নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় ইসলাম

পৃথিবীকে ঘোর অমানিশা থেকে মুক্ত করে হেদায়েতী নূরের আলোতে উজ্জ্বল করেছেন যিনি, মানুষের নৈতিক অবক্ষয়ের চরম বির্পযয় রোধ করে উসওয়াতুন হাসানার মাধ্যমে উত্তম জীবনাদর্শ ও অনুপম তাহযীব তমদ্দুন প্রতিষ্ঠা করেছেন যিনি, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানবতার মুক্তি সাধন করে সর্বতোব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন যিনি, তিনি হলেন মানবতার মুক্তির দিশারী, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট মহামানব, আমাদের প্রাণপ্রিয় রাসূল হযরত মোহাম্মদ (সা.)।

তিনি ছিলেন নারী জাতির মুক্তির ত্রাণকর্তা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কারক। নারী জাতি সম্পর্কে নবীজি (সা.) এর অমিয় শাশ্বত  বাণী ছিল  নারী জাতি মানব সমাজেরই একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ যা সৃষ্টি জগতের জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে এক অনুপম ও অতুলনীয় সৃষ্টি।

আল্লাহ তায়ালা আদি পিতা হযরত আদম (আ.) কে  সৃষ্টির পর তার সৃষ্টির পরিপূর্ণতা আনায়নের লক্ষ্যে আদি মাতা হযরত হাওয়া (আ.) কে সৃষ্টি করেছেন। কেননা আল্লাহর সৃষ্টিতে নর আর নারী এক অন্যের পরিপূরক।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় পৃথিবীর এই নারী সমাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী কাল ধরে সমাজের সর্বক্ষেত্রে চরম নির্যাতিতা, অবহেলিতা, বঞ্চিতা এবং ভোগের সামগ্রী হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। মানব জাতির স্থায়িত্ব, শান্তি নর ও নারীর পারস্পরিক সহযোগিতা এবং তাদের সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্কের উপর অনেকাংশে নির্ভর করে।

কিন্তু ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায় তার সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। প্রাচীন ভারতের অন্যতম হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মে নারী জাতিকে সকল পাপকর্মের প্রধান উৎস এবং তাদের অবজ্ঞা ও ঘৃণার পাত্রী বলে মনে করত। প্রাচীন কালের নারী সভ্যতার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত গ্রিসে নারী জাতিকে শয়তানের সমতুল্য মনে করা হতো এবং সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের কোনো গ্রহণযাগ্য অবস্থান  ছিল না।

সারাজীবন তারা গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ ছিল। সামাজিক জীব হিসেবে তাদের কোনো স্বীকৃতি ছিল না। দাসী এবং স্ত্রীদের মধ্যে সামাজিকতার কোন ভিন্নতা ছিল না।

বায়জেন্টাইন সাম্রাজ্যে নারীর কোনো আইনগত ভিত্তি ছিল না। তাদের আত্মাবিহীন জীব মনে করা হতো এমনকি নারী সম্পর্কে তাদের যে ধারণা ছিল তা ছিল নিদারুণ কষ্টের এবং বেদনাদায়ক। তারা মনে করতো নারী আদম সন্তানদের বিপদে পরিচালিত করার এক আকর্ষণীয় অস্ত্র।

ব্যাবিলন এবং ইরানের অবস্থা গ্রিক বা রোম সাম্রাজ্য থেকে কোনো ভিন্ন চিত্র ছিল না। অন্যদিকে জাহেলি আরব সমাজে নারীদের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয় এবং করুণ। কন্যা সন্তান জন্ম হওয়া তাদের কাছে অমঙ্গলের প্রতীক হিসেবে গণ্য হতো। তাদের কোন সামাজিক মর্যাদা ছিল না।

