কতটা অস্থির হবে ২০১৫

মাসুমুর রহমান খলিলী :

২০১৫ সাল কি অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার বার্তা নিয়ে আসছে? এ প্রশ্ন বিশ্ব বিশ্লেষকদের সামনে যেমন আছে, তেমনি বাংলাদেশ পরিস্থিতির বিশ্লেষকদের সামনেও রয়েছে। বাংলাদেশের এ অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ-আতঙ্ক যেমন দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান, তেমনি দেশের সাধারণ মানুষও আতঙ্কে রয়েছে কখন কী হয়।

নিশিরাতের অমাবস্যার অন্ধকারে ভয় তাড়াতে জোরে জোরে চিৎকার দেয়া বা কাকস্বরে গান গাওয়ার ঘটনা ঘটে গ্রাম-গ্রামান্তরে। ঠিক অনেকটা সে রকম জোরালো আওয়াজ উচ্চকিত হচ্ছে শাসকদের মুখে। দায়িত্ববান কর্মকর্তাদের মুখ থেকে এমন কথা শোনা যাচ্ছে, যা কোনো ব্যাকরণে মেলে না। কেন এসব হচ্ছে? বাংলাদেশের রাজনীতি বা অর্থনীতির ভেতরের অবস্থাটা আসলে কী? আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কিভাবে অবলোকন করছে বাংলাদেশ পরিস্থিতি? এসব প্রশ্নের জবাব নানাজন নানাভাবেই পেতে চাইছেন।

রাজনীতির অন্ধকার টানেলে আলো!

বাংলাদেশের রাজনীতিকে সাদামাটা চোখে দেখলে নিকশ কালো অন্ধকারই কেবল চোখে পড়ে। বিদায়ী বছরের ৫ জানুয়ারি এমন একটি নির্বাচন এখানে হয়ে গেছে, যাতে ৫১ শতাংশের বেশি প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া। যাদের মধ্যে রয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও প্রভাবশালী মন্ত্রীরা। বাকি আসনে ভোটার উপস্থিতি ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি বলে মনে করছেন না কোনো পর্যবেক্ষকই। এ নির্বাচন এমন এক প্রতিরোধ পরিবেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়, নির্বাচনের পরিস্থিতি ফল পর্যন্ত পৌঁছাবে এমন বিশ্বাসে চিড় ধরে নির্বাচন কমিশন-কর্তাদের মধ্যেও। তবুও তরী ভিড়েছে তীরে। তরী ভেড়ার পর পাল্টে যায় সুর রাষ্ট্রচালকদের।

নির্বাচনের আগে যেখানে ছয় মাসের মধ্যেই নিয়ম রক্ষার এ নির্বাচনের পর আরেকটি নির্বাচন হওয়ার কথা সরকারের প্রভাবশালীরা প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে বলতে থাকেন, তারাই এবার বলেন পাঁচ বছরের মেয়াদপূর্তির আগে কোনো নির্বাচন নয়। বিরোধী জোট নির্বাচনের পর তাদের কর্মসূচিতে বিরতি দেয়। আড়ালে শোনা যায়, কূটনীতিকেরা তাদের ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির মত কর্মসূচি থেকে বিরত রাখেন। আর রাজনৈতিক কর্মসূচিহীনতার পুরো সুযোগ নেয় সরকার। দেশের যেসব অঞ্চলে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল সেসব স্থানে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়। মামলার জটে জড়ানোর ঢাকা মহানগরী মডেল দেশের সব স্থানে বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়। এভাবে একতরফা নির্বাচনোত্তর ক্ষমতাকে সংহত করার চেষ্টা করে সরকার। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নানা প্রভাবশালী পক্ষের সাথে লেনদেনের মাধ্যমে ঝুঁকি নমনীয় করারও প্রচেষ্টা চলে। রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক নানা পক্ষ জড়িত হয় এর সাথে।

