বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ধারা

৯ নভেম্বর রবিবার লন্ডনের ইস্ট এন্ডের অট্রিয়াম হলে অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর এক নাগরিক সংবর্ধনা। তিনি কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় সব দলমতের বাংলাদেশিরা তাঁকে এই সংবর্ধনা জানিয়েছে। লন্ডনের আবহাওয়া এদিন ভালো না থাকা সত্ত্বেও বিশাল হলটি মোটামুটি ভরে গিয়েছিল। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও বাংলাদেশিদের মধ্যে দলাদলি ভুলে একাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্পিকারকে এই সংবর্ধনা দেওয়া থেকে মনে হয় দেশের এই নতুন অর্জনে তারা সবাই গৌরব বোধ করছে।

দেশের এই অর্জন এবার একটি নয়, একাধিক। শুধু শিরীন শারমিন চৌধুরী যে কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হলেন তা নয়, জাতীয় সংসদের আওয়ামী লীগদলীয় সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী নির্বাচিত হয়েছেন আন্তপার্লামেন্টারি সমিতির সভাপতি। এ ছাড়া বিশ্ব মানবাধিকার কমিশনেও বাংলাদেশ সম্মানজনক আসন লাভ করেছে। স্বভাবতই এই অর্জন বাংলাদেশের মানুষকে উদ্দীপ্ত ও আত্মমর্যাদা সম্পর্কে সচেতন করেছে। দেশ এবং দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে পোষিত নেতিবাচক মনোভাবের বদলে একটা ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সূচনা হয়েছে।

৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের মানুষের মনে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা নেতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে প্রধান বিরোধী দলটি (বিএনপি) থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের একটা বড় অংশ এবং নিরপেক্ষতার ভেকধারী একাধিক মিডিয়া চেষ্টার কম ত্রুটি করেনি। আমেরিকা থেকে শুরু করে আরো কয়েকটি পশ্চিমা দেশও বেশ কিছুদিন এই তালে তাল মিলিয়েছে। কমনওয়েলথ ও আন্তপার্লামেন্টারি সমিতিতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব লাভ, এমনকি মানবাধিকার সংস্থাতেও সম্মানজনক আসন লাভ এই প্রচার-প্রোপাগান্ডার গালে একটি চপেটাঘাতের মতো। দেশের মানুষও এই প্রচার-প্রোপাগান্ডার প্রভাব থেকে এখন অনেকটা মুক্ত। লন্ডনে গত রবিবার বাংলাদেশিদের সভা দেখেও তা অনুমিত হলো।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ধারা

মিথ্যার ঢাক বেশি দিন বাজানো যায় না। তাই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে যারা মিথ্যার জাল ছড়াতে চেয়েছিল, তারা ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের যে পার্লামেন্টকে তারা অবৈধ প্রমাণ করতে চেয়েছিল, বহির্বিশ্ব তাকে শুধু বৈধতা দেয়নি; তাকে আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি সংস্থাগুলোয় নেতৃত্বের আসনে বসিয়েছে। বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে যারা চিৎকার জুড়ে দিয়েছিল, সেই মানবাধিকার কমিশনে এখন বাংলাদেশের সম্মানিত আসন।

হাসিনা সরকারের এই অর্জনটিকে ছোট করে দেখার উপায় নেই। দেশের মানুষও তা দেখছে। বহুকাল ধরে দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ও হতাশাব্যঞ্জক কথা শুনতে শুনতে সাধারণ মানুষের মনেও হতাশা ও নেতিবাচক মনোভাব ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল। সরকারের ভালো কাজগুলোও তাদের চোখে পড়ছিল না, দেশ সম্পর্কে গর্ব করারও যেন তাদের কিছু ছিল না। বহুকাল পরে দেখলাম বাংলাদেশিদের মধ্যে দুটো পার্লামেন্টারি সংস্থায় তার দেশের প্রতিনিধিদের জয়লাভে আত্মসম্বিত ফিরেছে এবং দেশ সম্পর্কে তাদের মধ্যে একটা গৌরববোধ জেগেছে ও ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও সাবের হোসেন চৌধুরীর এই সাফল্যে আর কিছু না হোক দেশে এবং বিদেশে বাংলাদেশিদের মধ্যে একটা আত্মপ্রত্যয়ের ভাব যে সৃষ্টি হয়েছে তা আমি ইদানীং লক্ষ করেছি।

