একগুঁয়েমির খড়গে সঙ্কটাপন্ন সুন্দরবন

সুন্দরবন ক্রমশ যেন তার জৌলুস হারাচ্ছে। কথিত উন্নয়নের খড়গে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন এখন সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বিতর্কিত বাঘরক্ষা প্রকল্প, রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ থেকে সর্বশেষ ফার্নেস তেলবাহী কার্গো ডুবির ঘটনা এ বনের অস্তিত্বের মূলে আঘাত হেনেছে।

সাতদিনের পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক’র এক মন্তব্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবন বন থাকুক আর না থাকুক, উন্নয়ন চলবেই। সেই উন্নয়ন জোয়ারে তাবৎ বাধা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনার সরকার সুন্দরবনকে বিপদাপন্ন করেই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে উদ্যোগী হয়েছে। দেশের মধ্য থেকে অনেক রকম বাধা এসেছে বটে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে বাধা পাত্তা দেননি। তার যুক্তি- এক. উন্নয়ন করতে গেলে জলা, বনের কিছুটা ক্ষতি স্বীকার করতেই হবে। উন্নয়নের সুফল এই ক্ষতি পুষিয়ে দেবে। দুই. এখন উন্নত প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলে পরিবেশের ক্ষতি সহনীয় মাত্রায় হবে। ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি হবে। তিন. সারা দেশে বিদ্যুতের জোয়ার এলে, এরকম ছোটখাটো দু’চারটে ক্ষতি মানুষ ভুলে যাবেই।

সুন্দরবনে শ্যালা নদীতে তেলবাহী জাহাজ দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে সাড়ে ৩ লাখ লিটার ফার্নেস অয়েল সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে দৃশ্যমান যেসব ক্ষতি দেখা যাচ্ছে- এক. সুন্দরবনের ভেতরে বিভিন্ন খাল, ছোট নদীতে এ তেল ছড়িয়ে পড়েছে। শ্বাসমূলীয় (ম্যানগ্রোভ) বনের উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দুই. বনের গাছ, উদ্ভিদ, জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তিন. সুন্দরবনের শ্যালা, পশুর, বলেশ্বর নদীর পানি দূষিত হয়েছে। ফলে মাছ, শুশুক, ডলফিনের জীবন বিপন্ন হয়েছে। চার. সুন্দরবনের নদীর পানি নষ্ট হওয়াতে সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট অধিবাসী যারা এই নদীর ওপর প্রাণ ও জীবিকার কারণে নির্ভরশীল, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাবার পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। নদী সংলগ্ন জনগণের ঘরে পালিত হাঁস, মুরগি এই পানিতে বিচরণ করত সেসব প্রাণীর প্রাণ সংহার হচ্ছে। স্থানীয় অধিবাসীদের জীবন দুঃসহ হয়ে উঠছে। পাঁচ. সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়া তেল উদ্ধার কাজে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়িয়ে পড়ায় বনের নির্জনতা বিপন্ন হচ্ছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ সব বন্যপ্রাণীর জীবন হুমকির মধ্যে পড়ছে। ছয়. অবৈজ্ঞানিক উপায়ে অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে ৩০ টাকা লিটার দরে এই তেল কেনার লোভ দেখিয়ে যেভাবে স্থানীয় জনমানুষকে ব্যবহার করা হচ্ছে, দ্রুতই তারা স্বল্পমেয়াদে ও দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সাত. জোয়ার-ভাটার নদীতে ইতোমধ্যে মাছশূন্যতা দেখা দিয়েছে। ফার্নেস অয়েল যেভাবে বিস্তৃত এলাকাকে ছুঁয়েছে তাতে দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের অপ্রাকৃতিক মৃত্যু ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে প্রশ্ন তোলা হয়, এ তেল কেন পরিবহন করা হচ্ছে? কোথা থেকে এ তেল কোথায় যাচ্ছে? কার স্বার্থে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে এ রকম বাণিজ্যিক জলযান চলার অনুমতি দেয়া হয়েছে? কারা এসব জলযানের মালিক? এর সঙ্গে যারা জড়িত তারা আর্থিকভাবে কতটুকু লাভবান হচ্ছে? সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেলে কেন এই নতুন নৌরুট ব্যবহৃত হচ্ছে? জবাবও দেওয়া হয়েছে এভাবে, এ তেল পরিবহন করা হচ্ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে। মংলা বন্দর থেকে এ তেল আনা হচ্ছিল। রেন্টাল, কুইক রেন্টালের মতো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চাহিদা মেটাতে এ জ্বালানি পরিবহন করছিল প্রায় ৫০ বছর বয়সী ব্যবহার অনুপোযোগী অয়েল ট্যাংকার। এসব জলযানের মালিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এবং তাদের ঘনিষ্ঠজন। নানা প্রভাব খাটিয়ে, টাকার বিনিময়ে এ নৌরুটটি চালু করা হয়। অথচ দীর্ঘদিন ধরে মংলা-বেতবুনিয়া-ঘষিয়াঘাটি নৌরুট বন্ধ। বিকল্প পথ হিসেবে বনের মধ্য দিয়ে নৌরুট চালু করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে বনবিভাগ আপত্তি দিলেও তা ধোপে টেকেনি। এভাবে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলের উদ্দেশ্য হচ্ছে আখেরে ভারতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নির্মিত বিতর্কিত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও মালামাল সরবরাহের সংক্ষিপ্ত ও সাশ্রয়ী নৌরুট প্রতিষ্ঠিত করা। যেকোনো মূল্যে, পরিবেশ প্রতিবেশ ধ্বংস করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে নীতি সরকার নিয়েছে তার বাস্তবায়ন করতেই এ নৌরুটকে স্থায়িত্ব দেয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

