আক্রমণ এবং আঘাত

মানুষ মানুষকে আঘাত করে। মনে আঘাত করে, অনুভূতিতে আঘাত করে, চিন্তায় আঘাত করে, সম্মানে আঘাত করে এবং শরীরে আঘাত করে। মানুষের মন বা অনুভূতি বা চিন্তা আঘাতের চিহ্ন দেখাতে পারে না; কিন্তু আক্রান্ত মন বা অনুভূতি বা চিন্তার কারণে মানুষ তিগ্রস্ত হয়। শরীর আঘাত পেলে, প্রমাণ থেকে যায়; কিন্তু পরবর্তী যুগের মানুষ জানে না কেন আঘাত পেয়েছিল বা কিভাবে পেয়েছিল।

কর্নেল তাহের
কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম, বর্তমানে মরহুম। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ছিলেন অন্যতম সেক্টর কমান্ডার। সম্মুখ সমরে নিজে না গেলেও পারতেন, কিন্তু গিয়েছেন। একদিন একটি মাইন বিস্ফোরণে নিজের একটি পা হারিয়েছিলেন। চিকিৎসার পর নকল পা লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল, যেটি সব সময় লাগানো থাকত। হাতে একটি লাঠি রাখতেন, চলাফেরার সময় ভারসাম্য রার সুবিধার্থে। অনেকেই জানতেন না যে, তার পা মাইন বিস্ফোরণে উড়ে গিয়েছিল। কর্নেল তাহেরের শরীরের ওপর আঘাত ছিল দেশের স্বার্থে।

মেজর শমসের মুবিন
অবসরপ্রাপ্ত মেজর শমসের মুবিন চৌধুরী বীর বিক্রম। বর্তমানে বিএনপির অন্যতম সহসভাপতি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তিনি ছিলেন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে চাককিরত, র‌্যাংক ছিল লেফটেন্যান্ট। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করে ২৬ মার্চ ১৯৭১ এর প্রথম প্রহরে। কর্ণফুলী নদীর ওপর অবস্থিত বিখ্যাত প্রাচীন কালুরঘাট রেল সেতু। সেতুর উভয় পাড়ে, অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরাব্যূহ গড়ে তোলে। ওই সময় পাকিস্তানিদের গুলির আঘাতে শমসের মুবিন চৌধুরীর পা খণ্ডিত হয়ে যায়। চিকিৎসা হয়। তার পায়েও একটি অংশ বিগত ৪৩ বছর ধরে নকল। তিনিও একটি লাঠি ব্যবহার করেন চলাফেরার সময় ভারসাম্য রার জন্য। যদিও রাজনীতিতে সুপরিচিত, তথাপি সহস্র লোকে জানে না তিনি কেন লাঠি হাতে নিয়ে চলেন। মেজর শমসের মুবিন চৌধুরীর শরীরে আঘাত ছিল দেশের স্বার্থে।

জেনারেল নাসিম
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবস্থান ছিল বর্তমান গাজীপুর জেলার সদর দফতর জয়দেবপুর নামক গ্রামে। বাংলাদেশের এতদঞ্চলের ইতিহাসে অতি বিখ্যাত একটি নাম হচ্ছে ভাওয়াল রাজা। ভাওয়াল রাজার রাজপ্রাসাদ বা রাজবাড়িতে দ্বিতীয় বেঙ্গল থাকত। দ্বিতীয় বেঙ্গলে বাঙালি অফিসারদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ক্যাপ্টেন আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের অন্যতম কৃতী ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধের সাড়ে পাঁচ মাসের মাথায় ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট নামক নতুন ব্যাটালিয়ন জন্ম লাভ করে। নবজাত ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক নিয়োগ করা হয়েছিল মেজর আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম বীর বিক্রমকে। ১৯৭১-এর ডিসেম্বরের ১ তারিখ থেকে সীমান্তে এবং অন্যত্র ঘোরতর যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। এস ফোর্স নামে ব্রিগেড সমতুল্য বাহিনীর অন্যতম শরিক ছিল ১১ ইস্ট বেঙ্গল। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে তেলিয়াপাড়ার পর, মাধবপুরের পর, ইসলামপুর নামক স্থানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি দল এবং ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মধ্যে তুমুল প্রত্য যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন অধিনায়ক বা কমান্ডিং অফিসার মেজর নাসিম তার পায়ে হাঁটুর ওপরে এবং নিচে একাধিক জায়গায় গুলিবিদ্ধ হন। প্রায় এক বছর তিনি দেশে-বিদেশে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তার দু’টি পায়ের মধ্যে আঘাতপ্রাপ্ত পা দৈর্ঘ্যে এবং আকৃতিতে ছোট হয়ে গেছে। তাকে ওই পায়ের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করা জুতা পরতে হয়। তিনি সামান্য খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। তিনি লাঠি ব্যবহার করেন না। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সর্বশেষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল র‌্যাংকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান হয়েছিলেন। ওই সেনাবাহিনীর হাজার সৈনিকও নিশ্চিতভাবে জানত না যে, এই বীর সৈনিক যার নাম নাসিম, কিভাবে কোথায় কী কারণে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। নাসিমের শরীরের আঘাত ছিল দেশের স্বার্থে।

রাজনৈতিক কর্মী সাইফুল্লাহ
এখন অন্যরকমের দু-একটি উদাহরণ দিই। প্রথম উদাহরণ। ৪ এপ্রিল ১৯৮৭ সালের কথা। চট্টগ্রাম মহানগরে অবস্থিত মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের পূর্ব পাশে আছে হজরত বন-আলী শাহ নামে একজন আউলিয়ার পুরনো মাজার। মাজারসংলগ্ন বিল্ডিংয়ের মালিক ছিলেন বর্তমানে মরহুম আমিনুল হক। হক সাহেব সুপরিচিত ব্যক্তি ছিলেন। কারণ তিনি চট্টগ্রাম মহানগরের আন্দরকিল্লায় অবস্থিত বিখ্যাত সুপরিচিত ‘পাঠক-বন্ধু’ লাইব্রেরির মালিক ছিলেন। ওই চারতলা দালানের দোতলায় থাকতেন, ওই সময়ের জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হাটহাজারী উপজেলার প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম। ওই সময় হাটহাজারী উপজেলা থেকে নির্বাচিত সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ছিলেন অন্য একজন জ্ঞানী সম্মানী ব্যক্তি। ওই সময় হাটহাজারী উপজেলায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বা সরকারদলীয় সংসদ সদস্যের নীরব পৃষ্ঠপোষকতায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল একই উপজেলার আবদুর রহীম সিদ্দিকী নামে একজন ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলের মানুষ নিজেদের মধ্যে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলার সময়, বিশেষত অবজ্ঞাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে কথা বলার সময় অন্য একজন ব্যক্তির নাম রূপান্তর করে ফেলে, যথা : আহমদ হয়ে যায় আমইদ্দা, সামাদ হয়ে যায় সামাইদ্দা, শফিক হয়ে যায় শফিক্কা, রফিক হয়ে যায় রফিক্কা, সালামত হয়ে যায় সালামইত্তা। এই ধারাবাহিকতায় আবদুর রহিম সিদ্দিকী হয়ে গিয়েছিলেন আবদুইয়া। নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান সন্দেহ করছিলেন যে, কোনো না কোনো সময় তিনি সন্ত্রাসী কর্তৃক আক্রান্ত হতে পারেন, তাই বেশির ভাগ সময় বাসায় থাকতেন না। অপর পে মানুষ তো তাকে খুঁজতে বাসাতেই আসত। এরূপ সমস্যা মোকাবেলার জন্য তিনি বন্দোবস্ত করেছিলেন যে, তিনি অনুপস্থিত থাকলে তার প্রাইভেট সেক্রেটারি বাসায় সামনের কামরায় থাকবে। এরকমই একটি দিনে আবদুইয়ার নেতৃত্বে, আবদুইয়া বাহিনীর কয়েকজন আক্রমণ করতে গিয়েছিল নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যানকে তার বাসভবনের ভেতর পিস্তল-রামদা ইত্যাদি নিয়ে। ঘটনাক্রমে উপজেলা চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন না। উপস্থিত ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক পিএস সৈয়দ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। আবদুইয়া বাহিনী মূল টার্গেট না পেয়ে সাইফুল্লাহকে আক্রমণ করে, তার পায়ে, রানে, হাঁটুর নিচে এবং পায়ের পাতায় কঠোর আঘাত করে। রক্তাক্ত মৃতপ্রায় সাইফুল্লাহকে দুই হাত ও দুই পা ধরে (চ্যাংদোলা করে) দোতলা থেকে নিচের উঠানে ছুড়ে ফেলে দেয়। সন্ত্রাসীরা ধরেই নিয়েছিল, সাইফুল্লাহ মৃত। স্থানীয় লোকজন সাইফুল্লাহকে হাসপাতালে নেয়, সাইফুল্লাহ সেরে ওঠে; কিন্তু অপারেশনের কারণে তার পা ছোট হয়ে যায়। ফলে সাইফুল্লাহকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয় এবং আঘাতপ্রাপ্ত পায়ে শক্তি অনেক কম। আজকের প্রজন্ম সাইফুল্লাহ নামে একজন ব্যক্তিকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখলে কল্পনাও করবে না যে সাইফুল্লাহ সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার কারণেই খুঁড়িয়ে হাঁটছে। মনে করবে হয়তো ছোটকালে পলিও হয়েছিল অথবা কোনো গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে এ জন্যই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। আবদুইয়া নামে সন্ত্রাসী ওই ঘটনার কয়েক বছর পর নিজেই উন্মুক্ত জায়গায় মানুষের আক্রমণে টুকরো টুকরো কাটা হয়ে মারা যায়। ওই আমলের হাটহাজারী আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্যের প্রতি সম্মানের নিদর্শনস্বরূপ এখানে অবশ্যই বলে রাখা প্রয়োজন মনে করি যে, ওইরূপ কোনো আবদুইয়া এখন আর নেই বা ওইরূপ আরেকজন আবদুইয়াকে এখন পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় না। সাইফুল্লাহর শরীরে আঘাত হয়েছে, তার মুরুব্বির প্রতি আনুগত্যের কারণে।

সাংবাদিক টিপু সুলতান
দ্বিতীয় উদাহরণ। ২৫ জানুয়ারি ২০০১ সালের কথা। ঢাকা মহানগরের মৌচাক মোড়েই একটি ছোট বহুতল দালানে অবস্থিত বিখ্যাত সংবাদ সংস্থা ইউএনবি’র অফিস। ওই ইউএনবি’র একজন স্টাফ রিপোর্টার তথা সংবাদকর্মী ছিলেন টিপু সুলতান। জানুয়ারির কিছু দিন আগে বাংলাদেশের দণি-পূর্বে অবস্থিত বিখ্যাত ফেনী শহরে স্থাপিত হয়েছিল একটি স্কুল, ‘সুলতানা মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল’। সুলতানা হচ্ছে একজন নিবেদিতপ্রাণ স্কুল শিকিার নাম। তার জীবনের সব সঞ্চয় ব্যবহার করে, তার সন্তানেরা ওই স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত করেছিল। প্রতিষ্ঠার পর স্কুলটির উদ্বোধন ফাংশনে আয়োজকেরা একজন মন্ত্রীকে দাওয়াত দিয়েছিলেন প্রধান অতিথি হিসেবে। এতে মনোুণœ ও ুব্ধ হয়েছিলেন ওই এলাকার নির্বাচিত সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারী। জয়নাল হাজারী তখনকার আমলে ফেনীর অঘোষিত রাজা ছিলেন। তিনি ‘স্টিয়ারিং কমিটি’ নামে এক অদ্ভুত সাংগঠনিক ব্যবস্থায় ফেনী শাসন করতেন। দাওয়াত না দেয়ার কারণে তিনি স্কুলের ওপর প্রতিশোধ নিতে সিদ্ধান্ত নিলেন। ফাংশনের আগেই স্কুলটি গুঁড়িয়ে দিলেন। স্কুলের পাশেই সুলতানা কামালের কবরের বেড়াসহ গুঁড়িয়ে দিলেন। তৎকালীন ইউএনবির সাংবাদিক টিপু সুলতান এ ঘটনাটি ইউএনবিতে রিপোর্ট করেন। ইউএনবি আরো অনেককে সরবরাহ করে। দেশবাসী অনেকেই জানতে পারেন। ফেনীর অঘোষিত রাজা প্তি হলেন সাংবাদিকের ওপর। আদেশ দিলেন ওই সাংবাদিককে ফেনী শহরে পাওয়া গেলে যেন ‘উপযুক্ত মেহমানদারি’ করা হয়। সংবাদ প্রকাশের কয়েক দিন পর টিপু সুলতান ফেনী গিয়েছিলেন। ২৫ জানুয়ারি ২০০১, বৃহস্পতিবার। সময় মাগরিবের