প্রভুর কাছে হাজিরা

প্রথম মানুষ হজরত আদম আ: ইবলিসের বিভ্রান্তিতে পড়ে বেহেশত থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর প্রভুর কাছে মার্জনা লাভ এবং মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম আ: স্ত্রী-পুত্রকে মক্কার অনুর্বর উপত্যকায় নির্বাসন দেয়া ও প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে প্রভুর নির্দেশে কোরবানির পবিত্র স্মৃতিধন্য হজের জন্য আগত আল্লাহর মেহমানরা সৌদি আরব থেকে বিদায় গ্রহণ করছেন। নভেম্বরের ৮ তারিখে হাজীদের সর্বশেষ ফাইটটি জেদ্দা ত্যাগ করার কথা রয়েছে। ইউরোপ থেকে আসা হাজীরা বিদায় নিয়েছেন অনেক আগেই। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার হাজীরা বেশ কিছুটা বেশি সময় অবস্থান করেন পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনায়। দুই হারাম শরিফে তাদের পদচারণাই এখন বেশি দেখা যায়।

সর্বাধিক ইন্দোনেশিয়ার, পঞ্চম বাংলাদেশ
২০১২ সাল ছিল ইতিহাসে সর্বাধিক হজযাত্রীর হজ পালনের বছর। সেই বছর ৩১ লাখ ৬০ হাজার মুসলিম হজ পালন করেন, যার মধ্যে ১৪ লাখ ছিল সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ আর বাকিটা বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত। হজ পালনের অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগের কারণে পরের বছর বিদেশী হজযাত্রী ২০ শতাংশ এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ হজযাত্রী ৫০ ভাগ কমিয়ে আনা হয়। ২০১৪ সালে হজযাত্রীর সংখ্যা থেকে যায় আগের বছরের প্রায় একই পর্যায়ে। এবার ২১ লাখ হাজীর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা হলো ১২ লাখ ৯৭ হাজার আর মহিলা হাজীর সংখ্যা ছিল আট লাখ ৮৩ হাজার। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে সর্বাধিক দুই লাখ ৯৩ হাজার মুসলিম (২১ শতাংশ) হজ করতে সৌদি আরব যান। এরপর পাকিস্তান থেকে এক লাখ ৮৯ হাজার, ভারত থেকে এক লাখ ৫১ হাজার ৫০০, মিসর থেকে এক লাখ ২৬ হাজার ৬০০ এবং বাংলাদেশ থেকে এক লাখ দুই হাজার ৯০০ মুসলিম হজ করেন। সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ হাজীদের মধ্যে মিসর ও পাকিস্তানিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

পৃথিবীর পবিত্রতম নগরী
হজের মূল কেন্দ্র হলো মক্কা। পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্রতম নগরী হিসেবে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন মক্কাকে। পবিত্র কুরআনের সূরা নাহলের ৯১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘(বলুন) আমি আদিষ্ট হয়েছি এই নগরীর প্রভুর ইবাদত করতে, যিনি একে করেছেন সম্মানিত, সব কিছুর মালিক তিনিই। আমি আরো আদিষ্ট হয়েছি যেন আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হই।’ সূরা বাকারার ১২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আর যখন আমি এই ঘরকে (কাবা) মানবজাতির মিলনকেন্দ্র এবং নিরাপত্তাস্থল বানিয়েছিলাম এবং (বলেছিলাম) ইব্রাহিমের দাঁড়ানোর স্থানকে (মাকামে ইব্রাহিম) নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো এবং ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে নির্দেশ দিয়েছিলাম যে তোমরা দু’জনে আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতেকাফকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।’ আমাদের প্রিয়নবীও মক্কার তাৎপর্য নিয়ে বলেছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা। হজরত আবদুল্লাহ বিন আদি বিন আল হামরা আজ জুহরি থেকে বর্ণিত এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘রাসূল সা: সাওয়ারির ওপর আরোহণ অবস্থায় মক্কাকে লক্ষ্য করে বলেছেন, নিশ্চয়ই তুমি আল্লাহর দুনিয়ায় সর্বোত্তম নগরী এবং আল্লাহর কাছে পৃথিবীর অধিক প্রিয় ভূমি, যদি আমি তোমার কাছ থেকে বহিষ্কৃত না হতাম তাহলে আমি বের হতাম না।’ ইবনে আব্বাস রা: বর্ণিত এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘রাসূল সা: বলেছেন, তোমার (মক্কা) চেয়ে অধিক পবিত্র এবং আমার কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো নগর নেই। যদি আমার স্বজাতি আমাকে বের করে না দিত তাহলে তোমাকে ছাড়া অন্য কোথাও আমি বসবাস করতাম না।’

পাপ মার্জনার আরাফাহ
শুধু বায়তুল্লাহ শরিফই নয়, হজের প্রতিটি পবিত্র স্থানই হলো প্রথম মানব হজরত আদম আ: থেকে শুরু করে হজরত ইব্রাহিম, ইসমাইল ও শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর নানা স্মৃতি ও ঘটনাধন্য পুণ্য এলাকা। হজের মূল স্থান হলো আরাফাহ, যেখানে অবস্থান করা হজের চার ফরজের একটি। অন্য তিন ফরজ হলোÑ ইহরাম, তাওয়াফ ও সায়ি করা। বেলা হেলে পড়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর কাছে দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ স্থান হলো আরাফাহ। এটি ছিল বেহেশত থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর হজরত আদম আ: ও হাওয়ার পুনর্মিলনস্থল এবং আল্লাহর কাছে তাদের ক্ষমা প্রার্থনা কবুলের স্থান। আরাফার জাবালে রহমত হিসেবে পরিচিত ইলাল পাহাড়ে দাঁড়িয়েই বিদায় হজের সেই বিখ্যাত ভাষণ দিয়েছিলেন মহানবী সা:। মক্কার নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের হাতে আসার আগে কুরাইশরা আরাফায় অবস্থান করার পরিবর্তে মুজদালিফায় অবস্থান নিত। বাইরের আরবরা অবস্থান করত আরাফায়। কুরাইশদের যুক্তি ছিল আরাফাহ হারাম এলাকার বাইরে বলে এর চেয়ে বেশি মর্যাদা হারামের ভেতরের মুজদালিফার। আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে লাত, মানাতের আরাধনার মতো আরাফাকে উপেক্ষা করার কাফের কুরাইশদের চেষ্টা সফল হয়নি। আর আল্লাহর নির্দেশে আরাফার উন্মুক্ত প্রান্তরেই হাজীরা দুই হাত তুলে প্রভুর কাছে বিচ্যুতির জন্য মার্জনা ভিক্ষা করেন। ২০ লক্ষাধিক হাজী এবারো পরম করুণাময়ের কাছে গুনাহ মাপের জন্য তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এখানে। আরাফায় দোয়া কবুলের ব্যাপারে কোনো ধরনের সংশয় না করতে বলেছেন আল্লাহ তায়ালা। বলা হয়েছে, এখানে বান্দাহ প্রভুর কাছে যে দোয়া করে সেটি কবুল হয়; কিন্তু কেউ এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করলে সেই গুনাটি যুক্ত হয় তার হিসাবে।
আরাফাতের এই সুবিশাল প্রান্তরে এসে প্রতি বছরই বিভিন্ন দেশের হাজীরা বাংলাদেশের কথাও স্মরণ করেন। এই বিশাল মরুপ্রান্তরে লাখ লাখ নিমগাছ লাগিয়ে ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন বাংলাদেশেরই একজন খ্যাতিমান সাবেক রাষ্ট্রপতি। এই বৃক্ষ সারি তার মূল নাম হারিয়ে হয়ে গেছে কারো কাছে জিয়া ট্রি, আবার কারো কাছে বাংলাদেশ ট্রি।

মুজদালিফার উন্মুক্ত প্রান্তর
