মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক

মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকপৃথিবী গ্রহটিতে যত রকমের সম্পদ রয়েছে, মহামূল্যবান খনিজ সম্পদসহ, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানবসম্পদ। সম্পদের সুষ্ঠু ও সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে কোনো জাতির আর্থসামাজিক উন্নতি। তবে মানবসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ছাড়া কোনো দেশের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য নেই, কিন্তু মানবসম্পদে বাংলাদেশ সম্পদশালী।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। জমি উর্বর। প্রচুর ফসল জন্মে। ফলে খাদ্যাভাবে এখানে মানুষ মরে না বটে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষকে বাস করতে হয় দারিদ্রে্যর মধ্যে। তার জন্য দায়ী বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অভাব। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক উত্থান-পতনের কারণে এবং পুঁজি ও শিল্পোদ্যোক্তার অভাবে যথেষ্ট শিল্প-কলকারখানা গড়ে ওঠেনি। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য তৈরি পোশাক কারখানা শিল্পের বিকাশ ঘটায় লাখ লাখ নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। অর্জিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। যার পরিমাণ ২২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তবে আমদানিকৃত কাঁচামাল কাপড়, সুতা প্রভৃতির মূল্য পরিশোধ করতে ওই বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় ৪০ শতাংশ বিদেশে চলে যায়। তার ফলে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে প্রকৃত আয় ১৪ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি নয়।

অন্যদিকে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। সুতরাং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান সবচেয়ে বেশি। সেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় কর্মরত শ্রমিকদের অবদানই বেশি। আরব বিশ্বে কর্মরত অদক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লাখের কম নয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কয়েক হাজার নারী।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কথা আমরা গর্ব করে বলি। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে তাঁদের অবদানও স্বীকার করি। কিন্তু একটা কথা আমরা বলি না যে, বাংলাদেশের ওই লাখ লাখ অদক্ষ শ্রমিক ওই সব দেশের অর্থনীতিতে কত বড় ভূমিকা রাখছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের মানবসম্পদ নিজের দেশের অর্থনীতিতে যেমন অবদান রাখছে, তেমনি ওই সব দেশের অর্থনীতিতেও বিরাট ভূমিকা রাখছে।

যে ৫০-৬০ লাখ বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্যে গেছেন, তাঁরা ভিক্ষা করতে বা খয়রাত নেওয়ার জন্য সেখানে যাননি। একজন সম্পদহীন বা ভূমিহীন শ্রমিক বা স্বল্পশিক্ষিত নারী বা পুরুষের বিক্রি করার মতো একটি জিনিসই থাকে, তা হলো তাঁর শ্রম। মধ্যপ্রাচ্যে বা অন্যান্য দেশে গিয়ে তাঁরা তাঁদের শ্রম বিক্রি করছেন। সেই শ্রমের বিনিময়ে মজুরি পাচ্ছেন। কেউ দয়া করে তাঁদের টাকা দিচ্ছে না। তাঁরা কঠোর পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করছেন। নিজেরা অতি কষ্টে প্রবাসে জীবন যাপন করে, প্রায় না খেয়ে টাকা জমিয়ে দেশে পাঠাচ্ছেন। সেই ডলার, রিয়াল, দিনার বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা হচ্ছে, আর আমাদের নেতারা সব উঁচু গলায় বলছেন, ‘এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ।’ ওই সর্বোচ্চ রিজার্ভের জন্য প্রত্যেক শ্রমিককে যে সর্বোচ্চ শারীরিক পরিশ্রম দিতে হচ্ছে, তা আমাদের ধারণারও বাইরে। অথবা জেনেও আমরা নীরব থাকি।
আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বৈদেশিক মিশনগুলো অদক্ষতার ক্লাসিক দৃষ্টান্ত। বিদেশে আমাদের মিশনগুলোয় যাঁরা কর্মকর্তা-কর্মচারী, তাঁরা নিজেরা খুবই সুখে থাকেন। ওর চেয়ে সুখের চাকরি পৃথিবীতে নেই। তৎকালীন পিএফএস বা পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের কূটনীতিকেরা উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতায় ছিলেন অসাধারণ। তাঁরা অবসরে চলে যাওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুর্বল হয়ে পড়েছে। গত দুই যুগে বহু দলীয় অযোগ্যরা স্বজনপ্রীতিবশত নিয়োগ পাওয়ায় সার্বিকভাবে আমাদের দূতাবাস ও মিশনগুলোর অবস্থা শোচনীয়। তার ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না সরকার। আপদে-বিপদে মিশনগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহযোগিতা পান না প্রবাসী শ্রমিকেরা। নিয়োগদাতারা যখন আমাদের শ্রমিকদের ওপর অবিচার করেন, তার প্রতিকারে আমাদের মিশনগুলোর কর্মকর্তাদের তাঁদের পাশে পাওয়া যায় না। এ সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় বহুদিন যাবৎ অব্যাহতভাবে লেখালেখি হচ্ছে, কিন্তু তাতে সরকারের মাথাব্যথা নেই।

