ইকবাল-এর রাষ্ট্রদর্শন

ড. তারেক এম তওফীকুর রহমান

”Iqbal has come amongst us as a Messiah and has steered the dead with life’.  -Dr. Renold Nickolson (এক মুসলিম যুবকের ভাষ্যে)

”The Muslims may claim Dr. Iqbal a million times as their property, but he belongs to us all’-  ১৯২৯ সালে মহীশুর টাউন হলে ইকবালের সংবর্ধনায় এক অমুসলিম বক্তা।

‘খূদী কো কর বুলন্দ ইত্না/কেহ্ তক্দীর সে পহলে/খোদা বান্দে সে খোদ পূছে/ বাতা তেরি রেজা কিয়া হ্যায়’- মুহাম্মদ ইকবাল, ‘ইনসান-ই-কামিল’, যর্‌ব-ই-কালিম।

রাষ্ট্রদর্শনের ইতিহাস মোটামুটি আড়াই হাজার বছরের। গুরু সক্রেটিসের (৪৬৯-৩৯৯ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ) ‘মূলনীতি’  ও তাঁর জীবনের পরিণতির শিক্ষার আলোকে প্লেটো (৪২৭-৩৪৭ খ্রি. পৃ.) ও প্লেটোর শিষ্য এরিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রি. পূ.) আমাদের জানা রাষ্ট্রদর্শন প্রথম উপস্থাপন করেছেন। একে বলি প্রাচীন কালের রাষ্ট্রদর্শন।

বিশ্বের প্রথম ‘লিখিত সংবিধান’ প্রণয়নে নেতৃত্ব দেন হযরত মুহাম্মদ (স.)। রাজনৈতিক ব্যবস্থার ‘নমনীয় বিভিন্ন মূলনীতি’ আসে কুরআন মজিদের বিভিন্ন আয়াত বা বাক্যে। এ দু’টি ক্ষেত্রে ধর্ম হিসেবে ইসলাম সংশ্লিষ্ট হয়। খ্রিস্ট ধর্মের যাজকদের কেউ কেউ  প্লেটো-এরিস্টটলের রাষ্ট্রদর্শনের সাথে খ্রিস্ট ধর্মীয় চিন্তার মিশ্রণ ঘটাতে চেয়েছেন। মুসলিম দার্শনিকদেরও কেউ কেউ এমন চেষ্টা করেছেন। এ কালটিকে আমরা রাষ্ট্রদর্শনের মধ্যযুগ বলি। এ যুগে ধর্মাশ্রিত রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশ ঘটে।

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির (১৪৬৯-১৫১৭ খ্রি.) হাত ধরে আধুনিক যুগের রাষ্ট্রদর্শন এগিয়ে যায়। বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রাচ্য-প্রতীচ্যের অনেক ধীমান চিন্তাবিদ তাঁদের রাষ্ট্রদর্শন উপস্থাপন করেছেন। পশ্চিম ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকান চিন্তাবিদেরা এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য অব্যাহত রেখেছেন।

প্রাচ্যের, আরো নির্দিষ্ট করে বৃটিশ-ভারতের সন্তান, মুহাম্মদ ইকবাল (অতঃপর ইকবাল)  রাষ্ট্রদর্শনের ক্ষেত্রে কিছু তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছেন। চিন্তা ও চেতনার পরিপক্কতার সাথে ‘তাল মিলিয়ে’ ইকবাল  ‘ভিন্ন’ অথবা ‘অগ্রসর’ রাষ্ট্রদর্শন  উপস্থাপন করেছেন। একে তাঁর জীবন ও রাষ্ট্রদর্শনের বিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ইকবাল মহাকরির স্বীকৃতি পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর দার্শনিক পরিচিতি অন্য পরিচয়গুলোকে ছাপিয়ে গেছে। তাঁর দর্শন উপস্থাপনার ক্ষেত্র সমগ্র মানবজীবন, দেশ, রাজনীতি ও বিশ্ববিধাতা। ‘মানবাত্মা’ ও এর বিকাশ-উন্নয়ন বিষয়ক ইকবাল-দর্শন অগ্রসর শিক্ষিত সচেতন মন-মানসকে অনেক বেশি নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে। রাজনীতি ও রাষ্ট্র বিষয়ে ইকবালের চিন্তা-দর্শনকে এ প্রবন্ধে সংক্ষেপে বোঝার চেষ্টা করা হবে।