মিনার দিকে আরাফাতের সীমান্ত ছাড়ালেই মুজদালিফা। আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৯৮ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘তোমরা স্বীয় প্রতিপালকের অনুগ্রহ লাভের চেষ্টা করলে তাতে তোমাদের পক্ষে কোনো অপরাধ নেই। অতঃপর তোমরা যখন আরাফাত থেকে প্রত্যাবর্তিত হও তখন পবিত্র (মাশায়ারে হারাম বা মুজদালিফা) স্মৃতি স্থানের কাছে আল্লাহকে স্মরণ করো। এবং তিনি তোমাদেরকে যেরূপ নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে তাকে স্মরণ করো। নিশ্চয়ই তোমরা এর আগে বিভ্রান্তদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলে।’ এই মুজদালিফায় রাতের কিছু সময় অবস্থান করা ওয়াজিব। কারো কারো মতে, সুবহে সাদেকের পর কিছু সময় থাকতে হবে এখানে। সূর্যাস্তের পর আরাফাহ প্রান্তর ছেড়ে লাখ লাখ হাজী যখন একসাথে মুজদালিফার দিকে ছুটতে থাকেন তখন সৃষ্টি হয় অনন্য দৃশ্য। হাজার হাজার যানবাহনের একমুখী যাত্রায় আর লাখ লাখ মানুষের পদমিছিলে যানজটও হয় ব্যাপক। এসব কষ্ট প্রভুর করুণা বা সন্তুষ্টির কাছে কিছুই মনে করে না তার দরবারে হাজিরা দিতে আসা মেহমানরা। এ দিন রাতে মুজদালিফার পাহাড় প্রান্তর রাস্তার দুই পাশ সাদা ইহরাম পরা মানুষের অবস্থানে এক অনন্য শুভ্ররূপ ধারণ করে। যুগে যুগে দ্বীনের দাওয়াত দিতে যে কষ্ট নবী-রাসূলরা করেছেন, তার অনুভব আসে সবার মধ্যে। আরাফাতের ময়দানে যেখানে জোহর ও আসরের নামাজ একসাথে আদায় করতে হয়, সেখানে মুজদালিফায় আদায় করতে হয় মাগরিব ও এশা একসাথে। এখান থেকে হাজীরা জামারায় শয়তানকে লক্ষ্য করে মারার জন্য সংগ্রহ করেন পাথরকণা।

জামারায় পাথর, মিনায় কোরবানি
মুজদালিফায় রাত কাটানোর পর ফজর আদায় করে শুভ্র কাপড় পরা হাজীদের মিছিল রওনা করে মিনার উদ্দেশে। হাজীরা এখান থেকে জামারায় পাথর নিক্ষেপ করে আগে থেকে অবস্থান নেয়া মিনার তাঁবুতে যান। আবার অনেকে তাঁবুতে ফিরে সেখান থেকেই যান শয়তানকে পাথর মারতে। এ দিন কেবল পাথর মারতে হয় বড় শয়তানকে। পরের দু’দিন পাথর মারতে হয় সব জামারায়। হজরত ইসমাইল আ:-এর স্মৃতিকে স্মরণ করেই এটিকে হজের অংশ (ওয়াজিব) করে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। এক সময় মুজদালিফা থেকে হেঁটে এসে জামারায় শয়তানের উদ্দেশ্যে পাথর মারার কাজে অতিরিক্ত ভিড়ে অনেক হাজীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটত। এখন জামারার পাথর মারার বহুতল ব্যবস্থা ও চমৎকার শৃঙ্খলা স্বস্তি নিয়ে এসেছে হাজীদের জন্য।
বড় শয়তানকে পাথর মারার পরই হজরত ইব্রাহিম আ:-এর স্মৃতিময় কোরবানি। আল্লাহর নির্দেশে প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি দেয়ার জন্য তিনি নিয়ে এসেছিলেন এই মিনার প্রান্তরে। প্রভুর হুকুমে ইসমাইলের পরিবর্তে কোরবানি হয় পশু। মিনার পাহাড়ের সেই স্মৃতি স্থানটি এখনো প্রত্যক্ষ করেন হাজীরা। হজে মিনার প্রধান তিন কাজ হলোÑ রাত যাপন, পাথর নিক্ষেপ ও হাদি বা পশু কোরবানি। প্রথম দিনের পাথর নিক্ষেপ আর কোরবানির পর মাথা মুণ্ডন করে ইহরাম খুলে ফেলেন হাজীরা। এর পর অনেকে মক্কায় চলে যান পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফের উদ্দেশ্যে। অনেকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিন জামারায় পাথর মেরেও কাবা তাওয়াফের জন্য যান। মিনা সেই স্মৃতিময় স্থান, যেখানে মহান প্রভু তার পবিত্র ঘর কাবাকে ধ্বংস করতে আসা আবরাহাকে ছোট্ট আবাবিল পাখির কঙ্কর দিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। মিনার সেই অভিশপ্ত স্থানটি হাজীরা দ্রুত অতিক্রম করেন। সেখানে হাজীদের থাকার জন্য কোনো তাঁবুও নির্মাণ করা হয়নি।

কাবায় তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ায় সায়ি
কাবায় তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ায় সায়ি হজের অন্যতম অপরিহার্য কাজ, যা না করলে হজ পালন হবে না। কাবা হলো আল্লাহর সেই পবিত্র ঘর ও মুসলিমদের কেবলা, যেটাকে মহান প্রভু তাঁর নবী ইব্রাহিম আ:কে নির্মাণ ও উঁচু করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এক হাদিস অনুসারে এটি হলো পৃথিবীতে নির্মিত আল্লাহর প্রথম ঘর। এর ৪০ বছর পর দ্বিতীয় ঘর বায়তুল মোকাদ্দাস নির্মিত হয়েছে, যেখান থেকে আল্লাহ তার প্রিয় হাবিব মুহাম্মদ সা:কে মেরাজে (ঊর্ধ্ব গগনে) নিয়ে গিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কাবাকে বিরাট বৈশিষ্ট্যময় করেছেন, এ ঘরের দিকে মুখ করে নামাজ না পড়লে সেটি আদায় হয় না। আর বর্গাকৃতির বিস্ময়কর আল্লাহর নিদর্শনের চার পাশে ঘড়ির কাঁটার উল্টো গতিতে সাতবার না ঘুরলে (তাওয়াফ) হজ আদায় হবে না। পৃথিবীতে আল্লাহ কেবল এই একটি ঘরকে তাওয়াফের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর নির্দেশে ইব্রাহিম আ: পৃথিবীর মানুষের প্রতি পবিত্র কাবাঘরে হজ করার আহ্বান করেছিলেন। মহান প্রভু সেই আহ্বানকে সবার কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। সেই থেকেই জারি রয়েছে হজ ও তাওয়াফ এই কাবাঘরকে ঘিরে। কাবার অলৌকিক নিদর্শনের একটি হলো হাজরে আসওয়াদ। বেহেশতের এই শুভ্র পাথরটি আদমসন্তানদের পাপ শুষে নিতে নিতে এখন নিকষ কালো বর্ণ নিয়েছে। কাবার যে কোনায় এই পাথর বসানো হয়েছে, সেখান থেকেই ‘আল্লাহু আকবর’ বলে তাওয়াফ শুরু করতে হয়। সাতবার প্রদক্ষিণের পর শেষও করতে হয় সেখানে। হজের ভিড়ে সাধারণভাবে এই পাথরে চুমু দেয়া অথবা এর আগের কোনায় রুকনে ইয়ামেনি স্পর্শ করা হাজীদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। সে ক্ষেত্রে হাজরে আসওয়াদের প্রতি ইশারা করে দিতে হয় চুমু। কাবার আরেকটি নিদর্শন হলো আল হিজর (হাতিম)। কাবাঘরের উত্তর পাশের বৃত্তাকার এই এলাকা কাবার অংশ হিসেবে চিহ্নিত। এটিকে কাবার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া না হলেও আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হাজীদের তাওয়াফ করতে হয় কাবার সাথে এটাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। এখানে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের চেষ্টা থাকে সবার। মাকামে ইব্রাহিম হলো কাবাঘরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এটি হলো সেই পাথর, যার ওপর হজরত ইব্রাহিম আ: দাঁড়িয়েছিলেন, যখন কাবার নির্মাণকাজ ওপরে উঠলে পাথর নেয়া কষ্টকর হচ্ছিল। এ সময় হজরত ইসমাইল আ: পিতাকে পাথর এগিয়ে দিচ্ছিলেন। এই পাথরের ওপর দাঁড়িয়েই হজরত ইব্রাহিম আ: আজান ও হজের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ৯৭ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘তার মধ্যে প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহ বিদ্যমান রয়েছে, মাকামে ইব্রাহিম উক্ত নিদর্শনসমূহের অন্যতম। আর যে এর মধ্যে প্রবেশ করে সেই নিরাপত্তা লাভ করবে।’ তাওয়াফের পর মাকামে ইব্রাহিমের সামনে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন হাজীরা।
