‘মুসলমানদের চলমান সমস্যা এবং উত্তরনের উপায়’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

গত ১ নভেম্বর জ্যাকসন হাইট্স’এর পালকি সেন্টারে আমেরিকায় মদিনার আলো এবং লাইট অব দ্য আর্থ ইউএসএ’র ৬ষ্ঠ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে ‘মুসলমানদের চলমান সমস্যা এবং উত্তরনের উপায়’ শীর্ষক মনোজ্ঞ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। মূল আলোচনার আলোচ্যসূচী ছিল: পিতামাতা ও মুরুব্বীদের প্রতি অশ্রদ্ধাবোধের নেতিবাচক প্রভাব, টিভি চ্যানেলের মূল্যবোধবিরোধী অনুষ্ঠানমালার কুফল ও পারিবারিক ভাঙ্গন, অর্থ আয়ে ওভারটাইম কাজ পারিবারিক অশান্তি এবং নেশাগ্রস্থতা হতে সন্তানদের রক্ষায় পরিবারের দায়িত্ব।
আমেরিকায় মদিনার আলো এবং লাইট অব দ্য আর্থ ইউএসএ’র প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক আলহাজ্জ্ব আব্দুল ওয়াহিদ টুপনের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ বাংলাদেশ মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি ডঃ এ কে আবদুল মোমেন প্রধান অতিথি ও নিউইয়র্কস্থ শ্রমজীবী মানুষের সর্ববৃহৎ সংগঠন লোকাল ১৪০৭ ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট এবং ডিস্টিক ৩৭’এর কোষাধ্যক্ষ মাপ মিছবাহ উদ্দিন বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন।
মাপ মিছবাহ উদ্দিন বলেন, চাঁদা দিয়ে হলেও এ ধরনের অনুষ্ঠান শুনা উচিত। আজকের অনুষ্ঠানের একটিই বার্তা: এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজক আলহাজ্জ্ব টুপন সাহেবের মতো আরেকজন টুপন সাহেব খুঁজে বের করুন। অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে এভাবে তার অনুভূতি ব্যক্ত করেন।
মোহাম্মদ ইকবাল কবীরের পরিচালনায় এ অনুষ্ঠানে কারী মাওলানা রহমত উল্লাহ পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন। বাংলাদেশ ও আমেরিকার জাতীয় সংগীত বাজানোর পর এক মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে সুরা ফাতেহা পাঠের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতাযুদ্ধসহ সব আন্দোলনের শহীদদের রূহের মাগফেরাত কামনা করা হয়।
আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে মধ্যে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব গিয়াস আহমেদ, নজমুল আহসান চৌধুরী, কারী মাওলানা রহমত উল্লাহ ও মাওলানা অলিউল্লা আতিকুর রহমান। অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আহমদ হোসেন, শেখ সিরাজুল ইসলাম, এডভোকেট মজিবুর রহমান, ফজলুল হক, মনিকা রায়, হাজী আবদুর রহমান, মাওলানা রহমত উল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, আবদুর রহমান, প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অনুষ্ঠান ঘোষক মোহাম্মদ ইকবাল কবির মদিনার আলো কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ধর্মীয় আলোচনা সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, র‌্যালি, ইসলামী জলসা, ইসলামী মহাসম্মেলন, ইফতার মাহফিল, দরিদ্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ-কবলিত মানুষের মধ্যে খাদ্যদ্রব্য ও শীত-বস্ত্র বিতরণ; কৃষি প্রদর্শনীর আয়োজন; ফরমালিনের অপব্যহার ও সড়ক দুর্ঘটনারোধে বেপরোয়া গাড়ি চালানোবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন জনহিতকর কার্যাবলীর সংক্ষিপ্ত বিবরণী তুলে ধরেন।
স্বাগত ভাষণের প্রারম্ভে মহান আল্লাহর প্রতি সালাম ও দুরুদ পেশ করে আলহাজ্জ্ব আব্দুল ওয়াহিদ টুপন আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও গুণাবলীর প্রশংসা করেন। মহানবী (সাঃ)’এর হাদিস উদ্বৃত করে তিনি বলেন, সৃষ্টিকর্তার কীর্তিগুলি সম্পর্কে এক প্রহর ধ্যান করা ৭০ বছর উপাসনা করার চেয়েও শ্রেয়। সুতরাং আল্লাহর ধ্যানে আমাদের সবারই মগ্ন থাকা উচিত।
