গায়ের জোরে নয়

এক. সকালবেলা ঘর থেকে বেরিয়ে ছিলাম। সাড়ে ৯টায় বাংলাদেশ প্রতিদিনের সালাহউদ্দিন রাজ্জাক ফোন করল আজ আমার বাংলাদেশ প্রতিদিনের জন্য উপ-সম্পাদকীয় লেখার কথা। আগামীকাল বুধবার তা ছাপা হবে। তাড়াতাড়ি করে বের হলাম বেইলি রোড থেকে। রমনা থানা পার হতেই জ্যামের সঙ্গে দেখা হলো। নিয়মিত ব্যাপার। এ বছরের জানুয়ারিতেই নাকি মগবাজারের ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। আরেক জানুয়ারি দরজায় কড়া নাড়ছে কিন্তু ফ্লাইওভারের খবর নেই। কবে শেষ হবে তা কেউ জানে না। সড়ক পরিবহন ও সেতু (আগে ছিল যোগাযোগ) মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কয়েক দিন দৌড়ঝাঁপ করেছিলেন। নির্মাণ প্রতিষ্ঠান তমাকে কথা শুনাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ করব। তিনি কি নালিশ করেছিলেন? জানি না। কিন্তু অবস্থার যে কোনো পরিবর্তন হয়নি তা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। ওবায়দুল কাদের হয়তো বলবেন, আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলতে পারিনি কিন্তু মানুষ তা বিশ্বাস করবে না। কারণ প্রধানমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, ওবায়দুল কাদের তো দিনরাত পরিশ্রম করছেন, প্রতিদিন মোবাইল ফোনে আমাকে আপডেট জানাচ্ছেন। তাহলে এখন পর্যন্ত মগবাজারের উড়াল সেতুর খবর নেই কেন?

আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর মগবাজার রেলক্রসের ওপর এসে গাড়ি দাঁড়াল। রেলক্রসিং বলেই একটু উঁচু জায়গা। সামনে-পেছনে তাকিয়ে দেখলাম চতুর্থদিকে যেমন থৈ থৈ করে মানুষ, তেমনি থৈ থৈ করছে গাড়ি। স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে আছে মগবাজার থেকে হাতিরঝিল পর্যন্ত। কবে যে এখান থেকে বেরুতে পারবে গাড়িগুলো। এই যে হাজার কোটি টাকা খরচ করে হাতিরঝিল বানানো হলো তাতে কী লাভ হলো? সাতরাস্তা থেকে মগবাজার মোড় পর্যন্ত রাস্তা যে এখন আগের তুলনায় পুলসিরাত হয়ে গেছে তা তো সবাই দেখতে পাচ্ছি। গাড়িতে বসে সালাহউদ্দিনের কথা ভাবছিলাম। ওকে বলেছিলাম ৪০-৪৫ মিনিটের মধ্যে বাসায় পৌঁছব। যখন ঘর থেকে বেরিয়েছিলাম তখন সময় লেগেছিল ৪০ মিনিট। তখন ছিল সকাল সাড়ে ৭টা। মানুষ সবাই রাস্তায় বের হওয়ার আগেই আমি বের হয়েছিলাম ঘর থেকে। কিন্তু এখন সবাই রাস্তায় নেমেছে। অতএব, বিস্তীর্ণ যানজট। বলেছি স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে আছে গাড়িগুলো। কেউ কিছু বলছে না। সবারই যেন গা-সওয়া হয়ে গেছে। গতকালও দুপুরের পর থেকে একবেলায় প্রায় চার ঘণ্টা রাস্তায় ছিলাম।

 

আচ্ছা, ওবায়দুল কাদের নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন মগবাজার উড়াল সেতুর কথা। তিনি কি ব্যবস্থা নিয়েছেন? কাল আমার সঙ্গে ছিলেন সাংবাদিক এম জে কাদের। তাকে বলেছিলাম কথাটা। তিনি বললেন, সামনে যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে ৫ জানুয়ারি এই সরকারের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এখন উড়াল সেতু নিয়ে কে ভাববে?

