গুমের ঘটনায় সরকার সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় : বিবিসি সংলাপ

রাকিব হাসনাত সুমন

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপের এবারের পর্বের বিষয়বস্তু ছিল বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি। এতে অংশ নিয়ে বিএনপির একজন নেতা বলেছেন গুমের ঘটনা গুলোর বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। একই সাথে তিনি র‍্যাবকে বিলুপ্ত করতে তার দলের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।

তবে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বলেছেন গুম বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সরকার মোটেও নিষ্ক্রিয় নয়, নারায়ণগঞ্জ সহ বিভিন্ন স্থানের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। শনিবার ঢাকায় বাংলা একাডেমী মিলনায়তনে সংলাপের এ বিশেষ পর্বে বেশিরভাগ দর্শকই বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশন যথাযথভাবে কাজ করতে পারছেনা বলে মত প্রকাশ করেন।

এ পর্বে আলোচক ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ও দ্যা অবজারভার এর সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী শাজাহান ওমর, উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার এবং মানবাধিকার কমিশনের অনারারী মেম্বার ও জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ফওজিয়া করিম ফিরোজ।

অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন সানজিদা ইসলাম। তিনি জানতে চান সাম্প্রতিক সময়ে অনেকগুলো গুমের ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়নি। গুমের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে কি রাষ্ট্রের এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ? এই প্রশ্নের যৌক্তিকতা বোঝাতে এই দর্শক তার পরিবারের একজন সদস্যের গুম হওয়ার পরের ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “আমার ভাইকে গুম করা হয়েছে এক বছর আগে। এরপর আমরা র‍্যাব সদর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তিনবার আবেদনের পরও কোন তদন্ত হয়নি। আমরা এখনো উত্তর পাইনি”।

তবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ও দ্যা অবজারভার এর সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন গুম হচ্ছে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে সরকার এসব ঘটনায় মোটেও নিষ্ক্রিয় নয়।

একজন দর্শক

bbc_nocreditতিনি বলেন, “নারায়ণগঞ্জের ঘটনা উদঘাটিত হয়নি। যারা জড়িত ছিল তাদের আটক করা হয়েছে। ইলিয়াস আলী গুম হয়েছে। কিন্তু সরকার নিষ্ক্রিয় সেটা বলা যাবেনা”।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী শাজাহান ওমর বলেন গুম-খুনের সাথে সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর সম্পৃক্ততার কারণেই সরকার কোন পদক্ষেপ নিতে পারছেনা। তিনি বলেন, “যেখানে সরকার এসব বাহিনীকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করে সেখানে বাহিনীগুলো সরকারের উপর নিয়ন্ত্রণ পায়। সরকার যেহেতু তাদের ব্যবহার করছে তাই এখন মুখে কুলুপ দিয়ে বসে আছে”।

ফরিদা আখতার বলেন, “গুমের ঘটনাগুলোর সাথে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা আছে। আর সে কারণেই এসব ঘটনায় সরকারের নিষ্ক্রিয় থাকাই স্বাভাবিক”।

ফওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, “ঢালাওভাবে সব ঘটনা গুম বলা ঠিক হবেনা। দেখতে হবে এসব ঘটনার পর কতদূর পদক্ষেপ নেয়া হয়। অভিযোগ পেলে মানবাধিকার কমিশন তা গ্রহণ করে ও তদন্ত করে থাকে”।

র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি প্রসঙ্গ

তানজিয়া আলম জানতে চান র‍্যাবের অনেক কর্মকাণ্ডকে মানবাধিকার বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে এই বাহিনীর বিলুপ্তি দাবী করা হয়েছে দেশে ও দেশের বাইরে থেকে। একটি বাহিনী ভেঙ্গে

দেয়ার দাবী কতটুকু যৌক্তিক বলে আপনারা মনে করেন ?

এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে একজন দর্শক তার সন্তানকে তার সামনেই নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনা দেন।

তিনি বলেন, “আমার ছেলে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুবলীগের নেতা ছিল। তাকে র‍্যাব আমার সামনে, আমার বউয়ের সামনে ধরে আমাকে চারদিকে আক্রমণ করে ওরা নিয়ে যায়”।

তবে আলোচনায় অংশ নিয়ে অনেকেই আবার র‍্যাবকে বিলুপ্ত না করে সংস্কার বা নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব করেন।

প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শাজাহান ওমর বীর উত্তম এবং মানবাধিকার কমিশনের অনারারী সদস্য ফওজিয়া করিম ফিরোজ।

