ক্ষমতার দ্বন্দ্বেই ক্রমে লাগামহীন ও বেপরোয়া ছাত্রলীগ!

আওয়ামী লীগের সহযোগী ছাত্রসংগঠন লীগের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা ক্রমেই লাগামহীন ও বেপরোয়া হয়ে পড়ছেন।

তাদের এহেন কর্মকাণ্ডে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারও বিব্রত। ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, মন্ত্রী ও সাংসদ এবং শিক্ষকদের পর্যন্ত।

কিন্তু ছাত্রলীগের এই বেসামাল হয়ে ওঠার কারণ কী? এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, কমিটি গঠন নিয়ে স্থানীয় নেতা, সাংসদ ও মন্ত্রীর দ্বন্দ্ব ছাড়াও শিক্ষক রাজনীতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও প্রচেষ্টার ঘটনায় বিভিন্ন সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। নেপথ্যে শেল্টারদাতাদের আধিপত্যের জেরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জড়িয়ে পড়ছেন এসব ঘটনায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এক নেতা জানান, যেকোনো ইউনিটে কমিটি করতে স্থানীয় এসব প্রভাবশালী নেতাদের পছন্দ অনুযায়ীই করতে হয়। আর তাদের পছন্দমতো কমিটি দিতে না পারলে ওই কমিটি বেশি দিন টিকতে পারে না। পেছন থেকে বিভিন্নভাবে কলকাঠি নাড়া হয়।

গত ১৮ নভেম্বর দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর কলেজের একাডেমিক কাউন্সিল আগামী তিন মাস ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগ দুই ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে একটি গ্রুপ ১৩ নভেম্বর মো. মোজাহিদুর হাসানকে সভাপতি ও কৌশিক দেবকে সাধারণ সম্পাদক করে ৬১ সদস্যের কমিটি গঠন করে। এই গ্রুপের কমিটিকে অনুমোদন দেন জেলা ছাত্রলীগের পাঁচ সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক ও দুই যুগ্ম আহ্বায়ক। আর ছাত্রলীগের এই তিন নেতা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা এবং জেলা আওয়ামী লীগের এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পক্ষের অনুসারী।
এর দুই দিন পরে জেলা ছাত্রলীগের অপর গ্রুপটি আশফাকুর রহমানকে সভাপতি ও এস এম আসফিকার সামসকে সাধারণ সম্পাদক করে ৬১ সদস্যের পাল্টা কমিটি গঠন করে। আর এ কমিটির অনুমোদন দেন সদর আসনের সাংসদের অনুসারী। এই পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠনই উদ্ভূত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে বলে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের একাধিক ছাত্রলীগ কর্মী এবং শিক্ষার্থীরা দাবি করেন।

অপরদিকে গত বৃহস্পতিবার সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে  ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে সুমন দাস নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হন। কিন্তু তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন না। তিনি সিলেট শহরের ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসনের (বিবিএ) তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

আধিপত্য বিস্তার ও হল দখলকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জীবন চক্রবর্তী ও সহসভাপতি অঞ্জন রায়ের পক্ষের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। সভাপতি পক্ষের সঙ্গে যোগ দেন সাধারণ সম্পাদক ইমরান খানের পক্ষের কর্মীরা। সহসভাপতি পক্ষের সঙ্গে যোগ দেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য উত্তম কুমার দাসের সমর্থকেরা।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, বিবদমান এই দুই গ্রুপের মধ্যে সভাপতি পক্ষের গ্রুপটি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সাবেক সাংসদের মদদপুষ্ট। অপরপক্ষে সহসভাপতি গ্রুপ কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এক উপদেষ্টা পরিষদ এবং প্রাক্তন মন্ত্রীর মদদপুষ্ট অনুসারী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাবিপ্রবিসহ বিভিন্ন ইউনিটের একাধিক ছাত্রলীগ নেতা রাইজিংবিডিকে কেন্দ্রীয় নেতাদের এই গ্রুপিংয়ের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এই রকম চিত্র সম্প্রতি গঠিত ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটে। এই মুহূর্তে অন্তত আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে ছাত্রলীগের এসব ঘটনায়। তার সর্বশেষ বলি হলো সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত মহাজোট সরকারের মেয়াদকাল ও নতুন সরকারের গত সাড়ে ১০ মাসে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা কয়েক হাজার সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। এর মধ্যে গত সাড়ে ১০ মাসেই অন্তত শতাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর বেশির ভাগই ঘটেছে নিজেদের মধ্যে। এসব ঘটনায় অনেক জায়গায় এ সংগঠনের কমিটি বিলুপ্ত করতে হয়েছে। গত কয়েক দিনে এ রকম তিনটি কমিটি স্থগিত করার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা ও সংঘর্ষের পেছনে স্থানীয় সাংসদ, মন্ত্রী ও নেতার দ্বন্দ্বের সঙ্গে শিক্ষক রাজনীতির দিকেও অঙ্গুলি নির্দেশ করেছে।

