থামছে না পরকীয়া, যোগ হচ্ছে নতুন মাত্রা

পরকীয়ার কারণে পারিবারিক, সামাজিক অস্থিরতা ও নানাবিধ অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা দিন দিন বাড়ছেই। নিয়ন্ত্রণের লক্ষণ তো মিলছেই না, বরং নতুন নতুন কৌশলে পাচ্ছে নতুন মাত্রা। সম্প্রতি দুই সন্তানের জননীর সাথে কলেজের প্রথম বর্ষের এক ছাত্রের অনৈতিক সম্পর্কের জের ধরে খুনের ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। অভিভাবকেরাও উদ্বিগ্ন তাদের সন্তানদের নিয়ে।

সাম্প্রতিক আলোচিত পরকীয়া ও খুন : লাভলী ইয়াসমিন লিনা। বয়স ২৯। বিবাহিতা। আট ও পাঁচ বছর বয়সী দুই সন্তানের জননী। চলার পথে এক দিন চোখ পড়ে এক যুবকের চোখে। নাম তানভীর আহমেদ। বয়স ১৭ বছর পাঁচ মাস। নৌবাহিনী কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র। লিনা ও তানভীরের বসবাস একই এলাকায়। তাই চলার পথে মাঝে মধ্যে চলে চোখাচোখি। এরপর মোবাইল নাম্বার আদান-প্রদান। শুরু হয় আলাপ। আলাপ থেকে প্রেম।

লিনা তার বিয়ে, স্বামী সংসার ও সন্তানাদি থাকার খবর তানভীরের কাছে গোপন রেখে চালিয়ে যায় প্রেমের সম্পর্ক। মোবাইল প্রেমালাপ থেকে পরে দেখা সাক্ষাৎ এবং তা বেড়ানোতে গড়ায়। মাঝে মধ্যে স্বামীর অনুপস্থিতিতে লিনার বাসায় গিয়েও সময় কাটায় তানভীর। পরকীয়া যখন গভীরে রূপ নেয় লিনা তখন তানভীরের কাছে স্বামী, সন্তান এবং সংসারের কথা খুলে বলে। স্বামী-সংসার ত্যাগ করে সে তানভীরের সাথে নতুন করে ঘর বাঁধতে চায়। স্বামীকে তালাক না দিয়েই গত ১৫ অক্টোবর গোপনে কাজীপাড়া গিয়ে বিয়ে করে তারা।

এরপর লিনা তানভীরকে বলে তাদের নতুন জীবনের পথে প্রধান বাধা তার স্বামী। তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে। তানভীরকে নিয়ে স্বামী খুনের পরিকল্পনা সাজায় সে। তানভীরকে এ কাজে সহায়তায় এগিয়ে আসে তার এলাকার দুই বন্ধু সাদমান ইসলাম মুক্ত ও আকিবুল ইসলাম জিসান। সাদমান ইসলাম মুক্ত ঢাকা কমার্স কলেজ ও আকিবুল ইসলাম জিসান সরকারি বিজ্ঞান কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র। পরিকল্পনামতো ১৯ অক্টোবর রাতে লিনার সহায়তায় তারা হত্যা করে স্বামী গিয়াসউদ্দিনকে।

এভাবেই স্ত্রীর পরকীয়া ঘটনায় মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের নিজ বাসায় খুন হন ঝুট ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন (৩৬)। লিনার সাথে তানভীরের পরিচয়ের এক বছরের মাথায় ঘটে এ হত্যাকাণ্ড। গ্রেফতারকৃত তানভীর, লিনা ও তানভীরের অপর দুই বন্ধুর স্বীকারোক্তির মাধ্যমে উন্মোচিত হয় হত্যাকাণ্ডের পেছনে দুই সন্তানের জননীর সাথে একজন কিশোরের পরকীয়ার ঘটনা। দুই সন্তানের জননীর সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে একাদশ শ্রেণীর তিন কিশোর কর্তৃক হত্যার ঘটনায় যেমন বিস্মিত ওই পরিবারগুলো তেমিন বিস্ময়ে হতবাক দেশবাসী।