Sundarbanসুন্দরবন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন। জাতিসংঘের বিজ্ঞান ও শিক্ষা ঐতিহ্য বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। জাতিসংঘের জলাভূমি বিষয়ক সংস্থা রামসার কর্তৃপক্ষ সুন্দরবনকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশ্ববাসীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও বিশেষ শ্রেণির ডলফিনের জন্য বিখ্যাত এ সুন্দরবন। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে মানুষ, নৌযান, যত বেশি চলাচল করবে সুন্দরবনের ভেতরে বাস করা সব প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য তা বিপজ্জনক হবে, এ চিন্তায় ইউনেস্কো, জাতিসংঘসহ দেশি-বিদেশি নানা সংস্থা ও ব্যক্তিÑ প্রতিষ্ঠান সুন্দরবনকে রক্ষার আহ্বান জানাচ্ছে বেশ ক’বছর ধরেই। সরকার তাতে গা লাগায়নি। বরং গায়ের জোরেই সুন্দরবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে উদ্যোগী হয়েছে। সরকার এ কাজ করতে আত্মঘাতী দায়মুক্তির আইন বানিয়েছে। মানুষের সব প্রতিবাদ উপেক্ষা করে এ দায়মুক্তির আইনের মেয়াদ বছরের পর বছর বাড়িয়ে চলেছে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানো এ দায়মুক্তির অস্বাভাবিক, কালো আইন ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ নামে পরিচিত। এ জনঅহিতকর, অগণতান্ত্রিক, স্বৈরমুখী কালো আইনের ৯, ১০, ১৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে-

“আদালত, ইত্যাদির এখতিয়ার রহিতকরণ

৯। এই আইনের অধীনকৃত, বা কৃত বলিয়া বিবেচিত কোন কার্য, গৃহীত কোন ব্যবস্থা, প্রদত্ত কোন আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা সম্পর্কে কোন আদালতের নিকট প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।

সরল বিশ্বাসে কৃত কাজকর্ম রক্ষণ

১০। এই আইন বা তদধীন প্রণীত বিধি, সাধারণ বা বিশেষ আদেশের অধীন দায়িত্ব পালনকালে সরল বিশ্বাসে কৃত, বা কৃত বলিয়া বিবেচিত কোন কার্যের জন্য কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে দেওয়ানী বা ফৌজদারী মামলা বা অন্য কোন প্রকার আইনগত কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না।

