আমার আম্মাকে যেভাবে না ফেরার দেশে চলে যেতে হলো

সাঈদ তারেক :

না, এমন কোন লক্ষণ ছিলনা যে হাসপাতালে না নিলে তিনি আর বাঁচবেননা।
কিছুদিন যাবত ঠিকমত খেতে পারছিলেননা। শক্ত খাবার গিলতে কষ্ট হচ্ছিল। মাঝে মাঝে ব্লেন্ড করে চামচ দিয়ে খাওয়াতে হচ্ছিল। তবে বুঝতে পারছিলাম দিনে দিনে বেশ দুর্বল হয়ে পড়ছেন। সকাল বিকাল প্রেশার মেপে সুগার চেক করে অষুধ ইনসুলিন দেয়ার তদারকি নিজেই করে আসছিলাম দীর্ঘদিন ধরে। ফলে প্রেশারজনিত কারন বা সুগারের কারনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার আশংকা খুব একটা ছিলনা। তারপরও সপ্তাহখানেক যাবতই ঠিক করে রেখেছি একবার হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চেকআপ করিয়ে আনবো। মাস দেড়েক আগে পা পিছলে মেঝেয় পড়ে গিয়েছিলেন, থাইতে ছিলে গিয়েছিল বেশ খানিকটা। ইনফেকশনমত হয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে নিয়ে সেটা দেখিয়ে আনা হয়েছে। ডাক্তার অষুধ দিয়েছিলেন, খাওয়ানো হয়েছে, সেড়েও গেছে। কিন্তু আট দশদিন ধরে লক্ষ্য করছিলাম আগের মত শক্তি পাচ্ছেননা। হাঁটছেন খানিকটা ঝুঁকে। কেমন একটু অস্থিরভাব। যে লোক সারারাত প্রায় জেগেই থাকে সে প্রায়সময় বিছানায়ই পড়ে থাকে। ডাকলে ওঠেননা খেতে চাননা এমনকি তিনদিন বাথরুম পর্যন্ত বন্ধ।
সব মিলিয়ে মনে করছিলাম যত দ্রুত সম্ভব একবার হাসপাতালে নিয়ে কয়েকদিন রেখে পুরো চেক আপ করিয়ে আনা দরকার। চালু অষুধগুলো যদি বদলাতে হয় বদলিয়ে নতুন অষুধ আনবো। চারদিন যাবতই নেই নিচ্ছি করছি। বন্ধু আলম সাহেবের বিল্ডিংয়ে প্যান প্যাসিফিক হাসপাতাল, শাহজাহানপুরে। তিনি নিজেও সে হাসপাতালের একজন পরিচালক। কথা বললাম। সোৎসাহে বললেন কালই নিয়ে আসেন। বাসার অন্যদের মত- কাছের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নিতে। যেহেতু ভর্তী থাকবেন, সবসময় যাওয়া আসা করতে হবে, সুবিধা হবে। সিদ্ধান্ত হলো এখানেই নিয়ে যাবো।
ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল খুব বিজি হাসপাতাল। কেবিন পাওয়া যায়না। বন্ধু সাদেক সিদ্দিকী বললেন তার পরিচিত ডাক্তার আছে, কথা বলে তিনি কেবিন ব্যবস্থা করে দেবেন। বুধবার দিন ঠিক করলাম। কিন্তু ব্যাটে-বলে মিললো না, আম্মাকে আর সেদিন হাসপাতালে নেয়া হলোনা। আবার ফোন করলাম আলম সাহেবকে, বৃহষ্পতিবার প্যান প্যাসিফিকে নিয়ে যাবো। বৌমা বললো ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে আম্মার ডায়াবেটিসের ডাক্তারের সাথে তার ফোনে কথা হয়েছে। আশ্বাস দিয়েছে আম্মাকে নিয়ে গেলে ভর্তীর ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু বৃহষ্পতিবার দুপুরে ফিরে জানালো ডাক্তার কেবিনের ব্যবস্থা করতে পারবেননা। সেদিনও তাকে নেয়া হলোনা। আবার আলম সাহেব। বললাম কাল নিয়ে আসছি। আলম সাহেব জানালেন তাদের হাসপাতালে শুক্রবার কোন সিনিয়র বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার থাকেননা। যেন শনিবার নিয়ে যাই। অগত্যা শনিবারই ফাইনাল হলো।
শুক্রবার ঘুম থেকে উঠতে খানিকটা বেলা হয়ে গেল। আমি সাধারানত ঘুম থেকে উঠে আগে আম্মার রুমে গিয়ে দেখে আসি কি অবস্থায় আছেন। প্রায়ই দেখি শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছেন। নইলে ঘুমে। কিন্তু এদিন কাছে গিয়ে দেখি প্রায় চোখ উল্টে পড়ে আছেন। এই লক্ষন আমার চেনা। সুগার ফল বা হাইপো হয়ে গেলে এমন হয়। এর আগেও এমন অবস্থা দুই একবার হয়েছে। এ অবস্থায় করনীয় চিনির শরবত খাওয়ানো। দ্রুত চিনির পানি নিয়ে এসে চামচ দিয়ে খাওয়ানো হলো। কিন্তু লক্ষ্য করলাম এদিন গলা দিয়ে পানি নামতে চাইছিল না। গলায় পানি ঢেলে দিলে ভেতরে ঘররজাতীয় আওয়াজ হচ্ছিল। ভয় হচ্ছিল পানিতে না নি:শ্বাষ আটকে যায়। সাবধানে খানিকটা সময় নিয়ে আরও কয়েক চামচ পানি খাওয়ানোর পর তার জ্ঞান ফেরে। চোখ মেলেন। এ সময় সুগার মেপে পাওয়া যায় পাঁচ। খানিকটা উন্নতি হয়। কিন্তু গলার ভেতর থেকে ঘরর আওয়াজটা রয়ে যায়। এই আওয়াজ আমার কাছে নতুন। বুঝতে পারছিলাম না এটা কি কফ জমে যাওয়া না গলায় পানি আটকে যাওয়ার কারনে। আম্মার হাঁফানি বা এ্যাজমাজাতীয় কোন অসুখ নাই। দ্রুত প্রেশার মাপি। ১৪৪ বাই ১০০। এবার খানিকটা ভয় পেয়ে যাই। মনে হলো খুবই বেশী। বুঝতে পারছিলাম না কি করলে প্রেশার কমবে। এ সময় মনে হচ্ছিল আম্মার শ্বাষ নিতে কষ্ট হচ্ছে। হয়তো বুকে ব্যাথা। আর রিষ্কে যাওয়া ঠিক মনে করলাম না। সিদ্ধান্ত নিলাম ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাবো। তারপর ওরা যা করে। আম্মা তখন হাঁফাচ্ছেন কিন্তু পুরো সেন্সে। জিজ্ঞেস করলাম, আম্মা হাসপাতালে যাবেন? আম্মা মাথাও নাড়লেন মুখেও বললেন, না। যাবেননা। কিন্তু সে সময় তো তার কথা শোনার অবস্থা নাই। গাড়ী ডেকে বিশ মিনিটের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হলো কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে।
সেখানে গিয়ে খানিকটা বমি করলেন। শুধু পানি, একটু আগে যা খাওয়ানো হয়েছিল। সুগার মেপে পাওয়া গেল আড়াই। তার মানে পাঁচ থেকে নেমে গেছে। ডাক্তার নার্স বলতে পেলাম এ্যপ্রোনপড়া অল্প বয়সী কিছু ছেলে মেয়েকে। তারা যথারীতি স্যালাইন লাগালো। এ্যাডমিশন প্রেসক্রাইব করলো। কেবিন নাই। আম্মার ঠাঁই হলো দশ তলায় মহিলা ওয়ার্ডের ১৭ নম্বর বেডে।
তখনও আম্মা পুরো সেন্সে। কথা বললেন ভাল। খানিকটা হাঁফাচ্ছেন। শ্বাষ নিতে কষ্ট হচ্ছে। শুক্রবার, জুম্মার দিন। নামাজের সময় হয়ে এলে আম্মাকে বলি, আম্মা একটু বাসায় গিয়ে গোসল করে নামাজ পড়ে আসি। আম্মা বললেন, যা। বৌমা আর কাকলীকে রেখে চলে আসি। হাসপাতালে ভর্তী করানোর পর আমার সব টেনশন প্রায় দুর হয়ে যায়। ওরা যখন দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে তখন আর চিন্তা নাই। আমি চলে আসার খানিক পরে বৌমা আর মেয়েটাও চলে আসে। রয়ে যায় মাইনুদ্দিন, আমার এলাকার ছেলে। আমার বাসায়ই থাকে। আম্মাকে দাদী বলে ডাকে। খুবই সেবাযতœ করে তার। এ সময় মাইনুদ্দিনের সাথে আম্মার খুব স্বাভাবিক কথা হয়। আম্মা জানতে চান তাকে কোথায় নেয়া হয়েছে। আশেপাশের রোগীনীদেরকে দেখে বলেন ওরা কি তার মত অসুখ নিয়ে এখানে এসেছে? মাইনুদ্দিন বলে, তারাও সবাই রোগী। আম্মা বলেন, আমি একবার আমেরিকায় হাসপাতালে ভর্তী হয়েছিলাম। কিন্তু সেবার ভাল হয়ে বাসায় চলে গেছিলাম। এবার হাসপাতালে এলাম। আল্লাহই জানেন এবার কপালে কি লেখা আছে। এই কথাটা তিনি কয়েকবার বলেন।