যাঁরা আমাদের অর্থনীতির প্রাণশক্তিকে চাঙা রেখেছেন, যাঁদের ঘাম ও শ্রমের বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার দামি গাড়ি হাঁকান আমাদের কর্মকর্তারা, তাঁরা কি একটুও ভাবেন প্রবাসী শ্রমিকদের ব্যাপারে? জোতজমি-ঘটিবাটি বেচে, পরিবার-পরিজন ফেলে শ্রম বিক্রি করতে যাঁরা বিদেশে যান, ঢাকা বিমানবন্দরে তাঁদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়, তা শুধু যে চরম অসম্মানজনক তা-ই নয়, অমানবিক। সেই আচরণ আমাদের নিজেদের চোখে দেখা, শোনা কথা নয়। শ্রমিকের চাকরি নিয়ে যাঁরা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে যাবেন, তাঁদের সম্মানজনকভাবে বিদায় জানানোর জন্য বিমানবন্দরে বিশেষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার দাবি আমাদের। একই সঙ্গে যেসব প্রবাসী শ্রমিক বিদেশ থেকে ফিরবেন, তাঁদের বিশেষভাবে দেখাশোনার জন্যও আলাদা ব্যবস্থা রাখতে হবে। যাতে তাঁরা কোনোক্রমেই দেশের মাটিতে এসে বিমানবন্দরে নাজেহাল না হন।
আমাদের একটি বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় আছে। প্রবাসী শ্রমিকদের সুবিধা-অসুবিধা দেখাশোনায় ওই মন্ত্রণালয়ের কর্তাদের ভূমিকার
কথা আমাদের চেয়ে প্রবাসী শ্রমিকেরাই ভালো জানেন। তবে তাঁদের আরও সক্রিয় শুধু নয়, সংবেদনশীল হওয়ার অনুরোধ জানাব। তাঁরা যেন আরও মানবিক হন। এ প্রসঙ্গে একটি দৃষ্টান্ত দিতে চাই। কিছুদিন আগে সংবাদপত্রের এক প্রতিবেদনে জানতে পারি, আমাদের বহু প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মর্গের হিমাগারে রয়েছে। তাঁদের মরদেহ দেশে এনে প্রিয়জনদের কাছে হস্তান্তরের দায়িত্ব কে নেবে? সরকারকেই নিতে হবে।

