মধ্যপন্থী ইসলামি দলের ভবিষ্যৎ

২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী সক্রিয় মুসলিম মধ্যপন্থী দলগুলোর ভবিষ্যৎ কোন পথেÑ এটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। এসব দল মুসলিম সমাজে ইসলামি আন্দোলন এবং পাশ্চাত্যে রাজনৈতিক ইসলাম হিসেবে পরিচিত। মধ্যপ্রাচ্য হলো এসব ইসলামি দলের সবচেয়ে জোরালো তৎপরতার কেন্দ্র। ১৯২৮ সালে মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর এটি মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ ইতিহাসের বড় অংশ এসব দলকে পার করতে হয়েছে শাসকদের দমন পীড়নের মধ্য দিয়ে। তবে উপসাগরীয় কোনো কোনো দেশ অতীতে সীমিতপর্যায়ে এই আন্দোলনকে সমর্থন জুগিয়েছে।

চলতি দশকের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে আরব জাগরণ শুরু হলে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই গণজাগরণে ইসলামি দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিউনিসিয়া ও মিসরে গণবিস্ফোরণের মুখে স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে ইসলামি দলগুলো ক্ষমতায় চলে আসে। লিবিয়ার নির্বাচনেও সংসদের বেশি আসনে জয়ী হয় তারা। মরক্কোতে রাজতন্ত্রের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয় ইসলামিস্টদের নেতৃত্বে। ইয়েমেনে যে আন্দোলনের মুখে প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তাতে সামনের কাতারে ছিল ইসলামিস্টরা। সিরিয়ায় গণবিস্ফোরণ সরকারের নির্মম দমনের মুখে সশস্ত্র রূপ নেয়। এর বাইরে ভেতরে ভেতরে অন্য আরব দেশগুলোতেও দানা বাধতে থাকে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের আন্দোলন। মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্যের সরব নীরব সমর্থনের মধ্য দিয়ে আরব বসন্তের এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

কিন্তু এই পরিবর্তনের পর বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলোর বিজয় শুরু হলে নেপথ্য সমর্থনের ধারা থমকে যায়। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক শাসকেরা আরব জাগরণের নামে আরব দেশগুলোর শাসক পরিবর্তনের এই ধারার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। এর অংশ হিসেবে স্বৈরাচারের পতনের পর গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে বিলম্বিত করার প্রচেষ্টা চলে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়। তিউনিসিয়া ও মিসরে ইসলামিস্টদের বিজয়ের পর লিবিয়ায় যাতে ইসলামিস্টরা জয়ী হতে না পারে তার জন্য উদারপন্থী ও সেক্যুলারিস্টদের সংগঠিত করার প্রচেষ্টা শুরু হয়। এ চেষ্টায় ভালো ফল আসে লিবিয়ায়। মিসর ও তিউনিশিয়ায় ইসলামিস্টদের সরকার গঠনের পর কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়া হয় নতুন ব্যবস্থাকে ব্যর্থ করার জন্য।

প্রথমত, বিপ্লবোত্তর সময়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতি যাতে না আসে তার জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক সাহায্য এসব দেশে কার্যত বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে আন্দোলনজনিত অস্থিরতার পর বেকারত্ব নিরসন এবং জনগণকে কাজ দেয়া এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যে নতুন করে গতি আনতে যে অনুকূল পেিরবেশ দরকার হয় সেটি থাকেনি। আরব জাগরণে যে বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে জনগণ অংশ নিয়েছিল তাতে হতাশা নেমে আসতে শুরু করে।

দ্বিতীয়ত, উদারপন্থী ও সেকুলারিস্টদের সাথে ইসলামিস্টদের সুস্পষ্ট বিভেদরেখা সৃষ্টি করা হয়, যা জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখা দেয়। তিউনিসিয়াার আন নাহদার নেতৃত্বাধীন সরকার এটাকে মোকাবেলায় যতটা দূরদৃষ্টির পরিচয় দিতে পেরেছে ততটা দেখা যায়নি মিসরের ক্ষেত্রে।

তৃতীয়ত, গোপন হত্যাকাণ্ড ও সাম্প্রদায়িক হানাহানির কারণে আন্তঃসম্প্রদায় সঙ্ঘাত ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করা হয়। মোবারকের পতনের পর মিসরে একাধিকবার মুসলিম-খ্রিষ্টান দাঙ্গা বাধার ঘটনা ঘটে।