আম্মা একটানা ১৮ বছর নিউ ইয়র্ক ছিলেন। আমার ভাইয়ের বাসায়, ব্রুকলীনের চার্চ-ম্যাকডোনাল্ডে। গ্রীনকার্ডধারী। চার বছর ধরে ঢাকায় আমার কাছে। ২০০৭ সালে তার একবার হাইপো হয়ে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যায়। অনেক কিছুই মনে রাখতে পারেন না। লোকজনও ঠিকমত চেনেননা। ২০১২ তে একবার গেছিলেন। কিন্তু কোন কারনে মাইল্ড হার্ট এ্যটাক হয়ে (এই তথ্যটা আমার আগে জানা ছিলনা) আলঝেইমারের রোগীমত হয়ে যান। ওই অবস্থায় ছোটভাই তাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। এরপর থেকে আর আমেরিকায় যাওয়া হয় নাই।
বেডে শুয়ে শুয়ে মাইনুদ্দিনের সাথে আম্মা আরও কিছু কথাবার্তা বলেন। পান খেতে চান। মাইনুদ্দিন পান এনে দেয়। পান মুখে দিয়ে আম্মা বলেন মাত্র দুইটা সুপারি দিলা! এ সময় নার্স শ্বাষকষ্ট কমানোর জন্য আম্মার মুখে অক্সিজেন মাষ্ক পড়াতে যায়। আম্মা তা কিছুতেই পড়াতে দেবেন না। জোর করে মাষ্ক খুলে ফেলতে চান। স্যালাইনের সুই ধরে টান দেন। এ নিয়ে চার পাচজন নার্সের সাথে তার খানিকক্ষন ধস্তাধস্তি হয়। আমি তখন বাসায়। হঠাৎ মাইনুদ্দিনের ফোন। তাড়াতাড়ি আসেন, দাদীকে আইসিইউতে নিতে হবে। কি ব্যপার! ভাল মানুষ রেখে এলাম হঠাৎ এমন কি ঘটলো তাকে আইসিইউতে নিতে হবে! ফোনে বললাম ডাক্তার যা ভাল মনে করে করতে বলো, আমার আসার জন্য বসে থেক না। দৌড়ে গিয়ে দেখি আম্মাকে ততক্ষনে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আম্মার নতুন পরিচয় হলো আইসিইউ ফাইভ। মানে আইসিইউ’র পাঁচ নম্বর বেডের রোগী।
মাইনুদ্দিনকে জিজ্ঞেস করলাম ঘটনা কি! সে জানালো নার্সদের সাথে ধস্তাধস্তির পর সম্ভবত: তাকে নিস্তেজ করার জন্য কোন ইঞ্জেকশন পুশ করা হয়। এতে ধপ্ করে তার প্রেশার পড়ে যায়। অনভিজ্ঞ নার্সরা বুঝতে পারেনা কি করবে। আইসিইউ’তে খবর দেয়। ডাক্তার এসে বলে তাকে সেখানে নিতে হবে।
ঢাকার হাসপাতালগুলো সম্পর্কে আমার মোটামুটি ধারনা আছে। টাকা আদায়ের জন্য কোথাও কোথাও রোগীদের সাথে জল্লাদের আচরন করা হয়। প্রায়ই পত্রপত্রিকায় এসব নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। কোন কোন হাসপাতালকে কসাইখানার সাথেও তুলনা করা চলে। শুরু হয় নানা রকমের টেস্ট দিয়ে। লক্ষ্য থাকে কোনমতে আইসিইউ’তে নিয়ে তোলা। তারপর কয়েকদিন লাইফ সাপোর্ট লাগিয়ে দিতে পারলেই কয়েক লাখ টাকা আদায়ের ব্যবস্থা হয়ে গেল। তাতে রোগী বাঁচলো কি মরলো এসবে ওদের কিছু যায় আসেনা।
সন্দেহ হচ্ছিল আইসিইউ’তে নেয়ার জন্যই ইচ্ছা করে প্রেশার ফল করানো হয়েছে কিনা। কারন এর মধ্যে নার্সরা মাইনুদ্দিনের কাছ থেকে জেনে নিয়েছে রোগীনীর গার্জেন কি করে। কিন্তু সে সন্দেহ মনে বাসা বাঁধতে দেইনা। এই হাসপাতাল সম্পর্কে আমার একটা সাধারন ইমপ্রেশন ছিল- নামের আগে ইসলাম, ডাক্তার ব্রাদার স্টাফ প্রায়ই দাড়িধারি, নামাজী। নার্সরা পর্দা করে চলে। প্রতি তালায় পাচ ওয়াক্ত নামজের আজান শোনা যায়। প্রতি তালায় জামাতে নামাজ আদায় হয়। এখানে কোন দুই নম্বরী হয়না।
হাসপাতালে ছুটে এসেই ঢুকে যাই আইসিইউতে। সোজা আম্মার পাশে। দেখি মুখে অক্সিজেন মাষ্ক, নাকে একাধিক নল লাগানো। হাতে স্যালাইনের সুই। ক্যাথেড্রেল লাগানো। আরও কিছু পাইপ এখানে ওখানে ফিটকরা। আম্মা পুরো সেন্সে। ভয়ার্ত চোখে তাকাচ্ছেন এদিকে ওদিকে। অক্সিজেন মাষ্ক লাগানো অবস্থায়ও জোড়ে জোড়ে শ্বাষ টানছেন। সঙ্গে খানিকটা কোকানি। হাতদু’টো বিছানার দুই পাশের রডের সাথে বাঁধা। এর মধ্যে কি করে যেন একটা হাতের বাধন খুলে ফেলেন। সেই হাত দিয়ে অক্সিজেন মাষ্ক সড়িয়ে ফেলেন। পাশ থেকে নার্স ছুটে আসে। হালকা ধমক দিয়ে হাত আবার বেঁধে দেয়। আমি শুধাই, আম্মা খুব কি কষ্ট হচ্ছে। আম্মা মাথা নাড়েন। বলি অক্সিজেনটা থাক, আপনার নিশ্বাষ নিতে সুবিধা হবে। অভয় দেই, কিছু হবেনা। আপনি ভাল হয়ে বাসায় ফিরবেন। আম্মা হাঁফান আর তাকিয়ে থাকেন আমার মুখের দিকে।
আম্মার ওই কষ্ট আর সহ্য হচ্ছিলনা। সড়ে আসি। ডক্টর’স ডেষ্কে এসে থ’ মেরে যাই। এরা কারা! ডাক্তারের এ্যপ্রোনপড়া কয়েকটা ছেলে ছোকরা! মনে হলো এখনও ছাত্র, বিকালেই রাস্তায় গাড়ী ভাংচুর করে এসেছে। ভাবতে অবাক হচ্ছিলাম, এরা ডাক্তার! এরা কতটুকু লেখাপড়া করেছে কতটুকু জানে! এইসব ছেলে ছোকড়াদের হাতে এইরকম সিরিয়াস রোগীদের জীবন মরনের ভার তুলে দেয়া হয়েছে! আইসিইউ’তে কোন সাধারন রোগী আসেনা। যারা পৌঁছে যায় জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষনে তাদেরকেই আনা হয় আইসিইউ’তে। আর সেখানে এইসব নবীশ বা ইন্টার্নীদের আসর! প্রথম দর্শনেই কেমন একটা অনাস্খাভাব এসে গেল। মনের ভাব চেপে রেখে ডাক্তারদের কাছে জানতে চাইলাম আম্মার অবস্থা। আঁতেলটাইপের এক ছোকড়া ডাক্তার তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন, ভাল না। ভালনা মানে! উনার কি সমস্যা। বললো, উনার লাঞ্চে পানি জমে আছে। আমরা কিছুটা সিরিঞ্জ দিয়ে বের করেছি। আরও রয়ে গেছে। প্রমান হিসেবে এক্সরে ফিল্ম এনে সামনে টাঙিয়ে দেয়া হলো। তারপর আমাকে বোঝানোর চেষ্টা চললো পানি এলে ছবি কেমন থাকে না থাকলে ছবি কেমন থাকে। শুধাই আম্মার কিডনীর কি অবস্থা। ওরা বললো, ভাল। লিভার? ভাল। হার্ট? ভাল। তার মানে সমস্যা শুধু লাঞ্চে। তাহলে এখন কি করনীয়? পানি বের করতে হবে।
ডাক্তার জানালো, প্রেশারটা স্বাভাবিক হচ্ছেনা। সাধারনক্ষেত্রে আট থেকে দশ লিটার অক্সিজেনেই রোগীর প্রেশার নর্মাল থাকে, আম্মাকে বার লিটার দেয়া হচ্ছে। কারন, ফুসফুস প্রয়োজনীয় অক্সিজেন টানতে পারছে না। পানি বের করতে পারলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বেড়ে যাবে। এই পানি বের করার উপায়? বুকের ডানপাশে পাজরের হাড়ের নীচে ছিদ্র করে পাইপ লাগাতে হবে। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। আম্মার বুকের পাশে ছিদ্র করা হবে ভাবতেই নিজের হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। শুধু মনে হচ্ছিল এই কষ্ট তিনি সহ্য করবেন কিভাবে। তার ওপর এই বয়সে! সভয়ে শুধাই, আম্মার অবস্থা কি খুবই ক্রিটিকাল! ডাক্তার বলে, উনার অবস্থা ভালনা। ভালনা বলতে কি বোঝাতে চান? ডাক্তারের ত্যাড়া উত্তর, ভালনা মানে ভালনা। এখন যা বোঝার বুঝে নেন!