নির্বাচনের পরই বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকারী প্রতিবেশী দেশের সাবেক এক হাইকমিশনার এক নিবন্ধ লেখেন ভারতীয় এক ইংরেজি দৈনিকে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারকে দু’টি কাজ করতে হবে। প্রথমত, সারা দেশে বিধ্বস্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হতে হবে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন ও এর আগের আন্দোলন সময়ের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সামরিক বাহিনীর সরব বা নীরব সমর্থন কার্যকর প্রমাণ হবার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। নির্বাচনোত্তর রাষ্ট্র পরিচালনায় বজায় রাখতে হবে এ সমঝোতা। এটি হলে ক্ষমতা নিরুদ্বিগ্ন করার পথে কোনো বাধা থাকবে না। আর শুধু সমর্থন প্রয়োজন হবে প্রতিবেশী দেশটির।

জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর প্রায় এক বছর সময়ে ভারতীয় এই কূটনীতিকের পরামর্শকে অক্ষরে অক্ষরে যেন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বিশেষ এলাকার কোনো চাহিদা অপূর্ণ রাখা হয়নি। সেখানকার সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। বাহিনী সম্প্রসারণ করে পদোন্নতির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। বড় বড় কনটাক্ট ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সুবিধা ভাগাভাগি করা হচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও যেন স্বস্তি আসছে না। ভীতি তাড়ানোর গান গাইছেন আর বক্তৃতা দিচ্ছেন রাষ্ট্রচালকেরা। ইদি আমিনের মতো কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশের কর্তাদের মুখে। এটিই হয়তোবা হতে পারে টানেলের অন্ধকার ভেদ আলো বিচ্ছুরিত হবার সম্ভাবনার ইঙ্গিত।

অস্বস্তির নানা কারণ

সরকার গত ছয় বছরের অভিজ্ঞতা এবং এর মধ্যকার স্থানীয় পরিষদের নির্বাচন ও কয়েক দফা গণবিক্ষোভে বুঝতে পারছে যে, জনসমর্থন নিয়ে এ সরকারের পক্ষে ক্ষমতায় থাকা বা নতুন করে ক্ষমতায় আসা সম্ভব নয়। এই উপলব্ধির কারণেই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সব দরজা বন্ধ করার কাজ শুরু হয়েছে জরুরি তত্বাবধায়কের মেয়াদ শেষে প্রথম বার ক্ষমতায় আসার স্বল্পসময় পর থেকেই। এর একটি বড় মহড়া ছিল ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। এ নির্বাচনের আগে ক্ষমতার যে অবস্থা ছিল তার পরে জনগণের মধ্যে দুঃখদুর্দশা আরো বেড়ে গেছে। এতে অবস্থার ঘটেছে আরো অবনতি, দৃশ্যমান চিত্রে আন্দোলন প্রতিরোধ একেবারেই ভেঙে পড়েছে বলে মনে হয়েছে। তবে এর পরও সরকারের শীর্ষমহলে এ ভীতি রয়েছে যে, বিরোধী জোট যেকোনো সময় একটি চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এ আশঙ্কাকে ব্যর্থ করার জন্য নানামুখী কাজও করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের নেতাদের যাতে কোনো চূড়ান্ত আন্দোলনে সক্রিয় করা না যায়, তার জন্য ভয়ভীতি, মামলা এবং অর্থ দেয়ার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিরোধী দলের প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদেরও এ ধরনের একটি জালে আটকাতে কাজ হচ্ছে। এটি সফল হলে বিরোধি জোটের মূল নেতৃত্ব বেগম খালেদা জিয়াকে অন্তরীণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ জন্য ফেব্রুয়ারি ও মার্চকে করা হয়েছে টার্গেট। এভাবে বিএনপিকে নেতৃত্বহীন ও ছন্নছাড়া করার পাশাপাশি জামায়াতকে আদালতকে দিয়ে নিষিদ্ধ করার কাজ সম্পন্ন করা গেলে মাঠের প্রতিরোধ ভবিষ্যতে কোনোভাবে সংঘটিত হতে পারবে না বলে মনে করছেন সরকারি দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।