বিবেককে নাড়া দেয় যে পরকীয়া : পরকীয়ার কারণে স্ত্রী কর্তৃক স্বামী হত্যা, স্বামী কর্তৃক স্ত্রী খুন, স্ত্রীর প্রেমিক কর্তৃক স্বামী খুন বা স্বামীর প্রেমিকা কর্তৃক স্ত্রী খুনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। পরকীয়ার কারণে সন্তান স্বামী সংসার ফেলে গৃহত্যাগের ঘটনাও সমাজে অহরহ ঘটছে এখন। প্রায়ই পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের পেছনে বের হয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর পরকীয়ার ঘটনা। পরকীয়ার কারণে মা কর্তৃক সন্তান হত্যা, বাবা কর্তৃক সন্তান হত্যার মতো লোমহর্ষক ঘটনার খবরে গোটা জাতির বিবেককে নাড়া দেয় প্রায়ই। পরকীয়া দেখে ফেলায় মা অথবা বাবা কর্তৃক আপন সন্তান হত্যার ঘটনা মাঝে মধ্যে স্তম্ভিত করে দেয় গোটা জাতিকে। কিন্তু তারপরও থামছে না এসব অঘটন। বরং নিত্যনতুন মাত্রায় হাজির হচ্ছে এ পাপ।

গত ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় মিরপুর মধ্য পাইকপাড়ায় আইরিন আক্তার আরজু ও তার সাত বছরের ছেলে সাবিদ হোসেনকে হত্যা করা হয় শ্বাসরোধ করে। ঘটনার পরপরই পুলিশ নিহত আরজুর স্বামীকে গ্রেফতার করে। প্রাথমিকভাবে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে পরকীয়ার কারণেই স্বামী এ হত্যাকাণ্ড ঘটনা ঘটিয়েছেন।
পরকীয়ার ঘটনায় গিয়াসউদ্দিন হত্যায় গ্রেফতারকৃত তানভীর, সাদমান ইসলাম ও আকিবুল কেউই বস্তি বা পথের সন্তান নয়। যাচ্ছেতাই পরিবার থেকেও তারা উঠে আসেনি। প্রত্যেকেই অবস্থাসম্পন্ন শিক্ষিত পরিবারের সন্তান ও রাজধানীর নাম করা কলেজের তারা ছাত্র। কলেজপড়–য়া এ তিন ছাত্র খুনের মামলার আসামি। শহুরে অভিভাবকেরা সন্তানদের নিয়ে সবসময় নানামুখী নিত্যনতুন দুশ্চিন্তায় ভোগেন। সবারই ভাবনা এ থেকে মুক্তির উপায় কী। সন্তানকে ভালো রাখা যায় কিভাবে?