লন্ডনের সংবর্ধনা সভায় ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী যে বক্তৃতা দিয়েছেন তা থেকেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ধারার সূচনা আমি লক্ষ করেছি। সে ধারাটি হলো, বিরোধী দল বা দলগুলোর একবার নামোল্লেখ না করে তাদের নেতিবাচক প্রচারণার জবাবে কোনো নেতিবাচক কথা না বলে দেশের উন্নয়নের চিত্রটি তুলে ধরা। এই উন্নয়ন প্রচেষ্টায় কোথায় কোথায় ঘাটতি আছে এবং সেই ঘাটতি পূরণে কেন সময় লাগছে, সেটি জনসাধারণকে স্পষ্টভাবে বোঝানো। শিরীন শারমিন তাঁর বক্তৃতায় শুধু স্পিকারসুলভ নিরপেক্ষতাই বজায় রাখেননি; দেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে চমৎকার ভারসাম্য বজায় রেখে কথা বলেছেন। তা যে সংবর্ধনা সভার শ্রোতাদের মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে তা অমি লক্ষ করেছি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এত কালের প্রচলিত ধারা, বিরোধী দল সরকারকে সত্য-মিথ্যা নানা অপবাদ দেবে এবং ক্ষেত্র বিশেষে কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তাও বলবে। অন্যদিকে সরকারের মন্ত্রী এবং নেতারাও বিরোধী দলের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা কথা বলবেন, তাদের মোকাবিলা করার হুমকি দেবেন। এই হুমকি ও পাল্টা হুমকির মুখে দেশের সমস্যাগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়। তা নিয়ে না সরকারের, না বিরোধী দলের নেতানেত্রীরা কোনো গঠনমূলক কথা বলেন, না তার সমাধান সম্পর্কে দেশবাসীকে কোনো পন্থা বাতলান। তাদের হুমকি ও পাল্টা হুমকিতে দেশের কোনো সমস্যার সমাধান হয় না।

উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে জাতির আপৎকালে সরকার ও বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিপদ ঠেকানোর পন্থা উদ্ভাবন করে। আমাদের দেশে এর উল্টো ব্যবস্থা। জাতির বিপদে সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের কাছ থেকে আরো দূরে সরে যায়, এমনকি বিরোধী দল সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য দেশের শত্রুরও পক্ষাবলম্বন করে। এটা আমরা পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংকের শত্রুতামূলক আচরণের সময়েও দেখেছি। বিশ্বব্যাংকের আচরণে গোটা জাতির জন্যই এক বিরাট সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল। এটা ছিল শুধু আওয়ামী লীগের বিপদ নয়, গোটা জাতির বিপদ।

এ সময় সরকার ও বিরোধী দলের দুই মাথা এক করে এই বিপদ ঠেকানোর এবং বিশ্বব্যাংকের চাতুরি বন্ধ করার জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা গ্রহণের দরকার ছিল। তা না করে বিএনপি, এমনকি আমাদের একটি সুধীসমাজকেও দেখা গেল আনন্দে বগল বাজাতে এবং বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশবিরোধী অবস্থানের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখতে। কোনো বড় জাতীয় সংকটেই আমাদের ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের নেতারা কোনো গঠনমূলক ও ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন না। পারস্পরিক দোষারোপ করে তাঁরা সংকটের সমাধানকে বিলম্বিত করেন।

এটাই এত কালের রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীরা জনসভা করে সরকারকে শুধু গালি দেবেন এবং সরকারের মন্ত্রী ও নেতারা তাঁদের পাল্টা হুমকি দেবেন। এই নিন্দা ও পাল্টা নিন্দার মাঝখানে দেশের মানুষের সমস্যাটি হারিয়ে যায়, তার সমাধান কী তা তারা জানতে পারে না। ইদানীং এই ট্রেন্ডটির একটু বদল হয়েছে বলে মনে হয়। বিএনপি শিবিরে না হলেও আওয়ামী লীগ শিবিরে হতে যাচ্ছে বলে অনুমিত হয়, বিশেষ করে তাদের তরুণ প্রজন্মের কিছু মন্ত্রী ও নেতার মধ্যে।

