মানুষের জীবন, সম্মান কবে নিরাপদ হবে?

জীবনের শেষদিকে এসে কেন যেন মনে হয়, জনাব গোলাম আযম স্বাধীনতার বিরোধিতা করে বর্তমান আওয়ামী নেতৃবৃন্দ এবং সমর্থকের কাছে যত না অপরাধ করেছেন, জীবনপণ করে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদারদের পরাজিত করে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনে আমি তার চেয়ে বেশি অপরাধ করেছি। আশা করেছিলাম যে বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছিলাম সেই দেশে আর কিছু না হোক বয়সকালে মান-সম্মান-সম্ভ্রম নিয়ে নিরাপদে থাকব, কেন যেন তাও ফিকে হয়ে আসছে। মানুষ তার সন্তান-সন্ততির সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য সারা জীবন কষ্ট করে। আমার দেশের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কোথায়? আমি চলে যাওয়ার পরও যদি আমার সন্তানরা বেঁচে থাকে তাহলে তাদের কী হবে? আমার সাদামাটা স্ত্রী নাসরীন আমার আগে না মরে, আমি যদি মরি, তার পরের দিনগুলো কেমন হবে? এ দেশের কাছে সে কী ব্যবহার পাবে? মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে এক সময় একমাত্র সিলেটের ফারুক পাশে ছিল। একদিন বড় বিমর্ষ হয়ে এক বটগাছের ছায়ায় বসেছিলাম। অন্ধকার ছাড়া সামনে কোনো আলো ছিল না। হঠাৎই আমার পিঠে হাত দিয়ে বলেছিল, ‘বজ্র ভাই, চিন্তা করবেন না। আমি আছি আপনার সঙ্গে।’ কত জায়গায় কতভাবে কত নেতা-নেত্রীকে বলা হয়, ‘নেত্রী তুমি এগিয়ে চল, আমরা আছি তোমার সঙ্গে।’ কিন্তু সেদিনের ফারুকের হাতের স্পর্শে আমার মনে হয়েছিল, সে তো আছেই, তার সঙ্গে সারা দেশ আছে। সেই ফারুক গত বছর আওয়ামী নেতাদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছে। যা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। কিন্তু হত্যাকারীরা বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই সেদিন তার স্ত্রী গিয়েছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বামীর হত্যার বিচার চাইতে। ফারুকের স্ত্রী আমার ভাতিজি নাহারকে নাকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কাদের সিদ্দিকীকেই যেখানে দল থেকে বাদ দিয়েছি, সেখানে অন্যরা কে? গতকাল লতিফ সিদ্দিকী সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে আগেই নাকি কাদের সিদ্দিকীকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, দেখে ভীষণ মর্মাহত হয়েছি। আজ যারা মনে করেন আমাকে ছোট করে তারা বড় হন, লাভবান হন, তাদের বলব- দুনিয়ার ইতিহাস আমি পড়েছি, সেই ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ভবিষ্যতে তারা ফকির-মিসকিনের সম্মানও পাবেন না। আমাকে অস্বীকার করলে মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করতে পারবেন না। মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর কর্তৃত্ব-নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমার মতো নাদানের প্রয়োজন হবে। লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে তার তেমন ভূমিকা ছিল না। আর আওয়ামী লীগ সব সময় সুখের পায়রা, দুর্দিনে আওয়ামী লীগ কখনো কারও পাশে দাঁড়ায় না। আওয়ামী লীগে থাকলে অন্যের শত্রুতার দরকার পড়ে না, আওয়ামী লীগই আওয়ামী লীগের জন্য যথেষ্ট। জানি, আমি বিএনপি জোটে যোগ দিইনি বা দিতে পারিনি জামায়াত আছে বলে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিনে বিএনপির প্রধান জন্মদিন পালন করেন, অসুবিধা তো ওখানেই। তবু বলি বোন কি আমায় বাদ দিতে পেরেছেন? সে সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কি তার হয়েছে? আমিই তো আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়েছি। এই দুনিয়ায় যারা আওয়ামী লীগ করে না তারা কি বেঁচে থাকে না? ১৯৯৯ সালের ২৮ আগস্ট সখীপুর পাইলট স্কুলের মাঠে সংসদ সদস্য পদ ত্যাগ করার জন্য ভোটারদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছিলাম, ২৯ আগস্ট সংসদ এবং আওয়ামী লীগ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলাম। ইস্তফার পর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের কারণ দর্শানোর চিঠি পেয়েছিলাম। তার উত্তরে জনাব মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানকে জানিয়েছিলাম, আপনার পত্রের এখন আর কোনো কার্যকারিতা নেই। পদত্যাগ করার পর কাউকে বহিষ্কার করা যায়? সে সুযোগ থাকে?