চতুর্থত, রাজনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতা দখলের ব্যাপারে উসকে দেয়া হয়। সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন বিশেষত সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাধা দিতে সামরিক নেতৃত্ব এবং বিচার বিভাগকে কাজে লাগানো হয়।

পঞ্চমত, আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামিস্ট উত্থানের ব্যাপারে ভয়ঙ্কর ভীতি ছড়িয়ে দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখার জন্য এক রকম গোপন কোয়ালিশন হয়। এ ব্যাপারে ইসরাইল এবং সৌদি আরব-আমিরাতের মতো পরস্পরবিরোধী শক্তির মধ্যে এজেন্ডাগত ঐকমত্য সৃষ্টি হয়।

এই মেরুকরণের পর প্রথম আঘাত আসে মিসরের মুরসি সরকারের ওপর। সরকার গঠনের পর থেকে ড. মুরসির সরকারকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেনাপ্রধান জেনালেল আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুরসি সরকারের পতন ঘটায়। এ জন্য পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে তাহরির স্কোয়ারে সামরিক কর্তৃপক্ষের ইন্ধনে লাখো লোকের সমাবেশ ঘটানো হয়। মুরসি সরকারের পক্ষে এর পাল্টা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলেও বিশ্ব গণমাধ্যমে একতরফা প্রচারণা পায় মুরসিবিরোধী বিক্ষোভ। সেনা অভ্যুত্থানের পর এর বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ ও রাবেয়া স্কোয়ারে মাসাধিককালের অবস্থানকে নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও দমন অভিযানের মাধ্যমে ইতি ঘটানোর চেষ্টা করে সেনা কর্তৃপক্ষ। সামরিক অভ্যুত্থানবিরোধী অবস্থান কর্মসূচি বানচাল ও অন্যান্য প্রতিরোধ ভেঙে দিতে তিন থেকে এগারো হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটানোর খবর বিভিন্ন সূত্র উল্লেখ করেছে। এই ব্যাপক হত্যার পাশাপাশি ব্রাদারহুডের প্রথম থেকে তৃতীয় স্থরের নেতৃত্ব মিলিয়ে ২০ হাজারের বেশি নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাতে দলটির আধ্যাত্মিক প্রধান ড. মোহাম্মদ বদিইসহ শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রায় সবাই রয়েছেন।

২০১৩ সালের ৩ জুলাই মিসরে জেনারেল সিসি সেনা অভ্যুত্থান ঘটানোর পর থেকে প্রায় দেড় বছর সময়ে নিয়মিতভাবে সামরিক অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভ চালিয়ে আসছে ব্রাদারহুড ও সমমনা ইসলামি দলগুলো। একই সাথে চলছে দমন পীড়ন হত্যাকাণ্ড এবং বিচারের নামে হাজার হাজার লোকের ফাঁসির দণ্ডাদেশ। আরব বলয়ের বিভিন্ন দেশে ইসলামিস্ট দমনের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন হলেও এর মধ্যে মিসরের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মিসরে গত দেড় বছরে সামাজিক শান্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতি কোনোটাই আনতে পারেনি সিসি সরকার। নিয়মিত সরকারবিরোধী বিক্ষোভ সমাবেশ হচ্ছে সেখানে। মারা যাচ্ছে মানুষ। রাজনৈতিক সমঝোতা বা সব মতের অন্তর্ভুক্তিমূলক পুনর্মিলনের ব্যাপারে নানা কথা শোনা গেলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন লক্ষ করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি আন্দোলনের সূতিকাগার এই দেশটিতে ব্রাদারহুডের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে? এ ব্যাপারে বিশ্লেষকদের সামনে পাঁচটি দৃশ্যপট রয়েছে।

