সামনে তো এগোতেই হবে

বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে যাওয়াটা কখনো খুব আনন্দের ব্যাপার নয়। ব্রাসেলসে অথবা বোস্টনের বিমানবন্দরে আপনি ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, আপনার আগে অন্য দেশের নাগরিকেরা দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আপনার সময় এলে নির্ঘাত আটকে যাবেন। আপনার পাসপোর্ট উল্টেপাল্টে দেখবে ইমিগ্রেশন কর্তা, চোখ ছোট করে দেখবে, আপনার দিকে তাকাবে এমন কঠিন দৃষ্টিতে, যেন আপনি জেল পালানো কোনো আসামি। প্রশ্ন করবে গায়ে হুল ফোটানো। একসময় শুধু সন্দেহ করবে, এ লোককে ঢুকতে দিলে আর বেরোবে না। গত ১০ বছরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উগ্রপন্থার সন্দেহ। আপনাকে দেখবে ওই কর্তা আর ভাববে, এ লোকের প্যান্টের পকেটে নিশ্চয় বোমা আছে। খুঁজে দেখতে হবে।
এই চিত্র মোটামুটি মাকাও, মাল্টা অথবা মুসলিম উম্মাহর সব দেশেই। তবে এসব দেশে দেখানো হয় তুচ্ছতাচ্ছিল্য। দোহা আর কুয়ালালামপুরে নিজের চোখে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ইমিগ্রেশন লাইন থেকে আলাদা করে একটা জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখার দৃশ্য দেখেছি, যেন এরা ইবোলা ভাইরাস নিয়ে ঢুকে পড়ছে। তার পরও বিদেশে বাংলাদেশিদের কাফেলা থেমে থাকেনি। বৈধ-অবৈধ উপায়ে প্রতিদিন পাড়ি দিচ্ছে শয়ে শয়ে তরুণ। থাইল্যান্ডের জঙ্গলে ‘আধুনিক’ ক্রীতদাস প্রথার শিকার বাংলাদেশিদের খবর নিয়ে কিছুদিন আগে খবরের কাগজে হইচই হয়েছে; মালয়েশিয়ার পাম সাম্রাজ্যে আমাদের তরুণদের বন্দী হওয়ার খবরও পাওয়া যায়। আফ্রিকার নানা দেশ পাড়ি দিয়ে মরক্কো অথবা তিউনিসিয়ার কোনো বন্দর থেকে পাচার হয়ে ইতালি অথবা সাইপ্রাসে পাড়ি দিতে গিয়ে ধরা পড়া বা প্রাণহানির খবরও মাঝেমধ্যে আমরা পাই। এসব পড়ে চোখ ভিজে যায়, কিন্তু এসব তরুণের সামনে কোনো বিকল্প যে থাকে না! কষ্টটা গভীর হয়, যখন দেখি এদের বা এদের পরিবারগুলোর পাশে কেউ দাঁড়ায় না, না বিদেশে আমাদের দূতাবাস বা মানবাধিকার নিয়ে প্রতিদিন গর্জন তোলা বিশ্বের ছোট-বড় সংস্থাগুলো। বাংলাদেশের কোনো তৈরি পোশাক কারখানায় আগুন লেগে শ্রমিক মারা গেলে আমরা যখন এর প্রতিবাদে এবং নিহতদের পরিবারগুলোর সাহায্যের জন্য পথে নামি, তখন এসব সংস্থাও সরকারকে চাপ দেয়, কিন্তু তা কতখানি পুঁজি রাজনীতি আর কতখানি প্রকৃত মানবাধিকারপ্রেমে, তা বুঝতেও আমাদের বেশি দিন লাগে না।