মিন্টো রোডে মোস্তফা মহসীন মন্টুকে নিয়ে যেদিন সভা হয়েছিল, রাত ৩টা পর্যন্ত ছিলাম। তখন তো আমি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির ১ নম্বর সদস্য ছিলাম। সভা মুলতবি হয়েছিল। কিন্তু পরদিন পত্রিকায় দেখা গেল মোস্তফা মহসীন মন্টুকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রাত ৩টা পর্যন্ত সভা চললে তাতে সিদ্ধান্ত না হওয়ার পরও পরদিন কী করে পত্রিকায় খবর আসে? তখন তো এখনকার মতো ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ছিল না। ছাপারও এত সুযোগ-সুবিধা ছিল না। রাত ৮-৯টার পরের কোনো খবর পরদিন পত্রিকায় আসত না। ড. কামাল হোসেনকে যেদিন দল থেকে বহিষ্কার করা হয়, সেদিন অনেকেই খুব বড় গলায় বক্তৃতা করেছিলেন। জনাব আমির হোসেন আমু এবং আমি বলেছিলাম, অনেকেই যেমন বলছেন ড. কামাল হোসেন যেন আর কেয়ামত পর্যন্ত আওয়ামী লীগে আসতে না পারে তার ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এটা ঠিক নয়। আর যাই হোক এত ক্ষোভ নিয়ে রাজনীতি চলে না। বহু মানুষের নিরলস পরিশ্রমে একটা দল দাঁড়ায়। হঠাৎ কারও ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে খুব বেশি অবিচার করতে নেই। তার পরিণতি ভালো হয় না। মানুষ যখন ক্রোধে উন্মাদ হয় তখন অন্যের যুক্তি মানে না। সেদিনও মানেনি বা শোনেনি।

২৪ অক্টোবর গিয়েছিলাম গুরুদাসপুরের রেজ্জুর মোড়ের দুর্ঘটনা দেখতে। ঘটনাস্থলে গিয়ে বুক ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছিল। নিহত মো. শরিফদের বাড়ি গিয়েছিলাম সান্ত্বনা দিতে। তার ছোট্ট বাচ্চা বিশালকে কোলে নিয়ে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। তার স্ত্রী বিউটির পেটে বাচ্চা।

এখন কী হবে তাদের? এ জন্য যদি বুক কাঁপে, হৃদয় ভেঙে খানখান হয়ে যায় তাও কি আমার দোষ? মো. শরিফের ৫ বছরের ছেলে বিশালকে কোলে নিয়ে যখন দাঁড়িয়েছিলাম তখন আমার মনে হচ্ছিল, কুশিকে কোলে নিয়ে আছি। দীপ-কুঁড়ি বড় হয়েছে। ওরা যখন জড়িয়ে ধরে তখন যেমন লাগে, বিশালকে কোলে নিয়ে যদি তেমন লেগে থাকে সেটাও কি আমার অপরাধ বা দোষ? আমাকে আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলে বা কোনো মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসি দেওয়া হলেও অতটা মর্মাহত হতাম না, যতটা হয়েছি আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এমনটা পত্রপত্রিকায় পড়ে। আওয়ামী লীগ আমায় কী বহিষ্কার করবে, আমিই তো আওয়ামী লীগকে বহিষ্কার করেছি আমার তনুমন প্রাণ সমস্ত অন্তর থেকে, আমার সমস্ত অস্তিত্ব থেকে। আজকের আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর নয়, হুজুর মওলানা ভাসানী, জননেতা শামসুল হকের নয়, এটা সুবিধাভোগী রক্তলোলুপ কিছু স্বার্থবাদীর দল এবং সেই দলে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে শিখণ্ডি হিসেবে রাখা হয়েছে, অন্য কিছু নয়। যখন ঘোর কাটবে তখন তিনি অথৈ পানিতে হাবুডুবু খাবেন, সাঁতরানোর সুযোগও পাবেন না। সাঁতরাতে গিয়ে দেখবেন স্বার্থের ডোরে তার হাত-পা বাঁধা, এখন টের না পেলেও তখন পাবেন।