শাজাহান ওমর বলেন, “কিছু সদস্য র‍্যাবকে কলঙ্কিত করেছে। কয়েকজন ব্যক্তির জন্য এ সংস্থাটি ঘৃণিত হয়ে গেছে। তাই বিডিআর এর মতো এ সংস্থাটিরও নাম পরিবর্তন করা উচিত”।

ফওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, “র‌্যাবের পোশাকটির মধ্যেই নেতিবাচক একটি বিষয় রয়েছে। র‍্যাবকে বিলুপ্ত না করলেও এর পুনর্গঠন প্রয়োজন”।

ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, “কয়েকজন ব্যক্তির কাজের দায় সবার উপর পড়তে পারেনা। এদেশে দুজন রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়েছে সেজন্য কেউ সেনাবাহিনী বিলুপ্তির দাবি করেনি। কারণ বাহিনী না থাকলে দেশে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তবে যারা অন্যায় করবেন তাদের শাস্তি পেতে হবে”।

ফরিদা আখতার বলেন, “ কিছু সন্ত্রাসী হয়তো দমন হয়েছে কিন্তু র‍্যাব নামটাই খুনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে”। মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে জাতিসংঘ !

মির্জা আশরাফুল ইসলাম জানতে চান কোন সদস্য রাষ্ট্রে ব্যাপক মাত্রায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে থাকলে জাতিসংঘের কি উচিত সেখানে হস্তক্ষেপ করা ?

ফওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, “জাতিসংঘকে বলা যায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা চাই এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য ব্যবস্থা নিন”।

ফরিদা আখতার বলেন, “যেহেতু জাতিসংঘের মাধ্যমে আমাদের দেশ থেকে শান্তিরক্ষায় অন্য দেশে যায়, সেক্ষেত্রে আমাদের দেশেই যদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে সে প্রশ্ন তারা অবশ্যই তুলতে পারে”।

একজন দর্শক বলেন, “অনেক সময় জাতিসংঘ উদ্বেগ প্রকাশ করে। কিন্তু এটাই কি যথেষ্ট ? আরও পর্যবেক্ষণ করে ব্যবস্থা নেয়া উচিত”।

ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, “জাতিসংঘ যদি বিশ্বজুড়ে যারাই যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে তা শক্তিশালী হোক আর দুর্বল রাষ্ট্র হোক সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারলে জাতিসংঘ সৃষ্টির লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে। জাতিসংঘের উপর আস্থা তৈরি হবে”।

শাজাহান ওমর বলেন, “জাতিসংঘের তো কোন ফোঁস নেই। তার দাঁত আছে কিন্তু কামড় দেয়ার সুযোগ নেই। তারা চাপ সৃষ্টি করতে পারে”।

মানবাধিকার কমিশনের দায়ভার কতটুকু ?

মু: আনিসুর রহমান জানতে চান বাংলাদেশের নাজুক মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য কি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কোন রকম দায়ভার রয়েছে ?

ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, “মানবাধিকারের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় যে কোন সংস্থারই দায়ভার রয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করতে চাইলেই সেটি সম্ভব। রাষ্ট্র একা এটি পারবেনা। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে”।

মন্তব্য করছেন একজন দর্শক

শাজাহান ওমর বলেন, “কমিশনের তো কিছুই নেই। জনবল মনোবল অর্থবল বা কিছু করার ক্ষমতা কিছুই নেই।

ফরিদা আখতার বলেন, “ মানবাধিকার কমিশন হওয়ার পর যতটা আশাবাদী হয়েছি ততটা হতাশ হয়েছি। কমিশনকে ওভাবে সক্রিয় হতে দেখিনি”।

ফওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, “কমিশনকে আরও কার্যকর করতে হলে এর মর্যাদা, ক্ষমতার পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্কৃতিরও উন্নয়ন ঘটাতে হবে”।

তিনি বলেন, “সাধারণ মানুষ যদি কমিশনকে কমিশন হিসেবে না দেখেন, ওটুকু মর্যাদা না দেন, আস্থা না দেখান তাহলে কমিশন কোন ভরসায় কাজ করবে”।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে সঞ্চালক দর্শকদের কাছে জানতে চান মানবাধিকার রক্ষায় মানবাধিকার কমিশন কি তার দায়িত্ব পালন করতে পারছে?

জবাবে শতাধিক দর্শকের মধ্যে কয়েকজন ছাড়া বাকীরা সবাই মত দেন যে কমিশন দায়িত্ব পালন করতে পারছেনা।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?

You Might Also Like