জাতীয়তাবাদ

১৯০৪ সাল পর্যন্ত ইকবাল জাতীয়তাবাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রপঞ্চ বা প্রসঙ্গ নিয়ে যে চিন্তা-দর্শন ইকবাল উপস্থাপন করেছেন, জীবনের অবশিষ্ট সময়ে তিনি তা থেকে সরে এসেছিলেন। এ জন্য ইকবালের ইউরোপ জীবন (১৯০৫-১৯০৮) তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে বলে দাবি করা হয়। দাবি করা হয় লন্ডন, ক্যামব্রিজ, মিউনিখসহ ইউরোপের বিভিন্ন শহরে অবস্থানকালে ইকবাল পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক দর্শন-চিন্তা-বোধ-বিশ্বাসকে ভেতর থেকে দেখার ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছিলেন। এই পর্যবেক্ষণ-সুযোগ ইকবালকে জাতীয়তাবাদের ইউরোপীয় ব্যাখ্যা ও অনুশীলন এবং এর ভয়াবহ পরিণাম বিষয়ে সচেতন করেছে। ভাষা, ভূখণ্ড, গোত্র ও বর্ণভিত্তিক জাতীয়তাবাদ মানবতার জন্য অন্যতম অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়। এসব জাতীয়তাবাদ অন্য মানুষের জন্য অমানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। বিপরীতে ইসলামের জীবনাদর্শ ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদ মানবতার জন্য করুণা ও আশীর্বাদ হতে পারে। এতে মানুষ ‘মানুষ’ হিসেবে স্বীকৃতি ও সম্মান পায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৯) সূত্রে প্রচলিত ভাষা-ভূখণ্ড-গোত্র-বর্ণভিত্তিক জাতীয়তাবাদের মর্মান্তিক মাশুল ইকবাল দেখেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ের তিনি আশঙ্কা করেছিলেন। ‘সাম্রাজ্যবাদের দানব’ এ জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি।

‘জাতীয়তা’ চিন্তার প্রথম পর্বে ইকবাল ইউরোপীয় বিবেচনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। তাই তিনি ‘তারানা-ই-হিন্দী’ কবিতায় ভূখণ্ডভিত্তিক হিন্দুস্তানী বা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জয়গান গেয়েছেন। লিখেছেন: ‘সারে জাহাঁ হে আচ্ছা/হিন্দুস্তাঁ হামারা’, বলেছেন, ‘ভারতের ফুল বাগানে আমি এক বুলবুল।’

অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ ইকবাল জাতীয়তার চিন্তায় বদলে যান। সে সময়ে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর জাতীয়তা বিষয়ক বিতর্ক ব্যাপক রাজনৈতিক রূপ পায়। মুসলিম নেতৃবর্গের এক অংশও ভূখণ্ডভিত্তিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পক্ষে প্রচারে নামেন। মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ও হুসাইন আহমদ মাদানীর মতো শীর্ষ ক’জন আলেমও এ মত প্রচার করেন। এ পর্যায়ে ইকবাল নীতিগত অবস্থান থেকে বলেন, জাতীয়তাবাদী ঐক্য ও সংহতির জন্য মানুষের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক ঐক্য অপরিহার্য। ধর্মীয় সূত্রে সারা বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠীর তওহীদ ও কাবাকেন্দ্রিক আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য রয়েছে। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও ভূখণ্ডে বিভক্ত অবস্থানে থাকার কারণে ও ‘সার্বজনীন ইমামত’ ব্যর্থ হওয়ায় একক নেতৃত্বের অধীনে তাৎক্ষণিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব নয়। তাই তাদের ভূখণ্ডভিত্তিক নেতৃত্বের অধীনে আপাততঃ ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং ভূখণ্ড ও ভাষাভিত্তিক ভিন্নতা স্বীকার করেই বিশ্ব পর্যায়ে একটি শিথিল ও আদর্শিক-সাংস্কৃতিক ঐক্য বা জাতিপুঞ্জ গড়ে তুলতে হবে। ইকবাল তেহরানভিত্তিক একটি ইসলামী জাতিপুঞ্জের কল্পনা করেছিলেন। পরে অবশ্য মক্কাভিত্তিক একটি মুসলিম সংস্থা ওআইসি (অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স) গঠিত হয়েছে। মুসলিম জাতির ঐক্যকে ইকবাল একটি ‘স্বাভাবিক ঐক্য’ হিসেবে দাবি করেছেন। নদীতে থাকা মাছ নদী-উপসাগর-সাগর-মহাসাগরে বিচরণে যেমন কোনো বাধার মুখে পড়ে না (‘বাং-ই-দারা’), সাংস্কৃতিক ঐক্যের মুসলিম জাতিপুঞ্জেও তেমনি একদিন মুসলিমেরা নির্বিবাদে ঘুরে বেড়াতেন্ এবং ন্যায্য স্বীকৃতি পেতেন। ইবনে বতুতা আল মাগরিব মরক্কোর ‘তুনাজা’ শহরে জন্মেছিলেন, বড় হয়েছিলেন। ‘তানবাকা’য় গিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেন। মিশরে গিয়ে ইবনে বতুতা প্রধান বিচারপতি হলেন। ভারত উপমহাদেশে এলে ইবনে বতুতাকে সুলতান মুহাম্মদ তুঘলক শাফেয়ী ফিক্হের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেন। পরে তিনি চীনে ভারতের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন।

ইকবাল নির্দিষ্টভাবেই উচ্চারণ করলেন, ‘জাতীয়তা দেশ ও  ভাষার ভিত্তিতে হয় না, বরং দ্বীন ও আকীদা-বিশ্বাসের ভিত্তিতে আকীদা পোষণকারী এবং এক সভ্যতা-সংস্কৃতির ধারক জাতি। যে সব জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও পথ মুসলমানদের থেকে ভিন্নতর, তাদের জাতীয়তা থেকে মুসলিম জাতীয়তা সম্পূর্ণ পৃথক।’ ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তা বিষয়ে ইকবাল লিখলেন: ‘ওসব জীবন্ত খোদার মধ্যে/সবচেয়ে বড়ো খোদা জন্মভূমি/যা তার জামা/তা-ই ধর্মের কাফন’। ইকবাল তীব্র প্রতিবাদ করেন: ‘হে অঞ্চল-পূজারী,/ এরা হিন্দী আর ওরা খোরাসানী,/এরা আফগানী আর ওরা তুরানী-/বাদ দাও এসব, ছড়িয়ে পড়ো সারাবিশ্বে/সাগর তরঙ্গময়।’ লিখলেন: ‘এক জাতি যে আরেক জাতির দুশমন-তার মূলতো এই,/ দেশ বিজয়ের নেশাও আসে এই স্বদেশের প্রেম থেকেই।/রাষ্ট্র  থেকে ধর্ম যে আজ পৃথক তারও এই কারণ/এতেই করে সরলরা ভাই দুর্বলদের আক্রমণ।/ ওয়াৎনিয়াতের তারই আজি খণ্ডিত সব মানবজাত/দ্বীন্ ইসলামের কওমিয়াতের জড় কেটে দেয়া ওয়াৎনিয়াৎ।  এ জাতীয়তার অনুসারীদের এবং নির্দিষ্টভাবে হুসাইন আহমদ মাদানীদের উদ্দেশ্য করে ইকবাল লিখেছেন: ‘বুঝেনি ঐ আজমবাসী/দ্বীনের মর্ম বিহ্বলতা,/দেওবন্দে তাই তো হুসাইন/আহমদ কন আজব কথা।/ ‘ওয়াতান থেকে মিল্লাত হয়-’/ এই কথা ফের গান যে তিনি। / বুঝেননি হায় নবীর মকাম, / আল-আরাবীর মান যে তিনি।/নবীর কাছে পৌঁছিয়ে দাও/ নিজেকে, এই দ্বীনের দাবী/ পৌঁছাতে না পার যদি,/ সবই হবে বু-লাহাবী।’