বিশেষজ্ঞদের অভিমত : সামাজিক অবক্ষয়, অনাচার, বিয়ের আগে ও বিয়ের বাইরে নারী-পুরুষের অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় সব সময় চলে আসে স্যাটেলাইট টেলিভিশনের প্রসঙ্গ বিশেষ করে ভারতীয় বিভিন্ন চ্যানেলের নাম। সামাজিক এসব অবক্ষয় বিস্তারে বিভিন্ন হিন্দি সিরিয়ালের প্রভাব বিষয়ে দীর্ঘ দিন ধরে উদ্বিগ্ন বিভিন্ন মহল। পরকীয়া, পারস্পরিক সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে ফাটল ধরানো, কূটনামির বিষবাষ্প ছড়াতে ভারতীয় বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান বিশেষ অবদান রাখছে বলে মনে করেন অনেকে। অনেকে অতিষ্ঠ এখন টিভি নিয়ে। না পারছে একেবারে বাতিল করতে আর না পারছে এসব গ্রহণ করতে। ভারতীয় এসব চ্যানেলের প্রভাব পড়েছে এ দেশেরও টিভি অনুষ্ঠানে। তাই ভারতীয় এসব টিভি চানেল বন্ধের দাবি শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. শাহ এহসান হাবীব বলেন, মিপুরের ঘটনার সাথে কয়েকটি বিষয় জড়িত। প্রথমত, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক। দ্বিতীয়ত, অসম বয়স। আমাদের সমাজে বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক অনেক বেড়েছে। ভারতে এটা খুব বেশি। বিশেষ করে মুম্বাই শহরে শতকরা ৩০ ভাগ মানুষ বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কের সাথে জড়িত। মানুষ কেন বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়ার ঘটনায় জড়ায় এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। প্রথম ও প্রধান কারণ হলো বিবাহিত কোনো মানুষ যদি মানসিক এবং শারীরিক উভয় দিক দিয়ে অসুখী হন তখন সুযোগ পেলে সে এ ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। স্ত্রী যদি স্বামীর কাছ থেকে সব সময় বঞ্চিত হন, স্বামী যদি স্ত্রীকে সময় না দেন তাহলে সে তখন বিনোদনের বিকল্প পথ খোঁজে। তাৎক্ষণিক আনন্দ খোঁজে। সেখানে কোনো রাখঢাক থাকে না। বয়স সেখানে কোনো বিষয় নয়। কারণ এটা নিষিদ্ধ জগত। নিষিদ্ধ জগতে পছন্দের সুযোগ কম।

এখানে হিসাব-নিকাশ করে সম্পর্ক তৈরি হয় না। দুই সন্তানের জননী ১৭ বছরের ছেলের সাথে কেন সম্পর্ক করে এখানে এসব প্রশ্ন অবান্তর কারণ চাহিদা পূরণই এখানে আসল। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায়ও অনেক পরিবর্তন এসেছে। মানুষের নিষিদ্ধ চাহিদা পূরণের উপায় এখানে সহজ এবং ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের কারণে হাতের নাগালে চলে এসেছে। শহরে বিনোদনের অনেক ব্যবস্থা থাকে। টিভি, সিনেমা, ইন্টারনেট, মোবাইল, ফেসবুকে এখন অনেক বেশি এক্সপোজার তৈরি হচ্ছে মানুষের সামনে। নানা ধরনের চাহিদা সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করছে এসব। একটি শিশুর নাগালেও যদি ইন্টারনেট থাকে তাহলে অটোমেটিক্যালি সেও নগ্নতার মুখোমুখি হয়। এটা চয়েজ করতে হয় না, কিকও করতে হয় না।

বিভিন্ন লিংকের মাধ্যমে আপনা আপনি এগুলো অনেক সময় সামনে চলে আসে। এক দিকে প্রযুক্তি, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম মানুষের মনে চাহিদা সৃষ্টি করছে আরেক দিকে শহরে রয়েছে বিনোদনের ব্যবস্থা। তাই নগরের যুবক-যুবতীরা সেক্সকে একটা বোনাস বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করে। কারণ এটা পাওয়া সহজ নগর জীবনে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়ছে যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অবাধ মেলামেশার সুযোগ। তরুণ প্রজন্ম এ বিনোদনের প্রতিই বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। কারণ নগরজীবনে এর সহজলভ্যতা বেশি।

সুতরাং পরকীয়া অবাধ মেলামেশা যেটাই হোক না কেন তা নিত্যনতুন মাত্রায় বিস্তৃত হচ্ছে। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে পরিবার সমাজ যে যেখানে দায়িত্বশীল রয়েছেন তাদের সবাইকে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। সবাইকে সবার খোঁজখবর সঠিকভাবে রাখতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান এস এম আবুল কালাম আযাদ বলেন, বর্তমানে তরুণ প্রজন্ম অনেকটা আলাদা হয়ে গেছে। তারা আলাদা এক ধরনের জগতে বিচরণ করে যার সাথে পরিবার, মা বাবার তেমন সম্পর্ক নেই। অনেক ক্ষেত্রেই শহরে মা-বাবা দু’জনই চাকরি করেন সংসারের ব্যয় মেটাতে। কারণ শহরের জীবন অনেক ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। সন্তানের পড়াশোনাও এখন অনেক ব্যয়বহুল। ফলে মা-বাবা উভয়কেই ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে সর্বক্ষণ। তারা সন্তানদের বেশি সময় দিতে পারেন না।

