রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন

একটি রাষ্ট্রের সরকার থাকবে এবং সরকারের তিনটি অঙ্গ পরস্পরের থেকে স্বাধীন আবার পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। একটি অঙ্গের নাম নির্বাহী বিভাগ, একটি অঙ্গের নাম বিচার বিভাগ এবং একটি অঙ্গের নাম আইন প্রণয়ন বিভাগ। আইন প্রণয়ন বিভাগ নির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয়। বাংলাদেশের সংবিধান মোতাবেক, বাংলাদেশের আইন প্রণয়ন বিভাগের নাম জাতীয় সংসদ; সাধারণভাবে যদিও পার্লামেন্ট হিসেবে পরিচিত। আমাদের জাতীয় সংসদ বা পার্লামেন্ট এক কবিশিষ্ট বা একটি সাংগঠনিক ইউনিট। আমাদের জাতীয় সংসদের সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কথা এবং অতীতে নির্বাচিত হয়েছেন; ব্যতিক্রম ২০১৪ সালের জানুয়ারি। তেমনি বিলাতে বা যুক্তরাজ্যে জনগণের ভোটে নির্বাচিত আইন প্রণয়ন বিভাগের নাম হচ্ছে পার্লামেন্ট। একই আইন প্রণয়ন বিভাগের, জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় এমন একটি ক আছে বিলাতে, যার নাম হাউস অব লর্ডস। অপরপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনগণের ভোটে নির্বাচিত আইন প্রণয়ন বিভাগের নাম হলো কংগ্রেস। কংগ্রেসে দু’টি ভাগ আছে। উচ্চকরে নাম হচ্ছে সিনেট এবং নিম্নকরে নাম হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ। উভয় করে ব্যক্তিরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন বারাক ওবামা। তিনি প্রথম

কিস্তিতে চার বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ শেষ করেছেন এবং দুই বছর আগে নভেম্বরে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট মেয়াদের মধ্যবর্তী সময়ে সিনেটের কিছুসংখ্যক আসনে এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভের কিছুসংখ্যক আসনে সময়োপযোগী নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের সার্বিক ফলাফল বারাক ওবামার অনুকূলে যায়নি।
এখন থেকে ছয়-সাত বছর আগের কথা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য প্রচার-প্রচারণা গতি পাচ্ছে। তখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ বুশ (কনিষ্ঠ বুশ বা বুশ জুনিয়র)। বুশ ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির ব্যক্তি। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন বারাক ওবামা। বারাক ওবামার মা ছিলেন শ্বেতাঙ্গী এবং বাবা ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ (ইংরেজি ভাষায় ব্লাক মাদার অ্যান্ড হোয়াইট ফাদার)। বারাক ওবামা তার নির্বাচনী অভিযানের স্লোগান স্থির করেছিলেন ‘চেইঞ্জ’। বাংলায় পরিবর্তন। ওই সময় মার্কিন অর্থনীতি অতি দুর্বল অবস্থায় ছিল। মার্কিন সমাজব্যবস্থা অতি ভঙ্গুর বা নাজুক ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বিপ্তিভাবে সামরিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীগুলো নিজেদের জনগণের কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছিল। এইরূপ প্রোপটে বারাক ওবামা আহ্বান জানিয়েছিলেন পরিবর্তনের। তিনি বলেছিলেন অনেকটা এ রকম কথাÑ ‘চেইঞ্জ উই নিড চেইঞ্জ উই ক্যান।’ বাংলা ভাবার্থ করলে অনেকটা এ রকম দাঁড়ায়Ñ ‘আমেরিকানরা পরিবর্তন চায়, আমেরিকানরা পরিবর্তন করতে পারে।’ সুপ্রিয় পাঠক, বারাক ওবামা যেই ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন, সেটা শুধু একজন ব্যক্তির বদলে আরেকজন ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া নয়, বরং বিভিন্ন েেত্র নীতিমালার পরিবর্তন, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আমেরিকা পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী দেশ, অন্যতম সম্পদশালী দেশ। আমেরিকার নির্বাচনের দিকে সারা পৃথিবী তাকিয়ে থাকে। আমেরিকার নির্বাচনের দিকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছোট-বড় মিডিয়া তাকিয়ে থাকে। বারাক ওবামার কণ্ঠ থেকে যেই মাত্র পরিবর্তনের আহ্বান বের হলো, সাথে সাথে মিডিয়া শুধু আমেরিকার ভোটারদের কাছে নয়, বরং পৃথিবীর সব সচেতন ব্যক্তির কাছে আহ্বান পৌঁছে দিলো। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমেরিকানরা ২০০৮-এর নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় বিপুল ভোটে বারাক ওবামাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছিল। ২০০৯ থেকে ২০১২ পর্যন্ত পূর্ণ চার বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বারাক ওবামা। ২০১২ সালে আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা হয়েছিল এবং সেবারো বারাক ওবামা আহ্বান জানিয়েছিলেন, তিনি যেই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সূচনা করেছেন সেই প্রক্রিয়াকে সমর্থন দানের জন্য। মার্কিন ভোটাররা তাকে আবারো সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তনের প্রক্রিয়ার গতি ধীর হওয়ায়, পরিবর্তনের ফলাফল উজ্জ্বল না হওয়ায় মার্কিন ভোটাররা বারাক ওবামা এবং তার দলের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে। যার ফলে এই ২০১৪ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের কিছুসংখ্যক আসনের নির্বাচনে ভোটাররা তাদের অসন্তুষ্টির প্রকাশ ঘটায়। এখন সিনেট এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস উভয় কে রিপাবলিকান দল মেজরিটি বা সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দল তথা ডেমোক্র্যাটিক পার্টি মাইনরিটি বা সংখ্যালঘিষ্ঠ।

