বাংলালিংকের দামে…

গত ১০-১২ দিন ছিল সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ঘটনাবহুল সময়। এই ক’দিনে দেশের বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ, বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক নেতা এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’ অপরাধী ‘প্রমাণিত’ আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত অধ্যাপক গোলাম আযমের মৃত্যু দিয়ে শুরু। অধ্যাপক গোলাম আযম ৯৩ বছর বয়সে কারাবন্দী অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি … রাজিউন)।

এরপর একই ধরনের ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’ জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে দ্বিতীয় দফায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ‘আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’। এরপর এই ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীকে। এরপর আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের। ফলে আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের পর এখন আশু মৃত্যুর অপেক্ষায় আছেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান।

এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে একেবারে প্রথম থেকেই দেশে-বিদেশে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। এই ট্রাইব্যুনালকে সরকারের তরফ থেকে যত না আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বলা হচ্ছে, তার চেয়ে অধিক বলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর সবই এক বিশাল গোঁজামিল। এই ট্রাইব্যুনাল যখন গঠন করা হলো, তখনই পৃথিবীব্যাপী শোরগোল শুরু হয়ে গেল। ট্রাইব্যুনাল যদি যুদ্ধাপরাধের বিচারের ট্রাইব্যুনাল হয়ে থাকে তাহলে তা অবশ্যই হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে কোনো প্রহসন চলবে না। এরকম প্রহসন পৃথিবীর দেশে দেশে কোথাও বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়েছে। কিন্তু সরকার প্রথম থেকেই কোনো রকম আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি বা নিয়মকানুন মানতে চায়নি। শেষ পর্যন্ত এখন সরকারের দাবি এটি কোনো আন্তর্জাতিক আদালত নয়। এটি দেশীয় আদালত। আমাদের দেশে আমরা কার কিভাবে বিচার করব, সেটা দেখার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নয়। অতএব এ বিষয়ে কথা বলার কোনো অধিকার তাদের নেই।

মানবতাবিরোধী অপরাধে এ পর্যন্ত যাদের বিচারের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়েছে, তাদের সবাই জামায়াত-বিএনপির লোক। জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাই সংখ্যায় অধিক। যখন মানবতাবিরোধী অপরাধের নামে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগে আশ্রয় নেয়া ‘মানবতাবিরোধী অপরাধীদের’ বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হচ্ছে না। তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না, একটি রাজনৈতিক দলকে নিশ্চিহ্ন করতে সরকার কতটা মরিয়া।

মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় পরে আসছি। এর আগে আসামিপক্ষের আইনজীবী তাজুল ইসলামের প্রণিধানযোগ্য বক্তব্য উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেছেন, মৃত্যুদণ্ড এখন বাংলালিংক দামে পাওয়া যাচ্ছে। তাজুল ইসলাম একজন সাহসী ও নামকরা আইনজীবী। বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে একটি বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়। তাতে দেখা যায় যে, এক চা দোকানি চায়ে চিনি অনেক বেশি দিয়েছেন। তাতে একজন খদ্দের বিরক্ত হয়ে দোকানিকে বললেন, ‘চায়ের দামে শরবত পাইলাম। ভালো না? ভালো তো। চিনি কি বাংলালিংক দামে পাইছ?’ অর্থাৎ বাংলালিংক খুব সস্তা দামে বিকায় (প্রকৃত অবস্থা কী তা আমি জানি না)। আইনজীবী তাজুল ইসলামের ভাষ্যমতে, এমনই সস্তা হয়ে গেছে এখন মৃত্যুদণ্ড দেয়া।

আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারব্যবস্থা বহু আগেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ওই ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারক বিদেশের এক ব্যক্তির সাথে বিচারে কী রায় হবে, তা লিখে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছিলেন। ওই দু’জনের মধ্যকার স্কাইপ সংলাপ বিশ্বখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা দি ইকোনমিস্ট-এ প্রকাশিত হয়। এটি প্রকাশ করতে গিয়ে ইকোনমিস্ট ব্যাখ্যা হিসেবে বলেছিল, ‘আমরা সাধারণত কারো ব্যক্তিগত সংলাপাদি প্রকাশ করি না। কিন্তু যখন এই সংলাপের সাথে একজন মানুষের জীবন-মৃত্যুর সম্পর্ক তখন আমরা মানবিক কর্তব্য হিসেবে এটা প্রকাশ করলাম। রায় দেবেন বিচারক। কিন্তু তাকে কেন ভিনদেশী এক ব্যক্তির পরামর্শ নিয়ে সে রায় তৈরি করতে হবে? ওই বিচারকের স্কাইপ সংলাপ অস্বীকার করার কোনো অবকাশ ছিল না। তিনি ট্রাইব্যুনাল থেকে পদত্যাগ করেন এবং আশ্চর্য এই যে, এই ‘ঘটনায়’ পদত্যাগ করার পরও তিনি উচ্চ আদালতে বিচারপতি হিসেবে বহাল আছেন এবং বিচারকার্য পরিচালনা করে যাচ্ছেন। এতে যেকোনো নাগরিক একটি দীর্ঘশ্বাস উক্তি করতে পারেন, হায় বিচার বিভাগ!