কিছু কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ সরকার নিয়েছে। তার মধ্যে একটি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক স্বার্থে যদি এই ব্যাংককে ব্যবহার করা না হয়, তাহলে এই ব্যাংক ভালো ভূমিকা পালন করতে পারবে। বিদেশে যাওয়ার সময় শ্রমিকেরা যদি এই ব্যাংক থেকে ঋণ পান এবং উপার্জিত অর্থ যদি এই ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসে, তাতে শ্রমিক ও দেশ উভয়ই উপকৃত হবে।
বাংলাদেশের শ্রমিক উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের চেয়ে সস্তা বলে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশিদের নিতেই আগ্রহী। সুতরাং আমাদের শ্রমিকদের চাহিদা কমবে না। অদক্ষ শ্রমিকদের বেতন খুব কম। সরকার দক্ষ শ্রমিক তৈরির উদ্যোগ নিতে পারে। সারা দেশের সব জেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যে নার্স ও গাড়িচালকদের খুবই চাহিদা। তাঁদের তৈরি করতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে যেমন বেকারত্ব ঘুচবে, বৈদেশিক মুদ্রার উপার্জনও বাড়বে। কিছু কিছু এনজিও ও খ্রিষ্টান চার্চ ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে বলে শুনেছি। কিন্তু কাজটি করা উচিত সরকারের। প্রবাসী কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সক্রিয় হলে দালালদের খপ্পর থেকে শ্রমিকেরা বাঁচতে পারেন।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকেরা সাড়ে তিন দশক যাবৎ কাজ করছেন। ওই অঞ্চলের সমাজব্যবস্থা, আইনকানুন, রীতিনীতির সঙ্গে তাঁরা নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। অনেকে সেখানে আছেন পারিবারিকভাবে। যেমন বাবা আগে গেছেন। পরে ছেলেদের, ভাতিজা, ভাগনে বা কোনো আত্মীয়কে নিয়ে গেছেন। ফলে সেখানে বাংলাদেশিদের নিঃসঙ্গতা কম। সে জন্য সেখানকার শ্রমবাজারটা আমাদের শ্রমিকদের জন্য বন্ধ না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
সৌদি আরবের পরেই আরব আমিরাত ও কাতারে বাংলাদেশের শ্রমিক বেশি। বেশ কিছুকাল যাবৎ আমিরাত বাংলাদেশের শ্রমিক নিচ্ছে না। তবে এখনো সেখানে লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক আছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের সময় আমিরাত এক হাজার গৃহকর্মী নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশেই নারী গৃহকর্মীদের ওপর নানা রকম নির্যাতনের কথা গণমাধ্যমে আসে। তাঁদের বেতন দেওয়া হয় কম, অথচ শ্রমঘণ্টা বেশি। তা ছাড়া শারীরিক নির্যাতন, এমনকি যৌন নির্যাতনের শিকার পর্যন্ত হতে হয়। সব ধরনের শ্রমিক, বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি কোনো এজেন্ট নয়, সরকারকেই দেখাশোনা করতে হবে।

আমার জানা একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। প্রথম আলোর অফিস থেকে আমার ফোন নম্বর জোগাড় করে এক নারী আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। আমি জানতে চাই কী বিষয়ে কথা। বলেন, তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশে তিন-চার বছর ছিলেন। সপ্তাহ খানেক আগে দেশে এসেছেন। তাঁরা কিছু কথা সাক্ষাতে বলতে চান। তাঁরা তিনজন আসেন। নিজেদের নাম-ঠিকানা গোপন করে মুখ সম্পূর্ণ ঢেকে তাঁরা আসেন। একজন তাঁর প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা বলে কাঁদতে থাকেন। তাঁদের স্বামী-সন্তান রয়েছে। তাঁদের অনুরোধ, আমি যেন পত্রিকায় এ সম্পর্কে লিখি। তাঁরা তাঁদের কোন অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন, পাঠক অনুমান করতে পারেন। তাঁদের কথা শুনে আমারও চোখ ভেজে।
কাতারের দোহা থেকে প্রথম আলোর সাপ্তাহিক উপসাগরীয় সংস্করণ প্রকাশ বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক মাইলফলক। কিন্তু আমি এর অন্য উপযোগিতা দেখতে পাই। মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় প্রথম আলো আশা করি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। প্রবাসী শ্রমিকদের অভাব-অভিযোগ, সমস্যা ও সুখ-দুঃখের কথা দোহা সংস্করণে স্থান পেলে ব্যক্তিগতভাবে শ্রমিকেরা শুধু নন, উপকৃত হবে বাংলাদেশ। সমস্যা শনাক্ত হলে প্রতিকার সহজ হবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
( প্রথম আলো )

You Might Also Like