প্রথমত, জেনারেল সিসির প্রশাসন  ব্রাদারহুডকে নির্মূলের ল্য বাস্তবায়ন করতে অব্যাহতভাবে অনমনীয় থাকবে। এ কাজ করতে পর্যাপ্ত অর্থকড়ির অভাব থাকলেও সরকার বেপরোয়াভাবে তা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবে। ব্রাদারহুডকে নির্বিচার গ্রেফতার,  সম্পদ বাজেয়াফত এবং হিংসাত্মক  নির্মম দমন অভিযান মোকাবেলা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, চলমান বিােভ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রশাসনকে ব্যতিব্যস্ত রেখে একপর্যায়ে বৃহত্তর জনপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হবে ব্রাদারহুড। আর এ সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে দলটি আবার মিসরীয় রাজনীতিতে ফিরে আসবে।

তৃতীয়ত, ইসলামপন্থীদের সাথে সরকারের এ মর্মে একটি রাজনৈতিক  সমঝোতা হবে যে, ব্রাদারহুড সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক আমলের মতো রাজনীতিতে সীমিত প্রবেশাধিকার পাবে। তাদের দলীয় তৎপরতা চালাতে দেয়া হবে। সংসদে সীমিত সংখ্যক আসনে জয়ী হওয়ার সুযোগও দেয়া হবে, তবে তারা প্রশাসন নির্দিষ্ট রেড লাইন অতিক্রম করবে না।

চতুর্থত, মুসলিম ব্রাদারহুড প্রচলিত প্রতিরোধ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী গতানুগতিক মনোভাবসম্পন্ন মধ্যপন্থী এবং দলের নেতৃত্ব অতিশয় আপসকামী আর আদর্শগতভাবে তাদের অনুসৃত পথ যথার্থ নয় এমন মনোভাবাপন্ন কট্টর ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়বে। উদারপন্থীরা প্রচলিত অহিংস প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে। বিচ্ছিন্ন হওয়া উগ্রপন্থীরা সহিংস ধারায় অগ্রসর হবে।

পঞ্চমত, মুসলিম ব্রাদারহুড বর্তমান বিােভ চালিয়ে যাওয়ার নীতির ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে রাজনৈতিক কার্যকলাপ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেবে এবং তাদের সেবামূলক কাজ ও আদর্শের দাওয়াত দেয়ার তৎপরতা চালিয়ে যাবে।

ওপরের এই পাঁচ দৃশ্যপটের কোনটি ব্রাদারহুডের ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষমাণ সেটি নিশ্চিত করে বলার মতো নয়। সেনা জান্তা সমর্থক সরকার এখনো পর্যন্ত ব্রাদারহুডকে পুরোপুরি নির্মূল করার কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর অন্য দিকে ব্রাদারহুড বিজয়যুক্ত প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্য অর্জনে সর্বাত্মক প্রতিরোধ সংগ্রামে অনমনীয়তা প্রদর্শন করছে। এ অবস্থায় সেনাসমর্থক সিসি সরকার অন্য কোনো বিকল্পের দিকে অগ্রসর হয়ে সমঝোতার পথ বেছে নেবে এমনটি মনে হচ্ছে না। ফলে স্বল্প বা মধ্য মেয়াদে ইসলামপন্থীদের সাথে বোঝাপড়া বা রাজনৈতিক পুনর্মিলন অথবা দূরবর্তী কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

ব্রাদারহুডকে প্রাথমিকভাবে যতটা প্রতিরোধ সৃষ্টিতে সক্ষম বলে সামরিক নেতৃত্ব মনে করেছিল বাস্তবে তাদের প্রতিরোধশক্তি তারচেয়ে অনেক বেশি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। নজিরবিহীন দমন অভিযান চালিয়েও তাদের নির্মূল তো দূরের কথা সেভাবে শক্তিহীন করতেও পারছে না সেনা সরকার। নির্যাতনের মুখে ব্রাদারহুডের সাংগঠনিক কাঠামো পাল্টে গেছে। তৃণমূল ইউনিটগুলোকে ছোট করে আনা হয়েছে। ব্রাদারহুডের পরিবর্তে সামরিক শাসনবিরোধী আইনানুগ শাসন ফেরানোর জন্য গঠিত জোটের নামে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যোগাযোগের জন্য গতানুগতিক মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্য নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হচ্ছে। দলের কার্যক্রম অনেকটা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাওয়ায় প্রাথমিকভাবে ব্রাদারহুড নেতৃত্বকে আটক করতে যে ধরনের সাফল্য সরকার পেয়েছিল এখন সেটি পাচ্ছে না। যুবক ও ছাত্রদের মধ্যে প্রতিরোধশক্তি আগের চেয়ে জোরদার হচ্ছে দিন দিন। ফলে রাজনৈতিক ইসলাম বা ইসলামি আন্দোলন যে নিকট ভবিষ্যতে মিসরে বড় শক্তি হিসেবে টিকে যাচ্ছে সে সম্ভাবনা প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছে।