আজানের অল্প পরে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহাসড়ক তথা গ্রান্ডট্র্যাংক রোডের পাশেই তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। কয়েকজন সন্ত্রাসী টিপু সুলতানকে সশরীরে উঠিয়ে নিয়ে গেল, ফেনী শহরেই অবস্থিত বিখ্যাত শহীদ জহির রায়হান হলের সামনে। তাকে মারা শুরু করল রড দিয়ে, শক্ত কাঠ দিয়ে। টিপু সুলতানের মাথা ফেটে গেল, টিপু সুলতানের দুই হাত এবং দুই পা ভেঙে গুঁড়া করে দেয়া হলো। টিপু সুলতান মৃত্যুর দুয়ারে অপো করতে থাকলেন। আক্রমণকারী সন্ত্রাসীরা টিপু সুলতানকে মৃত ভেবে ওখানে ফেলে চলে গেল। দূর থেকে দেখা লোকজন এগিয়ে এলো এবং টিপু সুলতানকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। পরে টিপু সুলতান ঢাকায় চার মাস এবং ব্যাংককে চার মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি সুস্থ হয়েছেন, কিন্তু ষোলো বছর আগে যেমন ছিলেন তেমনটি নয়। টিপু সুলতান আক্রান্ত হয়েছিলেন জনগণকে সত্য জানানোর কারণে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, মিডিয়ার স্বাধীনতার স্বার্থে।

‘প্রিয়’ মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী
শরীরের বাইরে আঘাতের উদাহরণ দিই। আওয়ামী লীগ নামে বিখ্যাত রাজনৈতিক দলের অন্তত চার দশকের পুরনো একজন সদস্যের নাম আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। ২০০৯ সালে মন্ত্রী হন। পাঁচ বছর মন্ত্রিত্ব করেন। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে আবার মন্ত্রী হন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অতি আস্থাভাজন, প্রিয় মন্ত্রী এবং আপনজন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। সরকারি নিয়ননীতির কোনো তোয়াক্কা না করেই মন্ত্রণালয় চালাতেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। সরকারি সম্পত্তি বেচাবিক্রি করতেন বা দান দণিা করতেন, যেন নিজের তিন পুরুষের পৈতৃক সম্পত্তি। নিজের জন্মস্থান জেলায় জায়গা জমি কিনতেন কাগজে, টাকা পয়সা লেনদেন করতেন না, পেমেন্ট করতেন লাঠির বাড়ি দিয়ে, সন্ত্রাস দিয়ে, অন্যের জীবন, শান্তি ও সুখ হরণ করে। দুর্নীতি করতেন ঈমানদারির সাথে যেন কেউ বলতে না পারে তিনি দুর্নীতিতে দুর্বল অথবা আন্তরিক নন। ২০১৪ সালে সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সফরে গেলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। প্রথিতযশা মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে সংবর্ধনা দিলেন নিউ ইয়র্ক মহানগরী তথা মার্কিন মুল্লুকে অবস্থিত টাঙ্গাইল জেলার সন্তানগণের সংগঠন যার নাম টাঙ্গাইল সমিতি। ওই সংবর্ধনা সভায়, শরীর হেলিয়ে দুলিয়ে, অতীতকালের রাজা মহারাজাদের মতো মাথা নেড়ে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বিজ্ঞ প্রফেসরের মতো ভাষণ দিলেন। ভাষণটি সংবর্ধনার জবাব ছিল না। ভাষণটি টাঙ্গাইলবাসীর প্রতি উপদেশমূলক ছিল না। ভাষণটি ছিল চারটি জায়গায় আক্রমণকারী। আক্রমণের ল্যবস্তু প্রথম ছিল : মানবকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানব, নবীগণের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম নবী, রাসূলগণের মধ্যে শেষতম রাসূল, দ্বীন ইসলামের বাহক হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা:। আক্রমণের দ্বিতীয় ল্যবস্তু ছিল দ্বীন ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম তথা পবিত্র হজ সম্পাদন। আক্রমণের তৃতীয় ল্যবস্তু