শোকে মুহ্যমান পাকিস্তান

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারের স্কুলটির শ্রেণিকক্ষজুড়ে এখনো রয়েছে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। রক্তের দাগ লেগে আছে জানালা-দরজায়। মাটিতে কান পাতলে হয়তো শোনা যাবে মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করা শিশুদের আর্তনাদ। কয়েক দিন পর হয়তো এ রক্তের দাগ সেখানে থাকবে না। কিন্তু ভয়াবহ ওই ঘটনায় মানুষের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা হয়তো শিগগিরই মুছবে না। দুঃসহ স্মৃতি তাদের তাড়া করে বেড়াবে সারা জীবন।

মঙ্গলবার পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরিচালিত আর্মি পাবলিক স্কুলে চালানো তালেবানের হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪১-এ দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৩২ জনই শিশু। বাকিরা স্কুলের শিক্ষক ও কর্মচারী।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাতজন জঙ্গি বিপুল বিস্ফোরক ও অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। স্কুলের পুরো নিয়ন্ত্রণ সেনাবাহিনীর দখলে।

এ ঘটনায় পাকিস্তানজুড়ে চলছে মাতম। এটা শুধু পাকিস্তানিদের নয়, বিশ্ববাসীকেও করেছে স্তম্ভিত, হতবাক, নির্বাক। ঘৃণ্য এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে শোক জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা এ ঘটনাকে হৃদয়বিদারক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

মঙ্গলবারের ওই ঘটনার পর পেশোয়ার শহর বুধবার যেন মৃত্যুপুরীর রূপ নিয়েছে। চোখের জলে নিজের সন্তানদের কবর দেওয়ার কাজ শুরু করেছেন বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরা। প্রাণপ্রিয় সন্তানদের শুধু সমাধিই নয়, সঙ্গে এক বুক স্বপ্ন ও ভালোবাসাও মাটির নিচে চাপা দিচ্ছেন তাদের বাবা-মা।
পেশোয়ারে স্কুলশিশুদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ফুল হাতে সেখানে হাজির হয়েছেন হাজারো মানুষ। একই সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি আহত শিশুদের পরিবারের উৎকণ্ঠা, আর অপেক্ষা কাটছে না। তারা হয়তো জানেন না তাদের শিশুদের ভাগ্যে আসলে কী ঘটতে চলছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এ ঘটনায় তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি ঘৃণিত এ ঘটনায় কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।

এ ঘটনাকে সর্বকালের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি উল্লেখ করে নওয়াজ শরিফ বলেন, ‘প্রতিটি শিশুটির শরীর থেকে ঝরে যাওয়ার রক্তের প্রতিশোধ নেব আমরা। হায়েনারা আজ যে ঘটনা ঘটিয়েছে এর দাঁতভাঙা জবাব তাদের পেতেই হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণার পরপরই প্রতিশোধ হিসেবে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জঙ্গি আস্তানায় ব্যাপক হামলা শুরু করেছে। টুইটারে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র অসিম বাজওয়া জানিয়েছেন, খাইবার প্রদেশের দুর্গম এলাকায় ১০ বার বিমান হামলা চালানো হয়েছে। জঙ্গি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে আরো বড় ধরনের অভিযান চালানো হবে।

ছেলের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে এক বাবা বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, ‘আমার একমাত্র সন্তান ছিল সে। বয়স ১৫। অষ্টম গ্রেডে পড়ত। আমি আদালতে ছিলাম। যখন আমি ঘটনাটি শুনলাম, তখন দ্রুত হাসপাতালে চলে আসি। তার বুকে ও হাতে গুলি লেগেছে। আমি দুঃখিত, এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে না পারায়।’

আরেক বাবা টুইটারে বলেন, ‘আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। মাটিতে মিশিয়ে দিলাম সেই স্বপ্ন।’

You Might Also Like