এই আইনের অধীন গৃহীত কাজের হেফাজত

১৪। এই আইনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও, এই আইনের অধীন কৃত কাজকর্ম বা গৃহীত ব্যবস্থা এমনভাবে অব্যাহত থাকিবে ও পরিচালিত হইবে যেন এই আইনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয় নাই।”

‘সাপ্তাহিক’ পত্রিকা আরো লিখেছে, যে ভারতকে তুষ্ট করতে সরকার উন্নয়নের কথা বলে সুন্দরবনকে ধ্বংস করতে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করছে সে ভারতের জনগণ সুন্দরবনের নিকটে নিজ দেশে কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে দেয়নি। শুধু তা-ই নয়, ভারতের আদালত সুন্দরবন সুরক্ষায় কতটুকু তৎপর তার নমুনা মেলবে আনন্দবাজার পত্রিকায় গত ১০ ডিসেম্বর  প্রকাশিত “কেমন আছে ম্যানগ্রোভ, উপগ্রহ-চিত্র চায় আদালত” শীর্ষক সংবাদটি পড়লে- “সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ নষ্ট হতে বসেছে, এই আশঙ্কা করে জাতীয় পরিবেশ আদালতের কলকাতা বেঞ্চই সেপ্টেম্বরে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছে। এই পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের বর্তমান চেহারা কী রকম, নদী বা খাঁড়িতে দূষিত ডিজেল ব্যবহার করা হয় কি না, সেখানে বেআইনি ইটভাটা চলে কি না অথবা সুন্দরবন এলাকায় অবৈধ হোটেল বা রেস্তোরাঁ বন্ধ করা হয়েছে কি না ইত্যাদি বিষয়ে রাজ্যের অবস্থান জানতে চেয়েছে পরিবেশ আদালত। ওই আদালতের বিচারপতি প্রতাপ রায় এবং পি সি মিশ্রের ডিভিশন বেঞ্চ এ দিন নির্দেশ দিয়েছে, সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে উপগ্রহ-মানচিত্র অবশ্যই থাকতে হবে। সুন্দরবনের সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্তকে আদালত-বান্ধব নিযুক্ত করা হয়েছে।

সুভাষবাবু জানান, ম্যানগ্রোভের পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্য সরকারের কাছে আগেই রিপোর্ট তলব করা হয়েছিল। কিন্তু বন দফতর এখনও কোনও রিপোর্টই পরিবেশ আদালতে জমা দিতে পারেনি। এ দিন ম্যানগ্রোভ মামলার শুনানি ছিল। পরিবেশ আদালতের ডিভিশন বেঞ্চ রাজ্যের আইনজীবী বিকাশকুমার গুপ্তকে নির্দেশ দেন, ২১ জানুয়ারি সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ সংক্রান্ত উপগ্রহ-চিত্র আদালতে জমা দিতে হবে।”

অথচ বাংলাদেশ সরকার যেন সুন্দরবনকে খুব পরিকল্পিত উপায়ে টার্গেট করেছে। তাই সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে সরকারের মাথায় আছে ‘বড় বড় উন্নয়ন পরিকল্পনা’। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ফুলবাড়ী কয়লাখনি নির্মাণ সরকারের টার্গেট। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে নৌরুট চালু করে এ প্রকল্পগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধা দিতে চায় সরকার। তাতে সুন্দরবন ধ্বংস হলেও কিছু যায় আসে না। মংলা বন্দরকে সচল-সক্রিয় করে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে সহজ, সাশ্রয়ী মূল্যে কয়লা ও উন্নয়ন প্রকল্পের সব সামগ্রী পরিবহনের জন্যই সরকার জাতিসংঘ, ইউনেস্কো, দেশের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নিষেধ, নিবেদন, পরামর্শ উপেক্ষা করেছে।

সুন্দরবন রক্ষায় হাইকোর্টে রিট : বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশনা চেয়ে রিট দায়ের করা হয়েছে। গত ১৫ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দা শাহিন আরা লাইলী হাইকোর্টে রিটটি দায়ের করেন। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল হাসানের দ্বৈত বেঞ্চে শুনানি করে পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৫ জানুয়ারি তারিখ ধার্য করেছেন। রিটে বিবাদী করা হয়েছে- পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব, শিপিং করপোরেশনের চেয়ারম্যান, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ, এসপি খুলনা ও বাগেরহাট।

