ব্যক্তিপূজা ও ব্যক্তিগত আক্রোশ

যাঁরা খুব বড় কাজের জন্য ইতিহাসে স্থায়ী আসন পান, তাঁদের জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়ও ইতিহাসবিদদের লেখার উপাদান। সেসব জানতে মানুষের আগ্রহ অশেষ। না জানলেও ক্ষতি নেই, তবু মানুষ বলে ও শুনে আনন্দ পায়, বিরক্তও হতে পারে, ক্ষুব্ধও হতে পারে ভক্তের কেউ। কিন্তু যাঁরা ইতিহাসের নায়ক, তাঁদের জীবনের কোনো ঘটনাই গোপন করার সুযোগ নেই। তবে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সম্পর্কে বর্ণিত সব কথাই যে সত্যি তা-ও নয়। অতিরঞ্জন থাকে, প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে মিথও যোগ হয়।
আড়াই হাজার বছর আগের চীনের সমাজও বাঙালি সমাজের মতোই ছিল। মা-বাবা, ভাই–বোন, স্বামী-স্ত্রী নিয়ে একান্নবর্তী পরিবার। কখনো কখনো, কোনো কোনো শাসকের সময় রাজনৈতিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছে আমাদেরই মতো। সংস্কার-কুসংস্কারও ছিল বাঙালির মতোই। বাঙালি সমাজে প্রায় সব মা-ই তাঁর ছেলেবউয়ের মুখ দেখে মরতে চান। কোনো মায়েরই কাম্য নয় যে তাঁর ছেলেটি ৭১ বছর বয়সে বিয়ে করুক। মহান শিক্ষক কনফুসিয়াসের সময়ের চীনের সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থার কথা তাঁর জীবনীতে পাওয়া যায়।

বাবাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি কনফুসিয়াসের। মায়ের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। বয়স ১৫ পেরিয়ে গেছে। কনফুসিয়াসের মা ঝেঙজাইয়ের পরিচিত একটি মেয়েকে পছন্দ পুত্রবধূ করার জন্য। তাঁর মনোবাসনার কথা ছেলেকে বলেন। প্রাচীন চীনে প্রথা ছিল, ৩০-এর দিকে বিয়ে করাই শ্রেয়। এর মধ্যে অসুখে ঝেঙজাই শয্যা নেন এবং কিছুকাল ভুগে মারা যান। ওই সমাজে প্রথা ছিল, বাবা-মা কেউ মারা গেলে তিন বছরের মধ্যে বিয়ে করা যাবে না।

মাকে সমাহিত করার পর তিন বছর কেটে গেছে। বাড়িতে নিঃসঙ্গ জীবন তাঁর। একটি ছোট সরকারি চাকরি করতেন। সারা দিন গ্রামে গ্রামে ঘুরতে হতো ট্যাক্স কালেক্টর হিসেবে। একদিন কাজ করে ফিরছেন সন্ধ্যার আগে। কনফুসিয়াস হঠাৎ কোথাও একটি মেয়ের ভুবনমোহিনী হাসি শুনতে পান। সেই হাসি তাঁর কানে মধু ঢেলে দেয়। তিনি ইতিউতি তাকান। দ্যাখেন গাছপালার মধ্যে তিনটি যুবতী হাসাহাসি করছে। বিশেষ করে একটি মেয়ে দোলনায় দুলছে আর খিলখিল করে হাসছে, যেন কাচের প্লেট-পেয়ালা পাথরের ওপরে পড়ে খান খান। তিনি ভাবেন, এই মেয়েটির কথাই কি তাঁর মা তাঁর জন্য ভেবেছিলেন? সেদিন নীতিকথার বই পড়তে পড়তে কনফুসিয়াস ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমানোর আগে নীতিকথার চেয়ে ওই খিলখিলানি মেয়েটির রূপ-যৌবনের কথাই তাঁর বেশি মনে পড়ে থাকবে।
বিখ্যাত হওয়ার পর তিনি তাঁর অনুসারীদের কাছে তাঁর অতীতের সব কথা বলে যান। তাঁর যৌনজীবনের অভিজ্ঞতার কথাও। ওই রাতে কনফুসিয়াস স্বপ্ন দেখছিলেন: নীল আকাশে একখণ্ড লাল মেঘ। কিছুক্ষণ পর ওই মেঘখণ্ডটি একটি মেয়েতে রূপান্তরিত হয়। মেয়েটির গায়ে লাল সিল্কের জামা। লাস্যময়ী মেয়েটিকে ধরার জন্য তিনি হাত বাড়ান। কিন্তু আকাশ তো অনেক উঁচুতে। তাঁর হাত মেয়েটির নাগাল পায় না। কিন্তু মেয়েটিকে তিনি ধরবেনই। দেখতে পেলেন, কাছেই একটি দোলনা (সন্ধ্যার আগে ওই রকমই একটি দোলনায় একটি মেয়েকে দুলতে দেখেছিলেন)। দোলনায় চড়ে তিনি তাঁর সব শক্তি দিয়ে এক ধাক্কা দেন। ওই ধাক্কায় দোলনাটি উঠে যায় আকাশে মেঘের মেয়েটির কাছে। তিনি লাল জামার মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়।