কোনো কোনো আরব গোত্রে কন্যা সন্তান ভূমিষ্ট হলে তাদের  জীবন্ত কবর পর্যন্ত দিতে তারা দ্বিধা করত না। (জাহেলি যুগের দাহইয়া কালবী যার বাস্তব উদাহরণ পরে অবশ্য তিনি ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে অতীত জীবনের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর দরবারে খালেস তওবা করেছেন)।

নারী জাতীর এহেন ক্রান্তি লগ্নে তাদের সকল প্রকার শোষণ, বঞ্চনা, অবহেলা, অবজ্ঞা এবং নির্যাতনের স্টিম রোলার থেকে পরিত্রাণ দিয়ে সম্মান এবং গৌরবময় সামাজিক জীব হিসেবে জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করতে এই বিশ্বধরায় আবির্ভূত হলেন মহানবী হযরত (সা.)।

তার আনিত জীবন ব্যবস্থাই অবহেলিত নারী সমাজকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে মর্যাদার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি বলিষ্ট কন্ঠে নারী পুরুষের অপরিহার্য সুসম্পর্কের উপর গুরুত্বারোপ করে উল্লেখ করেন ‘তাকওয়া ব্যতীত বংশগত ও প্রকৃতিগতভাবে  কোনো এক শ্রেণীর উপর অপর শ্রেণীর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো যিনি, তোমাদের এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি, তা হতে তাহার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তাহাদের দুজন হতে বহু নর নারী ছড়িয়ে দেন।

এই আয়াতের মর্মবাণী থেকে বুঝা যায় যে, কোরআনের দৃষ্টিতে মানব জীবনে নারী পুরুষের ভূমিকা সমান। পুরুষ বা নারী হওয়ার ভিত্তিতে মর্যাদা নির্ধারিত হয় না কেবল মাত্র তাকওয়ার ভিত্তিতেই মর্যাদা নির্ধারিত হয়ে থাকে। মর্যাদা নির্ধারিত হওয়ার আসল মাপকাঠি হল তাকওয়া।

এ ব্যাপারে আল্লাহ কোরআন পাকে এরশাদ করেন    ‘নিশ্চয় তোমাদের নিকট থেকে সেই ব্যক্তি আল্লাহর কাছে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন যে বেশি মুত্তাকি।’

অপর আয়াতে আল্লাহ পাক হযরত মরিয়ম (আ.) এর মাতাকে শান্ত্বনা দিয়ে এরশাদ করেন ‘যে ছেলে তুমি চেয়েছিলে, সে তো এ মেয়ের মতো নয়! যাকে তোমাকে দেয়া হয়েছে।’

অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থ যেখানে নারীর মাতৃত্বকে সম্মান দিতে কুন্ঠিত সেখানে ইসলাম মাতৃত্বের মর্যাদাকে মানবতার উচ্চতম স্থানে সমুন্নত করেছে। রাসূল (সা.) এর অমীয় চিরন্তন বাণী মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।

তাছাড়া ইসলামের সুমহান বিধানে পিতার চেয়ে মায়ের মর্যাদা অনেক ক্ষেত্রে বেশি। এ ব্যাপারে এক সাহাবী (রা.) নবী (সা.) কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি প্রথম তিনবার মায়ের কথা বলে চতুর্থবার পিতার কথা বললেন। এখানে মায়ের প্রতি যে সম্মান এবং মর্যাদার বার্তা নবীজি (সা.) প্রদান করলেন পৃথিবীতে প্রচলিত অন্যান্য ধর্মে তা সত্যিই বিরল।

নারীদের মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসে রাসুল (সা.) এরশাদ করেন যে ব্যক্তি দুই কন্যা বা ভগিনী প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন পালন করবে এবং পুরুষদিগকে (ছেলে/ ভাই) তাদের উপর প্রাধান্য দিবে না সেই ব্যক্তি আর আমি কিয়ামতের দিন এমনভাবে অবস্থান করব যেই ভাবে দুটি আঙ্গুল একত্রে থাকে।