এতে সামরিক নেতৃত্ব ও তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা ‘ব্রাদারহুড-উত্তর’ সময়ে আগের একনায়কতান্ত্রিক রাজনীতির অবসান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ধর্মীয় সংস্কার এবং অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক আন্দোলনপ্রক্রিয়া বিকাশের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার কোনোটাই এখন নিকট ভবিষ্যতে আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। মুরসির সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে জনগণের অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে যে আকাক্সক্ষা ছিল সেটাকে ব্যর্থ করে দেয়া হয়েছিল। সাধারণভাবে ধারণা করা হয়েছিল ব্রাদারহুড-উত্তর সময়ে আবার স্থিতি ও অর্থনৈতিক স্বাভাবিক উন্নয়নপ্রক্রিয়া ফিরে আসবে। বাস্তবে মুরসির এক বছর সময়ের তুলনায় সিসির দেড় বছরে অনেক বেশি রক্তপাত হয়েছে। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার বলতে কিছু নেই। কিন্তু এরপরও শান্তি ও স্বস্তি আসেনি মিসরীয় জনগণের মধ্যে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সামরিক সরকারকে স্থিত করতে দুই হাতে অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়েছে। কিন্তু এর বড় অংশ দুর্নীতিগ্রস্ত সামরিক নেতৃত্বের পকেটে চলে গেছে। গুণগত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে গণমাধ্যমে একতরফা প্রচারের পরও মিসরীয়দের মধ্যে সিসির গ্রহণযোগ্যতা ২০ শতাংশের নিচে রয়ে গেছে। ব্রাদারহুডের বৈরী জরিপগুলোতেও বলা হচ্ছে, এই দলটির পক্ষে এখনো ২৫ শতাংশের বেশি মানুষের সমর্থন রয়েছে। বাকি ৫০ ভাগের বেশি মিসরীয় সরকারের কার্যক্রমে আশাহত। এই অংশটি পরিবর্তনের বর্তমান ধারায় অসন্তুষ্ট। সিসির শাসনপ্রণালী এভাবে চলতে থাকলে এই অংশটি এক সময় ইসলামিস্টদের প্রতিরোধ কর্মসূচির একই সমান্তরালে চলে আসতে পারে। সেটি হলে দমন পীড়ন দিয়ে মিসরের আট কোটি মানুষকে নিশ্চুপ রাখা কঠিন হতে পারে।

প্রসঙ্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মিসরীয় রাজনীতিতে এখন যে ডিনামিক্স তা ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক মিসর প্রতিষ্ঠার কোনো ইঙ্গিত বহন করে না। বর্তমান সরকার  বা পুরনো রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ইসলামপন্থীদের একে অন্যের সাথে বোঝাপড়ায় আসতে না চাওয়ায় গণতান্ত্রিক চিন্তা নতুন করে শুরু হবে এমন কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। নতুন ব্যবস্থার সাথে ইসলামিস্টদের একাত্ম করে রাজনৈতিক নতুন অভিযাত্রার কোনো সম্ভাবনা এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান হচ্ছে না। এর বড় বিপদ হলো ব্রাদারহুডের একটি অংশ নিয়মতান্ত্রিক প্রতিরোধের পথে থাকলেও আরেক অংশ উগ্রবাদী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছেÑ যেটি পাঁচ দৃশ্যপটের একটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেটি হলে মিসরের সামরিক একনায়তন্ত্রকে নতুন করে একটি টেকসই ব্যবস্থায় রূপ দেয়া অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। এসব বিবেচনায় যে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে তাতে সিসির জঙ্গিমার্কা সেনা শাসন আরো বছর তিনেক টিকতে পারে। এর মধ্যে শাসকগোষ্ঠীর অবশ্যই মুক্ত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ইসলামিস্টদের অন্তর্ভুক্ত করার মতো কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সম্মত হতে হবে। আর যেকোনো মুক্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ব্রাদারহুডের পুনরুত্থান অনিবার্য হয়ে উঠবে।