সকালে গোসল করে কনফুসিয়াস গ্রামের এক বৃদ্ধ জ্ঞানীর কাছে যান। তিনি তাঁর স্বপ্নদোষের কথা বলেন তাঁকে। শুনে মৃদু হেসে বৃদ্ধ বলেন, ‘শোনো যুবক, তুমি আর দেরি কোরো না। যে মেয়েটিকে তোমার বউ করতে চেয়েছিলেন তোমার মা, যাকে তুমি খিলখিলিয়ে হাসতে দেখেছ, ওকেই বিয়ে করো। চিন্তার কারণ নেই। সুখে থাকবে। তোমার মায়ের আত্মাও শান্তি পাবে।’

অনেক বছর আগে চীন সফরকালে পশ্চিমাঞ্চলের হলুদ সাগরের তীরে শিনদাও শহরে এক তাওবাদী মন্দিরে গিয়েছিলাম। সেখানে এক বৃদ্ধ তাওবাদী ইউরোপ থেকে যাওয়া কয়েকজন যুবক-যুবতীর কাছে কনফুসিয়াসের শারীরতত্ত্ব নিয়ে কথা বলছিলেন। দোভাষী ইংরেজিতে তাঁর কথা তর্জমা করে দিচ্ছিলেন। ইউরোপের দুই পর্যটক যুবতী কনফুসিয়াসের স্বপ্নদোষের কাহিনি শুনে মৃদু হাসছিলেন।

কনফুসিয়াস ওই মেয়েটিকেই বিয়ে করেছিলেন। তাঁর সুখী পারিবারিক জীবন তাঁর নৈতিক দর্শন প্রচারে কোনো বাধা হয়নি। স্বপ্ন দেখার পরদিন শুধু যে নিজের ও ওই মেয়েটির চিন্তাতেই মশগুল ছিলেন কনফুসিয়াস তা-ই নয়, তিনি তাঁর দেশের অবস্থা নিয়েও ভাবছিলেন। বাড়িতে পুরোনো শাস্ত্রের বইপত্র ছিল। তার একটি ছিল প্রোপ্রাইটি বা যথাযথ সামাজিক আচরণবিধি, ঔচিত্য-অনৌচিত্য ও শোভনতা শালীনতাবিষয়ক। দেশের শাসকশ্রেণি ও সাধারণ মানুষের পরস্পরের প্রতি কী রকম আচরণ করা উচিত। এবং সেই যথাযথ আচরণের ব্যত্যয় ঘটলে সমাজে ও রাষ্ট্রে কী রকম দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় ঘটতে পারে, তা নিয়ে ওই শাস্ত্রে আলোচনা ছিল।
মাও সেতুংয়ের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আগে আড়াই হাজার বছর চৈনিক সমাজ কনফুসীয় নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে। সেদিন ওই শাস্ত্রে তিনি যা পাঠ করেছিলেন, তা হলো: প্রোপ্রাইটি বা ঔচিত্যবোধ হলো একটি আদর্শগত মান, যার দ্বারা দেশ শাসন করতে হয়। ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তার আচরণগত ঔচিত্যবোধের মানদণ্ডেই একজন মানুষ কতটা মানুষ তা বিচার্য। যখন কোনো দেশ নিয়মনীতির শুদ্ধতা ও নৈতিক বিধিবিধান দ্বারা পরিচালিত হয়, তখনই একজন রাজাকে রাজা বলা যায়, মন্ত্রীকে মন্ত্রী বলা যায়, মর্যাদাবানকে মর্যাদাবান বলা যায়, নিরভিমানকে নিরভিমান বলা যায়—অনলি হোয়েন দ্য কান্ট্রি ইজ গভার্নড বাই দ্য প্রিন্সিপালস অব প্রোপ্রাইটি, ইজ দ্য প্রিন্স ইজ প্রিন্স, দ্য মিনিস্টার দ্য মিনিস্টার, দ্য রেসপেকটেবল দ্য রেসপেকটেবল অ্যান্ড দ্য হাম্বল দ্য হাম্বল। ঔচিত্যবোধ ও নিয়মনীতির শুদ্ধ প্রয়োগ ছাড়া কোনো দেশ স্থিতিশীল হতে পারে না—উইদাউট প্রোপ্রাইটি দেয়ার ইজ নো স্ট্যাবিলিটি ইন দ্য কান্ট্রি। চৈনিক নীতিশাস্ত্র বলেছে, রাজপুরুষ যদি রাজার উপযুক্ত আচরণ না করেন, তাঁর মন্ত্রী যদি মন্ত্রীসুলভ সদাচরণ না করেন, তাহলে রাজার বা মন্ত্রীর মর্যাদা তাঁর প্রাপ্য নয়।