গুরুদাসপুর থেকে ফেরার পথে অনলাইনে খবর পেয়েছিলাম, কালিয়ার প্রাক্তন চেয়ারম্যান কচুয়ার জমশেদ শিকদারের মেয়ের ঘরের নাতনি দেড় বছরের জান্নাত আরাকে কে বা কারা উঠিয়ে নিয়ে পরদিন তার ছিন্ন মুণ্ড ও নাড়িভুঁড়ি পলিথিনে ভরে বাড়ির সামনে সুন্দর করে সাজিয়ে গেছে। কি চরম জিঘাংসা, দেড় বছরের কন্যার কী অপরাধ? তারপরও সরকার বলছে ভালো আছে। কোথায় মানবতা, কোথায় মনুষ্যত্ব, কোথায় বিবেক? কচুয়ার মরহুম জমশেদ শিকদারের বাড়ি গিয়েছিলাম। লোকে লোকারণ্য, তিল ধরার ঠাঁই ছিল না। সবাই মর্মাহত, সবাই শঙ্কিত, এভাবে চলবে কী করে? কচুয়া যাওয়ার আগে গিয়েছিলাম সুরীরচালা আলহাজ আবুল হোসেন ঘটু মাদবরের (মইষাল) কবর জিয়ারত করতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সাবেক প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরীর সুরীরচালার খামারবাড়ি দেখাশোনা করত। বড় ভালো মানুষ ছিল আবুল হোসেন মইষাল। আমার মা-বাবাকে দেখাশোনা করেছে, আজাদ-মুরাদকে কোলে নিয়েছে। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে চোখে পানি রাখতে পারিনি। আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি, আল্লাহ তাকে যেন বেহেশতবাসী করেন। ফেরার পথে সোহাগপাড়ায় মজিবরের বাড়ি গিয়েছিলাম। যার স্ত্রীসহ তিন মেয়েকে এজিদ-ফেরাউনের দল কোরবানির ঈদের রাতে পুড়িয়ে মেরেছে। কত সুন্দর বাড়ি, টাকা-পয়সা, কোনো অভাব নেই। কিন্তু মজিবরের সব আলো নিভে গেছে। সব থাকতেও যেন কিছুই নেই। এখনো প্রধান ঘাতক জাহাঙ্গীর গ্রেফতার হয়নি। তবু সান্ত্বনার কথা, টাঙ্গাইলের এসপি সালেহ আহমেদ তানভীরের সক্রিয় প্রচেষ্টায় আসামিদের ধরার চেষ্টা চলছে। এতে এলাকার মানুষ অনেকটাই আশ্বস্ত। এই প্রথম পুলিশের প্রশংসা শুনলাম। শুনে গর্বিত না হয়ে পারিনি। দোয়া করি, পুলিশ যদি সক্রিয় হয়, নিরপেক্ষ হয় তাহলে অনেক অশান্তি আল্লাহর রহমতে দূর হতে পারে।