আমার মূল্যায়নে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ওপর হত্যা-সম আঘাত করা হয়েছে চারবার। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে হলো প্রথমবার, ১৯৮২ সালের মার্চে হলো দ্বিতীয়বার, ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে হয়েছিল তৃতীয়বার। চতুর্থবারের প্রক্রিয়া চলমান। ১৯৭৫-এর জানুয়ারিতে নির্বাচিত পার্লামেন্টের মাধ্যমে সাংবিধানিক পরিবেশে তথাকথিত আইনানুগ পদ্ধতিতে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাতিল করে একদলীয় শাসন এবং আজীবন রাষ্ট্রপতির ব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছিল। বাতিলকারীদের শক্তি ছিল সংবিধান। ১৯৮২ সালের মার্চে তৎকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক শক্তিকে ভয় প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করে ওই মুহূর্তে বিদ্যমান নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে নিজে দেশের নির্বাহী মতা করায়ত্ত করেছিলেন। তার শক্তি ছিল বন্দুকের নল। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানে প্রদত্ত বিধানকে ব্যবহার করে বন্দুকের নলকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে ওই দিনের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীপ্রধান বাংলাদেশে ইমার্জেন্সি বা জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন এবং নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করিয়েছিলেন। বাংলাদেশে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজের কথা মতে, এইরূপ জরুরি অবস্থা জারি হওয়া এবং নবরূপে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবির্র্ভূত হওয়া ইত্যাদি ছিল তাদের দলের আন্দোলনের ফসল তথা আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফসল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদের শেষাংশে ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ যেই পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তার মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মতায় আসে। নির্বাচনের প্রোপট, নির্বাচন পরিচালনায় অপ্রকাশ্য কূটকৌশল ইত্যাদি নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা আছে, কিন্তু সেটা আমরা এখানে উল্লেখ করব না।
২০০৮-এর ডিসেম্বরে মতায় আসার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গভীরভাবে ও সূক্ষ্মভাবে পরিকল্পনা রচনা করেছে তাদের মতার মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার জন্য। সংবিধানকে ব্যবহার করেই তারা তাদের ল্য অর্জন করতে চায়। অতএব সংবিধানটিকে তাদের মনের মতো করে সাজাতে হবে। এ জন্য তারা একাধিকবার বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন করিয়েছেন বা করাচ্ছেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন পন্থায় রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর ওপর এবং বিচার বিভাগের ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রয়াস পেয়েছেন। তারা এমনভাবে পরিস্থিতি ও পরিবেশ সৃজন করেছেন, যেন তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে না আসে। অতএব সব কিছুকে ব্যবহার করে তারা ৫ জানুয়ারি ২০১৪ গণতন্ত্রের নতুন সংজ্ঞা পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন। যথা নির্বাচনবিহীন জনপ্রতিনিধি কর্তৃক পার্লামেন্ট গঠন।