এই ভূখণ্ডের মানুষের ২০ থেকে ৩০ বছরের নয়, দীর্ঘকালের আকাঙ্ক্ষা বা স্বপ্ন ছিল একটি স্বশাসিত রাষ্ট্রের। অগণিত মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সেই রাষ্ট্র কি প্রোপ্রাইটি বা ঔচিত্যবোধ দ্বারা শাসিত হচ্ছে? এখানে সত্য ও ন্যায়ের কি কোনো মূল্য আছে?
’৭৫-এর আগস্ট-নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে প্রথম ১০ বছর সরকারি ও বেসরকারি প্রচারমাধ্যমে সরকারি ভাষ্যই শুধু প্রচারিত হতো। আশির দশক থেকে একাধিক ভাষ্য প্রচারিত হতে শুরু হয়। বেসরকারি মিডিয়া কিছুটা স্বাধীনভাবে তাদের মতো লিখে আসছিল। বছর কয়েক যাবৎ সরকারি ভাষ্যকেই সমর্থন করে লেখালেখি হচ্ছে। ভিন্নমতকে করা হচ্ছে অগ্রাহ্য। কয়েক মাস যাবৎ যা চলছে, তাতে ন্যায়, সত্য ও ঔচিত্যবোধের লেশমাত্র নেই। প্রতিপক্ষের প্রতি বক্তব্যে শালীনতাবোধের বালাই নেই।

জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে প্রগ্রেসিভ ফোরাম নামের একটি সংগঠনের আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে শারমিন আহমদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশে সত্য উচ্চারণ করতে না দেওয়ার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। কারও মতের বিরুদ্ধে কথা বললেই স্বাধীনতাবিরোধী বা মত মেনে না নিলেই কাউকে রাজাকার-আলবদর বলার প্রবণতা দেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।’ শারমিন বলেন, ‘কোনো এক অজানা ভয়ে সত্য প্রকাশে বিরত থাকেন অনেকে। ব্যক্তিগত পরিসরে যে সত্য বলা যায়, প্রকাশ্যে তা বলতে ভয় কাজ করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মিথ্যার প্রক্রিয়ায় আরও অনেক মিথ্যা হাজির হচ্ছে। বুদ্ধিজীবীরা জাতির প্রতিনিধি না হয়ে দলের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করায় এসব সমস্যা বাড়ছে।’

তাজউদ্দীন-তনয়া বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন বজায় রাখতে হলে মুক্তচিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নতির ভিত্তি মুক্তচিন্তার চর্চা না থাকার কারণে ধসে পড়তে পারে। কেবল এই একটা বিষয়ে অভাব-প্রগতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।’ তাঁর একটি স্মৃতিকথামূলক বই প্রকাশের পর তিনি বিভিন্ন মহল থেকে ‘ইসলামিস্ট জঙ্গি গ্রুপের সদস্য’, ‘পাকিস্তান বা আইএসআই’-এর এজেন্ট—এসব ‘উপাধি’ পেয়েছেন বলে জানান। হিংসা-বিদ্বেষের বিষ যদি একবার শাসকশ্রেণির মাধ্যমে সমাজের সাধারণ মানুষের মধ্যে সংক্রামিত হয়, তাহলে সমাজ বিপর্যস্ত হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এমনকি শত্রুকেও আক্রোশবশত নিন্দা করার একটি ভাষা বা মান আছে।
যাঁরা বড়, তাঁরা নিজেদের জীবনের গোপন কথাটিও প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন না। কনফুসিয়াসের মতো গান্ধীজিও তাঁর বাবার মৃত্যুর দিনে স্ত্রীসহবাসের কথা স্বীকার করেছেন। যঁারা ছোট, তঁারা অপ্রীতিকর সত্যকে গোপন করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিছু অপ্রীতিকর সত্য অসহনীয়। কিন্তু একবার সত্যকে মেনে নিলে লাভ ছাড়া লোকসান নেই। সত্য মেনে নেওয়ার জন্য দরকার মনের জোর—নৈতিক শক্তি। দেশের মানুষের ভেতরটা যদি অনুন্নত থাকে, পৈশাচিক স্বভাব থেকে মুক্ত না থাকে, তাহলে কথিত উন্নয়নের অহংকার করা অতি বড় রকমের আহাম্মকি। বাংলাদেশে সুন্দর সড়ক হবে, সেতু হবে, ইমারত হবে, কিন্তু সত্য থাকবে না, সৌজন্য থাকবে না, স্বাধীনতা থাকবে না, ঔচিত্যবোধ থাকবে না—তা ৪৩ বছর আগে কল্পনাও করিনি।
একমাত্র সত্যনিষ্ঠা ও যুক্তিনির্ভর স্বাধীন চিন্তার চর্চাই একটি সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সাহায্য করে। ব্যক্তিপূজা ও ব্যক্তিগত আক্রোশ সমাজকে ধ্বংস করে দেয়।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

You Might Also Like