কিন্তু সরকারি দলের হিসাব-নিকাশে একটি ভুলও থেকে যাচ্ছে। প্রকাশ্য তৎপরতা ও কর্মসূচিতে বাধা দেয়ার কারণে বিরোধী পক্ষ আসলে কতটা সংগঠিত হচ্ছে; আর তাদের শক্তির ধরন ও প্রকৃতি আসলে কী এবং কতটুকু সে সম্পর্কে কোনো ধারণা করতে পারছে না সরকার। ফলে আগের কর্মপন্থার বাইরে আকস্মিক কোনো বিস্ফোরণের বিষয়টি ঠেকানো যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় সৃৃষ্টি হয়েছে।

বিএনপির সামনে এখন দু’টি পথ রয়েছে। এর একটি হলো তিলে তিলে নিঃশেষিত হয়ে যাওয়া। নীরবে প্রতিরোধহীন শক্তিবিনাসের মাধ্যমে মূল নেতৃত্বের খাচায় বন্দী হয়ে থাকা। আরেকটি হলো, চূড়ান্ত প্রতিরোধের মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে নেয়া। এ ধরনের একটা কিছু ২০১৫ সালের শুরুতে যে হতে পারে সেটি রাজনীতির সব পর্যবেক্ষকেরই সামনে থাকছে।

রাজনৈতিক কর্তৃত্ব চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাকে নির্বিঘœ করতে চাইছে সরকার পক্ষ। আর সরকারকে ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়তে বাধ্য করে একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নিয়ে আসতে চায় বিরোধি পক্ষ। দুই পক্ষের এ দুই লক্ষ্য অর্জনের চূড়ান্ত লড়াইয়ের সময় হয়ে দাঁড়াতে পারে ২০১৫ সালের প্রথম প্রান্তিক।

অর্থনৈতিক বিপদের ঘনঘটা

রাজনীতিকে যেভাবে ঝুঁকি নিয়ে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে এ পর্যন্ত সফল হয়েছে সরকার, তেমনিভাবে অর্থনৈতিক সঙ্কট বা বিপর্যয়কে ঠেকিয়ে রাখতেও সফল হয়েছে শাসকমহল। তবে রাজনীতিকে দমন করতে গেলে আকস্মিক বিস্ফোরণের আশঙ্কা থাকে। অন্য দিকে অর্থনীতির পতন একটিপর্যায় পর্যন্ত ঠেকানো যায় কিন্তু চূড়ান্ত ধস কোনোভাবেই রোধ করা যায় না, যদি এর মূল সূচকগুলোর উন্নয়নে পদক্ষেপ না নেয়া হয়। তেমন কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হচ্ছে না এখনো।

২০১৫ সালের আগমনের প্রাক্কালে অর্থনীতির দুই ধরনের অবয়ব বাইরে থেকে দেখা যায়। একটি হলো ইতিবাচক আর অন্যটি হতাশাব্যঞ্জক। পরপর পাঁচ বছর গড়পড়তা ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে জিডিপিতে। নতুন অর্থবছরেও অর্থনৈতিক বিকাশ ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। মুদ্রা বিনিময় হার রয়েছে স্থিতিশীল। মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের কোঠায় থাকাটা গ্রহণীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হলেও মহা বিপর্যয়ের সঙ্কেত এটাকে বলা যাবে না।

অর্থনীতির আরেকটি দৃশ্যপট হলো বেসরকারি খাতে দেশী-বিদেশী কোনো বিনিয়োগই এখন সেভাবে হচ্ছে না। বিদেশী বিনিয়োগ বলতে তা কেবলই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগ খাতে কিছু বিদেশী যন্ত্রপাতি আসার মধ্যে সীমিত থাকছে। দেশী বিনিয়োগের মূল উৎস হলো পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা। পুঁজিবাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার পর শিল্প বিনিয়োগে অর্থের জোগান দেয়ার কোনো অবস্থা আর শেয়ারমার্কেটের নেই। এখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারিয়ে ফেলার কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ আবাসন খাত ও ভোগ্যপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।