তাওয়াফের পর সায়ির আগে হাজীরা পান করেন সেই বরকতময় কূপের পানি, যেটি বিশ্বব্যাপী জমজম হিসেবে প্রসিদ্ধ। হজরত ইব্রাহিম আ: তার বার্ধক্যবেলার প্রিয় সন্তান শিশু ইসমাইলকে মা হাজেরার সাথে আল্লাহর নির্দেশে যখন মক্কার এক অনুর্বর উপত্যকায় রেখে যান, তখন মা হাজেরা পানির জন্য সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ছোটাছুটি করছিলেন। এই স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে সাফা-মারওয়ার সায়িকে হজের অংশ করে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। মা হাজেরা পানির সন্ধানে সাফা থেকে মারওয়ায় সাতবার আসা-যাওয়ার পর দেখতে পান শিশুপুত্র ইসমাইলের পা দাপাদাপির স্থান থেকে এক অলৌকিক প্রস্রবণ প্রবাহিত হচ্ছে। সেই অলৌকিক পানির প্রস্রবণই হলো জমজম। প্রতি বছর হজ ও ওমরায় আসা কোটি মানুষ এই কূপের পানি পান করছেন, নিয়ে যাচ্ছেন প্রিয়জনদের জন্যও। তবুও এই কূপে পানির ধারা অবিরাম প্রবহমান রয়েছে। আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন, জমিনের উপরিভাগের সর্বশ্রেষ্ঠ পানি হলো এই জমজমের পানি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায়ও প্রমাণিত হয়েছে, এটিই হলো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পানি। খাদ্যের মতোই পানকারীকে পরিতৃপ্ত করে এই পানি। সহি মুসলিমের এক হাদিসে বলা হয়েছে, আবদুল্লাহ বিন সামেত আবু জর রা: ৩০ দিন-রাত এই পানি পান করে বায়তুল্লায় কাটিয়েছেন। তিনি রাসূল সা:কে জানিয়েছেন, এ সময় ক্ষুধার লেশমাত্র তিনি অনুভব করেননি, বরং তার পেটের চামড়া মোটা হয়ে ভাঁজ পড়ে গেছে।
হজকে আল্লাহ এক অপরিহার্য ইবাদত করে দিয়েছেন শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের জন্য। এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীতে আল্লাহর পাঠানো নবী-রাসূলদের একত্ববাদ প্রচারের অনেক স্মৃতি। এটি মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্ববোধের এমন এক মহড়া, যেখানে শিয়া-সুন্নি অথবা বিভিন্ন মাজহাব নির্বিশেষে সবাই একসাথে এক কাতারে অভিন্ন ইমামের পেছনে আদায় করেন নামাজ। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একসাথে পালন করেন তাওয়াফ-সায়ি। এক অলৌকিক মমত্ব সবাইকে অভিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ করে। সবার মধ্যেই থাকে এক আকুতি, সেটি হলোÑ আল্লাহর ইচ্ছার কাছে তার নৈকট্য লাভের জন্য নিজেকে সমর্পণ করা।

প্রসঙ্গ বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছরই লক্ষাধিক হজযাত্রী হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা-মদিনা যান। একসময় এর বেশির ভাগ যেতেন সরকারি ব্যবস্থাপনায়। এখন একেবারে স্বল্পসংখ্যক যান সরকারিভাবে। এবার ১০ হাজার হজযাত্রী সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যাওয়ার কথা থাকলেও গেছেন সব মিলিয়ে হাজার দেড়েক। বাকিরা বেসরকারি হজ এজেন্টদের ব্যবস্থাপনায় হজ পালন করেছেন। হজব্রত পালনের বিভিন্ন সুবিধার সাথে যুক্ত থাকে আর্র্থিক সংশ্লেষ। স্বাভাবিক অবস্থায় সৌদি আরব আসা-যাওয়ার জন্য যেখানে বিমান ভাড়া ৫২ হাজার টাকার মতো, সেখানে হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া দিতে হয় এক লাখ ২০ হাজার টাকার মতো। বলা হয়, লোকসানি বাংলাদেশ বিমানকে রক্ষার জন্য এভাবে হজযাত্রীদের ওপর দ্বিগুণের বেশি বিমান ভাড়া চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। সৌদিয়া ও বাংলাদেশ বিমানের জন্য হাজী পরিবহন নির্দিষ্ট করে দেয়ায় অন্য এয়ারলাইন্সে অনেক কম ভাড়ায় হাজীদের