সবচেয়ে ভালো হতো যদি বিদেশে কঠিন পরিবেশে অল্প দামে শ্রম বিক্রি করতে আমাদের তরুণদের যেতে না হতো। ভালো হতো যদি তারা সাদা কলারের চাকরি নিয়ে যেত—পেশাজীবী, পরামর্শক, তত্ত্বাবধায়ক অথবা অর্থলগ্নিকারী হিসেবে যেতে পারত। এ রকম যারা যায়, যাদের বেশির ভাগ পশ্চিম অথবা পশ্চিমসম চীন অথবা সে রকম দেশের। সাদারা মধ্যপ্রাচ্যে রাজার সম্মান পায়, তাদের জন্য কোনো পান থেকে একটুখানি চুনও খসে না, যে যা হোক, কিন্তু আমরা কুর্নিশ না হোক, একটুখানি অনিরসবদন অভ্যর্থনা পেলেই খুশি হই। সেই অবস্থায় আমরা পৌঁছাতাম যদি একটি দালানের নির্মাণশ্রমিক না হয়ে আমরা এর স্থপতি হতাম, যদি একটি বিমানবন্দরের পরিচ্ছন্নতাকর্মী না হয়ে আমরা এর পরিচালনার দায়িত্বে থাকতাম। সেটি যে একেবারে হচ্ছে না তা নয়, তবে কম পারিশ্রমিকের বেশি পরিশ্রমের কর্মীদের স্রোতের পাশে তা চোখে না পড়ার মতোই ফোঁটা ফোঁটা কিছু ব্যতিক্রম।
কেন বিদেশে কাজ নিয়ে যেতে হয় তরুণদের এবং আর তরুণ নন এমন বয়সীদের? কারণ, দেশে পর্যাপ্ত ও পছন্দের কর্মসংস্থান নেই। থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো পেতে হলে পয়সা ঢালতে হয়, ছোট-বড় নানান কর্তার তালু তৈলাক্ত করতে হয়। প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি বিশ্বের নানা জায়গায় কাজ করছে। তাদের একটা অংশ পশ্চিমে অভিবাসী স্থায়ী বাসিন্দা। কিন্তু বেশির ভাগ বিভিন্ন মেয়াদে নানা দেশে শ্রম দিচ্ছে। তাদের জীবনটা কষ্টের। আমরা তা স্বীকার করি, সমবেদনা জানাই কিন্তু তাদের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করি না। আমরা তাদের পরিসংখ্যানের মর্যাদা দিয়েছি, তারা যে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা দেশে পাঠাচ্ছে, তা আনন্দের সঙ্গে উল্লেখ করি, কিন্তু তাদের প্রকৃত সামাজিক মর্যাদা দিইনি। তারা দেশের বাইরে যাওয়ার সময় বা দেশে ফেরার সময় মর্যাদার আচরণ পায় না, হেনস্তার শিকার হয় অনেক সময়।
আমরা ধরে নিতে পারি, বিদেশে চাকরির খোঁজে তরুণেরা চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। তাহলে কি অবস্থা এ রকমই চলবে? বর্তমানের গল্পগুলো ভবিষ্যতেও শুনতে হবে? তাদের পরিসংখ্যানগত মর্যাদা হয়তো আরও বাড়বে। কিন্তু প্রকৃত মর্যাদা কি তারা পাবে বা তাদের শার্টের কলার নীল থেকে সাদা হতে পারবে?
পারে এবং এই পারাটা যে খুব সুদূরবর্তী, তা-ও নয়। কাজটা কঠিন, পথটা বন্ধুর, কিন্তু অসম্ভব নয়। দুটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ইংল্যান্ডে যেসব অভিবাসী এক প্রজন্ম আগেও রেস্টুরেন্টে, বাসের বা রান্নাঘরে পেঁয়াজ-আনাজ কাটত, তাদের সন্তানেরা এখন অনেকেই ডাক্তার-ব্যারিস্টার। কীভাবে? তাদের শিক্ষার পেছনে বিনিয়োগ করেছে পরিবারগুলো। ইংল্যান্ডে এটি অবশ্য কঠিন নয়, কিন্তু অন্যত্র?