এর বিপরীত কাঙ্ক্ষিত জাতীয়তা বিষয়ে ইকবাল লিখলেন: ‘চীন ও আরব আমাদের,/ হিন্দুস্তান আমাদের।/আমরা মুসলিম,/সারা জাহান আমাদের।’ (চীন-ও-আরব হামারা হিন্দুস্তাঁ হামারা/মুসলিম হ্যাঁয় হাম ওয়াতন/ হ্যাঁয় সারে জাহাঁ হামারা।’ লিখেছেন: ‘আমরা দেশের কোনো সীমানা চিনি নাই/দুইটি নয়ন হতে একক রশ্মির মতো আমরা সবাই/ হেজাজ্, ইরান, চীন সব আমাদের/ আমরা তাদের।’

ইকবালের কাঙ্ক্ষিত প্যান ইসলামিজম একবিংশ শতাব্দিতেও কার্যত আলোর মুখ দেখেনি।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র

ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়েও ইকবাল তাঁর পূর্বতন চিন্তা থেকে সরে আসেন ইউরোপীয় অভিজ্ঞতার সূত্রে। বাংলায় পরিভাষাটি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ হিসেবে সুপরিচিত হলেও এর যথার্থ বাংলা পরিভাষা হওয়া উচিৎ ইহজাগতিকতা। এর ইংরেজী পরিভাষা সিকিউলারিজম । এ প্রত্যয়টির মূল কথা: ইহজগতের সুখ-সুবিধা-কল্যাণের জন্য মানুষ আপনার জ্ঞান ও যুক্তির ভিত্তিতে দেশ-সমাজ-রাষ্ট্র-রাজনীতি পরিচালনা করবে। এর সাথে পরজগতের কোনো বিবেচনা কাজে লাগানো যাবে না। পরজগতের বিবেচনার সাথে প্রধানত ধর্মের সম্পর্ক। এ জন্য বাংলা ভাষীদের অনেকে সেক্যুলারিজম এর বাংলা করেছেন ধর্মনিরপেক্ষতা। দেশ-সমাজ-রাষ্ট্র-রাজনীতি থেকে ধর্মকে পৃথক করার যে প্রত্যয় সেক্যুলারিজম-এ রয়েছে, এটিকে তীব্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেন ইকবাল। বলেন: ‘যেদিন বিচ্ছিন্ন হ’ল ধর্ম আর রাষ্ট্র একে একে;/লালসার আধিপত্য দেখা দিল সেই দিন থেকে।/ বাদশাহী বিক্রম আর পরিহাস এ গণতন্ত্রের,/বিচ্ছিন্ন যখন ধর্ম রাজনীতি থেকে/অবশিষ্ট থাকে শুধু নীতি চেঙ্গিসের।’  কেবল মানুষের বস্তুগত বুদ্ধি-বিবেচনা থেকে দেশ-রাজনীতি চালিত হলে মানবতার কাক্সিক্ষত কল্যাণ-সমৃদ্ধি সম্ভব নয় বলে ইকবাল বিশ্বাস করতেন। এর সাথে ধর্ম ও নৈতিক নির্দেশনার কার্যকর সংযোগ অপরিহার্য-ইকবাল দাবি করেন।

