সুনীল নয় আমার অর্ধেক জীবন

১. লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নয় আমার অর্ধেক জীবনের কথা বলছি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হাফ সেঞ্চুরি করে বাংলা সাহিত্যকেই সমৃদ্ধ করেননি, নিজের বর্ণাঢ্য জীবনের টুকিটাকি নিয়ে ‘অর্ধেক জীবন’ লিখেছিলেন। ১২ নভেম্বর মঙ্গলবার, দুপুর ১২টা, ১৯৬৩ সাল, জলজোছনার শহর সুনামগঞ্জের হাসননগরের গাছগাছালি ঘেরা পাখির কূজনে মুখরিত বাড়িতে জন্মেছিলাম। বাবা-মায়ের আট সন্তানের মধ্যে সপ্তম সন্তান হিসেবে পৃথিবীতে আসার পর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে এক দুরন্ত দস্যি ছেলের মতো কী স্কুল, কী বাড়ি, কী পাড়া- সবাইকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিলাম। রবীন্দ্রনাথের তের-চৌদ্দ বছরের মতো বালাই পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। আমার কৈশোরে ছুটি গল্পের ফটিক চরিত্র হয়েই জগৎ সংসারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম। পরিবারের কাছে ছেলেবেলায় দস্যিপনাটা ছিল বখে যাওয়ার মতো। বড় বেলায় এসে সেই অসহনীয় ছেলেবেলায় ফিরে যেতে মন খুব টানে। মনোজগৎ এক রহস্যময় জগৎ। পরিবার ও সমাজের রীতিনীতি এতটাই কঠিন যে কখনো সখনো বুকের ওপরে থাই পাহাড়ের মতো ভারী কিছু তুলে দেয়। এটি না পারা যায় সইতে, না পারা যায় বইতে। জীবনকে তখন বড় বেশি বোঝা মনে হয়। পৃথিবীর তাবৎ ক্লান্তি এসে ভর করে। কিন্তু তার অপর পিঠে জীবন তার ছেলেবেলা থেকেই এত শাসনের বিপরীতে এমনই এক চঞ্চলায় বেড়ে ওঠে যে সেই জীবনে ফিরে যেতে নস্টালজিয়ায় ভুগতে হয়। এক মুহূর্তের আনন্দ যখন অমূল্য সম্পদ হয়ে ওঠে ঠিক তখন জীবন পাখির পালকের মতো হালকা মনে হয়। আনন্দে তখন পাখির মতো উড়ে বেড়াতে ইচ্ছা করে।

বুনো পাখির শিস শুনতে শুনতে মনে হয় মানুষের জীবন কেন এত ছোট হয়। বরেণ্য সাহিত্যিকদের মতো প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় কচ্ছপের জীবন যদি হয় সাড়ে তিনশ বছর মানুষের জীবন কেন তবে সর্বোচ্চ একশতেই ফুরিয়ে যায়। যত দুঃখ, বেদনা, অন্তহীন দহন, তৃষ্ণা থাক না কেন জীবন এতটাই আনন্দময় যে, এতটাই ভালোবাসাময় যে, মানুষ অনেকদিন বাঁচতে চায়। রসিকতার ছলে বরেণ্য সাংবাদিক মরহুম এবিএম মূসা একবার বলেছিলেন, পঞ্চাশ পর্যন্ত বয়স বাড়ে, তারপর বয়স কমতে থাকে। গেল নভেম্বরের ১২ তারিখে পঞ্চাশ পূর্ণ করেছিলাম। অনুজরা অনেকের লেখা নিয়ে সম্মাননা গ্রন্থ তৈরি করেছিলেন। কিন্তু হরতাল, অবরোধ, সহিংস রাজনীতি স্বজনদের নিয়ে সেই আড্ডা হতে দেয়নি। মধ্যবিত্ত পরিবারের আট ভাইবোনের সংসারে আমাদের কখনো জন্মদিন পালন হয়নি। বড় হয়েও নয়। জীবনে বাঁচতে চাই অনেক। কিন্তু আজ ১২ নভেম্বর ৫১তম জন্মদিনে দাঁড়িয়ে দেখছি বয়স আমার কমছে। এই কমা মানে ধীরে ধীরে কবরের দিকে হেঁটে যাওয়া। মৃত্যুর চেয়ে অমোঘ সত্য পৃথিবীতে আর কিছু নেই। মৃত্যুর স্বাদ একদিন নিতেই হবে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতেই পারি, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’। কিন্তু গালিবের একটি সায়ের পড়েছিলাম- ‘যখন ভাঙা কবরের পাশে সুন্দরী রমণীকে চুল এলিয়ে ক্রন্দন করতে দেখি তখন মনে হয় পৃথিবীতে মৃত্যুর চেয়ে কোনো সুন্দর দৃশ্য আর নেই।’ যারা স্বপ্ন দেখতে জানেন তারা মৃত্যুকে নিয়েও দেখেন। আমি নৈরাশ্যবাদী নই। আমি আশাবাদী মানুষ। আমি ডানা মেলে স্বপ্ন দেখা মানুষ। বুক ভরা স্বপ্নই আমার বেঁচে থাকার, হেঁটে যাওয়ার, লড়ে যাওয়ার মূল শক্তি। একটি তরতাজা মন নিয়ে নানা চঞ্চলতা ও দস্যিপনায় আর উচ্ছলতায় শৈশব, কৈশোর এবং যৌবন অতিক্রম করে এসেছি। পঞ্চাশ বছরের উত্তীর্ণ সময়ে পেছনে ফিরে তাকালে মাঝেমধ্যে মনে হয়, যদি আর পনেরো বা বিশটি বছর পেতাম হয়তো জীবনটাকে নতুন করেই সাজাতাম। যে ভুলগুলো মধুর পৃথিবীতে কোনো দিন ফিরে এলে তা বারবার করতাম। যে ভুলগুলোকে অনুশোচনার জীবনের বারান্দায় আসতে দিতাম না। এই পঞ্চাশ বছরে এসে আল্লাহ রাব্বুল আল আমিনের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া জানানোর ভাষা নেই। অনেক পেয়েছি আমি। কত মানুষের স্নেহ ভালোবাসা আমায় অভিভূত করেছে। কত পাঠকের অভিনন্দন বার্তা আর টেলিফোনের ভালোবাসায় জীবন আমার সিক্ত হয়েছে। দেশকে ভালোবেসে ছিলাম। এই দেশের নবজাগরণ বা রেনেসাঁর বিপ্লব যাদের হাত দিয়ে ঘটেছিল সেই ষাটের নেতৃত্বকে যতই সমালোচনা করি ভেতরে ভেতরে অনুভূতি আর ভালোবাসা দিয়ে ধারণ এবং লালন করেছি। কবির হৃদয় নিয়ে চেয়েছি প্রিয়জন থেকে মানুষকে ভালোবাসতে। আমার অনেক সমালোচক বলেন, আবেগের মাত্রা কী লেখায়, কী জীবনে একটুখানি বেশি।

একটুও বিব্রত না হয়ে ভাবতে ভাবতে পথ হাঁটি আর প্রশ্ন করি, আবেগ ছাড়া মানুষ হয় কী করে? আমি তো মানুষ হতে চেয়েছিলাম। পূর্ণাঙ্গ মানুষ হওয়ার পাঠ নিতে পৃথিবীতে এসেছিলাম। আমাদের সুমহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম আর গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোর ইতিহাস একটি জাতির আবেগমথিত ইতিহাস। আবেগ দিয়েই এই জাতিকে বঙ্গবন্ধু এক সুতোয় বেঁধে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার চেয়ে মানুষের জীবনে বড় চাওয়া-পাওয়া আর কী হতে পারে? প্রতিনিয়ত আমরা কী নারী, কী পুরুষ স্বাধীনতার জন্য লড়েই যাচ্ছি। একালের মায়েরা এতটাই সচেতন বা সমাজ এতটাই সচল ভাবতেই পারেন না দুয়ের বেশি সন্তান নিতে। আমাদের আটপ্রৌঢ়ে সাদাসিধে সরল মায়াভরা হৃদয়ের মায়েরা এত সন্তান জন্ম দিতেন কী করে? ছেলেবেলায় দেখতাম জোছনা রাতে মা বারান্দায় ও উঠোনে হাঁটাহাঁটি করতেন। গাছের পাতার ফাঁকে চুইয়ে পড়া চাঁদের আলোয় মা কি তার গোপন দুঃখ লুকাতেন? মায়ের কাছেই ছেলেবেলায় ‘কিসসা’ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। পরীর স্বপ্ন দেখতাম। পরীর দেশ থেকে কত রাতে ঘুম থেকে হুরপরীরা তুলে নিয়ে যেত, ঘুম ভাঙলেই হতাশ। আমল দিতাম না। এখনো স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন ভাঙার ভয় থাকে। মায়ের কাছেই জোছনা রাতের রহস্যের ওপর পাঠ নিতাম। কৃষ্ণপক্ষ, শুক্লপক্ষ, ধ্রুবতারা, শুকতারা, তারার মেলায় ভেসে বেড়াতাম। আষাঢ়ে পূর্ণিমার রাতে নবযৌবনা সুন্দরীর আছড়ে পড়া রূপের মতো