ছিল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অদূরে অবিস্থত শিল্পনগরী টঙ্গীর দণি প্রান্তের তুরাগ নদীর তীরে বছরে একবার অনুষ্ঠিত বিখ্যাত তাবলিগ-ইজতেমা। আক্রমণের শেষ এবং চতুর্থ ল্যবস্তু ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম উপদেষ্টা, বাংলাদেশের ৪৪ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের বেতনভুক্ত উপদেষ্টা (মাসিক এক কোটি ষাট লাখ টাকা বা তার কাছাকাছি) সজীব ওয়াজেদ জয়, বাবা প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী বর্তমানে মরহুম ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া এবং মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আবদুল লতিফ সিদ্দিকী আক্রমণ করেছেন কোনো মানুষের শরীর নয়। তিনি আক্রমণ করেছেন বাংলাদেশের ষোলো কোটি মুসলমানের অনুভূতিকে, আবেগকে এবং বিশ্বাসকে। আক্রমণের কারণে যে ত সৃষ্টি হয়েছে সেটি সাধারণ চোখে দেখা যাবে না। কোনো হাসপাতালে গিয়ে এই তের চিকিৎসা করা যাবে না। ষোলো কোটি মুসলমান আক্রান্ত হতো না, যদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পাঁচ বছর যাবৎ আদরযতœ করে, আশ্বাস বিশ্বাস স্থাপন করে, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী নামক একজন ঔদ্ধত্যপূর্ণ, ইসলামি নিয়মের ঈমান-ত্যাগকারী ব্যক্তিকে নিজের ক্যাবিনেটে মন্ত্রী হিসেবে না রাখতেন। প্রধানমন্ত্রী হুকুমের আসামি নন; কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার আসামি।

দু’জন বীর উত্তম, বাহিনীপ্রধান
গত এক বছরে দু’টি বই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঝড় তুলেছে। একটি বইয়ের লেখক মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে শারমিন আহমদ। আরেকটি বইয়ের লেখক মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের অধীনস্থ মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতির দফতরে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ তথা উপপ্রধান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী (তৎকালীন গ্র“প ক্যাপ্টেন) এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার বীর উত্তম। সফল জীবনের উদাহরণ দিতে গেলে খন্দকারের নাম সহজেই অগ্রাধিকার পাবে। পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে উনিশ-বিশ বছর চাকরি করেছেন, যথাযথ নিয়মে ও সময়ে। ৯ মাসের মধ্যে সাড়ে সাত মাস মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান ছিলেন প্রায় সাড়ে চার বছর। জেনারেল জিয়াউর রহমান, বিচারপতি আবদুস সাত্তার এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকারের অধীনে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন। এরশাদ সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০০৯ থেকে ২০১৩ পাঁচ বছর হাসিনা সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন। নাগরিক সমাজের একাংশের তথা মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশের একটি সংগঠন, যার নাম সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, সেই ফোরামের সভাপতি ছিলেন ছয় বছরের অধিককাল। ২০১৪ সালে বই প্রকাশ করলেন মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে। সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। নতুন সভাপতি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম সেনাবাহিনী প্রধান বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ বীর উত্তম। এত দিন