আলহাজ্জ্ব টুপন অনুষ্ঠানে মূল আলোচনার আলোকে চারটি আলোচ্যসূচীর পুনরাবৃত্তি করে আল্লাহর সৃষ্টি, রহমত, নিয়ামত এবং তার প্রতি মানুষের শুকরিয়া প্রসঙ্গে বলেন, ১৮ হাজার মাখলুকাতের মধ্যে মানুষের অবস্থান সবকিছুর উর্দ্ধে। আল্লাহ অন্য সবকিছু মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য উদ্ভিদের মাধ্যমে পৃথিবীর বিষাক্ত গ্যাস চুষে নিয়ে মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যস অক্সিজেন গাছ থেকে নির্গত করাচ্ছেন। গাছপালা বিষাক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস চুষে না নিলে মানুষের পক্ষে পৃথিবীতে টিকে থাকা সম্ভব হতো না।
তিনি বলেন, পৃথিবীতে নানা অবস্থানের ও পেশার লোক রয়েছে। এর পেছনে আল্লাহর বিশেষ হেকমত রয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন। যিনি যতোবেশী জ্ঞানী-গুণী-ধনী তাদের দায়িত্ব বেশি করে আল্লাহ মনিটরিং করবেন। এই ফলাফলের ভিত্তিতেই মানুষের পরকাল নির্ধারিত হয়।
তিনি বলেন, মানুষের মৃত্যুর পর তার স্থায়ী জীবনের সূচনা হয় এবং নেক্কার মানুষের পরবর্তী জীবন বর্তমান জীবনের চেয়ে অধিক উত্তম হবে। পৃথিবীর পরীক্ষামূলক কাজের আলোকে মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য নির্ধারিত হবে। দুনিয়াতে অণু-পরমাণু পরিমাণ ভালো ও মন্দ কাজের জন্য যথাক্রমে পুরস্কার কিংবা শাস্তি দেয়া হবে।
আলহাজ্জ্ব টুপন অনুষ্ঠানের মূল বিষয়ের আলোকে চারটি আলোচ্যসূচীর উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, কোন জাতিকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে তুলতে হলে কিংবা কোন জাতিকে দুনিয়াতে মডেল হিসেবে তুলে ধরতে হলে ঐ জাতির শিশুদেরকে আদর্শবানরূপে গড়ে তুলতে হবে। কিশোর-কিশোরীসহ পরিবারের সবার দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। এরজন্য প্রয়োজন উত্তম শিক্ষার। শিক্ষার গুরুত্ব আছে বলেই মহানবী (সাঃ) জ্ঞানার্জনের জন্য সুদূর চীনে যেতে তাগিদ দিয়েছেন। তিনি মানুষকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া কিংবা ফ্রান্সে যেতে বলেন নি। কে শ্রেষ্ঠ তা পরখ করার জন্যই তিনি ২টি বা ৩টির পরিবর্তে এতগুলো রাষ্ট্র তৈরির পরিবেশ তৈরি করেছেন, যাতে তাদের কার্যক্রমের মধ্যে তুলনা করা যায়।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র সঠিক ও সৎভাবে পরিচালনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবকাঠামো, মানবতাবাদী সামাজিক ব্যবস্থা, ধর্মের সঠিক মূল্যায়ন, মানুষের জন্য গুণগত শিক্ষা ও আচার-ব্যবহার সুনিশ্চিত করা জরুরী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো কোন দেশের মন্ত্রীরা এত দ্রুত ধনী হন না, কারণ আমাদের মন্ত্রীরা মনে করেন সুযোগ চলে গেলে আর নাও আসতে পারে। কিন্তু সৎভাবে দেশ পরিচালনা করলে সুযোগ বারবার আসতে পারে। এটাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
মদিনার আলো সম্পাদক মুসলমানদের চলমান সমস্যা হতে উত্তরণ’ উপায় শীর্ষক চারটি আলোচ্য বিষয় পুনরাবৃত্তি করে এগুলোর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং সমাধান খুঁজে বের করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধান অতিথির ভাষণে ডঃ এ.কে. আবদুল মোমেন বলেন, ভাল করতে হলে উত্তম শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। ভাওতাবাজি ছাড়তে হবে। ভাওতাবাজি করলে ছেলেমেয়েরাও বাবাকে সম্মান করবে না। এ কারণেই বাপ-মা’র সাথে সন্তানদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণে মুসলমানদের মধ্যে তালাক অনেক বেশি হয়ে থাকে। মুসলমানদের মধ্যে অনেক সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, মুসলমানদের সমস্যা সমাধানে মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্ত্রীর সাথে স্বামীর এবং সন্তানদের সাথে পিতার উগ্র ব্যবহার না করার জন্য তিনি পরামর্শ দেন।