ইউরোপীয় অনুশীলনের গণতন্ত্র বিষয়েও ইকবাল গভীরভাবে হতাশ ছিলেন। তীব্র সমালোচনায় তিনি লিখেছেন: ‘গণতন্ত্র এমন এক শাসনপ্রণালী/যেখানে মানুষকে গণনাই করা হয়,/ পরিমাপ করা হয় না/ তাদের মস্তিস্কের।’ গণতন্ত্রের মূলনীতির বিষয়ে ইকবাল একমত এবং আগ্রহী হলেও নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণের বদলে এর নেহায়েত ‘মাথা গোণার’ নীতিকে অগ্রহণযোগ্য বলেছেন।

পুঁজিবাদ-সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ

পুঁজিবাদের উদারতাবাদ ও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে ইকবাল মূল্যবান বলেছেন। কিন্তু এর লাগামহীন ভোগ-বিত্ত-বিলাসকে নিন্দা করেছেন। সমজাতন্ত্র-সাম্যবাদের বিবেচনায় সব মানুষের সাম্য ও কল্যাণ চিন্তাকে ইকবাল গভীরভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু স্রষ্টার অস্বীকৃতিকে এ দর্শনের দীনতা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন- ‘সর্বশক্তিমান শয়তানের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার মতো শক্তি হলো মার্কসবাদ। এ কথা ঠিক যে, মার্কসবাদকে পরম সিদ্ধি বলে ভাবেননি; এই কবি, ভাবেননি, কেননা সেখানে ধর্মের কোনো প্রশ্রয় নেই, ঈশ্বরকে সমূলে অস্বীকার করা হয়েছে সেখানে। রুশ দেশে সমাজতেন্ত্রর প্রতিষ্ঠার পর তাকে স্বাগত জানিয়ে ইকবাল বলেছিলেন যে, একটাই তার নেতির দিক, তাদের ওই সাম্যবাদের সঙ্গে ঈশ্বরবোধ যুক্ত হলেই পৌঁছে যাওয়া যায় ইসলামের ধারণায়, মনে হয়েছিলো তার।’  ধন-বৈষম্য, শ্রেণী শোষণ, পুঁজিবাদের দাপট ইকবালকে ক্ষুব্ধ করে। বিক্ষুব্ধ ইকবালের উচ্চারণ: ‘কলকারখানার মালিক কাজের নয়। /আয়েস পুতুল, শ্রম করা নাহি চায়।/ কোরান বলিছে, খেটে খাও সবে নিজে।/ কোন্ মজুরের শ্রমফল ধনী খায়? / …  আর এ জমির মালিক মুফতে দেখ/ সকল রক্ত খেয়ে গেল কিষানের।’ …‘ওঠো দুনিয়ার গরীব ভুখারে জাগিয়ে দাও।/ ধনিকের দ্বারে ত্রাসের কাঁপন লাগিয়ে দাও। / … কিষান মজুর পায় না যে মাঠে শ্রমের ফল/ সে মাঠের সব শস্যে আগুন লাগিয়ে দাও।’

