পরিবর্তন না আনলে ভাঙবে পাকিস্তান

পেশোয়ারে ১৪১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এদের বেশির ভাগই ১২ থেকে ১৬ বছরের শিশু শিক্ষার্থী। নিহতদের তালিকায় শিক্ষকও আছেন। আরো আড়াই শ জনের কাছাকাছি গুরুতরভাবে আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই বর্বরোচিত হামলাকারীদের আমি ধিক্কার জানাই। তালেবান মুখপাত্র ওমর খোরাসানী এই হত্যাকাণ্ডের দায়-দায়িত্ব শিকার করে বলেছে, ‘এটা প্রতিশোধমূলক ঘটনা। পাকিস্তান সরকার আমাদের পরিবার ও নারীদের টার্গেট করে সেনা অভিযান চালাচ্ছে বলেই আমরা সেনাবাহিনী পরিচালিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছি। যাতে তারা আমাদের মতই যন্ত্রণা ভোগ করে।’

ওয়াজিরিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। মার্কিনিদের ড্রোন হামলা হচ্ছে। সেখানে নির্বিচারে বৃদ্ধ, নারী ও শিশুরাও নিহত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু তার প্রতিশোধ হিসেবে এই আত্মঘাতী হামলা, শিশু শিক্ষার্থীদের এভাবে হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

হামলার স্থানটি সেনাবাহিনীর একটি শক্ত অবস্থান। এখানে সেনা কমান্ডো বাহিনী, প্যারামিলিটারির হেড কোয়ার্টার রয়েছে। এই স্থান থেকে ওয়াজিরিস্তানে অভিযান পরিচালিত হচ্ছিল। এ রকম এক জায়গায় তালেবানদের হামলা তাৎপর্যপূর্ণ।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী, সারা বিশ্বের নেতারা এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। আমাদের মহান বিজয় দিবসে আমরা যখন আমাদের ওপর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণের কথা স্মরণ করছি, তখনো পাকিস্তানের ওই বিপর্যয়কর ঘটনায় হামলাকারীদের ধিক্কার জানিয়েছি।

পাকিস্তান গত তিন দশক ধরে মহাসংকটের মধ্যে রয়েছে। পাকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আফগান মুজাহিদীনদের যুদ্ধে পরোক্ষভাবে সমর্থন, সিআইয়ের মাধ্যমে মুজাহিদীনদের প্রশিক্ষণ, অর্থ বণ্টন- এসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেশটির খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চল থেকে তখন বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানি মুজাহিদীনে যোগ দেয়। ওই এলাকাতেই মুজাহিদীনদের শক্ত ঘাঁটি গড়ে ওঠে। ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক বিদেশিও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ওই যুদ্ধে অংশ নেয়। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই তখন সিআইয়ের হয়ে কাজ করে। ওই সময় আফগানিস্তান বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের যে নীতি-উদ্দেশ্য ছিল তা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিদায়ের পর বাস্তবায়িত হয়নি। পাকিস্তান চেয়েছিল আফগানিস্তানে পাকিস্তানপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু তা হয়নি। আফগানিস্তানের পশতুন অঞ্চলে তালেবান নামের একটি সংগঠন সংগঠিত হয়। তার পরও পাকিস্তান তাদের আফগান নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনেনি। এরপর ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেনের ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের তালেবানবিরোধী যুদ্ধে ইচ্ছার বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে সঙ্গে নেয়।

আফগানিস্তানে তালেবানদের পতনের পর পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে গড়ে ওঠে তেহরিক তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি। ওই এলাকাটি স্বায়ত্তশাসিত উপজাতীয় অঞ্চল। মধ্য এশিয়া থেকে যেসব যোদ্ধা আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে যোগ দিতে এসেছিল, তাদের অনেকেই ওই এলাকাতে স্থায়ী হয়ে যায়। বিয়ে করে বসবাস শুরু করে। পাকিস্তানের ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা টিটিপি নেতা বায়তুল্লাহ মাসুদের নেতৃত্বে পাকিস্তান থেকে বের হয়ে একটি ইসলামী স্টেট গড়ে তোলার চেষ্টায় লিপ্ত হয়। ওই এলাকাতে ব্রিটিশ আমলেও তৎকালীন সরকারের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। ২০০৫-০৬ সালের দিকে টিটিপি সোয়াতে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সেখানে শরিয়া আইন প্রয়োগ করতে সচেষ্ট হয়। ২০০৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী ওই এলাকায় তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ২০১২ সালে ঘটে মালালার ওপর তালেবান হামলার ঘটনা। এ বছরই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সোয়াত থেকে তালেবানদের বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়। তালেবানরা তখন ওয়াজিরিস্তানসহ সারা পাকিস্তানেই ছড়িয়ে পড়ে। এর আগেই ২০১১ সালে পাকিস্তানের নেভাল এয়ার বেস মেহরানে হামলা চালায় টিটিপি। গত ৮ জুন করাচির জিন্নাহ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে হামলা চালায় তারা। এর পর থেকেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ওয়াজিরিস্তানে টিটিপির বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে।