যাতায়াত সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ ক্ষেত্রে হজের সময় একমুখী পরিবহনের যে যুক্তি দেখানো হয়, সেটি গ্রহণযোগ্য মনে করেন না কেউই। বিমানের অনেক ফাইটই অর্ধেক খালি বা সামান্য যাত্রী নিয়ে আসা-যাওয়া করে; কিন্তু তাদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া দাবি করা হয় না। অস্বাভাবিক ভাড়া নেয়া হয় কেবল হাজীদের কাছ থেকে। এর সাথে সরকারের উচ্চ মহলের নানা স্বার্থবাদীদের স্বার্থসংশ্লিষ্টতার কথা বিভিন্ন সময় প্রকাশ হয়ে পড়ে। বিমান ভাড়াকে যৌক্তিক করা হলে অনেক কম খরচে হজ পালন করা সম্ভব হতো। এখানকার সাশ্রয়ী অর্থ মক্কায় বাড়ি ভাড়ায় ব্যয় করা হলে হারাম শরিফের কাছাকাছি হোটেলে থেকে সহজে ও নিয়মিত নামাজ আদায় করতে পারত বয়স্ক এবং মহিলারাও। এখন অনেক এজেন্সি এত দূরে হজযাত্রীদের রাখে যে, সেখান থেকে বয়স্ক বা মহিলাদের হারাম শরিফে নিয়মিত আসা সম্ভব হয় না। কিছু কিছু এজেন্সির ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা অথবা বেশি লাভ করার মানসিকতার কারণেও ভোগান্তির শিকার হতে হয় হাজীদের। মক্কা থেকে মিনা, মিনা থেকে আরাফাহ এবং আরাফাহ থেকে মুজদালিফা আর মক্কা থেকে মদিনায় আসা-যাওয়ার পরিবহনের দায়িত্ব মূলত সৌদি মুয়াল্লেমদের। প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশী হাজীদের এসব ক্ষেত্রে পরিবহন সঙ্কটে পড়তে হয়। বিশেষত আরাফাহ থেকে মুজদালিফায় আসার সময় এক গাড়িতে চাপাচাপি করে শতাধিক হাজীকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। আবার অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত গাড়ির অভাবে আরাফাতে আটকা পড়তে হয়। এবার হাজার হাজার বাংলাদেশী হাজী আরাফাতের ময়দানে মুয়াল্লেমের গাড়ি না আসায় আটকে থাকতে হয়। অনেকেই হেঁটে চলে যান মুজদালিফায়; কিন্তু মহিলা ও বয়স্কদের পক্ষে সেটি সম্ভব হয়নি। অন্য সব দেশের হাজীরা গাড়ি পেলেও বাংলাদেশীদের কেন এই দুরবস্থা, তার কোনো জবাব এজেন্সির ব্যবস্থাপক বা হজ মিশনের কর্মকর্তাদের কাছে ছিল না। তারা কেবলই সৌদি মুয়াল্লেমদের দোষারোপ করেছেন। শেষ পর্যন্ত সৌদি পুলিশ ও হজ মন্ত্রণালয়ের লোকজন এখান-সেখান থেকে গাড়ির ব্যবস্থা করে রাত শেষ হওয়ার আগেই আরাফাত থেকে মুজদালিফায় হাজীদের পাঠিয়েছেন; কিন্তু এতে হাজার হাজার হজযাত্রী কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। তাদের অনেকে হজের আনুষ্ঠানিকতা ঠিকমতো পালন করতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে হজ এজেন্সিগুলোর করণীয় কিছু থাকলে সেটি যেমন বাংলাদেশের হজ মিশন কর্তৃপক্ষ বা ধর্ম মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করতে পারত, তেমনিভাবে সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ের সাথেও আলোচনা করে এর একটি স্থায়ী প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে পারত। এসব না করায় বাংলাদেশের হজযাত্রীদের যতটা অসহায় অবস্থায় বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, ততটা মুসলিম সংখ্যালঘু অনেক দেশের হাজীদেরও দেখা যায় না। এর বাইরে বাড়তি বিড়ম্বনা হিসেবে দেখা দিয়েছে সরকারের সিনিয়র মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর হজ নিয়ে ঔদ্ধ্যত্যপূর্ণ মন্তব্য। এটি সৌদি পত্রপত্রিকায় বেশ ফলাওভাবে প্রচার হয়েছে। এতে সরকার ও দেশের ভাবমর্যাদার হয়েছে অপরিমেয় ক্ষতি।

You Might Also Like