১৯৫৪ সালে জামাল আবদুন নাসের ব্রাদারহুড দমনে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছিলেন জেনারেল সিসির নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তা সেটিকে সামনে রেখে অগ্রসর হয়। সে সময় ব্রাদারহুডের উপপ্রধান আবদুল কাদের আওদাহ সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কর্মসূচি তুলে নিয়েছিলেন। ফলে বিনা বাধায় নাসের ব্রাদারহুড দমন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। কিন্তু ২০১৩ সালের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন যে প্রতিরোধ মিসরে দেখা দিয়েছে তা সমাজের অনেক গভীরে প্রোথিত। ফলে আরো ২০ বছর একনায়কতান্ত্রিক শাসন চালিয়ে গিয়ে তারপর গণতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা উন্মুক্ত করার যে কথা সিসির পরামর্শকেরা বলছেন, তার সাথে বাস্তবতার একেবারেই সম্পর্ক নেই। আর সিসির আঞ্চলিক উচ্চাভিলাষ বাস্তবায়ন করাও সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। এসব বিবেচনায় ব্রাদারহুড বিজয়ী হয়ে মিসরের রাজনীতিতে আবার ফিরে আসার যে দৃশ্যপট ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে সেটি দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি জোরালো। তবে এ জন্য সময় নিতে পারে কয়েক বছর।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ইসলামের ভবিষ্যৎ প্রশ্নে মিসর অবশ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক। কিন্তু এর বাইরেও অনেক ফ্যাক্টর সক্রিয় রয়েছে। আরব জাগরণের সূতিকাগার তিউনিসিয়ায় মধ্যপন্থী ইসলামি দল আন নাহদাকে নির্মূল করার জন্যও পরিকল্পনায় সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু সেখানকার আন নাহদা দল তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তে অনেক বেশি পরিণামদর্শিতার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছে। আন নাহদাকে ব্যর্থ করার জন্য নানা ধরনের অন্তর্ঘাতী ঘটনা এবং অস্থিরতা সৃষ্টির চক্রান্ত করা হয়েছে। কিন্তু দলটি তাদের আদর্শিক এজেন্ডার চেয়েও গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের এজেন্ডাকে আগে স্থান দিয়েছে। এতে সেখানে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ প্রতিপক্ষের কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও বিপুল আসনে জয়ী হয়ে শক্তিমান বিরোধী দল হচ্ছে আন নাহদা। ২১ ডিসেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আন নাহদা দুই প্রার্থীর কাউকে সমর্থন করছে না। ফলে যেই নির্বাচিত হোক না কেন, তিউনিসিয়ার রাজনীতি থেকে আন নাহদাকে বিদায় করার মতো পরিস্থিতি দেখা দেবে না।

এর মধ্যে লিবিয়ার পরিস্থিতিও যথেষ্ট জটিল আকার নিয়েছে। সেখানে সিসির ঘনিষ্ঠবন্ধু জেনারেল হাফতারের ইসলামিস্টদের নির্মূল করার অভিযানের ঘোষণা ব্যাকফায়ার করেছে। সামরিক শক্তির দিক থেকে এখনো প্রাধান্য বিস্তার করে আছে ইসলামিস্টরা। মিসর লিবিয়ায় সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়লেও তাদের সেকুলার মিত্রদের জয়ী করতে পারবে এমন অবস্থা নেই। প্রতিবেশী দেশ সুদানে ইসলামিস্ট প্রাধান্য অনেক বেশি জোরালো। জর্ডানে ব্রাদারহুড সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। তারা রাজতন্ত্রবিরোধী কোনো অবস্থান নেয়নি বলে স্বার্থগত সঙ্ঘাত জোরালোভাবে নেই বাদশাহ আবদুল্লাহর সাথে। তবে সেখানে ইসলামিস্ট নির্মূলের কোনো অভিযানে বাদশাহ জড়াতে চাইলে রাজতন্ত্রকে নিরাপদ রাখা কঠিন হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির জন্য ফিলিস্তিন এবং প্রতিরোধ সংগঠন হামাস একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। মিসর ও শীর্ষ আরব দেশগুলোর সমর্থন নিয়েও ইসরাইল হামাসের বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারেনি। হামাসের প্রতিরোধযুদ্ধ পুরো আরব জনমতকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে, সেসব দেশের শাসকদের ইচ্ছার বাইরে হলেও ইসরাইলের আগ্রাসী হামলার প্রতিবাদ করতে হয়েছে। সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী ইয়েমেনের পরিস্থিতি দেশটির জন্য বেশ উদ্বেগজনক। সেখানকার রাজনীতিতে সুন্নি ইসলামিস্ট  এবং শিয়া ইসলামিস্ট দুটোই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। হুতি গেরিলাদের রাজধানী দখলের ঘটনা সৌদি স্বার্থের জন্যও বিপর্যয়কর। একইভাবে সার্বিক মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামিস্ট বা রাজনৈতিক ইসলাম দমনের নেতা সৌদি আরবের নিজস্ব ভূখণ্ডে ব্রাদারহুডের রয়েছে বিরাট প্রভাব। সেখানে কোনো পক্ষই প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে নির্মূল অভিযানে নামেনি। তেমন পরিস্থিতি কোনো পক্ষের জন্য সুখকর হওয়ার সম্ভাবনাও নেই।