পাকিস্তানে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের পতনের পর থেকে সেনাবাহিনীর তালেবানবিরোধী অভিযানের সঙ্গে বেসামরিক রাজনৈতিক সরকারের তেমন সমন্বয় পরিলক্ষিত হয়নি। আফগাননীতি বিষয়েও পাকিস্তানের বেসামরিক রাজনৈতিক সরকারের তেমন প্রভাব নেই। কাশ্মির বিষয়েও প্রায় একই ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে। কাশ্মিরে ছয়-সাতটি উগ্রবাদী সংগঠন ভারতের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব সংগঠনের ওপরও পাকিস্তানের বর্তমান সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। আফগান ও আজাদ কাশ্মির বিষয়ে পাকিস্তাননীতিতে এখন দ্বিচারিতা দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তানের স্টাবলিশমেন্ট তাদের সহায়তা করছে; কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণের অভাবই এখন দেশটির বড় সংকট।

আজ (বুধবার) এ কথাগুলো বলার সময় পাকিস্তানে একটা অভাবনীয় ঘটনা ঘটে গেছে। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সভাপতিত্বে সেখানে সর্বদলীয় বৈঠক হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোনো সমঝোতা নয়, টিটিপির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান চালানো হবে। পেশোয়ারে যে হামলা হয়েছে তাকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও আইএসআইয়ের প্রধান তাঁদের ওপরই হামলা বলে বিবেচনা করছেন।

আমার ধারণা, পাকিস্তানের বেসামরিক সরকার ও সামরিক বাহিনীর আফগান ও কাশ্মিরনীতিতে পরিবর্তন আনার এখনই সময়। আফগানিস্তান ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে এটাই সুযোগ তাদের। কর্তৃত্বের বদলে আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা আনায় পাকিস্তানকে সহায়তা করতে হবে। কাশ্মিরনীতিতে পরিবর্তন এনে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা প্রশমিত করতে হবে। রাজনৈতিক ও সমারিকভাবে একত্রে উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেবে। পাখতুনখোয়ায় অন্যান্য উপজাতি নেতাদেরও এ অভিযানে সামাজিকভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। তা না হলে পাকিস্তানের যে ভঙ্গুর অবস্থা, তাতে ওই রাষ্ট্রটি পুরোপুরি ভেঙে পড়তে আর বেশি সময় নেবে না। তবে এ সমস্যার মধ্যে পাকিস্তান ভেঙে গেলে এ উপমহাদেশের জন্যও তা সুখকর হবে না। পাকিস্তানে ইসলামী উগ্রপন্থীদের উত্থান, ভারতে অতিহিন্দুত্ববাদী দলের উত্থানও উপমহাদেশজুড়ে সমস্যা বাড়াবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও সমস্যামুক্ত থাকবে না।

বাংলাদেশে এখনো ওই ধরনের সমস্যা নেই। এখানে জঙ্গি সংগঠনগুলোর পুনর্জাগরণের অবস্থা নেই। তবে রোহিঙ্গারা যেভাবে এ দেশে ভোটার তালিকায় স্থান পেয়ে যাচ্ছে, বিভিন্ন উগ্রপন্থী তৎপরতায় লিপ্ত হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা উদ্বেগের। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। এ বাস্তবতায় পাকিস্তান ও ভারতের সমস্যা বাংলাদেশেও সমস্যা সৃষ্টির সুযোগ করে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ওই সমস্যা মোকাবিলায় সরকারকে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে ভাবাদর্শগত কোনো উগ্র সংগঠনকে প্রতিহত করা সম্ভব নয়।

 

You Might Also Like