ডাক্তার আরও জানান, সিরিঞ্জ দিয়ে যে পানিটুকু বের করা হয়েছে তাতে রক্ত মিশ্রিত ছিল। পানির রং ছিল লালচে। এক্সরের ছবিতে ডান পাজরের নীচের দিকে হাড়ে ক্রাক পাওয়া গেছে। লাঞ্চে পানি থাকায় ফ্রাকচারের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় নাই। পানি বের করে আবার এক্সরে করলে জানা যাবে আসলেই পাজরের হাড়ে কোন ফ্রাকচার আছে কিনা। মনে পড়লো মাসদেড়েক আগে আম্মা পড়ে গিয়ে উড়–তে আঘাত পেয়েছিলেন। হয়তো সেসময়ই পাজরের হাড় ভেঙ্গে গিয়েছিল। কিন্তু উনি কখনও তা বলেননি বা এমনও জানাননি যে বুকে তার কোনরকম ব্যথা হচ্ছে। উড়–তে থেতলে যাওয়ার চিকিৎসা করাতে যখন হাসপাতালে আনা হয়েছিল তখন ডাক্তারও কোন এক্সরে করান নাই। আমরা কেউ জানতেই পারি নাই যে আম্মা এমন একটা মারাত্মক আঘাত বুকে নিয়ে সহ্য করে চলেছেন। পানিতে যে লালচে রং পাওয়া গেছে তা সেই হাড় ভেঙ্গে যাওয়ার সময়ের বলে নিশ্চিত হলাম।
ডাক্তার বলেন, কি করবেন ডিসিশন নেন। আমি বলি ডিসিশন নেয়ার কি আছে। রোগী আপনাদের হাওলায়। তাকে স্স্থু করে ফেরত দেবেন তার জন্য যা ডিসিশন নেয়ার আপনারা নেবেন। ডাক্তার শুধান উনার বয়স কত। প্রশ্নটা শুনে রাগ ধরে যায়। সকাল থেকে এই হাসপাতালে বেশ কয়েকবার একই প্রশ্ন শুনেছি। যখনই বলেছি আশির ওপরে, চোখেমুখে এক ধরনের তাচ্ছিল্যভাব ফুটিয়ে তুলে অনেকটা ঠোট ওল্টানোর ভঙ্গিতে প্রতিক্রিয়া পেয়েছি ‘ও আশি’! যেন আশি বছর বয়স হলে কেউ আর বেঁচে থাকেনা। যেন আমার আম্মাও আর বাঁচবেন না। মনের ভাব চেপে রেখে ডাক্তারকে জানাই আম্মার বয়স আশির ওপরে। ডাক্তারের চোখেমুখেও একই ভাব ফুটে ওঠে।
সে রাতে আম্মা একইভাবে পড়ে থাকেন। নাকের ভেতর দিয়ে নল। মুখে অক্সিজেন মাষ্ক। প্রেশার স্থিত হচ্ছেনা। নি:শ্বাষ টানতে কষ্ট হচ্ছে। শেষবারের মত দেখা করতে গিয়ে বলি, আম্মা বাসায় যাই। কাল সকালে আসবো। আম্মা পরিষ্কার বলেন, এত রাতে বাসায় যাবি! তার অর্থ আম্মা তখনও পুরো সেন্সে। তখন যে বেশ রাত আইসিইউতে শুয়েও তিনি তা বুঝতে পারছেন। বলি, রাত কোথায়! বাসা তো কাছেই। কাল সকালে আবার আসবো।
সাড়ে এগারটার দিকে ইমার্জেন্সি ব্লাডের রিকুইজিশন আসে। ও পজিটিভ। এখন কার কাছে রক্ত পাই। আমার বি পজিটিভ। ফোন করি দুইজনকে। কপাল খারাপ হলে যা হয়, দুইজনের ফোনই বন্ধ। হাসপাতালের ব্লাডব্যাংকে এক ব্যাগ পাওয়া গেল। সাতদিন আগের। ডাক্তাররা বললেন এটা চলবেনা। রেফার করলেন শান্তিনগরে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনকে। সেখানে গিয়ে কিনি এক ব্যাগ রক্ত। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে সেই রক্ত নিয়ে ফিরতে ফিরতে রাত দুইটা হয়ে যায়। জানিনা সে রক্ত ওরা কি করেছিল। পরদিন বেশ কয়েকবারই ভেতরে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছি। কেউই সঠিক করে কিছু বলতে পারে নাই। পারবে কি করে, এ বেলা যে ডিউটি করে ও বেলা তাকে আর দেখা যায়না। তিনদিনেও দেখা যায়না। মাঝে মাঝে সন্দেহ হতো এরা কি লোকজন ভাড়া করে আনে কোথাও থেকে!
পরদিন কিছুটা বেলা করে আসি হাসপাতালে। মাইনুদ্দিন রাতে ছিল। জানায় সকালে আম্মা নাশতা খেতে চাইলে ডাক্তারের অনুমতিক্রমে ক্যান্টিন থেকে স্যুপ এনে দিয়েছে। আম্মাকে তা খাওয়ানো হয়েছে। এরপর তার সাথে খানিকক্ষন কথাও বলেছে। আমি গিয়ে দেখি প্রায় একই অবস্থা। শ্বাষ নেয়ার কষ্টটা কমে নাই। তার মধ্যেও আম্মা কথা বলতে চাইছেন। ভয়ার্তচোখে চারপাশ দেখছেন। পাশের ছোকড়া নার্সটাকে জিজ্ঞাস করি প্রেশারের কি অবস্থা। বলে অক্সিজেন চলছে আগের মতই। প্রেশার স্বাভাবিক করার জন্য একটা সাপ্লিমেন্টারি চলছে। ওটা অফ করে দিলে প্রেশার পড়ে যাচ্ছে। ডাক্তারদের ডেষ্কে এসে দেখি আবার সব নতুন মুখ। কাল রাতে যারা ছিল তারা কেউ নাই। একইরকম, কয়েকটা ছেলে ছোকড়া। হলেও ভাবটা তাদের ষোল আনা। এদেরই হাতে আমার আম্মাসহ আইসিইউ’র দশ বারজন রোগীর জীবন-মৃত্যুর ভার। কথা বলি ভয়ে ভয়ে, যেন আমার কথায় সামান্য রুষ্ট হলেই ওরা আম্মাকে মেরে ফেলবে। ডেভলপমেন্ট জানতে চাই। একই উত্তর, ভালনা। তাদের কাছেই জানতে পাই কাল রাতের পর থেকে কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা কনসালট্যান্ট আসে নাই। বিকালে একজনের আসার কথা আছে। উনি এসে সিদ্ধান্ত নেবেন আম্মার বুকে ফুটো করতে হবে কিনা।
সারাটা দিন কাটাই টেনশনে। বিকালে জানানো হলো আম্মার বুকের পাশে ফুটো করে পানি বের করা হবে। এই ডিসিশনটা নিতে তাদের তিরিশ ঘন্টার ওপর সময় লাগলো। একটা ব্যপার লক্ষ্য করছিলাম আইসিইউ’তে বড় ডাক্তার আসেন ২৪ ঘন্টায় একজন। একএক দিন একএক জন। আজ যিনি আসেন পরদিন তাকে আর পাওয়া যায়না।