আইসিসের ইসলামিক স্টেট রাজনৈতিক ইসলামবিরোধী রাষ্ট্রীয় শক্তির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। মধ্যপন্থী ইসলামি শক্তির বিরুদ্ধে যতই নির্মূল অভিযান চালানো হচ্ছে ততই শক্তি বাড়ছে কট্টরপন্থীদের। কট্টর ধারার সাথে মধ্যপন্থীদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কোনো মিল নেই। এক পক্ষ যেখানে অহিংস গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতায় যাওয়ার কথা ভাবে, সেখানে অন্য পক্ষ সহিংস পন্থায়  তাদের কাক্সিত রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য মধ্যপন্থীরা অনেক বেশি নিরাপদশক্তি। মধ্যপ্রাচ্যে এই ধারার রাজনীতিকে সমর্থনদানকারী কাতার ও তুরস্কের বড় যুক্তি ছিল এটি।

উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের চাপে সেই অবস্থানে কাতার নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও তুরস্ক তার অবস্থানে অনমনীয় রয়েছে। এই রাজনৈতিক শক্তির সাথে ইরানের যেকোনো সমঝোতা সৌদি-মিসর-আমিরাত বলয়ের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সিরিয়াকে কেন্দ্র করে এই দুই ধারার মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ যেমন রয়েছে তেমনিভাবে ফিলিস্তিন ও লিবিয়া প্রশ্নে তাদের স্বার্থের সম্মিলনও রয়েছে। এসব বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে রাজনৈতিক ইসলাম বা ইসলামি আন্দোলনের শক্তিকে নিভিয়ে দেয়ার যে প্রচেষ্টা এখন চলমান রয়েছে তা এক সময় শেষ হয়ে যাবে। এ জন্য সময় নিতে পারে বছর পাঁচেকের মতো। আর এক দশক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূগোলের পরিবর্তন নিয়ে যে জল্পনা চলছে তাও একটি অবয়ব নিতে পারে।

ইসলামিক রাজনৈতিক শক্তির ব্যাপারে ফিলিস্তিন বংশো™ভূত ব্রিটিশ সাংবাদিক ড. আজেম তামিমির বক্তব্যটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ‘ব্রাদারহুডের আবেদন ফুরিয়ে গেছে বা একে নিষিদ্ধ করা উচিত এমন দাবি করা নিরর্থক। ব্রাদারহুড হলো একটি আদর্শ। কোনো আদর্শের মৃত্যু ঘটে না; এটি একটি আশা এবং আশা কখনো ফুরিয়ে যায় না। এটি একটি সংস্কার আন্দোলন। আর মুসলিম বিশ্বাসের মর্মমূলে রয়েছে এই সংস্কার। তাই যারা দ্রুত কিছু অর্জন করতে চান বা হতাশ কিংবা মরিয়া, তাদেরকে বলব, ব্রাদারহুডকে মুছে ফেলার চেষ্টা করবেন না। যত দিন ব্রাদার আছেন, তত দিন ব্রাদারহুড থাকবে। এই আন্দোলন ফের ঘুরে দাঁড়াবে। সঙ্কটই হয়তো রূপ নেবে রহমতে।’

You Might Also Like