একের পর এক হৃদয়বিদারক মর্মান্তিক ঘটনায় মনটা বড় বেশি ভারাক্রান্ত। কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছি না। গুরুদাসপুর ঘটনাস্থলে না গেলে অন্ধকারেই থাকতাম। অন্যান্য দুর্ঘটনার মতো এটাকেও একটা দুর্ঘটনাই মনে করতাম। আসলে ২০ অক্টোবর রেজ্জুর মোড়ে বাসে-বাসে সংঘর্ষ কোনো সড়ক দুর্ঘটনা ছিল না, সেটা ছিল উদাসীনতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। পত্রপত্রিকায় দেখেছিলাম, অথৈ পরিবহন ও কেয়া পরিবহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৪ জন নিহত। ২০-২৪- এ ক’দিন সেটাই বিশ্বাস করেছি। কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে শত শত মানুষের কাছে শুনলাম অন্য কথা। নাটোর থেকে অথৈ পরিবহনের একটি বাস ঠাসা যাত্রী নিয়ে বনপাড়া থেকে সিরাজগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। সে সময় রেজ্জুর মোড়ে এক ট্রাক তাকে ঘেঁষা দিয়ে পালিয়ে যায়। সামনের দিক থেকে আসা কেয়া পরিবহনের চালক সামনের বাসকে ট্রাকের ধাক্কায় এদিক ওদিক মাতলামি করতে দেখে সে পাশের উপপথে নামিয়ে দিয়ে যখন দেখে তার গাড়ি নিচে পড়ে যাচ্ছে তখন আবার রাস্তার উপর ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলে দেড়-দুই ফুট নিচে থেকে লাফিয়ে উঠে অথৈ পরিবহনের টালমাটাল গাড়ির উপরে সজোরে আঘাত হানে, এতে দুই গাড়ি রাস্তার দুদিকে ছিটকে পড়ে। কিন্তু চরম দুর্ভাগ্য, একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে নির্মম ঘটনা ঘটে তারপর। কেয়া পরিবহনের পিছে পিছে ধেয়ে আসা হানিফ পরিবহনের গাড়ি রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মানুষ দেখে না থামিয়ে তার উপর দিয়ে চলে যায়। এই সময় কতজন যে নিহত হয়েছে কেউ বলতে পারে না। কারবালার প্রান্তরে সীমার যে নির্মমতার পরিচয় দিয়েছিল, গুরুদাসপুরে হানিফ পরিবহনের নির্মমতা তার চেয়েও জঘন্য বেদনাদায়ক। কেয়া এবং অথৈ পরিবহনের সংঘর্ষ দুর্ঘর্টনা হিসেবে মেনে নিলেও রাস্তার উপরে পড়ে থাকা মানুষের উপর দিয়ে হানিফের গাড়ি চালিয়ে দেওয়াকে কি করে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেই? এ তো নির্মম গণহত্যা ছাড়া আর কিছু নয়। আমার প্রিয় ছোট্ট কুশি। দিন দিন তার কর্তৃত্ব-নেতৃত্ব বলিষ্ঠ থেকে বলিষ্ঠ হচ্ছে। সে যখন চার সাড়ে চার বছরের তখন ওর মা ছেলে-মেয়ে নিয়ে কোথায় যেন গিয়েছিল। হঠাৎই একটি কুকুর গাড়ির নিচে পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। মা আমার বাসায় ফিরে সে কি চিৎকার-চেঁচামেচি। আমার কাছে নালিশ দেয়, ‘আব্বু, যীশুকে বাদ দিয়ে দাও। ও কুকুর মারতে চায়। ও ভালো না, কুকুরটা মারা গেলে কেমন হতো?’ আসলে কুশিমণির কথা আমরা কেউ ফেলতে পারি না। তার সব কথা মার কথার মতো মেনে চলার চেষ্টা করি। অনেক বলে কয়ে বাবার দেওয়া চালক যীশুর চাকরি সে যাত্রায় রক্ষা করা গিয়েছিল। তারপরও রাস্তাঘাটে গাড়ির সামনে গরু-ছাগল-কুকুর-বিড়াল-হাঁস-মুরগি পড়লে কুশিমণি চিৎকার করে ওঠে, ‘যীশু, তুই কিন্তু মারবি না।’ আসলেই কুশিকে গাড়িতে নিয়ে যীশু সব সময় তটস্থ থাকে। ছোট্ট একটি বাচ্চা, যার এখন সাড়ে ৭ বছর বয়স। রাস্তার গরু-ছাগল-কুকুর-বিড়াল-হাঁস-মুরগি-পশু-পাখির উপর যাতে গাড়ি না উঠে তার জন্য কত চিন্তা আর গুরুদাসপুরে রেজ্জুর মোড়ে দুর্ঘটনায় পতিত মানুষের উপর দিয়ে হানিফের গাড়ি চলে গেল? মাননীয় নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের আশকারা পাওয়া ড্রাইভারের বুকে একটুও বাধল না? কোনো পশুর আত্দাও তো অমন হিংস্র হতে পারে না। কোথায় মনুষ্যত্ব, কোথায় মানবতা? এ তো হিংস্রতার চরম প্রকাশ।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়, রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে অসংখ্য মানুষ খুন করলেও এখন পর্যন্ত হানিফ পরিবহনের সেই গাড়ি এবং ড্রাইভারকে শনাক্ত করা হয়নি। যে ট্রাক অথৈ পরিবহনকে ঘেঁষা দেওয়ায় ঘটনার সূত্রপাত, সেই ট্রাকটি যেমন শনাক্ত করা হয়নি, হানিফ পরিবহন কতজনকে যে হত্যা করেছে, তাকেও শনাক্ত করা হয়নি। এত বড় ঘাতককে ধরার জন্য এ পর্যন্ত তেমন কোনো চেষ্টাও হয়নি। বিআরটিসি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, হানিফ পরিবহনের বাসটি তারা শনাক্ত করতে পারেনি। তাই জনসাধারণ যদি সাহায্য করেন তাহলে ভালো হয়। নির্লজ্জেরও একটা সীমা থাকে। এক্ষেত্রে তাও নেই।

