটেনি। জিহাদের পিতা ও আটককৃত শিশুদের কপাল জিহাদের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিলো। তা নাহলে সরকারের থানা পুলিশের হাতে তাদের যে অবর্ণনীয় নিগ্রহের শিকার হতে হতো সেটা কল্পনাতীত।

জিহাদকে জীবিত উদ্ধারের জন্য কোটি মানুষ প্রার্থনা করেছে। আল্লাহর কাছে দোয়া করেছে। কিন্তু সরকার ও তার বাহিনী গুম, খুন, নিগ্রহে এতটাই অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে যে, তাদের কারও হৃদয় বেদনা ভারাক্রান্ত হয়নি। আরও প্রমাণিত হয়েছে যে, সরকারের বাগাড়ম্বরই সার। এসব কাজে তারা অতিশয় অদক্ষ। আমরাও মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি জিহাদের আত্মা শান্তি পাক। তার পরিবার শোক কাটিয়ে উঠুক। আর এমন বিপদ যেনো আর কারও না ঘটে।

You Might Also Like