দ্বিতীয় উদাহরণটি মধ্যপ্রাচ্যের দোহা থেকে। একটি ছেলে হোটেলে সামান্য বেতনে চাকরি করত। অথচ বিএ পাস। একসময় সে সিদ্ধান্ত নিল ইংরেজিটা শিখতে হবে। অদম্য ছেলে, কাজে নেমে পড়ল। ইংরেজি শিখতেই বেতনের একটা অংশ চলে গেল। সঙ্গে আরবিটাও শিখল বিনা পয়সায়, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে, এখন সে আরেকটা হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে চাকরি করে। ছেলেটি ভাগ্যবান, তাকে সাহায্য করেছেন আল-জাজিরা টেলিভিশনের এক সাংবাদিক। এই সাহায্যটা অর্থাৎ কর্মভিসাসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন সরকারি উদ্যোগেও করা যায়, যদি সরকার আন্তরিক হয়। দুটি উদাহরণ আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় পাওয়া।
এ দুই ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামক শিক্ষা ও উদ্যম। আরেকটি হলো সহায়তা। প্রথম উদাহরণে পরিবার, দ্বিতীয়তে সাংবাদিক। যদি শিক্ষা ও সহায়তার দায়িত্বটা কেউ নেয়, উদ্যমের সমাবেশ ঘটানো কোনো ব্যাপারই নয়। আমাদের তরুণেরা পরিশ্রমী, উদ্যমী, অদম্য। সেই উদ্যম-পরিশ্রমের আগে যদি সমাজ-সরকার-রাষ্ট্র নিজ নিজ অবস্থান থেকে সহায়তা দেয়, তাহলে দুয়ে দুয়ে চার না হয়ে পাঁচ হতে সময় লাগবে না।
অঙ্কের এই হিসাবটা মোটেও গোলমেলে নয়। প্রথম আলোর ৩ নভেম্বর সংখ্যায় একটি প্রতিবেদন বেরিয়েছে ১৯৭১ থেকে নিয়ে সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিষয়ে। এই অগ্রগতি অঙ্কের হিসাবকে লজ্জা দিয়েছে। আমি যখন বাংলাদেশের দিকে তাকাই, আমার চোখে হতাশার চিহ্নগুলো প্রবল হয় না, আমার চোখে ধরা পড়ে অঙ্কের তামাশা করা নানান অর্জন। কত প্রতিকূলতাকে জয় করে তরুণেরা দাঁড়াচ্ছে নিজেদের পায়ে, মেয়েরা যাচ্ছে স্কুলে, নামছে কাজের জটিল সব ক্ষেত্রে। কত না বিভাজন আমাদের সমাজে, ওদিকে আমাদের রাজনীতি হিংসা-বিদ্বেষ শেখায়। উগ্রবাদী দলের ঝান্ডার নিচে বোমার কারিগর বানানো হয় পথভ্রষ্ট তরুণদের। উচ্চফলনশীল দুর্নীতির চাষি ও ঠিকাদারেরা দাপিয়ে বেড়ান সর্বত্র। তার পরও এই দেশটা একটা উৎসবের উপলক্ষ পেলে এক হয়ে যায়—পয়লা বৈশাখে বা বাংলাদেশ ফুটবল বা ক্রিকেট দল বড় কোনো জয় পেলে।
এই ঐক্যটা অনেক গভীর। রোগ সাময়িক, স্বাস্থ্যটা স্থায়ী অথবা সে রকম হওয়ারই কথা। স্বাস্থ্যটা তাহলে কীভাবে ধরে রাখা যায়?
উত্তরটা সহজ—শিক্ষা দিয়ে। সনদমুখী, বাজারমুখী শিক্ষা নয়; প্রকৃত, সংস্কৃতিনির্ভর ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা। এ জন্য শিক্ষায় চাই প্রচুর বিনিয়োগ। স্বল্প মেয়াদে, যারা বিদেশে কাজ নিয়ে যেতে চায়, তাদের ভাষা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেওয়া হোক। ব্যাপকভাবে, আন্তরিকতার সঙ্গে। দীর্ঘ মেয়াদে, যদি বিশাল বিনিয়োগের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা যায়, তাহলে সেই শিক্ষা নিয়ে যারা বিদেশে যাবে, তাদের কুর্নিশ না জানালেও অভিনন্দন জানাবে বিদেশের অভিবাসন কর্তারা।


প্রথম আলোর ৩ নভেম্বরের প্রতিবেদনটা নতুন খবর নয়, তবে দেশকে নিয়ে যাঁরা হতাশ হতে ভালোবাসেন, তাঁদের চমকে দেওয়ার মতো। এসব পরিসংখ্যানের পেছনে আছে ওই উদ্যম, পরিশ্রম, সামাজিক বিনিয়োগ, নানান কর্মী-পরিবর্তনপ্রত্যাশী মানুষের বিনিয়োগ। সরকার আছে সেখানে। কিন্তু তারা যদি আরও সক্রিয় হতো, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াবাদী না হতো, অর্জনটা আরও বড় হতো। কিন্তু এই অর্জনের গল্প তো শেষ হয়নি, শুরু হলো মাত্র। এখনো যদি সবাই পরিবর্তনের জন্য প্রত্যয়ী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, অর্জন হবে আকাশছোঁয়া।
এই অর্জন দাবি করতেই পারে আমাদের স্বপ্ন দেখা তরুণেরা।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

You Might Also Like