দলীয় সংশ্লিষ্টরা জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্রীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটে মনিটরিংয়ের উদ্যোগ না থাকা এবং অর্থের বিনিময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের কমিটিতে পদায়নেরও ঘটনা ঘটছে।

কিছুদিন আগে রংপুর মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের কমিটির গঠন নিয়ে মহানগর ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক লেনদেনের অভিযোগে কমিটি স্থগিত ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় কমিটি। একই সঙ্গে সভাপতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি যথাক্রমে জয়দেব নন্দী ও আবদুল কাদের মহিউদ্দিন এবং দপ্তর সম্পাদক শেখ রাসেলকে নিয়ে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং এই কমিটি খুব শিগগির রংপুরে এসে পুরো ঘটনার তদন্ত করবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গত ১৫ অক্টোবর রংপুর মহানগর ছাত্রলীগ রংপুর মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি অনুমোদন করে।

ছাত্রলীগে আরো কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা- ১৩ জুলাই ইফতার পার্টিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে খুন হন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ছাত্র নাইমুল ইসলাম রিয়াদ। ১ এপ্রিল ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) নিজ দলের কর্মীদের হামলায় খুন হন ছাত্রলীগ নেতা সায়াদ ইবনে মোমতাজ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে ইফতারির টোকেন ভাগ-বাঁটোয়ারাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে ছাত্রলীগ কর্মী নাসিরুল্লাহ নাসিমকে শাহ মখদুম হলের দোতলার ছাদ থেকে ফেলে দেয় দলীয় কর্মীরা। ঘটনার এক সপ্তাহ পর ২৩ আগস্ট ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার।

২০১১ সালের ১৬ জুলাই পদ্মা সেতুর টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন রাবি ছাত্রলীগ সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের মাঝে বিশ্ববিদ্যালয় মাদার বখশ হলের সামনে সংঘর্ষ হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় ছাত্রলীগ কর্মী আবদুল্লাহ আল সোহেল। ৪ এপ্রিল, ২০১৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের ২৩০ নম্বর কক্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ছাত্রলীগ নেতা রুস্তম আলী আকন্দ।

এ ছাড়া ২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি বিকেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জুবায়ের আহমেদ নামে এক কর্মীকে কুপিয়ে খুন করে নিজ সংগঠনের প্রতিপক্ষের নেতা-কর্মীরা। ২০১০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এএফ রহমান হলের সিট দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময়ে খুন হন আবু বকর সিদ্দিক।

এ ব্যাপারে ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগের মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে আজ শুক্রবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগ সভাপতি বলেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের মধ্যে কোনো সংঘর্ষ হয়নি। বহিরাগতরা এসে ক্যাম্পাসে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। কিন্তু কিছু গণমাধ্যম এ ঘটনায় ছাত্রলীগকে জড়ানোর ‘হীন’ চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত ও বহিরাগত সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ডের ফলে ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে ‘বহিরাগত’ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সুমন দাস নামের এক শিক্ষার্থীকে। নিহত সুমন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। সে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও ছিল না। তিনি বলেন, গতকাল কেন তিনি (সুমন) ক্যাম্পাসে আসলেন? বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতি করলে তা করবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে কেন আসবে? আর তার দায় বরাবরের মতো ছাত্রলীগের ঘাড়ে কেন বর্তাবে?’

অপরদিকে শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচার মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘরে বঙ্গবন্ধু একাডেমীর আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছাত্রলীগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ছাত্রলীগকে রক্ষা করতে হবে। গুটি কয়েক কর্মী ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে ম্লান করে দিচ্ছে। সময় চলে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ছাত্রলীগকে আবার নীতি ও আদর্শের পথে নিয়ে আসতে হবে। প্রধানমন্ত্রী কষ্ট করে যা কিছু অর্জন করছেন, তা কয়েকজনের কারণে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।’

সূত্র: রাইজিংবিডি

You Might Also Like