দুই. বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান আবার একটি বোমা ফাটিয়েছেন লন্ডন থেকে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান ব্যক্তিত্ব শেখ মুজিবুর রহমানকে তিনি রাজাকার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বোমা শব্দটি আমি এ কারণেই ব্যবহার করলাম, এখন পর্যন্ত বাঙালি জাতির প্রধান ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও শেখ মুজিবকে নিয়ে প্রশ্ন যে ওঠেনি তা নয়। স্বাধীনতার পর সাড়ে তিন বছর তিনি দেশের ক্ষমতায় ছিলেন। শাসক হিসেবে এই সাড়ে তিন বছরে তার মূল্যায়ন তো হবেই। উল্লেখযোগ্য হিসেবে ‘৭৩-এর ডাকসু নির্বাচনের ব্যালট বাঙ্ হাইজ্যাক, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোর করে খন্দকার মোশতাকসহ অনেককে বিজয়ী করে আনা, ‘৭৫-এ একদলীয় শাসন বাকশাল কায়েমসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার সমালোচনা অতীতেও হয়েছে, এখনো হচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যেভাবে বলার চেষ্টা করে যে শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা, তিনি সব রকমের বিতর্কের ঊর্ধ্বে, সে রকম করে কিছু চলে না। স্বাধীনতার পরে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি তৎকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমানসহ অন্য নেতারা বলতেন, মুজিববাদের বিরুদ্ধে কথা বললে জিহ্বা কেটে ফেলা হবে। আজ সেই আওয়ামী লীগ মুজিববাদের কথা মুখেও আনে না। মুজিববাদের কোনো তাত্তি্বক ও বাস্তব অস্তিত্ব নেই।

শেখ মুজিব শুধু যে ওই সাড়ে তিন বছরের জন্যই আলোচিত হয়েছেন তা নয়। মুক্তিযুদ্ধ এবং তার বিজয় বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের কথা তো বাঙালি জাতির অজস্র লেখা এবং কথায় আসবেই। সেখানেও শেখ মুজিব থাকবেন। যত দিন যাবে তত এই আলোচনা-সমালোচনা আবেগমুক্ত নির্মোহ ও নৈর্ব্যক্তিক হবে। এ কথা সত্যি স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং তার মর্মান্তিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব বাঙালি জাতির আবেগের এক বিরাট জায়গা জুড়ে আছেন। আমাদের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতেই যে অপার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে মানায় না তার কারণও ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতি প্রশ্নাতীত আস্থার প্রকাশ। ব্যক্তি মুজিব প্রধানমন্ত্রী মুজিবের চেয়ে বড় হয়ে গিয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে আবেশ কেটে যাচ্ছে। এখন স্বাধীনতা আন্দোলনের ওপরে লেখা যেসব বই বেরুচ্ছে তাতে আবেগের চেয়ে যুক্তি বেশি আসছে। নতুন নতুন প্রশ্ন আসছে। কেউ কাউকে ছোট করার জন্য এরকম করছে তা নয়। মইদুল হাসান, এ কে খন্দকার, শারমীন আহমদসহ কেউই কাউকে বিশেষ করে শেখ মুজিবকে ছোট করার জন্য কিছু লেখেননি। পুনরায় পেছন ফিরে ইতিহাসকে দেখতে চাইলে এভাবেই নতুন নতুন প্রশ্ন উঠে আসে এবং তাই স্বাভাবিক। এতে রাগ করার কিছু নেই। তাতে কাজ হয় না। কেউ ইচ্ছামতো ইতিহাস রচনা করতে পারেন না বিশেষ করে আওয়ামী লীগের এ কথা বোঝা উচিত। কিছু বললেই তাকে স্বাধীনতাবিরোধী বললেই তিনি তা হয়ে যাবেন না।

সমালোচনার জবাবে তারেক রহমান বলেছেন, তিনি যা বলেছেন তা সবই ডকুমেন্টেড। বই পড়ে, ইতিহাস ঘেঁটে, তিনি যা পেয়েছেন তাই বলেছেন। তিনি এও বলেছেন, গালাগালি না করে যুক্তি দিয়ে আমার কথা খণ্ডানোর চেষ্টা করুন। সুন্দর কথা। আমি এও জানি, অনেকগুলো প্রশ্ন তিনি তুলেছেন যা আমাদের ইতিহাসে আছে। কিন্তু শেখ মুজিব রাজাকার ছিলেন এ কথা কি তিনি ইতিহাসের কোথাও পেয়েছেন। তিনি যুক্তি দিয়ে এটা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন? সমালোচনা করুন, কিন্তু যুক্তিহীনভাবে শেখ মুজিবকে রাজাকার বললে ইতিহাস বিকৃত হয়। ধরে নিচ্ছি ১৫-২৩ মার্চ ১৯৭১ মুজিব-ভুট্টো-ইয়াহিয়ার যে আলোচনা হয়েছিল সেখানে শেখ মুজিবের কৌশল ছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। সেটাও কি খুবই অন্যায়। উনি তো ভাবতেই পারেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারলে উনি সব প্রদেশের জন্য ছয় দফা বাস্তবায়ন করতেন। তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আরও সহজ হয়ে যেত। তার এই চিন্তার কারণেই (যদি থাকে) তাকে রাজাকার বলা যাবে?