এ আদালত যুদ্ধাপরাধের বিচার আদালত নয়। এ আদালত যদি সত্যি সত্যি মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার আদালত হয়ে থাকে, তাহলে সবাইকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে। সরকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন আদালত গঠন করে একে এখন দেশীয় বিচার বলে দাবি করেছে। তাই যদি হয়, তাহলে হাজার হাজার মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় এই সরকারের অনেককেই একদিন বিচারের কাঠগড়ায় অবশ্যই দাঁড়াতে হবে। পুরনো ঘটনা বাদ দিলাম, বরাইগ্রামের নূর হত্যা, নারায়ণগঞ্জের ত্বকী হত্যা, র‌্যাবের সাত খুন, ফুলগাজীর উপজেলা চেয়ারম্যান খুন, অসংখ্য কিশোরী, তরুণী, যুবতী নারীর আত্মহত্যা এবং তার সাথে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা Ñ এগুলোও মানবতাবিরোধী অপরাধ। একসময় আপনাদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

এখন নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান দোর্দণ্ড প্রতাপশালী লোক। প্রধানমন্ত্রী তার সব পাপের পক্ষে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ওসমান পরিবারের সাথে তিনি আছেন। থাকবেন। দারুণ! কিন্তু বেশি দিনের কথা নয়। প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দিত এক-এগারোর সামরিক শাসনের পরে এই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শামীম ওসমান কানাডায় গিয়ে অভিবাসন গ্রহণ করেছিলেন। সেখানে তিনি ট্রাক্টর দিয়ে হালচাষ করছিলেন। ট্রাক্টরে বসে থাকা তার ছবিসহ সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল ঢাকার মানবজমিন পত্রিকায়। তিনি এখন আবারো বড় বেশি প্রতাপশালী। সরকারের নেতানেত্রী বা শামীম ওসমান এদের কারো ধারণা নেই যে, ‘নদীর একূল ভাঙে ওকূল গড়ে এই তো নদীর খেলা।’ একূল ভেঙে যাবে, ওকূলে পৌঁছতে পারবেন কি না, সেটি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না।

এবার হরতাল প্রসঙ্গ। জামায়াত নেতাদের একটির পর একটি মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়েছে। তারা হরতাল ডেকেছে। যেহেতু বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সব সংবাদপত্র সরকারের অনুগত, তাই তারা সবাই মিলে এখন তো শোরগোল তুলছে যে, হরতাল বিষয়টা খুবই খারাপ। কোনো কোনো পত্রিকা অদ্ভুত সব কাভারেজ করছে। প্রথম পাতা-শেষ পাতাজুড়ে হরতালের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরছে। জামায়াত কেন হরতাল ডাকল, এ বড় অপরাধ!

হরতাল-টরতাল তো মানুষ পছন্দ করে না, বুঝলাম। তারপর সরকারের অনুগত সব মিডিয়া কেবলই বলে যেতে থাকল যে, এই হরতালে কী বিরাট ক্ষতি হয়েছে। তা-ও ভালো। কিন্তু তারা রিপোর্ট করল, হরতাল ছিল ঢিলেঢালা। পিকেটিং-টিকেটিং ছিল খুব কম। আন্তঃজেলা বাস চলেনি। ঢাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি বের হয়নি। বাস, সিএনজি, রিকশা চলেছে। তার অর্থ কী? জামায়াত বা হরতালপন্থীরা রাস্তায় বের হবে, নিরীহ পথচারীকে পিটিয়ে আহত করবে, বাস-ট্রাক জ্বালিয়ে দেবে, বোমা বিস্ফোরণ সাধারণ মানুষের মৃত্যুর কারণ হবে। এটা কেন জামায়াত করল না? অতএব হরতাল কর্মসূচি ব্যর্থ। কিন্তু এসব অর্বাচীন মিডিয়াও জানে না যে, এভাবে তারা সরকারকে রক্ষা করতে পারবে না। কাচের দেয়ালে ঘেরা তাসের সরকার একদিন ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়বে, বাংলালিংকের দামের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
( নয়া দিগন্ত )

You Might Also Like