কর্মজীবী বাংলাদেশীদেরকে নিজ দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে এ কে মোমেন বলেন, কোন কাজেই ‘নো’ বলবেন না। যে কাজ দেয়া হবে, তা নিষ্ঠার সাথে করবেন। কাজে ফাঁকি দিবেন না। সময় মতো সবকিছু করবেন। আমাদেরকে ভাওতাবাজি বন্ধ করতে হবে।
কোন কোন মুসলমানের উদ্দেশ্যমূলক হজ্জ্ব পালনের তীব্র নিন্দা করে ডঃ মোমেন বলেন, এরা কেবল আলহাজ্জ্ব হিসেবে পরিচিত হবার জন্য মক্কায় গমন করে।
মুসলমানদের চলমান সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের দুর্দিনের জন্য মুসলমানরাই দায়ী। আমাদেরকে নেতিবাচকগুলো মানসিকতা পরিত্যাগ করতে হবে।
তিনি বলেন নানাবিধ সমস্যা সত্বেও আমাদের সন্তানরা আমেরিকাতে বেশ ভালো করছে। কারণ তারা পরিশ্রমী।
আমেরিকার মূলধারা রাজনীতিতে বাংলাদেশী সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশীসহ কমসংখ্যক দক্ষিণ এশীয়রা আমেরিকার নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন। তিনি তাদেরকে ৪ নভেম্বর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের অনুকূলে ভোট প্রদানের জন্য আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথি মাপ মেজবাহ উদ্দিন তার ভাষণে বলেন, মদিনার আলো আয়োজিত আলোচনা সভার ৪টি বিষয়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী। চাঁদা দিয়ে হলেও এ ধরনের অনুষ্ঠান শুনতে চাই। আজকের অনুষ্ঠানের একটিই বার্তা: এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজক আলহাজ্জ্ব টুপন সাহেবের মতো আরেকজন টুপন সাহেব খুঁজে বের করুন। তিনি মেহমানদেরকে টুপন সাহেবের মতো বিকল্প ব্যক্তিত্ব খুঁজে বের করার পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, আমাদের সন্তানদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হলে আমাদের সন্তানদেরকে হালাল রুজির হালাল খাবার খাওয়াতে হবে। কোরআন-হাদিসের আলোকে পিতামাতার প্রতি সন্তানদেরকে দায়িত্ব পালনের শিক্ষা দিতে হবে।
বাংলাদেশের নানাবিধ সমস্যার উল্লেখ করে তিনি এসব সমস্যা দূরীকরণে প্রবাসীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। আফ্রিকার দেশগুলোতে যে প্রক্রিয়া আর্থিক অনুদান কোন কোন আমেরিকান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়, একই প্রক্রিয়ার আওতায় বাংলাদেশকেও আনার উদ্যোগ হিসেবে তিনি বাংলাদেশীদেরকে মূলধারার রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হবার আহ্বান জানান।
মাপ মেসবাহ উদ্দিনের মতে বাংলাদেশে আর্থিক সমৃদ্ধিতে সরকারের কোন কৃতিত্ব নেই। এটা হলো গার্মেন্টস কর্মীদের শ্রম এবং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ফলশ্রুতি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আর্থিক চেহারা রাতারাতি পরিবর্তনে কক্সসবাজার, সুন্দরবন প্রভৃতি দর্শনীয় স্থানকে আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্রের পর্যায়ে নেয়া হলে বাংলাদেশ প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্জিত হবে।
মাপ মিছবাহ উদ্দিন বলেন, দেশ আমাদের মায়ের মতো। মায়ের অংশ। তাই দেশকে উন্নত করতে আমাদের সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। বছরে এক হাজার ডলার যদি আমরা দেশের জন্য প্রেরণ করি, তবে দেশের সব সমস্যা অতি দ্রুত দূরীভূত হবে।
অধ্যাপক আহমদ হোসেন বলেন, স্বদেশে-বিদেশে নির্বাচন করার জন্য প্রার্থীরা যে অর্থ ব্যয় করেন তা দেশের জন্য কেউই ব্যয় করেন না। সরকার বিরোধী দলকে দমন করার জন্য যে অর্থ ব্যয় করে তা জনগণের কল্যাণে ব্যয় করলে দেশের অনেক উন্নতি হবে।
