৪ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন

আর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই যুক্তরাষ্ট্রের মিডটার্ম বা মধ্যবর্তী নির্বাচন। আগামী ৪ নভেম্বর সিনেটের ৩৬টি আসনে এবং হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভের ৪৩৫টি আসনে একযোগে ভোট হবে।

‘‘পপুলার ভোট ‘’ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত এই ভোটে প্রেসিডেন্ট ওবামা সরাসরি ‘রেসে’ না থাকলেও বিগত বছরগুলোতে দেশ-বিদেশে তার প্রশাসনের নানা কর্মকান্ডের প্রতি ভোটারদের সমর্থন-অসমর্থনের প্রতিফলন ঘটবে এই নির্বাচনে।

তবে, এই ভোটের ফলাফল ওবামার জন্য হতাশার বার্তা বয়ে আনবে বলেই রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করছেন।

সিনেট নির্বাচন :
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রতি দুই বছর পর হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ বা কংগ্রেসম্যান নির্বাচন হলেও সিনেটর নির্বাচন একটি চলমান প্রক্রিয়া। ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হবার পর যেসব আসনে মেয়াদ উত্তীর্ণ হয় সেখানেই অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন। তবে সেটাও হয় জোড় সংখ্যার বছরে। সেই হিসেবে আগামী ৪ নভেম্বর মঙ্গলবার শূন্যস্থান পূরণের জন্য ৩টি আসনসহ মোট ৩৬ টি আসনে সিনেট নির্বাচন হবে। পরবর্তী নির্বাচন হবে ২০১৬ সালে। সিনেটে মোট ১০০ আসনের মধ্যে ডেমোক্রেটদের ৫৩টি এবং রিপাবলিকানদের ৪৫টি আসন রয়েছে। দু’টি আসন রয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের। তবে তারা দু’জনেই ডেমোক্রেটদের ‘ককাসে’ ( ঈঅটঈটঝ ) আছেন। সে কারণেই তারাও ডেমোক্রেটদের সাথে আছেন বলে মনে করা হয়।

১০০ আসনের মধ্যে এ বছরে যে ৩৬টি আসনে সিনেটর নির্বাচন করা হবে সেখানে ডেমোক্রেটদের দখলে ২১টি এবং রিপাবলিকানদের দখলে রয়েছে ১৫টি আসন। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর জরিপের ফলাফল অনুয়ায়ী ৯টি আসনের ফলাফলের ওপরেই হার-জিৎ নির্ভর করছে। জরিপ বলছে, ডেমোক্রেটদের হেরে যাবার আশংকাই বেশি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত যদি ডেমোক্রেটরা সিনেটে সব মিলিয়ে ৫০টি আসনও ধরে রাখতে পারে অর্থাৎ ফলাফল যদি সমান সমান হয় তাহলেও ডেমোক্রেটরা সিনেটে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে। তবে সেক্ষেত্রে ভাইস-প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে শেষ পর্যন্ত নিয়ামক হিসেবে হাজির হতে হবে।

হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ
এদিকে একই দিনে হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভের সবগুলো আসনেই নির্বাচন হবে। বর্তমানে হাউজে রিপাবলিকানদের ২৩৩ এবং ডেমোক্রেটদের ১৯৯ জন হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ বা কংগ্রেসম্যান রয়েছেন। ৪৩৫টি আসনের মধ্যে ৩টি আসন শূন্য রয়েছে। মূলত হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে প্রেসিডেন্ট ওবামা অনেক কাজই করতে পারেননি, যেসব কাজের প্রতিশ্র“তি তিনি নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে দিয়েছিলেন। শুধুমাত্র কর প্রদান বিষয়ক একটি বিল ছাড়া আর কোন কিছুতেই হাউজের সমর্থন ওবামা পাননি।

জরিপ এবং বিশেষজ্ঞ মতামত
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যবীমা, কয়েকটি দেশে ইসলামী মৌলবাদীদের উত্থান, বিদেশনীতিসহ ওবামা প্রশাসনের অনেক নীতি নিয়েই সাধারণ মানুষের চিন্তার প্রতিফলন ঘটবে এই নির্বাচনে। সিনেটে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখার ব্যাপারে ডেমোক্রেটরা এখনও হয়তো স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু সেটার চুড়ান্ত ফল দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত। তবে, হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভে জেতার আশা অকল্পনীয়, উপরন্ত আরও কিছু আসন হারানোর আশংকাও করা হচ্ছে বিভিন্ন জরিপের ফলাফলে।