সন্ধ্যায় এলেন অপারেশনের ডাক্তার। শশ্রুমন্ডিত বয়ষ্ক লোকটাকে দেখে কিছুটা ভরষা পেলাম। তিনি ব্রিফিংয়ে বললেন, পানিটা জমে আছে লাঞ্চের বাইরে। এই পানির কারনে ফুসফুস ঠিকমত প্রসারিত হতে পারছেনা। ফলে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন নিতে পারছেনা। আমি জানতে চাইলাম, বুকের পাশে ফুটো করতে রোগীকে অজ্ঞান করে নেয়া হবে কিনা। ডাক্তার বললেন এই বয়স এবং অবস্থার রোগীকে অজ্ঞান করা যায়না। রোগীর জ্ঞান থাকবে তবে লোকাল এ্যানাসথেশিয়া করে নেয়া হবে যাতে কোন কষ্ট না পায়।
এরপর দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা, আর আল্লাহকে ডাকা। কাজ শেষ করে ডাক্তার এসে জানালেন পাইপ লাগানো হয়েছে, প্রায় এক লিটারের মত পানি বের করা হয়েছে। উপস্থিত আমরা সবাই বললাম আলহামদুলিল্লøাহ। শুধাই তাহলে কি আম্মা এখন বিপদমুক্ত? ডাক্তার বলেন, তা বলা যায়। পাইপটা আরও দুই একদিন থাকবে- দেখতে, নতুন করে সেক্রেশন হচ্ছে কিনা। যে পানি বের করা হয়েছে তা পরীক্ষা করে দেখা হবে তাতে ক্যান্সার টিউমার বা অন্য কোন কিছুর উপাদান আছে কিনা।
আমরা নির্ভয় হলাম। অপারেশনের ঘন্টাখানেক পর আম্মার সাথে দেখা করলাম। দেখি শ্বাষ নেয়ার কষ্ট খানিকটা কমেছে। জিজ্ঞাস করলাম এখন কি একটু আরাম বোধ হচ্ছে? আম্মা বললেন আগের চেয়ে ভাল লাগছে। শুনে বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠি। তাহলে দুই চারদিনের মধ্যেই আম্মাকে সুস্থ করে বাসায় নিয়ে যেতে পারবো। বলি, আর কষ্ট হবেনা। এখন থেকে ধীরে ধীরে ভাল হয়ে উঠবেন। আম্মা এ কথার পরও শুধু মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ছোট বোনটা ছিল ঢাকার বাইরে। সন্ধ্যার পর ছুটে আসে হাসপাতালে। আত্মীয় পরিজনরাও খবর পেয়ে একে একে আসতে থাকে। প্রায় সবাই দেখা করে আসে আম্মার সাথে। বোন গিয়ে পাশে দাঁড়ালে আম্মা বলেন, এখন আসছিস! বোন আর কি কথা বলবে, আম্মার ওই অবস্থা দেখে কেঁদে আকুল হয়। বের হয়ে এসে প্রায় হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। আমি রাগ হই। বলি এভাবে কাঁদার কি আছে। আম্মা তো এখন আউট অফ ডেঞ্জার। ডাক্তার বলেছে কন্ডিশন ইম্প্রুভিং। বোন ভেতরে ওই ছোকরা ডাক্তারগুলোর সাথে কথা বলে এসেছে। ওরা নাকি সেই একই গৎ আউড়েছে, অবস্থা ভাল না।
কারও মুখে অবস্থা ভাল না শুনলেই মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে উঠতো। যে মানুষ পুরো সেন্সে আছে সুস্থ মানুষের মত কথা বলছে এই দীর্ঘ সময় ধরে শ্বাষ টানার কষ্ট সহ্য করে চলেছে তার অবস্থা ভাল হবে না কেন? ভগ্নিপতি আব্দুস সালাম এলেন। নেতা মানুষ। ডাক্তারদেরও অনেকে তার পরিচিত। আম্মার টেক কেয়ার করার কথা বলে গেলেন। ডাক্তাররাও তাকে আস্বস্ত করলো চিকিৎসার কোন ত্রুটি হবেনা। কিন্তু চিকিৎসা বলতে যা দেখতে পারছিলাম- স্যালাইন অক্সিজেন আর হাজার হাজার টাকার অষুধ ইঞ্জেকশন, হরেক রকমের টেষ্ট। এই এত এত অষুধের অর্ডার আর টেস্ট দেখে মাঝে মাঝে সন্দেহ হচ্ছিল এরা কি আম্মাকে নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা করছে! ইন্টার্নীদের ট্রেনিং! কোন অষুধে কি কাজ হয়! আম্মা কি এদের হাতে গিনিপগ হয়ে গেলেন! নাকি এরা রোগটাই ধরতে পারে নাই। আন্দাজে একের পর এক ঢিল মেরে চলেছে!
রাতে আবার এক ব্যাগ রক্তের অর্ডার এলো। অপারেশনে নাকি বেশ রক্তক্ষরণ হয়েছে। বৌমা অল্প সময়ের মধ্যে ডোনার ঠিক করে ফেললো। তার এক আত্মীয় ছুটে এলেন গেন্ডারিয়া থেকে। হাসিমুখে দিয়ে গেলেন রক্ত। মধ্যরাত পর্যন্ত হাসপাতালে থেকে আমরা চলে আসি বাসায়। জরুরী প্রয়োজনে উপস্থিত হতে রয়ে যায় মাইনুদ্দিন।
পরদিন রোববার, দুুপুর পর্যন্ত আম্মা খানিকটা ভাল থাকেন। সাড়ে দশটার দিকে মাইনুদ্দিন গিয়ে আম্মার সাথে কথা বলে আসে। বারটার দিকে আমি যাই। অবস্খা প্রায় কাল রাতের মতই মনে হলো। ডাক্তারদের সাথে কথা বলার সাহস হয়না, না জানি কি কু-কথা বলে বসে। আম্মার পরিচর্যাকারি এক ছেলে নার্সকে জিজ্ঞাস করি ঘটনা কি। সে বলে প্রেশারটা স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছেনা। অক্সিজেনও কমানো যায় নাই। আপাতত: একটা সাপ্লিমেন্টারি দিয়ে প্রেশার নর্মাল রাখা হচ্ছে কিন্তু সেটা বন্ধ করে দিলে প্রেশার কমে যাচ্ছে। ঠিক বুঝতে পারছিলাম না চিকিৎসাটা কি চলছে তাহলে!
ডাক্তারদের ডেষ্কে এসে দেখি যথারীতি নতুন মুখ। ফাইল দেখে বলে দিল, অবস্থা ভাল না। এক্সরে করাতে হবে সিটি ষ্ক্যান করাতে হবে। তবে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বড় ডাক্তার। তিনি আসবেন বিকালে। এই হলো একটা প্রথম শ্রেনীর হাসপাতালের আইসিইউ। ডাক্তার আসে ২৪ ঘন্টা পর পর। তাও এভরি ডে নিউ ফেস। বাকি সময় ছেলে ছোকড়াদের হাওলায়। ডিসিশন দেয়ারও কেউ থাকে না। শুধাই বুক ফুটো করে লাগানো পাইপ দিয়ে নতুন কোন পানি আসছে কিনা। ওরা বললো সেটা প্রায় বন্ধ হয়েছে। পানির বায়োপসি রিপোর্ট এসেছে। খারাপ কিছু পাওয়া যায় নাই। তার মানে ক্যান্সার টিউমার বা হ্যামারেজের কোন লক্ষন নাই। তারপরও অবস্থা ভাল না!
