হরতাল ও ছুটির ফাঁদে পড়েছে জনজীবন

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দলের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে আগামী ৫ ও ৬ নভেম্বরও হরতাল ডাকতে পারে জামায়াতে ইসলাম। দলীয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্রমতে, দলের আমির নিজামীর মামলার বিষয়টি যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, তা জামায়াত দেশবাসীকে জানাতে চায়। একই সঙ্গে তারা প্রমাণ করতে চায়, দলটি সহিংস নয়। আর তাই নিজামীর ফাঁসির রায়ের পর সারা দেশে উল্লেখযোগ্য কোনো সহিংসতা ঘটেনি।

জামায়াত যদি আগামী ৫ ও ৬ নভেম্বরও হরতাল ডাকে, তাহলে টানা ১০ দিন হরতালের ফাঁদে পড়বে দেশ।

মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর আমীর মতিউর রহমান নিজামীর ‘মৃত্যদণ্ড’ রায়ের বিরুদ্ধে ৭২ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। তাদের এ কর্মসূচিসহ সাপ্তাহিক ও আশুরার সরকারি ছুটির কারণে বৃহস্পতি থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত টানা ৬ দিন সারাদেশে মূলত স্থবিরতা দেখা দেবে।

একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীসহ পরিবহন সেক্টরের সঙ্গে জড়িতরা সরাসরি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীকে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বুধবার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এ রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ অক্টোবর বৃহস্পতিবার এবং ২ ও ৩ নভেম্বর অর্থাৎ রবি ও সোমবার মোট ৭২ ঘণ্টার হরতালের ডাক দিয়েছে দলটি। এর মাঝের দুই দিন শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। হরতাল শেষ হওয়ার পরদিন অর্থাৎ মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) পবিত্র আশুরা উপলক্ষে সরকারি ছুটি। ফলে টানা ৬ দিনের স্থবিরতায় পড়ছে জনজীবন।

হরতালের তিন দিন সরকারি-বেসরকারি সকল অফিস ও আদালত খোলা থাকলেও কর্মস্থলে উপস্থিতির সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় অর্ধেকে নেমে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দেবে।

টানা ৬ দিনের এ স্থবিরতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবেন নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমিক-মেহনতি মানুষেরা পড়বেন চরম বেকায়দায়। অন্যদিকে হরতালের তিন দিন রাজধানীসহ সারাদেশে সকল ধরনের দূরপাল্লার যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বন্ধ রাখবে পরিবহন মালিক সমিতি। অভ্যন্তরীণ রুটে গণপরিবহন চলাচল করলেও তা আশানুরূপ যাত্রী না পাওয়ায় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে মালিকপক্ষকে। অন্যদিকে ফুটপাতকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে ৬ দিনের এ কর্ম স্থবিরতায়।

জামায়াতের ডাকা হরতাল, সাপ্তাহিক ও আশুরার ছুটিতে পরিবহন ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন অ্যাসোসিয়েশন অব বাস কোম্পানিজের সভাপতি মো. কাজল। তিনি বলেন, ‘এক দিন বাস বন্ধ থাকা মনেই লস। বাস যত বেশি চলবে, তত আয় বেশি হবে। একটি বাসের সঙ্গে কম করে তিন থেকে পাঁচজনের জীবিকা নির্ভর করে। আর এক দিন বাস বন্ধ থাকা মানে এ পাঁচজনের বেকার বসে থাকা।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসজুড়ে অবরোধ ও হরতাল থাকায় পরিবহন সেক্টরে যে ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও পুষিয়ে নেওয়া যায়নি। হরতাল হলে দূরপাল্লার রুটে গাড়ি বন্ধ থাকে। আর সিটি সার্ভিসে বাস চললেও যাত্রী থাকে না। দেখা যায়, দিন শেষে আয়ও স্বাভাবিক দিনের তুলনায় কম।’ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘সারাদেশে প্রায় ৬০ হাজার ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান রয়েছে। মালিক বাদ দিয়ে একজন ড্রাইভার ও একজন হেলপার হিসাব করলে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ সরাসরি এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। পণ্য ও মালামাল পরিবহনে জড়িত থাকায় এ কাজের সঙ্গে কুলি, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরাও সংশ্লিষ্ট। সব মিলিয়ে এ খাতে প্রায় এক কোটি মানুষের আয়-রোজগার নির্ভর করছে। হরতাল-অবরোধে এ ব্যবসা বন্ধ থাকলে এক কোটি মানুষের আয় বন্ধ থাকে।’

তিনি বলেন, ‘ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ৬০ ভাগই ব্যাংকের লোননির্ভর ব্যবসা। আমরা লোন নিয়ে ট্রাক রাস্তায় নামাই। আর এখান থেকে আয় করে লোন শোধ করি, ড্রাইভার-হেলপারের বেতন দেই এবং নিজেদের সংসার চালাই। টানা হরতাল ও সরকারি ছুটি থাকলে যে ক্ষতি হয়, তা এক মাসেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘হরতাল-অবরোধে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হন। এ ছাড়া দেশের বৃহৎ এক জনগোষ্ঠী দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভর হওয়ায় তাদের ক্ষতির পরিমাণটাও বেশি।’

তিনি আরও বলেন, ‘হরতালের পাশাপাশি সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটি থাকায় খেটে খাওয়া মানুষের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে। কারণ হরতালে নগরজীবনে কর্মস্থবিরতা সৃষ্টি হলে খেটে খাওয়া মানুষেরও কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে ফুটপাতনির্ভর যে সব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রয়েছেন, তাদের এ ৬ দিনে আয় বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে দূরপাল্লার পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানও ক্ষতির সম্মুখীন হবে।’

You Might Also Like