অন্য দিকে চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক আর শিল্প উন্নয়ন ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকে বিনিয়োগযোগ্য কোনো তহবিল এখন কার্যত নেই। এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের কোনোভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেয়া হচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ যেসব উৎস থেকে আমানত আসছে তা দিয়ে। এর বাইরে নিজস্ব বিনিয়োগপুষ্ট উদ্যোগগুলোতে কিছু চলতি মূলধন সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারি খাতের শিল্প বিনিয়োগের প্রধান ক্ষেত্র এভাবে শুকিয়ে যাওয়ার পর বেসরকারি ব্যাংকগুলো ছিল ভরসা।

বেসরকারি খাতের কমপক্ষে এক ডজন ব্যাংকের সরকারপন্থী মালিকেরা নামে বেনামে তহবিল নিয়ে এগুলোকে লাটে তোলা উপক্রম করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে এসব ব্যাংকে কোনো ধরনের তদারকি বা তদন্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এর বাইরে অনেক ব্যাংক থেকে নানাভাবে চাপ দিয়ে ও ভয়ভীতি সৃষ্টির মাধ্যমে তহবিল বের করে নেয়া হচ্ছে। ফলে অর্থনীতির কর্মসংস্থানমুখী স্বাভাবিক কোন বিনিয়োগ হচ্ছে না।

দেশী ব্যাংকগুলোর তহবিল সঙ্কটের কারণে সরকারপন্থী প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা এখন রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দিয়ে বিদেশী প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়া শুরু করেছেন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেলে এর দায় চাপবে রাষ্ট্রের ওপর। এসব কিছু করা হচ্ছে অর্থনীতির নগদ বিপদ ঠেকাতে। কিন্তু এ গুলোই যে একসময় বিপর্যয়ের সুনামি হয়ে দেখা দিতে পারে সেটি আমলে নেয়া হচ্ছে না।

এখন অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুঁজি পাচার বা পলায়ন। সরকারের সুবিধাভোগীরা নানাভাবে যে অর্থ বের করে নিচ্ছেন, তা দেশে বিনিয়োগ আর নিরাপদ মনে করছেন না। তারা অর্থ নিয়ে গিয়ে বিদেশে বিনিয়োগ করছেন। আর বিরোধী দল-সমর্থক ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা দেশে নিরাপদে ব্যবসা করার সুযোগই পাচ্ছেন না নানা হয়রানি ও প্রতিকূলতার কারণে। ফলে তারাও নিজেদের ব্যবসাবাণিজ্য গুটিয়ে বা সঙ্কুচিত করে পুঁজি নিয়ে যাচ্ছেন বিদেশে। এই উভয় পক্ষের পুঁজি সরানোর কাজ হচ্ছে রফতানি আয় প্রত্যাবাসন না করা এবং ভুয়া আমদানি বা আমদানি পণ্যের মূল্য অতিরিক্ত দেখিয়ে টাকা বাইরে পাঠানোর মাধ্যমে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অপ্রত্যাশিত রফতানি আয়ের অঙ্ক এবং আমদানি পণ্যের তালিকা পর্যবেক্ষণ করলেই এ চিত্র বেরিয়ে আসে। যেসব খাতে বিনিয়োগের খারাপ অবস্থা সেসব খাতেও মূলধনি যন্ত্রপাতি বা কাঁচামাল আমদানি দেখানো হচ্ছে। এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে রাজস্ব খাতের স্বল্প প্রবৃদ্ধির চিত্রেও।

দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসাবাণিজ্যেও অর্থনৈতিক শ্লথগতির প্রভাব দেখা যাচ্ছে জোরালোভাবে। রাজধানী ঢাকা শহরের মার্কেটগুলোতে কেনাকাটা এখন এতটাই স্থবির হয়ে পড়েছে যে, অনেকে দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন। অনেকে কর্মচারী ছাঁটাই করে কোনোভাবে ব্যবসা টেকানোর চেষ্টা করছেন। এ অবস্থা আরো কিছু দিন চললে একধরনের অচলাবস্থা দেখা দিতে পারে। অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদার মধ্যে আরো বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে। শ্লথগতি রূপ নিতে পারে মন্দায়।

রফতানি প্রবৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স প্রবাহও এর মধ্যে কমতে শুরু করেছে, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ভারসাম্য হয়ে পড়েছে নেতিবাচক। রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রার ধারে কাছে না থাকার কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। বৈদেশিক সম্পর্কে নানা ধরনের তিক্ততার ফলে বিদেশী অর্থসাহায্যের প্রতিশ্রুতি ও অবমুক্তি দু’টিই একেবারে নিম্নপর্যায়ে রয়ে গেছে।

এ অবস্থায় সরকার ব্যয় সঙ্কোচনের স্বাভাবিক নীতির পরিবর্তে উল্টো বেতনভাতা ও সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন নিয়োগ দিয়ে যাচ্ছে সরকারি চাকরিতে। এসবের প্রভাবে আগামী মার্চ-এপ্রিল নাগাদ সরকার একধরনের তারল্য সঙ্কটে পড়তে পারে। নতুন টাকা ছাপিয়ে এ সঙ্কট মোকাবেলা করতে চাইলে মূল্যস্ফীতির আকস্মিক উল্লম্ফন এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ফলে ২০১৫ সালের প্রথমার্ধ হতে পারে অর্থনৈতিক দিক থেকেও অস্থিরতা ও ঝুঁকি উত্থানের সময়।

সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে?

এ দফায় আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার রণকৌশল হলো ডান্ডা মেরে সব কিছু ঠাণ্ডা রাখা। এ নীতি প্রথম প্রয়োগ করা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপর। এর পর সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ দমনে শক্তি প্রয়োগ করা হয়। সাধারণ ছাত্র শিক্ষকদের অরাজনৈতিক দাবিও সহ্য করতে চাইছে না সরকার। শেয়ার বাজারে ধস নামার পর রাস্তায় নামতে দেয়া হয়নি পুঁজিহারা অসহায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের। ছাত্রদের সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক অগ্রাধিকার দেয়ার দাবি থেকে শুরু করে নার্সিং ছাত্রদের নিজস্ব দাবি আদায়ের আন্দোলন পর্যন্ত সব কিছু দমন করা হচ্ছে শক্তি দিয়ে। আফ্রিকা আর ক্যারিবিয়ান দেশগুলোর রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে হত্যা গুম এর সংস্কৃতিকে আমদানি করে আনা হয়েছে এখানে। এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত হলে, মানুষের কাজের অভাব না থাকলে ক্ষোভ বিক্ষোভ ততটা ধূমায়িত থাকে না। সরকার এক্ষেত্রেও দেখাতে পারছে না সাফল্য।

এর বিপরীতে সরকারের সমর্থক রাজনৈতিক কর্মীদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে অবৈধ আয়ের নানা সুযোগ। এ সুযোগে এক শ্রেণীর হাতে আসছে কালো অর্থের অবাধ প্রবাহ। এনিয়ে দেখা দিচ্ছে সংঘাত। এর পথ ধরে দেশের আনাচে কানাচে ঢুকে পড়ছে নানা ধরনের মাদক সামগ্রী। অপসংস্কৃতির প্রাবল্য সামাজিক অবক্ষয়কে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়িয়ে তুলছে। এতে ঘটছে আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতি । আইন ও বিচার ব্যবস্থায় দলীয় নিয়ন্ত্রণ চরমে পৌঁছায় শান্তি ও স্বস্তিতে থাকতে পারছে না কেউ। এ ধরনের সামাজিক অবস্থা গণবিষ্ফোরণকে অনিবার্য করে তুলে। এ কারণে সামাজিক অস্থিরতা ২০১৫ সালে প্রবলভাবে দেখা দিতে পারে।