লন্ডনে সম্প্রতি একাধিক তরুণ মন্ত্রী ও মহিলা এমপি এসেছেন। একজন মহিলা প্রতিমন্ত্রীও এসেছিলেন। তাঁদের বক্তৃতা শুনে আমি আশাবাদী হয়েছি। তাঁদের একজনও বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদের নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। তাঁরা দেশের সমস্যাগুলো নিয়ে অত্যন্ত তথ্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন। এই সমস্যা সমাধানে সরকার কতটা সফল হয়েছে তা যেমন বলেছেন, তেমনি সমস্যাগুলোর পূর্ণ সমাধানে বাধা কোথায় তাও তাদের শ্রোতাদের বুঝিয়ে বলেছেন। শ্রোতারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধৈর্য ধরে তাঁদের বক্তব্য শুনেছে এবং দেশের সব সমস্যার সমাধান যে রাতারাতি হওয়ার নয়, এই বাস্তবতাবোধ তাদের মনে তৈরি হয়েছে।

গত রবিবার লন্ডনের সংবর্ধনা সভায় ড. শিরীন শারমিনের বক্তব্যও ছিল রেটোরিক-মুক্ত, দেশের সার্বিক পরিস্থিতির একটি নিরপেক্ষ সার্বিক বিশ্লেষণ। তিনি নিজে নারী। তাই দেশের নারীর ক্ষমতায়ন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধী দলের নেত্রী নারী, সংসদীয় উপনেতা একজন নারী, স্পিকার একজন নারী; তার দ্বারা কি বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন সম্পূর্ণ হয়েছে মনে করা যাবে? না, তা মনে করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তা মনে করেন না। তাই তিনি নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর অবস্থান তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকেও তরান্বিত করবে। নারী মুক্তির এই লক্ষ্যে পৌঁছাই সরকারের লক্ষ্য।’

৯ নভেম্বর ইস্ট এন্ডের যে অট্রিয়াম হলে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সংবর্ধনা সভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে; দুই দিন আগে ৭ নভেম্বরের তথাকথিত ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব দিবস’ উপলক্ষে সেই হলে বিএনপির তারেক রহমান একটি সভা করেছেন। দীর্ঘকাল বিদেশে বাস করেও তাঁর মধ্যে দুর্বৃত্তপনা ও অর্বাচীনতা যে দূর হয়নি তাঁর বক্তব্যেই তা প্রকাশ পেয়েছে। ইদানীং ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে ধৃষ্ঠতামূলক কথা বলা ছাড়া তাঁর বক্তব্যে আর কিছু থাকে না। এটা হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতির নেতিবাচক দিকের সর্বনিকৃষ্ট উদাহরণ। দীর্ঘকাল বিদেশে বাস করতে বাধ্য হওয়ায় বাস্তবতাবর্জিত তারেকের মনে রাজনৈতিক হতাশা সৃষ্টি করেছে এই মানসিক বিকার। এই বিকার কমবেশি বিএনপির ছোট-বড় অনেক নেতাকেই পেয়ে বসেছে।

দেশের রাজনীতিকে এই বিপজ্জনক হতাশাব্যঞ্জক নেতিবাচক ধারা থেকে অবশ্যই উদ্ধার করতে হবে। বর্তমানের কিছু তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রী এবং বিশেষ করে লন্ডনে ড. শিরীন শারমিনের সাম্প্রতিক বক্তৃতা শুনে আমার মনে হয়েছে, রাজনীতিতে এই ইতিবাচক ধারাটি সৃষ্টি হতে চলেছে। আওয়ামী লীগের নবীন-প্রবীণ অন্য নেতারাও যদি এই ধারাটি অনুসরণ করে চলেন, তাহলে দেশ ও জাতি অনেক সংকটই কাটিয়ে উঠতে পারবে।
( কালের কণ্ঠ )

You Might Also Like