বিকালে এলেন ডাক্তার। রাউন্ড সেড়ে ব্রিফিংয়ে বসলেন। বললেন, বুক থেকে যে পানিটা বের করা হয়েছে তা ছিল লাঞ্চের বাইরে জমা হওয়া পানি। কিন্তু এখন ফুসফুসের ভেতরে পানি জমতে শুরু করেছে। সে কারনে ফুসফুস ঠিকমত অক্সিজেন পাম্প করতে পারছে না। নতুন করে ফুসফুসে পানি জমছে কেন? ডাক্তার বললেন, কারন খুঁজতে বুকের এক্সরে আর সিটি ষ্ক্যান করাতে হবে। আবার শুধান, আপনাদের ডিসিশন কি! এই একটা প্রশ্ন শুনলে আমার রাগ ধরে যায়। বলি, আমাদের আবার ডিসিশন কি! আম্মাকে সুস্থ করে তুলতে ডিসিশন যা নেয়ার আপনারা নেবেন। টাকার চিন্তা করবেন না। আম্মার জন্য যা যা দরকার, ব্যবস্থা নিন।
সন্ধ্যার আগ দিয়ে বাসায় এসেছি খেতে। হঠাৎ হাসপাতাল থেকে ভগ্নিপতি আব্দুস সালামের ফোন। আম্মার অবস্থা ভালনা। লাইফ সাপোর্ট লাগতে হবে। ধপ্ করে ওঠে বুকটা। লাইফ সাপোর্ট মানে! তাহলে কি আম্মা আর ফিরবেন না! লাইফ সাপোর্ট তো চিকিৎসা নয়। আম্মার জন্য কি আর কোন চিকিৎসাই নাই! সালাম সাহেবকে বলি, আম্মাকে বাঁচাতে যা যা দরকার ডাক্তারদেরকে ব্যবস্থা নিতে বলেন। কিছুক্ষনের মধ্যেই ফিরে আসি হাসপাতালে। ছুটে যাই আম্মার বেডের পাশে। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে আম্মার ওই অবস্থা দেখে। আগের নল পাইপ সব তো আছেই, এর সাথে যোগ হয়েছে লাইফ সাপোর্টের মোটা নল। মুখ হা করিয়ে গলার ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। আম্মা মাথাটা একদিকে কাত করে যন্ত্রনায় কাৎরাচ্ছেন আর ভীত চোখে চারপাশ দেখছেন। ওই অবস্থায়ও তাকান আমার দিকে। অসহায় সে দৃস্টির সামনে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনা। মাথায় হাত বুলিয়ে বলি, খুব কষ্ট হচ্ছে আম্মা? আম্মা মাথা নাড়েন। স্বান্তনা দেই। ডিউটি ব্রাদারকে শুধাই আম্মার অবস্থা কি খুবই খারাপ। ছেলেটা কোন জবাব দেয়না। মুচকি হেসে বলে ডাক্তারদেরকে জিজ্ঞাস করেন।
ডাক্তারদের কাছে আসি। এরা সব সময় একটা ভাব ধরে থাকে। বারবার এসে রোগীর সম্পর্কে খোঁজখবর করা তারা পছন্দ করেনা। ভয়ে ভয়ে শুধাই আম্মা কি সেড়ে উঠবেন? এক ছোকড়া বলে, দেখতেছেন না লাইফ সাপের্ট লাগানো হইছে। এখন যান, সবাই মিলা বইসা ডিসিশন নেন। আবার রাগ ধরে যায়। বলি, কাল ডাক্তার বললেন আউট অফ ডেঞ্জার। এখন কি অবস্থা দাঁড়ালো যে লাইফ সাপোর্টে যেতে হলো। ডাক্তার বললো সেটা বুকের এক্সরে আর সিটি ষ্ক্যান ছাড়া বলা যাবেনা। কখন হবে এসব? বললো, এক্সরেটা এখনই করা যাবে তবে সিটি ষ্ক্যান করাতে সময় লাগবে। প্রেশারটা আরও একটু বাড়লে তারপর নিয়ে যাওয়া হবে। কারন কাজটা করাতে আসা যাওয়া সব মিলিয়ে বিশ পচিশ মিনিটের ব্যপার। এই সময়টা ম্যানুয়েল পাম্পিং চলবে। এই পাম্পিং সব সময় ব্যালেন্সড্ থাকেনা। তাই রোগীর কন্ডিশন ইমপ্রুভ না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
আবার অনিশ্চিয়তা। ভেতরে ভেতরে খুব টেনশন কাজ করছিল। তারপরও আমার দৃড় বিশ্বাষ আম্মা ভাল হয়ে উঠবেন। এই লাইফ সাপোর্ট যন্ত্র আম্মাকে সুস্থ করে তুলবে। সন্ধ্যার পর আসেন এক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। প্রথমবার দেখলাম তাকে। ফাইল দেখে রোগীর অবস্থা জানলেন। ডেকে নিয়ে ব্রিফিং দিলেন। নতুন কিছুনা। আমি শুধু জানতে চাইলাম আম্মা বাঁচবেন কিনা। ডাক্তার বলেন, জীবন মৃত্যু তো আল্লাহর হাতে, আমরা চেষ্টা করতে পারি। তবে ভয়ের কিছু নাই। দেড় মাস আগে পড়ে গেলে আম্মার বুকের পাজরের দু’টো হাড় ভেঙ্গে যায়। সেখান থেকে খানিকটা ব্লিডিং হয়। এরপর কোন কারনে লাঞ্চে পানি জমে। সেই জমাট রক্ত পানিতে মিশলে তা লালচে রং ধারন করে। তবে নতুন করে আর পানি আসছে না। এই পানি ছিল লাঞ্চের বাইরে জমা পানি। এখন লাঞ্চের ভেতরে পানি জমতে শুরু করেছে। সেটা কেন তা সিটি ষ্ক্যান ছাড়া বোঝা যাবেনা।
আমরা আশা নিরাশার দোলাচলে দুলতে থাকলাম। বোন অজিফা নিয়ে বসলো। বৌমার হাতে তসবীহ। সবাই আল্লাহকে ডাকছে। দোয়া দরুদ পড়ছে। ভগ্নিপতির রাজনৈতিক কলিগ এক চিকিৎসক নেতা এলেন রাতে। ডিউটি ডাক্তারদের সাথে কথা বললেন, আম্মাকে দেখলেন। আমাদেরকে আশ্বস্ত করলেন, ভয়ের কিছু নাই। এসময় ভেতর থেকে জানা গেল প্রেশার খানিকটা বেড়েছে। ইমপ্রুভিং। আমিও কিছুক্ষন পর গিয়ে দেখে আসলাম মেশিনে প্রেশারের ফিগারটা ওপরের দিকে। ডিউটি ব্রাদার জানালো অক্সিজেন কমিয়ে দেয়া হয়েছে। তার মানে লাঞ্চ ধীরে ধীরে কার্যক্ষম হচ্ছে। লাঞ্চে যে পানি জমে আছে তা ভেতরেই শুকানোর জন্য অষুধ চালু করা হয়েছে। আম্মার মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, চিন্তা করবেন না আম্মা। আপনি ভাল হয়ে উঠবেন। আম্মা শুধু তাকিয়ে থাকেন ফ্যাকাশে চোখে।
রাত বারটার দিকে একটা স্লিপ ধরিয়ে বলা হলো ইব্রাহিম কার্ডিয়াক থেকে ব্লাডের একটা ষ্পেশাল টেস্ট করিয়ে আনতে। ছুটলাম। ঘন্টা দেড়েক লাগলো। রিপোর্টটা আমিও দেখলাম। ডাক্তারি ল্যাংগুয়েজ আমি বুঝিনা তবে এটা বুঝলাম কোন একটা কাউন্ট স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক অনেক বেশী। রিপোর্টটা ডাক্তারের হাতে দিয়ে শুধাই, খুব খারাপ কিছু কি? ডাক্তার বলেন আপনি রিপোর্ট দেখেন নাই? বলি, দেখেছি তো। মনে হলো এ্যবনরমাল। ডাক্তার বলেন, ব্যপারটা আমরা আগেই সন্দেহ করেছিলাম। টেষ্ট করিয়ে নিশ্চিত হলাম। তবে এর অষুধ আমরা আন্দাজের ওপরে আগে থেকেই দিয়ে আসছি। কিন্তু সন্দেহটা কি করেছিল আর রিপোর্টে কি পাওয়া গেল সে সম্পর্কে খুলে কিছু বললো না। একরাশ দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ফিরি বাসায়।
সোমবার, ১লা ডিসেম্বর। আম্মা পড়ে আছেন একইভাবে বেডে। শ্বাষকষ্ট কমে নাই। হাঁফাচ্ছেন, যন্ত্রনায় কাৎরাচ্ছেন। মুখটা হা করা দৃস্টি ছাদের দিকে। তারপরও আমি ডাকলে চোখ ঘুড়িয়ে তাকান আমার দিকে। হয়তো কিছু বলতে চাইছিলেন কিন্তু পারছিলেন না। মনে হলো বেশ দুর্বল হয়ে গেছেন। হবেনই তো। একনাগাড়ে চারদিন একই অবস্থায়। ঘুম নেই এক মূহুর্তের জন্য। ওই বয়সে ওই শারিরীক অবস্থায় এত সময় যে টিকে আছেন শুধু অদম্য মনের জোরের কারনে। আমি আর সহ্য করতে পারিনা সে দৃশ্য। ডিউটি ব্রাদারের কাছে জানতে চাই অবস্থা। বলে ডাক্তারের সাথে কথা বলেন। ডাক্তারের সাথে তো কথা বলবোই তারপরও ভয়ে ভয়ে তাকে শুধাই, আচ্ছা ভাই সত্যি করে বলোতো লাইফ সাপোর্ট মানে কি সব শেষ? বাঁচার আর কোন আশা নাই? ছেলেটি অভয় দিয়ে বললো তা কেন হবে। লাইফ সাপোর্টে থেকেও তো অনেক রোগী ভাল হয়ে যায়। পাশের বেডের এক রোগীনিকে দেখিয়ে বললো, উনি তো পাঁচ দিন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। এখন ভাল। তাকিয়ে দেখি বয়ষ্কা এক মহিলা দিব্বি আছেন। বয়স আম্মার চেয়ে বেশীই হবে।