কৌশলগত সঙ্ঘাত

২০১৫ সালের শুরুতে সরকারকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কৌশলগত সঙ্ঘাতের মুখে পড়তে হতে পারে। সরকার আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলতে বলতে এখন দেশটির বিরুদ্ধে রীতিমত বাগ্যুদ্ধে নেমে গেছে। এত দিন এটাকে ওয়াশিংটন মনে করেছিল তৃতীয় বিশ্বের জাতীয়তাবাদী নেতাদের রাজনৈতিক মেনিয়ার প্রকাশ। দুই রাষ্ট্রের বাস্তব সম্পর্কে এর প্রভাব থাকবে কম। এখন সরকার যে আসলেই আমেরিকাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তার প্রতিপক্ষ রাশিয়াকে ঘরে ডেকে আনছে, তাতে কোনো সন্দেহ করছে না ওয়াশিংটন।

বাংলাদেশে আমেরিকান অর্থনৈতিক স্বার্থের বড় অংশজুড়ে ছিল জ্বালানি খাতের বিনিয়োগ। এখন এ খাতে রাশিয়ার গ্যাজপ্রমকে নিয়ে এসে বড় বড় চুক্তি করা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমানা চিহ্নিত হওয়ার পর ধারণা ছিল মার্কিন কোম্পানিগুলোকে প্রতিশ্রুত গ্যাসব্লকের ইজারা দেয়ার কাজ শেষ করা হবে। বাস্তবে এ ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ করে রাশিয়া, ভারত ও চীনা কোম্পানির হাতে বঙ্গোপসাগরের গ্যাসব্লক দেয়ার প্রস্তুতি চলছে।

আমেরিকা তাদের অব্যবহৃত ও প্রযুক্তিগতভাবে পশ্চাৎপদ কম দামের অস্ত্র বাংলাদেশে বিক্রির একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। সরকারের অনাগ্রহে সে উদ্যোগ খুব একটা এগোয়নি। উল্টো বরং রাশিয়ার সাথে বড় ধরনের কয়েকটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া চলছে। ফলে আমেরিকার সাথে সরকার শুধু গালভরা বক্তব্যের লড়াইয়ে নেমেছে তা-ই নয়, একই সাথে বাস্তব কৌশলগত সঙ্ঘাতেও নেমেছে বলে মনে হচ্ছে।

এ সঙ্ঘাতে প্রতিবেশী ভারতের সহায়তার বিষয়টি একধরনের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হয়ে আছে এখনো। চীন প্রতিশ্রুত গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ না পাওয়ায় আশা-নিরাশার দোলাচলে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথেও সরকার কোনো বোঝাপড়ার সম্পর্ক তৈরি করতে পারেনি। ফলে যে কৌশলগত সঙ্ঘাত সরকার ডেকে নিয়ে এসেছে তার একটি প্রকাশ অনিবার্যভাবে ২০১৫ সালের প্রথমার্ধে দেখা দিতে পারে।

সব মিলিয়ে বড় ধরনের সঙ্ঘাত সহিংসতা ও অস্থির অবস্থা অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে ২০১৫ সালে । এমনকি এই অস্থিরতা রাজনৈতিক দৃশ্যপটে যে কোন পরিবর্তনও নিয়ে আসতে পারে। অবশ্য তেমন কোন পরিবর্তন কতটা স্বস্তি বা শান্তি নিয়ে আসবে তা নিশ্চিত করে বলা হয়তো বেশ কঠিন।

You Might Also Like