কক্সবাজার উপকূলের ১১ হাজার একর প্যারাবন হুমকি মুখে

কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকার প্রায় ১১ হাজার একর প্যারাবন হুমকির মুখে পড়েছে। ২৩ বছর আগে থেকে উপকূলীয় সবুজ বেস্টনীর আওতায় পর্যায়ক্রমে এই প্যারাবন সৃজীত হলেও নেই কোন রক্ষণাবেক্ষন। প্যারাবন রক্ষায় উপকূলীয় বন বিভাগ গ্রহন করেনি কোন পদক্ষেপ। যার ফলে প্যারাবেন নিধন ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে উজাড় হওয়ার উপক্রম হয়েছে উপকূলের নিরাপত্তার ছায়া হিসাবে খ্যাত প্যারাবন। বন বিভাগের এ সি এফ জানিয়েছেন এ ব্যাপারে অভিলম্বে বিশেষজ্ঞ দল পরিদর্শনে আসবেন।মহেশখালী কুতুবজুমের আমির হামজা জানিয়েছেন, প্রতি বছর ভুমি দস্যুরা প্যারাবন নিধন করলেও প্যারাবনের এ অবস্থা কখনো হয়নি। বিভিন্ন এলাকায় প্যারাবনে যেভাবে মড়ক দেখা দিয়েছে তা আশঙ্কাজনক। প্যারাবনের গাছ প্রায় সময় নষ্ট হয়। তবে এবার ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। নষ্ট হয়ে যাওয়া গাছগুলো আনতে গিয়ে অনেকেই ভাল গাছও কেটে নিয়ে আসছে। যার ফলে উজাড় হয়ে যেতে পারে প্যারাবন। তবে উপকূলীয় বন বিভাগের এ সি এফ এনামুল হক ভূইঁয়া জানিয়েছেন মড়ক রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছেন।মহেশখালী পৌরসভার চরপাড়ার আমজাদ হোসেন জানিয়েছেন সম্প্রতি মহেশখালী পৌরসভার দক্ষিণ পাশে যে প্যারাবন হয়েছে এতে জলোচ্ছা থেকে নিরাপ্দ হয়েছিল কক্সবাজার পৌরসভা। সম্প্রতি যেভাবে মড়ক দেখা দিয়েছে এতে আমরা আতংকিত। প্রতিদিন বিপুল পরিমান লোকজন রোগে আক্রান্ত গাছগুলো কেটে এনে বিভিন্ন বেকারীতে বিক্রি করছে। দ্রুততর সময়ের মধ্যে বিশেষজ্ঞ নিয়ে পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরো ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।কক্সবাজার কৃষি অফিসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জলবায়ু পরির্বতনের কারণে প্যারাবনে মড়ক দেখা দিয়েছে। এ ছাড়াও ছত্রাক জনিত ও পাতা মোড়ানো পোকার কারণে এ ধরণের মড়ক দেখা দিতে পারে। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করলে তেমন সমস্যা হবে না। বিলম্ব হলে উজাড় হতে পারে প্যারাবন।শহরের নুনিয়াছড়ার মোঃ সেলিম জানিয়েছেন যেভাবে মড়ক দেখা দিয়েছে এতে আমরা শংখিত। ভরাট হওয়া এলাকায় গাছ না থাকলে দখলবাজরা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।উপকূলীয় বনবিভাগের এ সি এফ এনামুল হক ভূইঁয়া জানান, মড়কের বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। ইতোমধ্যে বন গবেষণা ইস্টিটিউটকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। খুব দ্রুততর সময়ে বিশেষজ্ঞ দল পরিদর্শনে আসবে।প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড হয়েছিল কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা। ২৩ বছর আগের সেই ক্ষতি এখনো পুষিয়ে উঠতে পারেননি ভুক্তভোগী মানুষ। পুননির্মাণ হয়নি বেড়িবাঁধ। সৃজিত হয়নি প্যারাবন। যা আছে তারও দৈন্য দশা চলছে এখন।উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষায় ৯১ সালের পরে কক্সবাজারের মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া ও কুতুবদিয়ার সমুদ্র উপকূলের বেড়িবাঁধ ও চরভরাট এলাকায় ব্যাপকভাবে প্যারাবন সৃজনের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এই ২৩ বছরের মধ্যে যেসব এলাকায় প্যারাবন সৃজন হয়েছে তার বেশির ভাগই আবার উজাড় হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত প্যারাবন নিধন চলছেই। বন বিভাগ প্যারাবন সৃজনের নামে এ সময়ের মধ্যে কোটি টাকা লোপাট করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।সংশ্লিষ্ট লোকজনের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, ৫ উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা প্যারাবন নিধন করে চিংড়ি ঘের, লবণ মাঠ ও শুঁটকিমহাল তৈরি করছেন। সূত্র জানায়, গত ২৩ বছরে চকরিয়ার রামপুর, বদরখালী, বহলতলী, চরণদ্বীপ, পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া, করিয়ারদিয়া, মগনামা এবং কুতুবদিয়া উপজেলার বড়ঘোপ, লেইমশাখালী, ধুরংসহ উপকূলীয় এলাকায় অন্তত পাঁচ হাজার একর প্যারাবন অবৈধ দখলে চলে গেছে। বন বিভাগ প্যারাবন দখলের অভিযোগে আদালতে মামলা টুকে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে।৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী চকরিয়া, মহেশখালী ও কক্সবাজার শহর রক্ষায় ব্যাপকভাবে প্যারাবন সৃজন করে জাপানের পরিবেশবাদী সংগঠন ওয়েস্কা ইন্টারন্যাশনাল। সংগঠনটি নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে উপকূল রক্ষায় প্রায় এক হাজার একর এলাকায় প্যারাবন সৃজন করলেও প্যারাবন রক্ষায় কোন পদক্ষেপ নেয়নি বন বিভাগ। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান উবিনীগও মহেশখালী ও চকরিয়ার বদরখালীতে কিছু প্যারাবন সৃজন করেছে। ২০০২ সালে বদরখালী কৃষি সমবায় ও উপনিবেশ সমিতি প্রায় ২০০ একর প্যারাবন নিধন করে চিংড়িঘের তৈরি করে। তখন জোট সরকারের প্রভাবশালী নেতাদের চাপের মুখে থানা পুলিশ মামলাও নেয়নি। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে একই সমিতি আরও ২০ একর প্যারাবন কেটে চিংড়িঘের করে। এই ঘটনায় মামলা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। বদরখালীর বাসিন্দা আকবর আহমদ (৫০) ও আনোয়ার হোসেন (৬০) জানান, ৯১ সালে যেখানে প্যারাবন ছিল, সেখানে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে যে প্যারাবনগুলো ধ্বংস হয়েছিল তা-ও সৃজন করা হয়নি।

You Might Also Like