চাঁদের রূপ যখন হাওড়ের উত্তাল তরঙ্গে খেলা করে মন জুড়িয়ে যায়। একটি ধার্মিক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নিলেও পরিবার থেকেই পাঠ দিয়েছিল অসাম্প্রদায়িক মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার। চেষ্টা করেছি। সেই পথে নিরন্তর চলছি। একটি রাজনৈতিক বৃত্তে শিক্ষাজীবন কাটালেও এ বেলায় এসে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, আমার নেতার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেও দলের নাম মানুষ। আমার অনেক সময়ের লেখা নিয়ে নানা মত ও বিতর্ক থাকতেই পারে। এটিকে আমি সানন্দে গ্রহণ করি। মনে করি, নির্জীবের প্রতি কারও কথা নেই। প্রতিনিয়ত চিন্তাশীল সক্রিয় মানুষকে নিয়েই মানুষের আলোচনা, হাঁকডাক, কথাবার্তা। নানা মত, পথ, আলোচনা, বিতর্কই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য। সেই সৌন্দর্য বিকশিত করা এবং ডালপালার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেওয়ার কাজটিই আমাদের।

২. রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। তেমনি তাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে পথ দেখানোর দায়িত্বটি আমাদের উপরই অর্পিত হয়েছে। প্রায় তিন দশক কারা নির্যাতন সয়ে আসা নেলসন ম্যান্ডেলা জীবনের উপলব্ধি থেকে মানবকল্যাণে যে উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন তিনি চিরবিদায় নিলেও আমাদের জন্য সেটি এক বড় মডেল বলেই মনে করি। শত্রুর সঙ্গে প্রতিহিংসা নয়, উদার উষ্ণ আলিঙ্গনের নীতি, ঐক্যের নীতি আমাদের চলমান রাজনীতিবিদদের পূর্বসূরিরাও দেখিয়েছেন। সেই আলো আমাকে টানে। মওলানা ভাসানীকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মাসে মাসে কুড়ি হাজার টাকা পাঠিয়ে যে সৌজন্যতা দেখিয়েছেন সেখান থেকে আমরা তার বিশাল ব্যক্তিত্বের চিবুক চুইয়ে উদারতার আলো ঝরে পড়ার দৃশ্যই দেখি না। পাঠটিও নিতে চাই। সবুর খানের চিরকুট পেয়ে কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়া, শাহ আজিজুর রহমানদের কারামুক্তিই নয়, জীবন চলার ব্যবস্থা করা তার রাজনীতির কোনো ভুল দর্শন ছিল না। মহত্ত্বের নিদর্শন ছিল। ম্যান্ডেলা বলেছেন, ‘আমি মহাত্দা গান্ধীর ভক্ত কিন্তু নেহেরু আমার আদর্শ।’ এই উপমহাদেশে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যদি বলি- ‘মহাকাব্যের যুগ অতীত হইয়া গিয়াছে’ তাহলে বলতেই পারি নেহেরু নেই, ইন্দিরা নেই, বঙ্গবন্ধু নেই; কিন্তু উদার গণতন্ত্রী হিসেবে নেহেরু আর শেখ মুজিবের ছবি ভাসে পাশাপাশি। আমি আমার আবেগ-অনুভূতি দিয়ে বিবেচনা করি আমাদের আদর্শ কারা হবেন। সেখানে এই অর্ধেক জীবন পেরিয়ে এসে অবলীলায় বলতে পারি দলকানা, দলদাস, দলীয়করণ, সন্ত্রাস, প্রতিহিংসা ও দুর্নীতির রাহুর গ্রাসে পতিত লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই উঠে আসেন শীর্ষে। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, এমনকি তাদের আগে আসা কৃষকের বন্ধু শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। মানুষকে সম্মান করার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের বড় করা শিখিয়েছেন। তাদের তেজস্বীতা দিয়ে জানিয়ে গেছেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব কতটা দৃঢ়চেতার হতে হয়। তাদের সততা দিয়ে দেখিয়েছেন গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণের আস্থা অর্জনে ত্যাগের মহিমায় পথ হেঁটে লোভ-মোহের ঊধের্্ব কতটা উঠতে হয়। সাংবাদিকতায় তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আবুল মনসুর আহমেদ, জহুর হোসেন চৌধুরী পথ দেখিয়ে গেছেন। আদর্শ তারা হবেন নাকি অন্য কোনো কেউ? পাঠটি এখানেই নেওয়ার ব্যাপার।

৩. কথা বললেই যারা ষড়যন্ত্রের গন্ধ খোঁজেন, সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বললেই যাদের গাত্রদাহ হয় তাদের হাত ধরে আর যাই হোক, গণতন্ত্রের দরজা খুলতে পারে না। মুক্ত বাতাসে মানুষ বুক ভরে শ্বাস নিতে পারে না। যারা ষড়যন্ত্র করে তারা কথা বলে না। আড়ালে আবডালে মতলবে ঘুরঘুর করে। তারা তোষামোদ করে। তারা তেলমর্দন করে। সামনে দাঁড়িয়ে সত্য বলার সাহস রাখে না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- ‘সত্য সে যে কঠিন, কঠিনেরে ভালবাসিলাম আমি।’ এই চেতনাবোধ বুকে নিয়েই পথ চলাতে যারা আনন্দ পান তারা মানুষের কথা বলেন। সত্য যারা সইতে পারেন না গণতন্ত্র দূরে থাক গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা তাদের দিয়ে পূরণ হয় না।

৪. এই পঞ্চাশ বছরে কত স্বজনের মুখ হারিয়ে গেছে। মায়ের মুখ, বাবার মুখ, ভাইয়ের মুখ, বোনের মুখ, প্রিয়জনদের মুখ, অগ্রজদের, অনুজদের ভাবলে বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে। এই নভেম্বরে জন্ম নিয়েছিলাম বলে বৃশ্চিক রাশির জাতক হয়েছি। বৃশ্চিক রাশির জাতক হয়েছি বলে এই জাতকের চরিত্রগুলোকে জ্যোতিষীদের হিসাবের খাতায় দেখতে দেখতে নানা কথাই ভাবি। চারিত্রিক মিল খোঁজার চেষ্টা করি। ১৯ নভেম্বর ভারতের গণতন্ত্রের মহান নেত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী জন্ম নিয়েছিলেন। সিরাজ শিকদারও বৃশ্চিক রাশির জাতক। আজকের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু আর আমার জন্মদিন একই দিনে। হাসানুল হক ইনুর রাজনৈতিক জীবন উথালপাথাল সময় অতিক্রম করে আসা। বর্ণাঢ্য জীবন কাটিয়ে চলে যাওয়া কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ অকালে চলে গেলেও ১৩ নভেম্বর জন্ম নিয়েছিলেন। তার ভক্তদের কাঁদিয়ে চলে গেছেন। এত দ্রুত তিনি নিজেও যেতে চাননি। তারও অন্তহীন দহন ছিল। অকাল বৈধব্যের স্মৃতি হয়ে আছেন মেহের আফরোজ শাওন। পিতাহারা সন্তানের ক্রন্দন নিয়ে আছেন তার সন্তানেরা। আমাদের ৯০-এর ছাত্র আন্দোলনের নেতা ডা. জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু একজন স্বাপ্নিক পুরুষ। ১০ নভেম্বর ছিল তার জন্মদিন। একাডেমিকলি আমাদের অল্প সিনিয়র ভাই হলেও বয়সের হিসাবে মাত্র দুদিনের বড় ছিলেন। অনেকদিন বাঁচতে চেয়েছিলেন টিংকু। রাজনীতিতে দাপিয়ে বেড়াতে চেয়েছিলেন এই স্বাপ্নিক হৃদয়বান মানুষটি। তার আরেক সতীর্থ ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোজাম্মেল বাবুসহ আমরা একটি প্রজন্ম এক অন্ধকার সময়ে আদর্শবোধ বুকে নিয়ে একটি রাজনৈতিক দর্শনের পতাকাতলে সমাবেত হয়েছিলাম। মোজাম্মেল বাবু এখন একাত্তর টিভির কর্ণধার। জীবনের প্রথম প্রেম মোজাম্মেল বাবু তার প্রিয় বন্ধু টিংকুর কাছে হেরেছিলেন। টিংকু হেরেছেন নিয়তির কাছে। জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুর তারুণ্য ছিল আগ্রাসী আর সাহসিকতায় ভরপুর। তার স্ত্রী খুজিস্তা নুর ই নাহরীন আত্দমর্যাদা ও মূল্যবোধ নিয়ে দুটি সন্তানকে আগলে মেধা ও যোগ্যতার সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী হয়েই হাঁটছেন। একজন জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, টিংকুর ব্যবসায়িক শরিকদের কেউ কেউ তার সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার যে বিভৎস চেহারা দেখিয়েছেন তাও সইতে হয়েছে। কিন্তু নিয়তির কাছে হারলেও টিংকু জীবনের কাছে হারেননি। নির্জীবের মতো পড়ে থাকার চেয়ে বীরত্বের সঙ্গে গণতন্ত্রের সংগ্রামে লড়তে লড়তে চিরনিদ্রা নিয়েছেন। তাই বলে কি মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই নেননি? নিয়েছেন বলেই বন্ধুবরেষু এবিএম জাকিরুল হক টিটন শোককাতর হয়ে এখনো তার অগ্রজের কথা ভাবেন। ভাবেন বলেই জন্মদিনে, মৃত্যুদিনে কিছু একটা করার জন্য সবাইকে অস্থির করে তোলেন। ডেনমার্ক প্রবাসী ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। টিংকুর স্নেহসানি্নধ্য তাকে ভালোবাসার ঋণে এতটাই বন্দী করেছে যে, কদিন আগে যোগাযোগ করে বলেছেন, তিনি তার ভালোবাসার মানুষটির জন্য সব সতীর্থকে নিয়ে একটি প্লাটফর্ম করতে চান। তার আকুতিতেই টিংকু বেঁচে আছেন। মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মে। আমার বন্ধু বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজামও বৃশ্চিক রাশির জাতক। জন্ম ৫ নভেম্বর। প্রতি বছর জন্মদিনে অফিসে আমরা তাকে সারপ্রাইজ দিই। দুই বন্ধু মিলে প্রতিদিন পরিবারকে একটি টিম করে আমরা একাত্দা হয়ে কাজ করি। নঈম নিজামও আবেগী, রোমান্টিক, সাহসী। এখন অনেক শান্ত। সৃজনশীল মানুষরা এমনই হয়। দোষে-গুণেই মানুষ। আমার পঞ্চাশ বছরও সাদা কাগজের মতো ধবধবে নয়। কালো কালির ছিটেফোঁটাও রয়েছে। তাই বলে নির্দ্বিধায় বলে যেতে পারি ঠকালে নিজেকে ঠকিয়েছি, মানুষ ঠকাইনি। মানুষের কল্যাণই চেয়েছি। পেশাদারিত্বের জায়গায় এর মর্যাদা ও সম্ভ্রমহানি ঘটানোর মতো কিছু করিনি। এ পেশায় আমার জীবন তৃপ্ত। যতদিন রিপোর্টার ছিলাম স্মেল শুঁকে শুঁকে খবরের অন্দরমহলে ঢুকেছি। যেখানেই গেছি খবর নিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। কলাম লিখতে গিয়ে বা টকশোতে বলতে গিয়ে কে খুশি, কে বেজার সেই চিন্তা না করে আমার চিন্তা ও মেধা খাটিয়ে অন্তর নিঃসৃত সত্য উচ্চারণের চেষ্টা করেছি। আগামী দিনেও এই পথচলাতেই আনন্দ খুঁজে নিতে চাই। লেখার টেবিলে আমার মেয়ের ফোনও রিসিভ করি না। কাজ আমার কাছে ইবাদত।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।
(বাংলাদেশ প্রতিদিন)

You Might Also Like