সুপ্রিয় পাঠক, আপনারা ২০০৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ফিরে যান। আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনা উচ্চারণ করেই যাচ্ছেন বাংলায় তিনটি শব্দ। শব্দগুলো হলোÑ দিন বদলের সনদ অথবা দিন বদলের রাজনীতি। শেখ হাসিনা ওই ২০০৮ সালে বাংলাদেশের প্রধানতম দুইজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের একজন ছিলেন। বাংলাদেশের মিডিয়া তার আহ্বানকে বা তার নীতিবাক্যকে গোগ্রাসে গিলে নিলো। প্রচার পেল দিন বদলের সনদ। প্রচার পেল এই তত্ত্ব যে, আওয়ামী লীগ মতায় এলে বাংলাদেশের মানুষের দিন বদলে যাবে। দুঃখ-কষ্ট থাকবে না, বঞ্চনা থাকবে না, প্রতারণা থাকবে না, দুর্নীতি থাকবে না, অপশাসন থাকবে না, প্রতিহিংসা থাকবে না। সুপ্রিয় পাঠক, ২০১৪ সালের নভেম্বরে নিজেরাই মূল্যায়ন করতে পারবেন পরিবর্তন কতটুকু হয়েছে বা হয়নি।

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে চার-পাঁচ মাস আগে মতায় এসেছে বিজেপি নামক একটি রাজনৈতিক দল। পরিচিত বা সাধারণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় বা রাজনীতির পরিভাষায়, বিজেপি একটি সাম্প্রদায়িক দল। অর্থাৎ বিজেপি একটি সুনির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক-ধর্মীয়-সামাজিক চিন্তাধারাকে প্রতিফলন করেই মতায় এসেছে। বিজেপির মতে, হিন্দু ধর্ম সর্বোত্তম ধর্ম। বিজেপির মতে, হিন্দু ধর্মের ধর্মীয় মূল্যবোধ ভারতের সব মানুষের জন্য কল্যাণকর। অতএব সেই মূল্যবোধ বাস্তবায়নের জন্য পরিশ্রম করতে হবে। বিজেপি যেই মাত্রায় বা যেই তারতম্যে পার্লামেন্টে সাবেক মতাসীন দল কংগ্রেসকে পরাজিত করেছে, সেটা আশ্চর্যজনক। মিডিয়ার রিপোর্ট মোতাবেক, বিজেপির নেতারা নিজেরাও এত বড় সাফল্য কল্পনা করেননি। তবে ভারতের বিগত পার্লামেন্ট নির্বাচনে সবচেয়ে বড় বা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা। জনগণ বা ভোটারদের সামনে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে চয়েজ বা পছন্দ করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। শুধু আলোচনার খাতিরে আমরা একটা বিষয় আলোচনা করি। মনে করুন, ভারতীয় ভোটাররা কংগ্রেসের অপশাসন বা দুঃশাসনের বা দুর্নীতিপরায়ণ শাসনের কারণে মনে মনে বিুব্ধ হয়ে কংগ্রেসকে ভোট না দিয়ে বিজেপিকে ভোট দিলো। তাহলে মেজরিটি পার্লামেন্ট সদস্য যদি বিজেপির হয়, তাহলে তারা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করবে।

