প্রিয় রফিক ভাইঃ অন্তরগত আলোকের গান

শাহানা আকতার মহুয়া

[আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রূপকার রফিকুল ইসলামের মৃত্যুদিবস। প্রকৃতির নিয়মে পেরিয়ে গেল একটা বছর! পৃথিবীতে কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হয়নি তাঁর মৃত্যুতে, দিন-মাস-বছর, গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত কিন্তু আমরা প্রবলভাবে রফিক ভাইয়ের শূন্যতা অনুভব করি। প্রিয় রফিক ভাই, অনেক শ্রদ্ধা আর ভালবাসা আপনার জন্য।]

রফিক ভাইকে দেখলে শিল্পী শাহাবুদ্দিনের প্রবল গতিময় ছবির কথা মনে হতো। মনে হতো সবসময় যেন প্রাণচাঞ্চল্যে টগবগ করছেন। মাঝে মাঝে নিজেই ভাবতাম-আশ্চর্য! এই ব্যস্ত জীবনের ফাঁকফোঁকড় গলিয়ে কিভাবে তিনি অদম্য ছুটে চলেছেন নিজের লক্ষ্যের দিকে। সম্ভব হলে তার কাছ থেকে প্রাণশক্তি ধার করতাম! মানুষের তো কখনো না কখনো ক্লান্তি আসে, বিরক্তি আসে, মলিন হয় মুখ- কিনতু তাঁকে কখনো হাসিমুখ ছাড়া কেউ দেখেছে কিনা সন্দেহ! আরে, তিনি কী মুখে একটা মাস্ক লাগিয়ে রাখেন! তাই বা হয় কি করে! তাহলে চোখ, দৃষ্টি তো লুকোবার নয়।
২০০৮ সালে ভ্যাঙ্কুভারে আসার পর থেকে কোনো এক টানে রফিক ভাই আর বুলি আপাকে অনেক কাছে পেয়ে গিয়েছিলাম। অন্তর-বাহিরে দু’জনেই এতো উজ্জ্বল, এতো আলোময় যে তাদের আশেপাশের মানুষেরাও বোধহয় কিছুটা হলেও সেই ছটায় আলোকিত হয়েছে নিজেদের অজান্তেই।
Rafiqul Islam11
আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি, রফিক ভাই এবং বুলি আপাকে কাছাকাছি পেয়েছি বলে।এমন অনায়াসে কেউ যে কাউকে এতো আপন করে নিতে পারে-তা আমি বুঝেছি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। জরুরি কারণে নতুন দেশে গিয়েছিল ২০১২ সালে, আমার ছেলেও গিয়েছিল- দু’মাসের জন্য আমি একা। কাজের ব্যস্ততায় দিন কেটে যাবে- রাতে ঘরে ফিরলে বড্ড একা লাগবে। এদেশে একা থাকাটা মানুষের জন্য নতুন কিছু নয়, কিনতু আমার জন্য সেটি স্বস্তিকর নয়। রফিক ভাই-বুলি আপা জানলেন, বটবৃক্ষের মতোই ছায়া দিলেন।ছিলাম তাঁদের পরিবারের একজন হ’য়ে। সেবার কোরবানির ঈদটাও করেছিলাম তাদের সাথে। প্রতিটিদিন আমার কাছে ছিল যেন সোনায় বাঁধানো…
International Mother Language Lovers’ of The World(IMLLW)’এর কাজ করতাম একসাথে, চাইতেন আরো বেশি ইনভলভ হই। সময় করে উঠতে পারতাম না। এখন নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। প্রথমবার ক্যান্সার থেকে ফিরে আসার পরে সারাক্ষণ IMLLW কাজ নিয়ে ভাবতেন, নানা প্রোগ্রাম করতে চাইতেন। হয়তো ভাবতেন, একবার যেহেতু ছোবল দিয়েছে এই মরণব্যাধি, যে কোনো সময় আবারমাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, তাই প্রাণপণে চেষ্টা করতেন সময়টাকে কাজে লাগাতে। শরীরের ওপর প্রভাব পড়বে বলে অনেক সময় নিরস্ত করার চেষ্টা করতাম আমরা নানা কথা বলে।প্রতিদিন পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ভাষা। বাংলাভাষা যেন সাধারণের ভাষা হয়ে টিকে থাকে- সেজন্য চাইতেন ভাষার সরলীকরণ হোক, বাংলাভাষা যেন সংস্কৃত ভাষার মতো কুলীনদের ভাষা না হয়ে যায়। কিভাবে সেই সাধারণ্যের ভাষা হবে? তাঁর যুক্তি ছিল- যুক্তবর্ণ তুলে দিলে সকলের জন্যই বোঝার, বলার এবং লেখার সুবিধে হবে।