ব্রাদার ছেলেটার এই কথায় মনে সাহস ফিরে পাই। তাহলে আমার আম্মাও ভাল হয়ে উঠবেন। ডাক্তারদের কাছে এসে জানতে চাই আম্মার অবস্থা। নতুন কয়েকটা ছেলে ছোকড়া। ভাব ধরে বললো, ভালনা। ভালনা মানে প্রেশার স্বাভাবিক হচ্ছেনা। অক্সিজেনের পরিমান বাড়ানো হয়েছে। কি কারনে অবস্থার অবনতি হয়ে চলেছে? ওরা বললো সেটা সিটি স্ক্যান না করা পর্যন্ত বোঝা যাবেনা। কখন করা হবে সিটি স্ক্যান? অবস্থা একটু ইমপ্রুভ করলে। এদের সাথে বেশীক্ষন কথা বলা যায়না। ভয় হয় কখন না রেগে যায়। রেগে গিয়ে আম্মার না কোন ক্ষতি করে ফেলে! এইযে এতবড় আইসিইউ, দশ বারজন মূমুর্ষ রোগী এদের হেফাজতে। বলতে গেলে এইসব রোগীর জীবন মৃত্যুই এদের হাতে। কিন্তু কারও মাঝে কখনও কোন ধরনের সিরিয়াসনেস দেখতে পাইনা। আমার আম্মা আজ চারটা দিন ধরে অসহ্য যন্ত্রনায় কাৎড়াচ্ছেন সেদিকে কারও কোন খেয়ালই নাই। সবাই ডিউটি করে চলেছে। ঘন্টা বেজে গেলে আর এক দলের হাতে সপে দিয়ে চলে যাচ্ছে যার যার মত।
চার দিনে এই আইসিইউতে দেখলাম গড়ে একজন করে রোগী মারা যাচ্ছে। প্রতিদিনই বাইরে কান্নার রোল। ভাল হয়ে কেউ ফিরে গেছে এমন একজনকে পেলাম না। এক রোগী সম্পর্কে জানলাম ২১ দিন আইসিইউতে থাকার পর খানিকটা সুস্থ হয়ে সাধারন কেবিনে গেছিল। চার পাঁচ দিন পর আবার আইসিইউতে ফিরে এসেছে। এবং শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হয়েছে। সব কিছু দেখেশুনে এই কেন্দ্রটিকে মনে হচ্ছিল একটা যমালয়। কেউ একবার ঢুকলে আর প্রান নিয়ে ফিরতে পারছে না।
দুপুরের পর থেকে ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে যেতে থাকি। সন্ধ্যার আগ দিয়ে আম্মার সিটি ষ্ক্যান করা হয়। জানতাম না। বসে আছি বাইরের লবিতে। হঠাৎ দেখি আমার সামনে দিয়ে ধুমধাম করে একটা ট্রলিবেড আইসিইউতে নেয়া হলো। তাকিয়ে দেখি, আম্মা শুয়ে। লাইফ সাপোর্টের নল লাগানো আছে। পাম্পিং চলছে ম্যানুয়ালি। আম্মার মুখ নড়ছে দ্রুত। পান চিবুলে যেমন করতেন, তেমন।
নতুন লক্ষণ। এই তিনদিন তাকে এমন করতে দেখি নাই। দুপুরে যখন বেডে দেখেছি তখনও পড়ে ছিলেন একভাবে। আম্মাকে ওই অবস্থায় দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলেও একটু স্বস্তিভাব ফিরে আসে। সিটি ষ্ক্যান যখন করা হয়েছে তার মানে আম্মা আগের চেয়ে বেটার। কারন ওরাই তো বলেছিল অবস্থা একটু ভাল হলে সিটি ষ্ক্যান করানো হবে। আমরা রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। ভেতর থেকে জানানো হয় ডাক্তার রাউন্ডে আছেন, শেষ হলে আমাদের সাথে কথা বলবেন।
ঘন্টাখানেক পর ডাকা হলো। ডাক্তার কানিজ ফাতেমা। নাম শুনেছি। তবে তিনদিনে এই হাসপাতালে তাকে প্রথম দেখলাম। সময় নিয়ে আম্মার অবস্থা ব্যাখ্যা করলেন। নতুন যা জানালেন তা হচ্ছে, বেশ আগে আম্মার একটা মাইল্ড হার্ট এ্যাটাক হয়েছিল (আম্মার মৃত্যুর পর এই সেদিন ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পাই)। এর মধ্যে তার আরও একটা হার্ট এ্যাটাক হয়েছে। এর প্রভাবে ফুসফুসে পানি এসেছে। আমি রীতিমত হতবাক। প্রথমত: আগে যে তার মাইল্ড হার্ট এ্যাটাক হয়েছিল এ তথ্য আমার জানা ছিলনা। দ্বীতিয়ত: এর মধ্যে তার পরের হার্ট এ্যাটাকটা কবে হলো! জিজ্ঞেস করলাম। ডাক্তার বললেন সেটা বলতে পারবোনা। তবে সব মিলিয়ে রোগীর অবস্থা ভালনা। রিকভার করতে সময় লাগবে। আমি জানতে চাই শেষ পর্যন্ত আম্মা বাঁচবেন কিনা। ডাক্তারের অভয়, না বাঁচার অবস্থা এখনও দাঁড়ায়নি।
কানিজ ফাতেমার কথায় আবার আশায় বুক বাঁধি।
রাত সাড়ে ১১টার দিকে আবার তলব। ছুটে যাই ব্রিফিংরুমে। কার্ডিওলজির কনসালট্যান্ট এসেছেন। আম্মাকে দেখে এসে জানালেন ম্যাসিভ হার্ট এ্যাটাকের কারনে ফুসফুসে পানি জমেছে। ফুসফুস অক্সিজেন টানতে পারছেনা। প্রেশার পড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় তাদের আর কিছুই করার নাই। কারন ও্ই হাসপাতালে কার্ডিওলজির কোন সাপোর্ট নাই। শুনে আমার আক্কেল গুড়–ম। কার্ডিওলজির সাপোর্ট নাই তাহলে এই রোগীর এখন কি হবে! ডাক্তার মিনমিনে গলায় বলেন, আপনারা চাইলে অন্য কোথাও শিফ্ট করতে পারেন। আর যদি চান এখানেও রেখে দিতে পারেন। এখানে রেখে লাভ? আমরা লাইফ সাপোর্ট চালিয়ে যাবো, যতক্ষন আপনারা চাইবেন।
ডাক্তার প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দিলেন তাদের হাসপাতালে আম্মার আর চিকিৎসা নাই। এখানে রাখার অর্থ তার মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করা। কেমন অমানবিক এইসব হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, রোগী তাদের, রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তাদের। যদি কার্ডিয়াক সাপোর্ট তাদের না থাকে তাদেরই দায়িত্ব যেখানে এই সাপোর্ট আছে সেখানে ট্রান্সফার করা। আমরা তো খরচের ব্লাংক চেক দিয়েই রেখেছি। অথচ তারা অবলীলায় জানিয়ে দিলো সে কাজ তারা করতে পারবেনা। রেগে গিয়ে বললাম সন্ধ্যায় ডাক্তার কানিজ ফাতেমা যখন জানালেন যে আম্মার হার্ট এ্যাটাক হয়েছে তখনই কেন বলা হলো না তার এখন একমাত্র চিকিৎসা হার্টের এবং হার্টের চিকিৎসা আপনাদের হাসপাতালে নাই। কনসালট্যান্ট সেকথার কোন জবাব দেননা। জিজ্ঞাস করি আম্মার যে হার্ট এ্যাটাক হয়েছে কখন তা আপনারা জানতে পারলেন। বললেন, আমরা আগে থেকেই সন্দেহ করছিলাম তবে বিকালে সিটি ষ্ক্যান করার পর শিওর হই।
এ কি ফাজলামো না ছেলেখেলা! নিয়ে এলাম ভাল রোগী। প্রথম চেকআপে সব ওকে। কিডনী ভাল লিভার ভাল হার্ট ভাল। এখন যদি হার্ট এ্যাটাকটা হয়ে থাকে তাহলে তা হয়েছে হাসপাতালে আসার পরে। রোগী হাসপাতালে আসে হার্ট এ্যাটাক থেকে সুস্থ হওয়ার জন্য আর এখানে সুস্থ রোগী হাসপাতালে এসে তার হার্ট এ্যাটাক হলো! এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে! স্টুপিড ডাক্তারগুলো সেটা জানলো এবং আমাদেরকে জানালো তিনদিন পর! সব শেষ করে!