অথবা এই রকম চিন্তা করুন : ভারতীয় ভোটাররা বিজেপিকে পছন্দ করছে না, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যোগ্য নেতা হিসেবে নরেন্দ্র মোদিকে উপযুক্ত বিবেচনা করছে। তাহলে জনগণের সামনে উপায় কী? জনগণ বা ভোটাররা যদি নরেন্দ্র মোদিকে রাষ্ট্রের নেতা হিসেবে দেখতে চায়, তাহলে জনগণ বা ভোটারদের অবশ্যই বিজেপিকে ভোট দিতে হবে। এই কলামের সম্মানিত পাঠকগণ যদি নিজেরা ঠাণ্ডা মাথায় বিবেচনা করেন, তাহলে দেখবেন যে, নরেন্দ্র মোদি অনেক বড় রকমের একটি রাজনৈতিক চাল চেলেছিলেন বিগত নির্বাচনের সময়। তিনি তার রাজনৈতিক জোট ও নিজেদের দলের মাধ্যমে নিজেকে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই ঘোষণার দু’টি মানে ছিল। একটি মানে হলো এরকম : সম্মানিত ভোটাররা যদি আমাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান তাহলে বিজেপিকে ভোট দিন। আরেকটি মানে হলো এরকম : সম্মানিত ভোটাররা যদি বিজেপিকে পছন্দ করে ভোট দেন, তাহলে আপনারা পছন্দ করুন অথবা আপনারা পছন্দ না করুনÑ বিজেপি আমাকেই প্রধানমন্ত্রী বানাবে। এইরূপ একটি প্রশ্নমালার সম্মুখীন হয়ে এখন থেকে পাঁচ-ছয় মাস আগে ভারতীয় ভোটাররা ভোট দিয়েছেন।

ভোটাররা নরেন্দ্র মোদির কারণে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, নাকি বিজেপির মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদি নেতা হয়েছেন, এই প্রশ্নের বিশ্লেষণ করতে গেলে অনেক জায়গা দরকার। কিন্তু আমরা একটা প্রশ্ন করতেই পারি। প্রশ্নটি হলো, নরেন্দ্র মোদি নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করার পেছনে কী শক্তি কাজ করেছে বা কী আত্মবিশ্বাস কাজ করেছে? নরেন্দ্র মোদি এই আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান ছিলেন যে, তিনি কংগ্রেসের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা কংগ্রেস কর্তৃক ঘোষিত ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী থেকে বেশি দ ও গ্রহণযোগ্য নেতা। নরেন্দ্র মোদি তার দলীয় কাঠামোর মাধ্যমে, তার দলের শুভাকাক্সী মিডিয়ার মাধ্যমে, তার আশা-আকাক্সা ও আত্মবিশ্বাসকে জনগণের কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন। অর্থাৎ নেতার আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন, নেতার গুণাবলি প্রয়োজন, নেতার গুণাবলির প্রচারণা প্রয়োজন। তবে নরেন্দ্র মোদি কতটুকু সফল হন, সেটা সময়ের পরিক্রমায় আমরা দেখব; এখন কোনো মন্তব্য করা অপ্রাসঙ্গিক ও বাতুলতা হবে।
বারাক ওবামা এবং শেখ হাসিনা উভয়েই পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে বা পরিবর্তনের কথা প্রচার করে পরিবর্তন কায়েম করার জন্য নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের দল ছিল, তাদের রাজনৈতিক কাঠামো ছিল, তাদের দলের ঐতিহ্য ছিল, তাদের দলের ও দলের শুভাকাক্সীদের মেধাশক্তি ও অর্থশক্তি ছিল। সব কিছু ব্যবহার করেই বারাক ওবামা বা শেখ হাসিনা প্রেসিডেন্ট বা পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। শেখ হাসিনা যেহেতু একটি দলের প্রধান, তাই তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।