সেই দৃষ্টিকোণ থেকে লিখলেন ‘কারা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়’? একদিন বুলি আপাকে নিয়ে চলে এলেন অফিসে। হাতে একটা ফাইল। তারমধ্যে তার নিবন্ধ ‘কারা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়’? বললেন, বাংলা কম্পোজ করতে হবে। সেটা পাঠিয়েছিলাম ইমেইলে, কোনো কারণে আবার সেটা কিছুটা চেঞ্জ করবেন বলে একদিন রাতে চলে এলেন ড্রাইভ করে। তখন রফিক ভাইয়ের চোখে খুব সমস্যা, অনেক বড় করে না লিখলে পড়তে পারেন না, গাড়ি চালাতেও কষ্ট হয় কিনতু তিনি বুঝতে দিতে চাইতেন না। খুব ভয়ে ছিলাম তিনি বাসায় না পৌঁছা অবধি।লেখাটা পাঠিয়েছিলেন অনেককে, খুব ইচ্ছে ছিল দেশে গিয়ে এই বিষয়টা নিয়ে একটা কোনো পদক্ষেপ নেবেন।
সবকিছু থেকে ভাল কিছু খুঁজে নিতেন তিনি।তুলে ধরতেন ভাল অংশটুকু।অনেক কষ্টের মধ্যেও কখনো কষ্টের কথা উচ্চারণ করেননি। হাসপাতালে যখন ধীরে ধীরে তার প্রাণশক্তি নিঃশেষ হ’য়ে যাচ্ছে, তখনো যদি কেউ বলতো- রফিক ভাই, আজ কেমন আছেন? বলতেন, ভাল আছি। আল্লাহ্‌ ভাল রেখেছেন।
কিছু কিছু মানুষ থাকে পরশপাথরের মতো। পরশপাথরের ছোঁয়ায় যেমন সব যেমন সোনা হয়ে যায়, রফিক ভাই তেমনি এক পরশপাথর।তার সান্নিধ্যে যারা গিয়েছে কিছুটা হলেও জাগ্রত হয়েছে তাদের আত্মচেতনা, মনুষ্যত্বের বোধ। রফিক ভাই এক গভীর আলোর বিচ্ছুরণ, সে আলোয় যে একবার চোখ মেলেছে সে নিজেকে হারাবে না কোনোদিন।
আমার দাদিমা ছিলেন আমার বড় প্রিয় একজন মানুষ, আজো এমন একটা দিন নেই, যেদিন কোনো না কোনোভাবে তাকে অনুভব না করে কাটাই, আমার সেই কিশোরীবেলায় তাকে হারিয়ে বড় কষ্ট পেয়েছি, তারপরে হারালাম রফিক ভাইকে। অথচ তিনি আমার আত্মীয় নন, এমনও নয় যে বহু যুগ ধরে জানি। আশ্চর্য! মানুষের সাথে মানুষের আত্মিক সম্পর্কের বোধহয় কোনো প্রাচীর থাকে না।নইলে সারাদিন অসংখ্যবার কেন মনে হয় তার কথা? তার স্বপ্ন, চিন্তাধারা, কর্মস্পৃহা যেমন একরকম জাগরণ এনে দিয়েছিল, তার মৃত্যুটাও তেমনিভাবে একটা বড় ধরণের নাড়া দিয়ে গেছে।
রফিক ভাই নেই! অথচ প্রবলভাবে তার উপস্থিতি অনুভব করি।তিনি চলে যাবার কয়দিন পরে বাসায় গিয়েছিলাম,বুলি আপার সাথে কত কথা, কত স্মৃতিচারণ! বুলি আপা কাঁদছিলেন কথা বলতে বলতে… কখনো ছবিতে হাত রেখে আনমনা হয়ে যান, মাঝে মাঝে চোখ মুছে বলেন- কাঁদব না আর, তোমার ভাই অসুস্থ হবার পর থেকে বার বার বলতেন, বুলি, সবসময় যেমন হাসিখুশি থাকতে, তেমনি থাকবে। কান্নাকাটি করবে না’। মৃত্যুকে এতোটাই সহজভাবে নিয়েছিলেন তিনি! দেয়ালে তাঁর অম্লান হাসি, ছোট্ট লাইব্রেরিতে বই, টেবিলে ছড়ানো-ছিটানো কাগজ, ঘড়ি… সবখানেই তিনি ভীষণভাবে উপস্থিত। ‘International Mother Language Lovers’ of The World’ ‘International Mother Language Day’-কোথায় তিনি নেই! তিনি আছেন, তিনি থাকবেন।একজন মানুষ, আলোকবর্তিকার মতো একজন মানুষ- হয়তো তিনিও জানেননি কি দিয়ে গেছেন আমাদের! সবাই তাঁকে অনুভব করে যার যার নিজের মতো ক’রে, আমিও অনুভব করি তাঁকে, আমার নিজের মতো করে। Love you Rafiq bhai, miss you so much!

You Might Also Like