কেউ যুক্তি দিতে পারেন, ব্যাপারটি মোটেও এরকম হতো না। শেখ মুজিব শাসক হিসেবে যোগ্যতার প্রমাণ দেননি। তিনি যদি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতেন তাহলে ছয় মাসের মধ্যে তিনি ব্যর্থ হতেন। বাঙালি জাতির আমও যেত, ছালাও যেত।

বিশ্লেষণটা হয়তো ঠিক। হয়তো ঠিক না। এ তর্ক করে লাভ নেই। কারণ পুরো বিষয়টাই একটা হাইপোথেসিস বা ধারণা। বাস্তব নয়। বঙ্গবন্ধু যে ২৫ মার্চ রাতে কাপড় গুছিয়ে ব্যাগে ভরে পাকিস্তানিদের কাছে ধরা দিলেন তার অনেক সমালোচনাই করা যেতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিজয় অর্জন করেছে, শেখ মুজিব মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেছেন। বিস্ময়কর নয়?

তিন. আমার বিবেচনায় তারেক রহমান একটি উদ্ভট বক্তব্য দিয়েছেন। এতে তার বা তার দলের কোনো লাভ হয়নি। বরং তা ক্ষমতাসীনদের হাতে একটি অস্ত্র তুলে দিয়েছে। তারেক রহমান যতই বলুক, তার কথা যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা হোক, প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ তা করবে না। ইতিমধ্যেই তার বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু হয়েছে। তাও হয়তো তারা করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন তো আসবে, আপনারা কি সে রকম কাজ করেননি। মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার, যার কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে অনেকেই উজ্জীবিত হয়েছিলেন। তাকে পাকিস্তানের চর বলেননি? তদ্বীয় পত্নী বাংলাদেশের তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে সংসদে নোংরামি করেননি?

ইতিমধ্যে ছাত্রলীগ ঘোষণা দিয়েছে বেগম জিয়াকে বাংলাদেশের কোথাও জনসভা করতে দেবে না। তারা দাবি করেছে তারেক রহমানকে বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে। আমি আগেই বলেছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে রাজাকার বলা অন্যায় হয়েছে। কিন্তু তার জন্য তো আপনারা মামলা করেছেন। তারেক রহমানের দোষে তার মাকে কথা বলতে দেবেন না কেন? এর পরে যদি তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা কথা বলতে চান, তার গলাও কি টিপে ধরবেন? প্রধানমন্ত্রী নিজে যে ভাষায় তারেক রহমানের সমালোচনা করেছেন সেটাও কি সঙ্গত হয়েছে?

৫ তারিখ ক্ষমতাসীনরা তাদের ক্ষমতা গ্রহণের বর্ষপূর্তি পালন করতে যাচ্ছে। ওই দিন কি কোনো নির্বাচন হয়েছে? ১৫৪ জন তো ভোট ছাড়াই এমপি। এই সংসদকে কি নির্বাচিত বলা যায়? আওয়ামী লীগের বন্ধুদের ভেবে দেখতে বলছি। এক বছর পার করতে পেরেছেন বলে বাকি সব বছর তো পার নাও হতে পারে। কারও কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারলেই কি মিথ্যা সত্য হয়ে যায়? বাতাসে কান পাতুন, গায়ের জোরে মিথ্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারবেন না। এখন উচিত একটি সর্ব ব্যাপক জাতীয় সংলাপের আয়োজন করা। সবাইকে নিয়েই দেশ গড়তে হবে। জোর করতে গেলে নিজের জোর কমে যাবে।

লেখক : রাজনীতিক, আহ্বায়ক নাগরিক ঐক্য।

ই-মেইল : mrmanna.bd@gmail.com

You Might Also Like