আমরা আর দেরী করিনা। আম্মাকে আর এখানে রাখার অর্থ হয়না। শুরু হলো খোঁজখবর। পিজি হাসপাতালে নেয়া যায় কিন্তু একজন বললো ওখানে ডাক্তার খুঁজে পাওয়া যায়না। মিরপুরে হার্ট ফাউন্ডেশনে নেয়ার কথা উঠলো। জানা গেল ওটা নামেই হার্ট ফাউন্ডেশন অবস্থা এই হাসপাতালের মতই। অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো শাহবাগ মোড়ে ইব্রাহিম কার্ডিয়াকে নেয়া হবে। ভগ্নিপতি আব্দুস সালাম তার প্রভাব খাটিয়ে সিসিইউতে ভর্তীর ব্যবস্থা করলেন। ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের পুরো বিল চুকিয়ে রোগী নিয়ে যাওয়ার ছাড়পত্র মিললো। রাত ১টার দিকে আম্মাকে এনে ভর্তী করালাম ্ইব্রাহিম কার্ডিয়াকে।
লিফটে যখন তাকে ওঠানো হয় তখনও তিনি সেন্সে। দ্রুত পান চিবুলে যে মুখভঙ্গি করতেন তেমন করছেন। আমার বোন ছিল সাথে। ডাকে। আম্মা চোখ মেলে তাকান। কিছু বলতে পারেন না, শুধু চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে পানি। দ্রুতই তাকে নিয়ে গিয়ে নতুন করে মেশিনের লাইফ সাপোর্ট লাগানো হয়। কিছুক্ষন পর যাই সিসিইউতে। দেখি আম্মার চোখ বন্ধ। আশেপাশের কয়েকটা মেশিনে রিডিং ওঠানামা করছে। ডিউটি ডাক্তারকে শুধাই আম্মার চোখ বন্ধ কেন। বলে উনাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। অবস্থা কেমন বুঝছেন? একই উত্তর, ভালনা। প্রেশার পাওয়া যাচ্ছেনা।
ছ্যাৎ করে ওঠে বুকের ভেতরটা। প্রেশার পাওয়া যাচ্ছেনা মানে! তাহলে কি আম্মা নাই! শুধাই এ অবস্থায় আপনাদের করনীয়? বলে, ঘন্টাদু’য়েক দেখবো তারপর অন্য একটা অষুধ প্রয়োগ করবো। ডাক্তার খুব একটা কিছু বলেনা। বলবেই বা কি। সে তো জানেনা বিগত তিনটা দিন আম্মাকে নিয়ে কি খেলাটা খেলা হলো। সঙ্গে ফাইল দিয়ে দিয়েছে। সে ফাইল পড়ার সময় কোথায় তার। তরুন ডাক্তার তার উপস্থিত বুদ্ধিতে যা ভাল মনে করছিল, করছিল। অবাক কান্ড, ইব্রাহিম কার্ডিয়াকের মত একটা বিশেষায়িত হাসপাতালের সিসিইউতে পেলাম এক ছোকড়া ডাক্তার আর গোটা তিনেক নার্স। অল্প বয়সী একটা নার্সকে দেখলাম আম্মার নাকে মুখে ফাইপ লাগিয়ে চলেছে। কাছে গিয়ে দেখি মেশিনের রিডিং ফিগারগুলো সব নীচে নেমে আছে। কাতরকন্ঠে ডাক্তারকে মিনতি করি, প্লিজ আমার আম্মাকে বাঁচিয়ে তুলুন ডাক্তার। ডাক্তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে উত্তর দেন, আমরা তো চেষ্টা করবো। শেষ প্রশ্নটা করি, সত্য করে বলুন উনি কি মারা গেছেন? বলে, না। অভয় দিয়ে বলে, আপনারা এখন বাসায় যান। টেলিফোন নম্বর দেয়। দরকার মনে করলে যেন ফোনে খবর নেই।
দুপুর রাতে ফিরে আসি বাসায়। মাইনুদ্দিন রয়ে যায়। তখন মনের যে অবস্থা নামাজ পড়ে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে বিছানায় যেতে যেতে সাড়ে তিনটা বেজে যায়। ঘুম একটু আসে আবার ভেঙ্গে যায়। শুধু একটাই চিন্তা আম্মা কি ভাল হয়ে উঠবেন! কেমন এক ধরনের অপরাধবোধ মনটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। একবার ভাবছিলাম আম্মাকে সেদিন হাসপাতালে নিয়ে কি ভুল করলাম। না নিলে যদি কিছু হয়ে যেতো! ভাগের মা, ভাইবোনরা বলতো না টাকা বাঁচানোর জন্য আমি মা’কে হাসপাতালে নেই নাই! যদি না নিতাম কি অবস্থা দাঁড়াতো তার। এটা পরিষ্কার লাঙ্কে পানি এসেছিল কয়েকদিন আগে থেকেই। আমরা বুঝতে পারি নাই। সেদিন আম্মার বেশ শ্বাষকষ্ট হচ্ছিল। হাসপাতালে না নিলে নিশ্বাষ বন্ধ হয়ে যেতে পারতো। তিনি মারা যেতে পারতেন। কিন্তু হাসপাতালে এনেও তো সেই একই অবস্থা!
ঘুম আর আসেনা। তন্দ্রার মত পড়ে থাকি বিছানায়। সিসিইউ’র ডিউটি ডাক্তারের টেলিফোন নম্বর নিয়ে এসেছি। তার ডিউটি সকাল নয়টা পর্যন্ত। ঠিক করে রাখলাম নয়টার আগে গিয়ে তার সাথে কথা বলবো। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে সকাল হলো। সাতটা বাজলে উঠি বসি। ভাবি, ডাক্তারকে একবার ফোন করে দেখি। সাড়ে সাতটার দিকে ফোন দিলে ধরেন ডাক্তার। জানান, আম্মার প্রেশার কিছুটা বেড়েছে। ৬০ বাই ৪০। কাল রাতে মোটে ছিলনা এখন তবু ষাট-চল্লিশ পর্যন্ত উঠেছে। শুনে মনে হলো বুকের ওপর থেকে একটা পাথর নেমে গেল যেন। তবে ডাক্তার সাথে এটাও বললেন বিশেষ ব্যবস্থায় প্রেশার বাড়ানো হয়েছে ঠিকই কিন্তু এতে তার কিডনী ননফাংশানিং হয়ে যাচ্ছে। এর বেশী আর কিছু বললেন না, ফোন রেখে দিলেন। আম্মার অবস্থা ভাল’র দিকে, এটা শুনে মনে খানিকটা স্বস্তিভাব ফিরে আসে। নয়টার দিকে যাবো, খানিকটা সময় আছে মনে করে আবার বিছানায় গা এলিয়ে দেই। এ সময় চোখটা লেগে আসে। দেখি আমার বিছানায় মাথারধারটায় খানিকটা পাশ ফিরে বসে আছেন আম্মা। মুখটা পাশ থেকে দেখা যাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে বসে আমি এবং আরও কয়েকজন। আমি আম্মার ডান বাহু ধরে বলছি, আম্মা আমাদেরকে ছেড়ে যাবেন না। আম্মা আমাদেরকে ছেড়ে যাবেন না। বলতে বলতে কাঁদতে শুরু করি। আম্মা কিছু বলেননা। অনবরত ডেকে যাওয়ার এক পর্যায়ে ডানহাত দিয়ে আমাকে খানিকটা বুকে টেনে নেন। মুখটা আমার দিকে ফেরান। ঠোঁটে এক ধরনের মায়াবী হাসি। আমি আরও জোড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলি ‘আম্মা আমাদেরকে ছেড়ে যাবেন না।’ এই চীৎকার করতে করতেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘড়িতে দেখি সাড়ে নয়টার ওপরে। রীতিমত হাঁফাচ্ছি। ছ্যাৎ করে ওঠে বুকের ভেতরটা। একি স্বপ্ন দেখলাম। তাহলে কি আম্মা আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন! (পরে আমার বোন বলেছে ঠিক ওই সময়টায়ই আম্মা চলে যান) কিছুক্ষন পরই হাসপাতাল থেকে মাইনুদ্দিনের ফোন। তাড়াতাড়ি যেতে হবে ডাক্তার কথা বলবেন। বোনের কথা শুধাই। সে নয়টার দিকে এসেছে। এর মধ্যে ডাক্তারদের সাথে কথা বলেছে। আমাকেও আসতে বলেছে।