বিশ্বের বহু সভ্য জাতি নারী জাতিকে কোনো না কোনোভাবে উত্তরাধিকারীনি হতে বঞ্চিত করেছে এবং  বর্তমানে বঞ্চিত করার হীন ষড়যন্ত্র লিপ্ত রয়েছে। কিন্তু মানবতা এবং শান্তির ধর্ম ইসলাম নারীর অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করে তাদের স্বাধীন মালিকানা স্বত্ত্ব নির্দেশ করত আর্থিক ক্ষেত্রে স্ত্রীর অবস্থা  সুদৃঢ় করার প্রয়াসে পুরুষের উপর স্ত্রীর মোহর প্রদানের দায়িত্ব প্রদান করে নারী জাতির আর্থিক অবস্থাকে আরও সমুন্নত করেছে।

তাছাড়া মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে তাদের অধিকার সুনিশ্চিত করেছে। যা আজ সভ্য পৃথিবীর অনেক সভ্য জাতির কাছেই উপেক্ষিত। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে প্রথমেই তাহার স্ত্রীর মোহরানা বকেয়া থাকলে তা আদায় করা হয়। তারপর বাকি সম্পত্তি উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে বণ্টন করা হয় আর সেখানেও স্ত্রীর জন্য একটা অংশ নির্ধারিত থাকে।

ইসলাম নারীদের পৃথক ব্যক্তিসত্ত্বা স্বীকার করে কর্তব্যর সঙ্গে তাদের অধিকারের সীমারেখা বর্ণনা করে ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি দান করেছে।

এ ব্যাপারে নবী (সা.) এরশাদ করেন ‘দুনিয়ার সবকিছুই সম্পদ, এদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ হল নেককার স্ত্রী।’

অন্যত্র বলা হয়েছে ‘তারা (স্ত্রীগণ) তোমাদের অঙ্গাবরণ স্বরুপ।’ ইসলাম নারীদের সম্মান আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে বিদায় হজের ভাষণে নবীজি (সা.) বললেন, ‘নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো, ‘তাহাদিগকে তোমরা আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ।’

নারী জাতির  শিক্ষাক্ষেত্রে ও ইসলাম যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে যদিও তৎকালে নারী শিক্ষার দ্বার ছিল সর্বদা রুদ্ধ। যেখানে সামাজিকতার স্বীকৃতি ছিল না সেখানে শিক্ষা গ্রহণ ছিল এক অরণ্য রোদন। এত প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাকে নারীর মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্ব নবী (সা.) এরশাদ করেন ‘প্রত্যেক মুসলিম নর নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন অবশ্যই কর্তব্য।’

রাসূলের যুগে নারীরা শিক্ষাক্ষেত্রের কোনো অংশেই পিছিয়ে ছিলেন না বরং শিক্ষা-দীক্ষায় তাদের মেধা এবং প্রতিভার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বর্তমান পৃথিবীর অনেক জাতি যারা নিজেদের সভ্য জাতি বলে জাহির করে তাদের কাছে বিধবাদের কোন সামাজিক মূল্যবোধ ছিল না।

তাদের স্বামী মারা যাওয়ার পর তাদের সাথে (স্বামীর সাথে) আত্মাহুতি দিতে প্ররোচিত করত। (আজকের শিক্ষিত এবং ভদ্র সমাজেও তাদের কে ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের বোঝা মনে করা হয়)।

আরবের রীতি ছিল পিতা মারা যাওয়ার পর তার জ্যৈষ্ঠ পুত্র তাহার সৎ মাতার বৈধ উত্তরাধিকারী হতো। কোনো কোনো ধর্মে বিধবাদের বিবাহ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ইসলাম বিধবাদের অধিকার নিশ্চিত করে, বিধবা বিবাহ উৎসাহিত করছে। বিশ্ব নবী (সা.) স্বয়ং এ বিধান কার্যে পরিণত করে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন যা পৃথিবীর এই সভ্য ইতিহাসে সত্যিই  বিরল।

You Might Also Like