৪ নভেম্বরের ফলাফল নিয়ে সিএনএন, ফক্স, হাফিংটন পোষ্ট, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোষ্টসহ আরও অনেক জরিপ প্রতিষ্ঠান তাদের ভবিষ্যত বাণী তুলে ধরছে। এসব জরিপে বলা হচ্ছে, হাউজে কোনোভাবেই আর ডেমোক্রেটরা তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না এটা একেবারেই নিশ্চিত। তবে, সিনেটেও দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। অধিকাংশ জরিপই হচ্ছে সিনেটের দখল নিয়ে। ফঙ নিউজের জরিপে মঙ্গলবার পর্যন্ত ডেমোক্রেট ৪৭ এবং রিপাবলিকানরা ৫১ টি আসন পাবে বলে জানিয়েছে।

হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ, সিনেট ছাড়াও নিউইয়র্কসহ অনেকগুলো স্টেটে একইসাথে পাঁচ বছরের জন্য গভর্ণর নির্বাচন করা হবে।

নির্বাচনে ওবামা নেই, ওবামা আছে
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী এই নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো প্রতিদিনই একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ওবামাই আলোচনা বা সংবাদের প্রধান নায়ক অথবা ভিলেন। এই নির্বাচনে ওবামার রাজনৈতিক কোনও বিপর্যয় না হলেও সবকিছু আবর্তিত হচ্ছে তাকে কেন্দ্র করেই। সমালোচকরা আগামী ৪ নভেম্বরের সম্ভাব্য বিপর্যয়ের জন্য তাকেই দায়ী করছেন। যদিও তার বিগত দিনগুলোর শাসনামলে সব সিদ্ধান্তই নিয়েছেন তার উপদেষ্টা পরিষদ বা পরামর্শকদের সাথে আলোচনা করে।

এক সময়ের হোয়াইট হাউজ করেসপন্ডেন্ট, পলিটিক্যাল এডিটর, বর্তমানে ওয়াশিংটন পোষ্টের চিফ অব করেপন্ডেন্ট ড্যান বেলজ তার এক প্রতিবেদনে বলেছেন, এটা এমন এক নির্বাচন হচ্ছে যেখানে ওবামা প্রার্থী না, নির্বাচনী রেসে তিনি নেই, কিন্তু নির্বাচনের সবকিছুই আবর্তিত হচ্ছে তাকে নিয়েই। এ নির্বাচনের ফলাফলে প্রমাণ হবে ভোটাররা এখন ওবামাকে কোন চোখে দেখছে বা কিভাবে মূল্যায়ন করছে।
প্রথম মেয়াদে ওবামা যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, সেই সময় তার জনপ্রিয়তার তুলনায় এখন অনেক কম। ভোটাররা তার যাদুকরী কথায় এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে, তাকে নিয়ে বিরূপ কিছু ভাবারও অবকাশ যেনো কারো ছিল না। কিন্তু আজ সেই ভোটাররাই তার সমালোচনায় বিভোর। দলের ভেতরেও সমালোচিত নানা কারণে।

হুভার ইন্সস্টিটিউশন আয়োজিত এক সেমিনারে পোলিং এঙপার্ট স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডং রিভার্স বলেছেন, ওবামার বিরোধিতা করা ছাড়া রিপাবলিকানদের আর কোন ইস্যু নেই, আর ডেমোক্রেটরা ওবামার ব্যাপারে একেবারেই আগ্রহহীন।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক মঈনুদ্দীন নাসের মনে করেন, কেবলমাত্র রিপাবলিকান না, ডেমোক্রেটরাও প্রেসিডেন্ট ওবামাকে নানাভাবে চাপে রাখছে। এই চাপে হয়তো শেষ পর্যন্ত সিনেটেও ডেমোক্রেটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে। এতে ওবামার ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা না হলেও ইমিগ্রেশন রিফর্ম করা কঠিন হয়ে পড়বে। কিন্তু তারপরও তার নির্বাহী আদেশে এই কাজটি হয়তো প্রেসিডেন্ট তার শেষ মেয়াদের শেষ দিকে করে যাবেন বলে তার ধারণা। মঈনুদ্দীন নাসের মনে করেন, ওবামাকে চাপে রেখে দুই দলের রক্ষণশীলরাই ফায়দা লুটতে চাইছে।

যে আসনগুলো ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে
সর্বশেষ জরিপ বলছে ৯টি আসনের ফলাফলের উপরেই নির্ভর করছে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ । এই আসনগুলো হচ্ছে :

আলাস্কা : ডেমোক্রেট সিনেটর মার্ক বেগিচ এই আসনে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার জন্য লড়ছেন। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন আলাস্কার রিপাবলিকান গভর্ণর সারা পেলিনের সাবেক এটর্ণী জেনারেল ডেন সুলিভান। সে কারণেই এখানে দ্বিতীয়বার জেতা কঠিন হবে হবে মার্কের জন্য।