শোষিত-বঞ্চিত মানবতার পক্ষে এমন ক্ষুরধার উচ্চারণ শুনে ইকবালকে অনেকে সমাজতন্ত্রী-সাম্যবাদী বলবেন, তা অস্বাভাবিক ছিলো না। কিন্তু ইকবাল নেহায়েত বস্তুবাদী এ দর্শন গ্রহণ করেন নি। লিখেছেন: ‘…বলশেভিক ভাবধারা রাখা আমার কাছে ইসলামের গণ্ডি থেকে খারিজ হয়ে যাবারই নামান্তর। আমার বিশ্বাস এবং সে বিশ্বাস দলিল-প্রমাণাদির উপর প্রতিষ্ঠিত যে, মানবগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সমস্যার সবচেয়ে উত্তম সমাধান আল কুরআন পেশ করেছে। এতে কোন সন্দেহ নেই, পুঁজিবাদের শক্তিতে যদি নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে তাতে তা বিশ্বের জন্য এক প্রকার অভিশপ্ত রূপে পরিণত হবে। কিন্তু বিশ্বকে তার ক্ষতির প্রভাব থেকে মুক্তি দেয়ার উপায় এই নয় যে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে এই শক্তিকে বাদ দেয়া হবে, যে পন্থা বলশেভিকপন্থীরা অবলম্বন করেছে। কুরআনুল করীম এই শক্তিকে যথাযথ সীমার মধ্যে রাখার জন্য ওয়ারিসী আইন, সুদ নামকরণ এবং যাকাত ও সাদকা ইত্যাদি প্রদানের ব্যবস্থা রেখেছে। মানব চরিত্রের পরিপ্রেক্ষিতে এই পন্থাই বাস্তবায়নযোগ্য।’ … ‘ইসলাম পুঁজির শক্তিকে জীবন ব্যবস্থাকে বাদ দেয় না; বরং প্রকৃতির উপর একটু গভীর দৃষ্টিপাত করে তাকে বহাল রাখে এবং আমাদের জন্য এমন একটি জীবন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে যার ভিত্তিতে কার্যক্রম গ্রহণ করলে এই শক্তি কখনো স্বীয় ক্ষমতা অতিক্রম করতে পারে না।’

ইউরোপীয় বিবেচনার পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদকে ইকবাল মানবতার জন্য উপযুক্ত জীবন দর্শন হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন নি। তিনি মানবতার কথা ভেবেছেন, বঞ্চিত-শোষিত মানুষের কাক্সিক্ষত সমৃদ্ধির কথা ভেবেছেন। একই সাথে মানবাত্মার সাথে এ ইহ জীবনে জগৎ-স্রষ্টার কাক্সিক্ষত সম্পর্ক রক্ষা করে মানবের দায়িত্বের কথাও জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রদর্শন

ইকবাল ইউরোপীয় বা পশ্চিমা দর্শন অধ্যয়ন করেছেন। এর তাৎপর্য অনুধাবন করেছেন। এর প্রয়োগ, অনুশীলন ও ফলাফল হৃদয়ঙ্গম করেছেন। এ কাজের উপযুক্ত যোগ্যতা ও স্বীকৃতি তিনি সংশ্লি¬ষ্ট সবার নিকট থেকেই অর্জন করেছিলেন। এ যোগ্যতা ও স্বীকৃতির সূত্রেই তিনি পশ্চিমা দর্শন ও সভ্যতার মূল্যায়ন করেছেন। লিখেছেন: ‘উভয়ই (পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্যবাদ)/আল্লাহর থেকে গেছে দূরে সরে,/ মানুষকে দিয়েছে ধোঁকা/ মানবতা গুঁড়িয়ে যাচ্ছে তাদের যাঁতা তলে,/ কেউ কেড়ে নেয় শরীর থেকে জীবন/ আর কেউ হাত থেকে রুটি।’… ‘হে পাশ্চাত্যবাসী! / আল্লাহর এ পৃথিবীকে একটি দোকান ঘর মনে করো না। / তোমরা যাকে এ হাটে স্বর্ণ মুদ্রা মনে করছ, / তা প্রমাণিত হবে মেকি বলে।/ তোমাদের নিজেদের উদ্যত খঞ্জবের উপরই/ আপতিত হবে তোমাদের সভ্যতা/ ভঙ্গুর বৃক্ষ শাখায় নির্মিত নীড়/ ভেঙ্গে পড়বে- আজ নয়/ আগামীকাল।’