তার মতে, প্রযুক্তির অনেক ভালো দিক থাকলেও এগুলোর মন্দ দিক থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় অনেকে জানেন না। কারণ তাদের জীবন দক্ষতা বিষয়ে কোনো জ্ঞান দেয়া হয়নি। তাদের সামনে সব পথ উন্মুক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ তা বাছাই করার যোগ্যতা তারা অর্জন করেনি। সামনে মন্দ জিনিস এলে কিভাবে তা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে সে বিষয়ে তাদের মধ্যে সচেতনতাবোধ তৈরি হয়নি। মা-বাবাও এসব বিষয় নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই সচেতন নন। অনেক পরিবারই সমাজের স্রোতে গা ভাসিয়ে চলতে ভালোবাসে।

প্রফেসর আবুল কালাম আযাদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থা হয়ে গেছে রেজাল্ট-নির্ভর। বাণিজ্যনির্ভর। ফলাফলই এখন আসল। কি শিখল সেটা এখন আর আসল নয়। কাসে ও পড়াশোনায় অনেকের মনোযোগ নেই। কাসে আসতে হয় তাই আসে। পড়াশোনাতো হয় এখন কোচিং এবং প্রাইভেটে। তার মতে, চার দিকে যেভাবে অনৈতিকতা ছড়িয়ে পড়ছে তার বিপরীতে তরুণ প্রজন্ম নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার মতো কোনো আদর্শ পাচ্ছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রফেসর ড. আজিজুন্নাহার ইসলাম বলেন, সন্তানদের শিশুকালে যেমন মা বাবা কোলেপিঠে করে রাখে তেমনি করে কিশোর বয়সেও তাদের প্রতি সমান নজর রাখতে হয়। এ বয়সটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ তাদের জন্য। পশ্চিমা বিশ্বে কিশোর সন্তান নিয়ে মা-বাবা খুবই উদ্বিগ্ন থাকেন। তাদের তারা একা কোথাও রাখতে এবং ছাড়তে চায় না। কিন্তু আমাদের দেশে সন্তান একটু বড় হলেই আমরা তাদের ছেড়ে দেই। তাদের প্রতি আর ছোটবেলার মতো খেয়াল রাখা হয় না। তারা কী চায়, কী করে সে দিকে লক্ষ থাকে না। এ সুযোগে তারা অনেক কিছুর সাথে জড়িয়ে যায়। কিশোর ছেলেমেয়েরা যদি পরিবার থেকে যথেষ্ট আদর স্নেহ না পায়, আশ্রয় না পায় তখন তারা বিকল্প জায়গা খোঁজে এসব পাওয়ার জন্য।

প্রফেসর আজিজুন্নাহারের মতে, কিশোর ছেলেমেয়েদের দুর্দশার জন্য মা-বাবা অনেকটা দায়ী। তারা নিজেরা অনেক সময় সচেতন নয় সন্তানদের বিষয়ে। সন্তান মানুষ করা খুব কঠিন কাজ। অনেকে এ কঠিন কাজ যথাযথভাবে পালন করেন না। মা-বাবার উচিত সন্তানদের বেশি করে সময় দেয়া। সন্তান আর সংসারের খরচ জোগাতে গিয়ে সারা দিন পার করে দিলাম এবং তাদের প্রতি মনোযোগী হতে পারলাম না; এ সুযোগে সন্তান নষ্ট হয়ে গেলে কী লাভ হলো। তাই আমাদের উচিত ব্যস্ততা কিছুটা কমিয়ে পরিবারে সময় দেয়া। চাহিদা কিছুটা কমিয়ে জীবনযাপনের চেষ্টা করা।

You Might Also Like