আরকানসাস : এ আসনে তৃতীয় মেয়াদে ডেমোক্রেট প্রার্থী সিনেটর মার্ক প্রেয়র কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন ইরাক ফেরত যোদ্ধা রিপাবলিকান প্রার্থী টম কটনের কাছে। টম কটন তিনবারের বিজয়ী সাবেক ডেমোক্রেট সিনেটর ডেভিড প্রেয়রের ছেলে। ডেভিডের জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে জিতে যেতে পারে টম।

কলারাডো : ডেমোক্রেট সিনেটর মার্ক উডাল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন রিপাবলিকান কোরি কার্ডনারের কাছে। উডাল ওবামার কাছের মানুষ হলেও এখন ওবামার কাছ থেকে দুরে থাকার চেষ্টার বিষয়টি ভোটাররা জানে। এসব কারণেই ভোটাররা আর উডালকে নাও চাইতে পারে।

জর্জিয়া : এ আসনটি রিপাবলিকান সিনেটর সাঙবি চাম্বলিশের ছিল। তিনি অবসরে যাওয়ায় শূন্য এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, ডেমোক্রেট প্রার্থী মিখাইল নান এবং রিপাবলিকান প্রার্থী ডেভিড পারডু। নানের বাবা স্যাম নান এই আসনের ডেমোক্রেটিক সিনেটর ছিলেন এক সময়। ডেভিডের চাচাতো ভাই সাবেক গভর্নর সনি পারডু।

লোয়া : ডেমোক্রেটিক সিনেটর টম হার্কিং ৬ মেয়াদ পর অবসরে যাওয়ায় এই শূন্য আসনে নির্বাচনে লড়ছেন একই দলের ব্র“স ব্রেলি এবং রিপাবলিকান জনি আর্নস্ট। সাবেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মিট রমনী, রানিংমেট সারা পেলিনসহ রিপাবলিকান জায়ান্টদের প্রিয় পাত্রী হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত জনি। সে কারণেই এখানে তার বিজয়ী হবার সম্ভাবনা বেশি।

কানসাস : ৭৮ বছর বয়সী প্রবীণ রিপাবলিকান সিনেটর প্যাট রবার্টসকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন অপেক্ষাকৃত তরুণ নির্দলীয় প্রার্থী গ্রেগ অরম্যান। ডেমোক্রেটিক প্রার্থী চাড টেইলর নিজেকে প্রতিদ্বন্ধিতা থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

লুইজিয়ানা : ডেমোক্রেট সিনেটর ম্যারি লেনড্রিও রিপাবলিকান বিল ক্যাসিডির কাছে পরাজিত হবার আশংকায় আছেন। ওবামা কেয়ারের বড় সমর্থক হিসেবে সে নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপকভাবে পরিচিত।

মিশিগান : ছয় বারের ডেমোক্রেট সিনেটর কার্ল লেভিনের অবসরের কারণে এখানে শূন্যস্থান পুরণের জন্য লড়ছেন ডেমোক্রেট গ্যারি প্যাটার্স এবং রিপাবলিকান টেরি লীন ল্যান্ড।

নর্থ কেরোলিনা : রিপাবলিকান প্রার্থী থম টিলস কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন ডেমোক্রেটিক সিনেটর কে হেগানকে। হেগান তার নির্বাচনী এলাকায় আনপপুলার মানুষ হিসেবে পরিচিত। ওবামার সাথে তার দুরত্ব লক্ষণীয়।

সিনেটে ডেমোক্রেটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে কি হবে
সিনেটে ডেমোক্রেটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা ছাড়া সব ক্ষমতাই চলে যাবে রিপাবলিকানদের হাতে। ফলে ডেমোক্রেটরা চাইলেও কোন কিছু করার ক্ষমতা তাদের থাকবে না। সিনেট এবং হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভে রিপাবলিকানদের একক ক্ষমতার কারণে ভারসাম্য নষ্ট হবার আশংকা থাকবে। তবে চাইলেই যা ইচ্ছা তা হয়তো করতে পারবে না। কারণ কোন বিল পাশ করতে চাইলে শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ওবামার স্বাক্ষরের প্রয়োজনতো রয়েছেই। সিনেটে এবং হাউজে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও রিপাবলিকানরা কোনও বিল পাশ করাতে চাইলে সেটা হয়তো নাও হতে পারে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট চাইলে তার নির্বাহী ক্ষমতায় ইমিগ্রেশন রিফর্মসহ আরও কিছু প্রতিশ্র“ত ওয়াদা তিনি পুরণ করতে পারবেন, যা তিনি করবেন বলেই আশা করছেন অনেকে। তবে সিনেটে হেরে গেলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওবামা যে অনেকটাই অসহায় থাকবেন সেটাও মুখে মুখে প্রচার হচ্ছে সব জায়গায়।

You Might Also Like