জেলহত্যা দিবস আজ

আজ ৩ নভেম্বর। ঐতিহাসিক জেলহত্যা দিবস। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাত্র ৭৮ দিন পরেই নির্মমভাবে খুন করা হয় চার জাতীয় নেতাকে।

 

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর এই কালো অধ্যায়ের সৃষ্টি করেন কয়েকজন বিপথগামী সেনাসদস্য। ওই দিনের শুরুতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

 

দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বেদনাবিধুর দিন। এর আগে ওই বছরের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এর পর তার ঘনিষ্ঠ এ চার সহকর্মীকে গ্রেফতার করে পাঠানো হয় কারাগারে। পরবর্তী অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত অধ্যায়ে ৩ নভেম্বর সংঘটিত হয় জেল হত্যাকাণ্ড। সেই থেকে প্রতিবছর দিনটি জেলহত্যা দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে।
দিবসটি পালনে বেসরকরি পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কয়েকটি সংগঠন এবং চার নেতার পরিবার আলাদাভাবে এই শোকাবহ দিবসটি নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করবে।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে ঘাতকচক্র স্বাধীনতার নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করেছিল। আর সেই চক্রান্ত কারীদের পাঠানো ঘাতকরাই আইনকে তোয়াক্কা না করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঢুকে ফজরের আজানের সময় নির্মমভাবে হত্যা করে জাতির চার সূর্যসন্তানকে। কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় এমন জঘন্য, নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকা- পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

 

জেল হত্যাকাণ্ডের পরের দিনেই লালবাগ থানায় একটি মামলা করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ ২১ বছর এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তও বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর জেলহত্যা মামলার প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত হয়। এরপর দীর্ঘ আট বছরেরও বেশি সময় বিচারকাজ চলার পর বিগত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত ওই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২০ আসামির মধ্যে ১৫ জন প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তার শাস্তি এবং অপর পাঁচজনকে খালাস দেওয়া হয়। সাজপ্রাপ্তদের মধ্যে পলাতক তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।

 

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হচ্ছেন রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ওরফে হিরন খান, দফাদার মারফত আলী শাহ এবং এলডি দফাদার মো. আবুল হাসেম মৃধা। যাবজ্জীবন কারাদ-প্রাপ্তরা হচ্ছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সৈয়দ শাহরিয়ার রশীদ, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশীদ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) শরিফুল হক ডালিম, লেফটেন্যানস্ট কর্নেল (অব.) এম এইচ এম বি নূর চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) আহাম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ, ক্যাপ্টেন (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) মো. কিসমত হোসেন এবং ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসার। খালাসপ্রাপ্তরা হচ্ছেন বিএনপি নেতা কে এম ওবায়দুর রহমান (মরহুম), শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, প্রাক্তন মন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুর (মরহুম), নুরুল ইসলাম মঞ্জুর এবং মেজর (অব.) খায়রুজ্জামান।

 

২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট হাইকোর্টের রায়ে কেবল রিসালদার মোসলেমউদ্দিনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত দফাদার মারফত আলী শাহ ও এলডি দফাদার মো. আবুল হাসেম মৃধা এবং যাজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অপর চার আসামি লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) শাহরিয়ার রশীদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকে মামলা থেকে খালাস দেওয়া হয়। নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ওই চার আসামির চারটি আপিল ও রাষ্ট্রপক্ষের ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি করে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আতাউর রহমান খান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ রায় দেন।

 

তবে জেল হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ সময় পর এর বিচারের রায় হলেও জাতীয় চার নেতার পরিবারের সদস্যরাসহ বিভিন্ন মহল সে সময় রায়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রহসন বলে আখ্যায়িত করে। একই সঙ্গে রায়টি প্রত্যাখ্যানও করে তারা। তাদের অভিযোগ, জেলহত্যার ষড়যন্ত্রের দায়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়নি। জাতির ইতিহাসের নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডের পুনঃ তদন্ত ও পুনর্বিচার দাবি করেন তারা।

 

দিবসটি পালন উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন এবং অন্যান্য সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ উপলক্ষে বিশেষ বাণী দেবেন।

 

সকালে বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের সর্বত্র শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, কালো ব্যাজ ধারণ ও কালো পতাকা উত্তোলন এবং বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হবে। সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্ট শহীদ ও জাতীয় নেতাদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত করা হবে। রাজশাহীতে এ এইচ এম কামরুজ্জামানের কবরেও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হবে।

You Might Also Like