ঘাতক গাড়ি চিহ্নিত করা কী এত কঠিন? আমার তো মনে হয় এখনো তাতে রক্ত লেগে আছে। রক্ত না থাকুক যাদের হত্যা করেছে তাদের অভিশাপ লেগে আছে। কী এমন কঠিন কাজ, ৩ সাড়ে ৩টায় হানিফ পরিবহনের কোন গাড়ি ওখান দিয়ে প্রতিদিন যায়, তা জানতে কতক্ষণ? যেখান থেকে গাড়ি ছেড়েছে সে সিরিয়াল দেখলেই তো হয়। ৩ সাড়ে ৩টায় গুরুদাসপুরের রেজ্জুর মোড় কোন গাড়ি পাড় হয়। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গার টিকিট কাউন্টার, যমুনা সেতু, সিরাজগঞ্জ, বনপাড়া রাস্তায় কাছিকাটার কাছে টোল প্লাজায় জিজ্ঞাসা করলেই পাওয়া যায়। আরও সহজ, কেয়া পরিবহনের পিছে পিছেই ছিল হানিফের সেই ঘাতক। ওইদিন কেয়া পরিবহনের আগেপিছে প্রতিদিন হানিফের কোন গাড়ি চলাচল করে, সেটা ধরতে কতক্ষণ? সংঘর্ষে কেয়া ও অথৈ পরিবহনের চালক নিহত হয়েছে কিন্তু হানিফের দানব তো নিহত বা ধরা পড়েনি। ওই দানব রাস্তায় থাকলে কোনো মানুষ, কোনো গাড়ি-ঘোড়া নিরাপদ নয়। তাই মানবতার স্বার্থে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে অবশ্যই ধরা উচিত। হানিফ পরিবহন যদি নিজে থেকে দানবকে ধরে না দেয় তাহলে হানিফের সব গাড়ি বন্ধ করে দিলেই হয়।

প্রথম আলোর নাটোরের প্রতিনিধি মোক্তার হোসেন রিপোর্ট করেছেন, নাটোরের এডিসি আতোয়ার রহমান ওই গাড়িতে ছিলেন। বেলা সাড়ে ১১টায় গাড়িতে আই-৫ ছিল তার সিট নাম্বার, কোচ নম্বর ছিল ৭৪, গাড়ির নম্বর ১৫৭৫। শুধু ১৫৭৫-ই গাড়ির নম্বর না আগের দিকে আরও কিছু আছে। কিন্তু এ থেকেই সব কিছু বের করা কোনো ব্যাপারই নয়। এডিসির বর্ণনা,

‘দুর্ঘটনাস্থল পার হওয়ার মুহূর্ত স্মরণ করে এডিসি বলেন, সে এক ভয়াবহ মুহূর্ত। ভয়ে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। তিনি জানালেন, ওই দুর্ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি ছাড়া আর কারও কাছে ওই ঘটনার কথা বলেননি।

তদন্ত কমিটির কাছে কেন বললেন জানতে চাইলে এডিসি বলেন, দেখলাম, আমি জবানবন্দি না দিলে সত্যটা হয়তো কেউ জানতেই পারবে না। আর চালক ও সহকারীদের তো শনাক্ত করাই হয়নি।

হতাহতদের ওপর দিয়ে বাস চালিয়ে যাওয়ার কথা তাৎক্ষণিক পুলিশ প্রশাসনকে জানানোর কথা প্রয়োজন মনে করেননি? জবাবে এডিসি বলেন, ঘটনার পর থেকে নাটোর বাইপাসে নামা পর্যন্ত নিজের জীবনের কথা ছাড়া আর অন্য কিছুই ভাবতে পারিনি। পরে তদন্ত কমিটিকে সব বলেছি।

হতাহত ব্যক্তিদের মাড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে হানিফ পরিবহনের স্বত্বাধিকারী ও বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কফিল উদ্দিন গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা মিথ্যা কথা। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।’

এমন সরকারি কর্মকর্তার কাছে রাষ্ট্র এবং মানুষের জানমাল কি নিরাপদ যে এমন অবস্থায় নিজের জীবন ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না। দেশবাসীর কাছে আমার প্রশ্ন, এমন কর্মকর্তার কি শাস্তি হওয়া উচিত নয়? আর জনাব কফিল উদ্দিন যে বলেছেন, এটা মিথ্যা। তাকে এখন গ্রেফতার করে পুলিশ কি বাঁশডলা করবে নাকি র্যাবের মতো হাঁটুতে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে আতুড় করবে? এরপরও কি মাননীয় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ঘাতককে শনাক্ত করতে পারবেন না? আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে গাড়িসহ চালককে আটক করা না হলে যমুনার রাস্তায় সড়ক বন্ধ বা অবরোধ নয়, আমরা হানিফের কোনো গাড়ি চলতে দেব না।

লেখক : রাজনীতিক)

You Might Also Like