এ ভঙ্গুর এবং মানবতার জন্য চূড়ান্ত বিবেচনায় ক্ষতিকর হলেও মূলনীতি হিসেবে সাম্যবাদ ও গণতন্ত্রকে সাদরে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন ইকবাল। কখনো উচ্চারণ করেছেন: ‘তাঁকে কোনো রাষ্ট্রের ডিক্টেটর নির্বাচিত করা হলে তিনি গণতান্ত্রিক নীতির মারফত ইসলামী জীবনদর্শনের রূপায়ণ করে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতেন।’

সামগ্রিক জীবন দর্শন হিসেবে ইকবাল ইসলামকে গ্রহণ করেছিলেন তাঁর পরিণত বয়সে। এ জীবন দর্শনের তাৎপর্যপূর্ণ অংশ রাষ্ট্রদর্শন। এ রাষ্ট্রদর্শনের উৎস আল কুরআন। আল কুরআন বিষয়ে ইকবালের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ: ‘কুরআন কি জান? পুঁজিবাদীর মৃত্যু পরোয়ানা/এই কুরআন/ যার কিছু নেই সেই কৃষক শ্রমিকের এ বন্ধু’।

এভাবেই শুরু ইকবালের রাষ্ট্রদর্শনের। ইকবাল বলেন: ‘ইসলাম মানুষের একত্বকে আত্মা ও বস্তুর সমন্বয়াতীত দ্বৈতবাদে বিভক্ত করে না। ইসলামে আল্লাহ ও বিশ্ব প্রকৃতি, আত্মা ও বস্তু, উপাসনাগার ও রাষ্ট্র পরস্পরের পরিপূরক।’

‘ইসলামী জীবন-ব্যবস্থায় গতিশীলতা’ শীর্ষক ভাষণে ইকবাল তাঁর রাষ্ট্রদর্শন মোটামুটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে তা থেকে কয়েকটি বাক্য উপস্থাপন করা হলো: ‘… স্থান-কালের পরিপ্রেক্ষিতে জড় চেতনের রূপ লাভ করে। মানুষের মধ্যে জড় ও চেতনের সমাবেশ বিদ্যমান। জগতের কার্যকলাপের মধ্যে মানুষ প্রতিভাত হয় দেহ রূপে; সেই একই কার্যের আদর্শ ও উদ্দেশ্য বিচারে তাকে দেখতে পাওয়া যায় মন বা আত্মারূপে। তওহীদের কার্যকরী অভিব্যক্তি হল সাম্য, সংহতি ও স্বাধীনতায়। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে রাষ্ট্র হল এই আদর্শ নীতিগুলোকে স্থান-কালীয় শক্তিতে পরিণত করার প্রচেষ্টা বা এসব নীতিকে নির্দিষ্ট মানবীয় অনুষ্ঠানে রূপায়িত করবার আকাঙ্কক্ষা। একমাত্র এই বিশেষ অর্থেই ইসলামী রাষ্ট্রকে ‘ধর্মীয়’ আখ্যা দেওয়া হয়, এর অর্থ এই নয় যে, ‘ধরাপৃষ্ঠে আল্লাহর প্রতিভূ’ বেশে কেউ এ রাষ্ট্রের কর্ণধার থাকবেন এবং নিজের কল্পিত অভ্রান্ততার সুযোগ নিয়ে তিনি যদৃচ্ছাচারের অধিকার ভোগ করবেন। ইসলামের সমালোচকেরা এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটির প্রতি দৃষ্টি দেননি।… ঐহিক জগৎ বলে কিছু নেই। বস্তু জগতের এই বিশাল অভিব্যক্তি আত্মার আত্মোপলব্ধিরই একটি পন্থা মাত্র। সব ভূমিই পবিত্র ভূমি। রসূলুল্লাহ বলেছেন, ‘আমাদের সমগ্র পৃথিবীটাই একটি মসজিদ।’ ইসলামী দৃষ্টিতে রাষ্ট্র হল মানবীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে পরমাত্মাকে উপলব্ধি করবার একটি প্রচেষ্টা মাত্র।… সাধারণতন্ত্রী শাসনব্যবস্থা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল, শুধু তা-ই নয়, অধিকন্তু আজকের মুসলিম জগতের উদ্ভূত নব নব সমস্যাবলী নিয়ন্ত্রণ ক্ষেত্রে এ শাসন ব্যবস্থাই একান্তভাবে প্রযোজ্য।… ইসলামে দেশভেদ নেই। এর উদ্দেশ্য হল সমগ্র মানবমণ্ডলীকে নিয়ে এক মহাজাতি গঠন করা। পরস্পর বিরোধী জাতিসমূহকে এ একত্র করবে, তারপর সেই ছোট ছোট জাতির সমন্বয়ে পরিণামে যে মহাজাতি গড়ে উঠবে, সে মহাজাতিতে ছোট ছোট জাতিরও আত্মচেতনা অবলুপ্ত হয়ে যাবে না, জেগে থাকবে।… আজকের মুসলমানদের জন্য একান্তভাবে কাম্য, পারিপার্শ্বিক বিশ্বের পটভূমিতে নিজ অবস্থা পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা, ইসলামের মৌলিক নীতিসমূহের আলোকে সমাজজীবনকে পুনর্গঠিত করা এবং মুসলিম জীবনের যা চরমতম উদ্দেশ্য- আজ পর্যন্ত যার আংশিক বিকাশ মাত্র হয়েছে- সেই আধ্যাত্মিক গণতন্ত্রের ক্রমবিকাশ সাধনে এগিয়ে আসা।’