পড়িমরি করে ছুটি হাসপাতালে। ততক্ষনে সেখানে আরও অনেকেই চলে এসেছে। আমি ঢুকে যাই সিসিইউ’তে। সেখানে নতুন এক ডাক্তার। শুধান রোগী আমার কি হন। বলি। ডাক্তার বলেন, আমরা সব ধরনের চেষ্টাই করেছি। কিন্তু উনার হার্টকে আর সচল করা যায় নাই। প্রায় চীৎকার করে উঠি, তার মানে? আমার আম্মা নাই! ডাক্তারের উত্তর, লাইফ সাপোর্ট দিয়ে লাঙ্ক সচল রেখেছি। বলি, আপনারা চেষ্টা করুন। যেভাবেই হোক আমার আম্মার হার্ট সচল করুন।
কাঁদতে কাঁদতে বাইরে চলে আসি। এর মধ্যে ভগ্নিপতি আব্দুস সালাম আসেন। ডাক্তারের সাথে কথা বলেন। প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে চলে পরামর্শ। ছোটভাই থাকে নিউ ইয়র্ক। অর্দ্ধ পাগলের মত হয়ে গেছে। আম্মার খবর নিচ্ছে দশ মিনিট পরপর। দেশে আসার জন্য টিকেট কেটে রেখেছে। পরদিন সকালে ফ্লাইট। ডাক্তারকে গিয়ে বলে আমার ভাই কাল এসে পৌঁছুবে, তার আসা পর্যন্ত যেন আম্মাকে মেরে ফেলা না হয়। ডাক্তার এবার খোলাখুলিই বলে, উনার হার্ট ফাংশন করা বন্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থা থেকে কেউ ফেরেনা। আম্মারও সব কিছু শেষ হয়ে গেছে।
আমার তাতেও বিশ্বাষ হচ্ছিল না যে আম্মা নাই। ওইতো তার শ্বাষ চলছে। বুকটা ওঠানামা করছে। উনি তো ঘুমিয়ে আছেন। গত কয়েকদিন ডাক্তার নামের জল্লাদগুলো তাকে ঘুমাতে দেয় নাই। আমানুষিক কষ্ট দিয়েছে। পানির জন্য বুকটা ফেটে গেছে, এক ফোটা পানি পর্যন্ত গলায় ঢালে নাই। এখানে এসে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন।
১২টার কিছু পরে ডাক্তার আবার ডেকে পাঠান। বলেন, আপনারা ডিসিশন দেন। কিসের ডিসিশন? লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলার। আমি শুধাই লাইফ সাপোর্ট খোলা মানে তো তার মৃত্যু। আপনারা আমার আম্মাকে মেরে ফেলতে চাইছেন কেন। ডাক্তার এবার বলেন, উনি তো নাই। এ অবস্থায় লাইফ সাপোর্টের মেশিন বেশীক্ষণ লাগিয়ে রাখার কোন অর্থ হয়না। বলি, কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত রাখতেই হবে। আমার ভাই এসে দেখবে আম্মার মুখ। তারপর যা করার। ডাক্তার বলেন, বড়জোর চার পাঁচ ঘন্টা রাখা যাবে। এত লম্বা সময় রাখলে তো শেষে নল খোলা যাবেনা। বডি স্টিফ হয়ে যাবে।
আমি কোন জবাব না দিয়ে বাইরে চলে আসি। কিছুক্ষন পর ভগ্নিপতি এসে বলেন ওরা তো আর মেশিন রাখতে চাইছেনা। আপনি এসে বলেন। আপনি অনুমতি না দিলে মেশিন খুলতে পারছে না। প্রায় রেগে যাই। কি বলছেন আপনি, আমার আম্মাকে মেরে ফেলার অনুমতি দেব আমি! যান, আপনারা যেটা ভাল মনে করেন, করেন।
ভগ্নিপতি চলে যান। এক কোনে বসে কেঁদে চলেছি ফুফিয়ে ফুফিয়ে। ভাগ্নি শাওন এসে দাঁড়ায় পাশে। বলে সে এখন ভেতর থেকে এসেছে। শুধাই, তোমার নানুর কি অবস্থা? শাওন বলে, উনার তো লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হয়েছে। থ’ হয়ে তাকিয়ে থাকি ওর মুখের দিকে। অষ্ফুটে শুধাই, কখন? এইতো একটু আগে।
তার মানে আম্মা নাই! আমার আম্মা নাই!! আমার আম্মা চলে গেছেন আমাদেরকে ছেড়ে!!! আমার আম্মা আর ফিরে আসবেন না! চীৎকার করে কেঁদে চলি। কিন্তু কেঁদে আর কি লাভ। আম্মা তো চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
আম্মা চলে গেলেন। কথা দিয়েছিলাম সুস্থ করে বাসায় নিয়ে যাবো। পারলাম না সে কথা রাখতে। শুধু মনে হচ্ছিল আম্মাকে মেরে ফেলার জন্যই হাসপাতালে আনলাম! কি হতভাগা সন্তান আমি! ৩৮ বছর আগে আব্বা চলে গেছেন। তখন বয়স ছিল কম, অতটা বুঝি নাই। বাবা মা চলে গেলে কেমন বোধ হয় বুঝলাম আমার আম্মা আমাকে ছেড়ে চলে যাবার পর।
আমার আম্মাকে মারলেন হাসপাতালের ডাক্তারগুলো। ভুল চিকিৎসা অপচিকিৎসা পরীক্ষা নীরিক্ষার গিনিপিগ বানিয়ে আমার আম্মাকে তিলে তিলে ঠেলে দেয়া হয়েছে মৃত্যুর দিকে। শুক্রবার যখন তাকে হাসপাতালে আনি এমন কোন লক্ষন ছিলনা যে তিনি মারা যাবেন। তা থাকলে তার চিকিৎসা করাতাম ভাল জায়গায় নিয়ে। লাঙ্কে পানি এসেছিল। এটা বের করে দিলেই তার ভাল হয়ে যাওয়ার কথা। আইসিইউতে নেয়ার পর প্রথম পরীক্ষায় পাওয়া গেছে তার কিডনী হার্ট লিভার ভাল অবস্থায় আছে। অর্থাৎ তখনও তার হার্ট এ্যটাক হয় নাই। এই এ্যাটাকটা হয়েছে হাসপাতালে ভর্তী করানোর পর। হয় আইসিইউতে নেয়ার আগে বেডে যখন তিনি চার পাঁচজন নার্সের সাথে প্রচন্ড শক্তি দিয়ে ধস্তাধস্তি করছিলেন তখন অথবা আইসিইউতে নেয়ার পর বুকের পাজরের নীচে ফুটো করার সময় ভয় পেয়ে। আগেই বলেছি হাসপাতালে পুরোটা সময় আম্মা সেন্সে ছিলেন এমনকি ইব্রাহিম কার্ডিয়াকে নিয়ে ঘুম পাড়ানোর ইঞ্জেকশন বা অষুধ দেয়ার আগ পর্যন্ত। তিনি সব কিছু দেখেছেন। তার বুক ফুটো করা থেকে শুরু করে নাকের মধ্যে নল লাগানো পাইপ দিয়ে খাওয়ানো, গলার ভেতর মোটা নল ঢুকিয়ে লাইফ সাপোর্ট দেয়া সব কিছু ঘটেছে তার চোখের সামনে। এত কিছু সহ্য করেও সেন্সে ছিলেন। এই সময়ের মধ্যেই কোন এক সময় তার হার্ট এ্যাটাক হয়। কিন্তু ডাক্তাররা সেটা ধরতে পারে নাই। সন্দেহ করেছেমাত্র। দুই দিন পর সিটি ষ্ক্যান করিয়ে যখন নিশ্চিত হলো তখন হার্টের অবস্থা একেবারেই শেষ পর্যায়ে। সবচেয়ে অমার্জনীয় অপরাধ হচ্ছে কার্ডিওলজির সাপোর্ট যাদের নাই তারা কেন চারটা দিন এইরকম একজন রোগী নিয়ে ওইরকম উদাসীনতায় কাটালো! ২৪ ঘন্টায় একজন করে সিনিয়র ডাক্তার এসে আইসিইউ’র রোগী দেখে যায়! এটা কোন হাসপাতাল হলো! এর নাম চিকিৎসা!
বাংলাদেশের মানুষ যাদের কিছুটা পয়সা আছে এদের অনেককেই দেখি অসুখ বিসুখে সিঙ্গাপুর ব্যাংকক কলকাতা ভেলর যাচ্ছে। আমি সব সময় এদেরকে ভৎর্সনা করেছি। বলেছি দেশে এত ডাক্তার হাসপাতাল থাকতে পয়সা খরচ করে বিদেশে যাওয়া কেন। দেশেই তো ভাল চিকিৎসা হয়। আসলেই দেশের চিকিৎসক চিকিৎসা সেবা সম্পর্কে আমার খুব ভাল ধারনা ছিল। এই হলো সেই ভাল’র নমুনা! আমার ভাল মানুষ আম্মাকে পয়সার লোভে অযতœ অবহেলা করে ভুল চিকিৎসা অপচিকিৎসার শিকার বানিয়ে মেরে ফেলা হলো। কার কাছে এর বিচার দেব!
এখন আমি সবাইকে বলি, দয়া করে কেউ কোন অবস্থাতেই বাংলাদেশের কোন হাসপাতালে ভর্তী হবেন না। ওরা আপনাকে মেরে ফেলবে!

ঢাকা, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৪

You Might Also Like