সফিউল্লাহ খন্দকারের অধীনেই সহসভাপতি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে রণাঙ্গনে ৩ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ও এস ফোর্স নামে ব্রিগেড সমতুল্য বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন তৎকালীন মেজর বা লেফটেন্যান্ট কর্নেল কে এম সফিউল্লাহ। ২৪ অক্টোবর ২০১৪ সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের নতুন সভাপতি সফিউল্লাহ ঘোষণা করলেন, এখন থেকে খন্দকারকে আর মুক্তিযোদ্ধা বলা যাবে না। নিশ্চিতভাবেই সফিউল্লাহর ঘোষণা হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাকেই আঘাত করল। সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছিল এমন মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে প্রচুরসংখ্যক আঘাতপ্রাপ্ত হলেন তাদের নিজ মনে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই নিয়ে তোলপাড়। যারা জানেন না তাদের জন্য বিনীত নিবেদন, বিমানবাহিনীর এয়ার ভাইস মার্শাল এবং সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল সমান পর্যায়ের র‌্যাংক। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ খন্দকার ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম বিমানবাহিনী প্রধান এবং সফিউল্লাহ ছিলেন প্রথম সেনাবাহিনী প্রধান। পাঠক বিচার করুন মুক্তিযোদ্ধা সফিউল্লাহ বীর উত্তম, মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার বীর উত্তমকে আঘাত করতে গিয়ে, শাস্তি দিতে গিয়ে আর কাকে কাকে আঘাত করলেন এবং আর কাকে কাকে শাস্তি দিলেন। এয়ার ভাইস মার্শাল খন্দকার আক্রান্ত হলেন। কারণ তিনি ১৯৭১ সালের আগে পরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে নিজের অনুভূতি ও পর্যবেণ তার বইয়ের মধ্যে লিখেছেন। বইটি শাসক রাজনৈতিক দল পছন্দ করেনি। তাহলে অবশ্যই খন্দকারকে আক্রমণ করলে, শাসক রাজনৈতিক দল খুশি হওয়ার কথা। দল তো খুশি হতেই পারে, কিন্তু যিনি খুশি করলেন … তার প্রাপ্ত কী?

শেষ নিবেদন
পাঠক আঘাত করা থেকে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়; কিন্তু সব সময় বিরত থাকা যায় না। মৌখিক আক্রমণের উত্তর মৌখিকভাবে দিতে হয়। শারীরিক আক্রমণের উত্তর শারীরিকভাবে দিতে হয়; কিন্তু দুই প্রকারের আঘাত কেউ যেন না করেন, এই মর্মে আমার অনুভূতি প্রকাশ করে কলাম শেষ করছি। প্রথমটি হলো ধর্ম নিয়ে। মহানবী সা:-এর হাদিস আছে : তোমরা কেউ অন্য ধর্মাবলম্বী কাউকে তাদের ধর্মের কোনো বিষয় নিয়ে কটা করবে না বা তাদের কোনো উপাস্যকে নিয়ে কোনো কটা করবে না। কারণ যেই ব্যক্তিকে তুমি আঘাত দেবে, তখন প্রতিশোধ নিতে গিয়ে ওই আক্রান্ত ব্যক্তিও তোমার সৃষ্টিকর্তা বা তোমার প্রতিপালককে কটা করতে পারে। তুমি নিশ্চয় চাও না, তোমার আল্লাহকে কেউ কটা করুক। দ্বিতীয়টি হলো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। জীবন বাজি রেখে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে বা রণাঙ্গনের পারিপার্শ্বিকতায় থেকে, মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের কারণেই, মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কারণেই বাংলাদেশ স্বাধীন, আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। অতএব মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা বা অমুক্তিযোদ্ধা কটা করুক, এটা কি কারো কাম্য হতে পারে?
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
( নয়া দিগন্ত )

You Might Also Like