আপতত শেষ কথা

পরমাত্মাকে উপলব্ধি করার মানবীয় প্রচেষ্টার সৃষ্টি যে রাষ্ট্র, তেমন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হোক ইকবাল চেয়েছিলেন। বাস্তবে তা তাঁর দেখা হয়নি। যে রাষ্ট্র মানবাত্মাকে উন্নততর ব্যক্তিত্ব প্রদান করবে, বঞ্চিত-শোষিত-বিপর্যস্ত মানুষের ন্যায্য অধিকারে তৃপ্ত করবে, সে রাষ্ট্র ইকবাল দেখার সুযোগ পাননি। বৃটিশ-ভারতীয় প্রেক্ষাপটে ইকবাল স্থানীয় ও তৎকালীন মুসলিম জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে যে স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছিলেন, ‘ধর্ম-বিবেচনার দোষে’ তা নানাভাবে সমালোচিত  হয়েছে। কেউ কেউ সে সমালোচনাকে খণ্ডনও করেছেন।  ব্যক্তিত্ব,পাণ্ডিত্য আর শুদ্ধতার সেরা সমন্বয় ইকবাল একটি নাতিদীর্ঘ জীবনকাল (১৮৭৭-১৯৩৮) পেয়েছিলেন। ‘খূদী’কে ‘ইনসানে কামিলে’ উন্নীত করেই সম্ভবত ইকবাল ইহজীবন শেষ করেন। লিখেন জীবনের শেষ পংক্তিমালা: ‘প্রকৃত মুমিন কে বা,/ শোন তার পরিচয় / মরণ আসিবে যবে/ অধরেতে হাসি রয়।’

শোষিত-বঞ্চিত-বিপর্যস্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটানো আর পরমাত্মাকে উপলব্ধি করায় সক্ষম রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রপুঞ্জ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত ইকবালের রাষ্ট্র দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা থেকে যাবে, অনুমান করি।

(মহাকবি ইকবালের ১৩৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আল্লামা ইকবাল সংসদ, বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ইকবাল-এর রাষ্ট্রদর্শন’ শীর্ষক সেমিনারের মূল প্রবন্ধ।)

প্রবন্ধকার: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

You Might Also Like