রিটকারী আইনজীবী এখলাছ উদ্দিন ভুইয়া বলেন, গত ৭ ডিসেম্বর সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলের জাহাজ ডুবে। ওই জাহাজের তেলে সুন্দরবনের পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এর ফলে জীববৈচিত্র্যসহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হতে পারে। সুন্দবরন রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশনা চেয়েছি আদালতের কাছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু।

১৬ কারণে সুন্দরবন ও বাঘ হুমকির মুখে : এদিকে, গত বুধবার রাজধানী ঢাকার বন ভবনে টাইগার একশন প্ল্যান নিয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি আয়োজিত এক কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেড়শ’ বছর আগে ১৭টি জেলায় বাঘের বিচরণ ছিল। কিন্তু দিন দিন তা কমে গিয়ে বাংলা বাঘ (রয়েল বেঙ্গল টাইগার) এখন কেবল সুন্দরবনেই দেখা মিলে। সময়ের সাথে সাথে সীমাবদ্ধ হয়েছে তাদের বিচরণ। তবে সুন্দরবনের অন্তত ১৬টি কারণে বাঘের জীবনচক্র হুমকির মুখে।

ইউএসএআইডি’র গবেষক ড. স্বন্দীপ শর্মা বলেন, বাঘের অস্তিত্বের জন্য সুন্দরবনে অন্তত ১৬ ধরনের হুমকি বিদ্যমান। সবচেয়ে বেশি হুমকির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- বন ধ্বংস করে কাঠ সংগ্রহ, মাছ ও কৃষিদ্রব্য আহরণ, পশুখাদ্য হ্রাস, বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণ। এছাড়া, সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, মিঠা পানি প্রবাহ কমে যাওয়া, শব্দ দূষণ, সাগরের পানিতে এসিড বেড়ে যাওয়া, আগুন লাগা, বসতি স্থাপন, গাছগাছালির রোগ, কলকারখানাসহ বায়ুমন্ডলের গ্যাস, আক্রমণকারী বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী, তাপমাত্রার পরিবর্তন, ঝড় ও জোয়ার ভাটার তারতম্য এবং নদী দূষণও সুন্দরবনের জন্য ব্যাপক হুমকি। যা বাঘের জীবন চক্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, পৃথিবীতে যত বাঘ আছে তার ৫০ শতাংশ আছে সুন্দরবনে। তাই সুন্দরবনের (বাংলাদেশ-ভারত) দুই অংশেই সঠিক গবেষণার মাধ্যমে বাঘ রক্ষায় কাজ করতে হবে।

এ সময় বন বিভাগের প্রধান রক্ষক মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, সুন্দরবন কেবল জাতীয় সম্পদই নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক সম্পদ। আর বাংলা বাঘ কেবল সুন্দরবনেই রয়েছে। এমন বাঘ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। তাই সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় চ্যালেঞ্জ শুধু বাংলাদেশ বা ভারতের নয়। এটি সারা বিশ্বের জন্যও চ্যালেঞ্জ। তাই সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

কর্মশালায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, বন রক্ষক ড. তপন কুমার দে, গবেষক ড. স্টিভেন মনফোর্ট, মোহাম্মদ ইকবাল হুসেন প্রমুখ। এছাড়া ভারত, বাংলাদেশ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের বাঘ গবেষকরা এতে অংশগ্রহণ করেন।

উন্মুক্ত আলোচনায় তারা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে কার্গো বা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকেও হুমকি বলে জোর বক্তব্য রাখেন। এ সময় তারা বাংলাদেশের উজানে ফারাক্কাসহ যতগুলো বাঁধ রয়েছে, তা থেকে পানি প্রবাহের ব্যবস্থা নেওয়া জন্য গুরুত্বারোপ করেন। এজন্য সরকারের জোরালো ভূমিকা রাখার প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

You Might Also Like