বাংলাদেশের কোন টিভি চ্যানেল ভারতে না দেখানো সত্বেও বাংলাদেশে অবাধে ভারতীয় চ্যানেল দেখানোর ব্যবস্থাকে সরকারের নতজানু নীতির পরিণত বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ হওয়া সত্বেও যদি মন্ত্রী মঞ্চে বসে ধূমপান করেন তাহলে দেশ কীভাবে চলছে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
বিশিষ্ট সাংবাদিক শেখ সিরাজুল ইসলাম মদিনার আলো কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন কাজের প্রশংসা করে বলেন, এ সাময়িকী অমুসলিম আমেরিকানরাও পাঠ করেন। তিনি বলেন, মদিনার আলো সম্পাদকের কৃষি উন্নয়নে ভূমিকা, ভারতীয় টিভি অনুষ্ঠানের আমাদের সমাজ-সংস্কৃতিবিরোধী নেতিবাচক বিষয়গুলোর ব্যাপারে তার নিরীক্ষা ও সচেতনতা, পারিবারিক শান্তি ও সুস্থি বিঘœ ঘটার নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ, কোন কোন শিক্ষার্থীর নেশাগ্রস্থতা কিংবা বিপথগামী হওয়ার ব্যাপারে তার উদ্বিগ্ন হবার কারণগুলো আলোচিত হওয়া উচিত।
শেখ সিরাজ বলেন, আলহাজ্জ্ব টুপনের পিএইচডি ডিগ্রী নেই, কিন্তু সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যে তিনি যেভাবে চিন্তা করেন, তা বহু প্রবাসী শিক্ষাবিদদের মধ্যেও নেই। আমাদের উচিত তার সাথে সহযোগিতা করা এবং তার আন্দোলনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
এডভোকেট মজিবুর রহমান বলেন, আমাদের সন্তানদের সমস্যা হতে বের করে আনা সহজ নয়। এদেশের স্বাধীন সমাজব্যবস্থার কারণে আমাদের সাথে আমাদের সন্তানদের মন-মানসিকতার ভিন্নতা রয়েছে। আমি যা শিখেছি এবং তারা যা শিখছে উভয়ের মধ্যে বৈপরিত্য রয়েছে। এ কারণেই আমাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। তথাপি এখানকার ইতিবাচক দিকগুলো অনুশীলনে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ফজলুল হক বলেন, মদিনার আলো সম্পাদক একক উদ্যোগে সময়োপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ প্রসঙ্গে আলোচনার ব্যবস্থা করে আমাদের কমিউনিটিকে বিশেষভাবে উপকৃত করেছেন। আমাদের সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় অবক্ষয়ের মূলে যে কারণগুলো রয়েছে তিনি সেগুলোও আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। আমাদের সবাইকে এসব অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
বাংলাদেশ সোসাইটির সাম্প্রতিকতম নির্বাচনে সর্বাধিক ভোট পেয়ে নির্বাচিত সাংস্কৃতিক সম্পাদক মনিকা রায় বলেন, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অন্যান্যদের চেয়ে অনেক উন্নত, আমাদেরকে সংস্কৃতির সে ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে।
গোলাম মোস্তফা অনুষ্ঠানের বিষয়াবলীর প্রশংসা করে বলেন, এ ধরনের অনুষ্ঠান খুব কমই হয়ে থাকে। তিনি বলেন, এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য যেকোন ধরনের সহযোগিতা করতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। এখানে কোন রাজনীতি নেই। এ ধরনের অনুষ্ঠান করার জন্য আমি মদিনার আলো সম্পাদকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। প্রতি মাসেই এ ধরনের অনুষ্ঠান হওয়া উচিত। আমরা ১০০ ডলার খরচ করে বিভিন্ন শিল্পীর গান শুনি, অথচ এখানে আসলে কোন পয়সা দিতে হয় না, বরং খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। তিনি সবাইকে এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
মাওলানা রহমতউল্লাহ পবিত্র কোরআনকে সমগ্র মানুষের জন্য আল্লাহর রহমত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, কুরআন হক ও বাতিলের মধ্যে সুষ্পষ্ট ব্যবধান নির্দেশ করেছে। অথচ আমরা কোরআন পড়ি না, কোরআন জানি না। তিনি বলেন, মানুষকে সম্মানিত কিংবা অপমানিত করার মালিক আল্লাহ।
পিতামাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআন উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, তোমাদের জীবদ্দশায় যদি পিতামাতা উভয়ে কিংবা তাদের একজনের সাথে তোমাদের দেখা হয় তবে তাদের সাথে এমন আচরণ করো না, যাতে তারা ‘উহ্’ শব্দ করেন। তাদের কোন কাজ বা কথার জন্য ধমক দিয়ে কিছু বলা যাবে না।
মদিনার আলোর উপদেষ্টা হাজী আব্দুর রহমান মদিনার আলোর বিভিন্ন জনহিতকর কার্যক্রম সংক্ষেপে বর্ণনা করে বলেন, এর পেছনে কোন স্বার্থ ও রাজনীতি কাজ করে না।
মূলধারার রাজনীতিক গিয়াস আহমদ বলেন, মদিনার আলো ইসলামের মৌলিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করে। নবী-রাসুল, আউলিয়া-পীর-দরবেশদের সম্মান জানায়। অথচ ওহাবীরা এর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। এরা প্রচার করে বেড়ায় যে, রাসুল (স) পীর-দরবেশদের মাজার জিয়ারত করা নাকি বিদাত ও শিরক। ওহাবীরা আশুরা, ঈদে মিলাদ্দুন্নবী, অলি-আউলিয়াদের বিরুদ্ধে কথা বলেন । এদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
মানবাধিকার কর্মী আব্দুর রহমান বলেন, আমাদের যুবসমাজ মাদকে আসক্ত হয়ে তাদের মেধা ও জীবন ধ্বংস করছে। মাদকের অর্থ সংগ্রহের জন্য সন্তানরা পিতামাতাকে হত্যা করছে। কেবল তারা নিজেরই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে না, পুরো সমাজেই তারা নানা ধরনের অনৈতিক কাজ ছড়য়ে দিচ্ছে। ফলে এইড্স ইবোলার মতো ভবিষ্যতে হয়তো আরো মারাত্মক ব্যাধি আল্লাহর গজব হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এগুলো মানুষের অপকর্মের ফসল। আমাদের সন্তানদেরকে সব ধরনের অপকর্ম হতে দূরে রাখতে হবে এবং এ আন্দোলন পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে।
সমাপনী ভাষণে আলহাজ্জ্ব আব্দুল ওয়াহিদ টুপন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথিসহ সব বক্তা, সাংবাদিক, কমিউনিটির নেতৃবৃন্দসহ উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে আলোচ্য বিষয়গুলোর আলোকে মুসলমানদের সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরেন।
সামাজিক অনাচার ও অপকর্মরোধে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে মদিনার আলো সম্পাদক সবাইকে মাসে কমপক্ষে এক শুক্রবার মাত্র দুই ঘন্টা মিথ্যাকথা না বলার জন্য ওয়াদা করতে আহ্বান জানালে দর্শকরা হাত তুলে তার বক্তব্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।
তিনি বলেন, একটি মিথ্যা লুকানোর জন্য দশটি মিথ্যা কথা বলতে হয়। মিথ্যাকথা বলা বন্ধ করা গেলে সব ধরনের অপকর্ম ধীরে ধীরে সমাজ হতে দূরীভূত হয়ে যাবে।
অধিক সম্পদের লোভে ওভারটাইম না করে তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে পরিবার পরিজনের দিকে নজর দেয়ার পরামর্শ দেন। তার মতে ওভারটাইম কাজ করলে পরিবারের প্রতি সঠিকভাবে মনোযোগ দেয়া যায় না এবং এতে পারিবারে অশান্তি নেমে আসে।
যেসব টিভি চ্যানেল অপসংস্কৃতি ও আপত্তিকর অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে তিনি সেগুলো হতে সন্তানদেরকে দূরে রাখার আহ্বান জানান। এগুলোর প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হতে এবং এ ধরনের চ্যানেল না দেখার জন্য সন্তানদেরকে বুঝানোর পরামর্শ দেন । কিন্তু সন্তানরা এ ক্ষেত্রে পিতামাতার অবাধ্য হলে পরিবারের কারোরই টিভি দেখা উচিত হবে না, আলহাজ্জ্ব টুপন মন্তব্য করেন।
তিনি কোন কোন সম্প্রদায়ের প্রার্থনাগৃহের প্রধানদের অনৈতিক কাজের তীব্র নিন্দা করে তাদেরকে প্রার্থনাগৃহ হতে বের করার জন্য সংশ্লিষ্ট কমিউনিটির প্রতি আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে আমেরিকায় মদিনার আলোর উপদেষ্টাম-লীর সদস্য মাওলানা অলি উল্লা মোঃ আতিকুর রহমানের পরিচালনায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের মানুষের সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি কামনা করা হয়।
সংবাদ বিজ্ঝপ্তী

You Might Also Like