২০০৭ সালের ডিসেম্বরে অনেক চিন্তাশীল সচেতন নাগরিক মিলে পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে, পরিবর্তনের প্রচারণার সূচনা করে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল যাত্রা শুরু করেছিল। জন্মদিবস থেকেই এদের নীতিবাক্য (ইংরেজি ভাষায় ‘মটো’) ছিল ‘পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি’ বা ‘পলিটিক্স ফর চেইঞ্জ’। পরিবর্তন অনেক আঙ্গিকেই কাম্য ছিল এবং এখনো কাম্য আছে। প্রথম ও প্রধানতম কামনা হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে গুণগত পরিবর্তন। কিন্তু বারাক ওবামার দলের মতো বা শেখ হাসিনার দলের মতো এই নতুন দলটির ঐতিহ্য ছিল না, মেধাশক্তি সীমিত ছিল, অর্থশক্তি অতি নগণ্য ছিল। এই নতুন দলটি তথা বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ৩৬টি আসনে প্রার্থী দিয়ে অংশগ্রহণ করেছিল। বাংলাদেশের প্রাচীন ও বিদ্যমান প্রথা এবং রাজনৈতিক ঐতিহ্যের বিকল্প হিসেবে পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি স্লোগান নিয়ে আমরা চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি। নির্বাচনে জিততে পারিনি তার মানে এই নয় যে, পরিবর্তনের জন্য মনের আকাক্সা স্থগিত হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুণগত পরিবর্তন চাই।

বাংলাদেশে বিদ্যমান বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্য থেকেই এই গুণগত পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করতে হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমরা চাই সৎ, মেধাবী ও সাহসী ব্যক্তিরা রাজনীতিতে জড়িত হোক। আমরা চাই সৎ, সাহসী ও মেধাবী ব্যক্তিরা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জনগণের খেদমতের সুযোগ পাক। আমরা চাই, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এমন হোক যেখানে সৎ, সাহসী ও মেধাবী ব্যক্তিরা নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন, জনগণের সামনে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারেন এবং জনগণকে আশ্বস্ত করে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেতে পারেন। যথেষ্ট বা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সৎ, মেধাবী ও সাহসী ব্যক্তি যদি পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেন, তাহলে পার্লামেন্ট সদস্যদের মধ্যে একটি গুণগত পরিবর্তন সূচিত হবে। সে জন্য বাংলাদেশে সাহসী ভোটার প্রয়োজন, যেই ভোটাররা সৎ, সাহসী ও মেধাবী ব্যক্তিদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে। সে জন্য বাংলাদেশে সাহসী মিডিয়া প্রয়োজন, যেই মিডিয়া সৎ, সাহসী ও মেধাবী ব্যক্তিদের উৎসাহিত করবে এবং প্রচারণায় পৃষ্ঠপোষকতা করবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের আরো কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নি¤œরূপ। প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের চেতনা সম্মিলিতভাবে বা যুগপৎ বিদ্যমান থাকবে। দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব জাতীয় ঐক্যের প্রেরণা হবে, জাতীয় বিভক্তির কারণ হবে না। তৃতীয়ত, সমাজে ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। চতুর্থত, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াস শুরু হবে। পঞ্চমত, প্রতিহিংসা নয়, প্রতিযোগিতা হবে উন্নয়ন ও অবদানের কাঠামো। আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত এবং নিজেদের রাষ্ট্র বাংলাদেশের উদাহরণগুলো অতি সংপ্তি পরিসরে আলোচনা করেছি পাঠকের মনে চিন্তার খোরাক উপহার দিতেই মাত্র।

এই মুহূর্তে আমরা দু’টি সংগ্রামে লিপ্ত। একটি সংগ্রাম অতি সহজেই দেখা যাচ্ছে, আরেকটি সংগ্রাম অত সহজে দেখা যাচ্ছে না বা অনেক সহজে অনুভব হচ্ছে না। সহজেই দেখা যাচ্ছে এমন সংগ্রামটি হচ্ছে : সঠিক গণতন্ত্রের চর্চা নিশ্চিত করার জন্য তথা সর্বদলীয় অংশগ্রহণে নিরপে তত্ত্বাবধানে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা। সহজে দেখা যাচ্ছে না বা অনুভূত হচ্ছে না এমন সংগ্রাম হচ্ছে : রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনার সংগ্রাম। নয়া দিগন্তের পাঠকগণ তাদের মনের চুকে প্রসারিত করে অনুভব করার চেষ্টা করবেন বলে আমরা আশা রাখি।
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
( নয়া দিগন্ত )

You Might Also Like